কবিতার খাতা
স্বাধীনতা একটি বিদ্রোহী কবিতার মতো – শামসুর রাহমান।
সে এক সময় ছিল আমাদের, সন্ত্রাসের কণ্টকিত হাতে
সমর্পিত সারাক্ষণ। আমরা কখনো
আহত পশুর মতো নিজস্ব গুহায় স্বেচ্ছাবন্দি, কখনোবা
পলাতক গ্রাম-গঞ্জে, মফস্বলে, নদীতীরে, রাইফেল আর
বেয়নেট থেকে দূরে। গেরস্ত কুটিরে, স্কুলঘরে গাদাগাদি
অনেক সংসার একাকার। দুর্বিপাকে
হয়তো এমনই হয়। কোথাও নিস্তার নেই; খাকি
সন্ত্রাসে আচ্ছন্ন হয় নদীতীর, সর্ষেক্ষেত, তাল-সুপুরির
গাছ, বাঁশবন, বেতফল আর বাবুইপাখির বাসা। প্রহরে প্রহরে
রাইফেল গর্জে ওঠে, যেন বদমেজাজী মোড়ল
ভীষণ শাসাচ্ছে অধস্তন পাড়া-পড়শিকে। আবার গুটিয়ে
পাততাড়ি ফিরে আসি বিকলাঙ্গ শহরেই যূথচারী লেমিং যেমন
ছুটে যায় দুর্নিবার ধ্বংসের চূড়ায়।
সে এক সময় ছিল আমাদের। লুপ্ত স্বাভাবিক
কথোপকথন, হাসি তামাশা ইত্যাদি।
কেবল ভয়ার্ত চোখে চাওয়া,
কড়িকাঠ গোনা,
অন্ধকার ঘরে
কখনো নিঃশব্দ ব’সে থাকা, কখনোবা
রুলিপরা একটি হাতের
বন্দরে ভিড়িয়ে
ঝঞ্ঝাহত নিজের একলা হাত আবার চমকে ওঠা অভ্যাসবশত—
সে এক সময় ছিল আমাদের ভয়ানক আহত ঢাকায়।
তখন খেলার প্রতি ছিল বড় বেশি উদাসীন
বালক-বালিকা;
করাল বেলায় নিমজ্জিত
আপাদমস্তক
সন্ত্রাসে ওরাও যেন আমাদের সমান বয়সী!
আমাদের দিনগুলি, আমাদের রাত্রিগুলি শেয়াল-শকুন
ক্রমাগত খেল চেটেপুটে
দিব্যি সভ্যতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে।
একটি গণ্ডার, শিং যার রক্তমাখা, বারবার
হানা দেয় ঘরে,
দরজা-জানালা ভাঙে; আসবাবপত্র
করে তছনছ,
চালায় ধারালো শিং উদরে আমার;
বন্য পদতলে, হায়, দলিত সন্তান,
দ্বিখণ্ডিতা জীবন-সঙ্গিনী।
পরদিন সে গণ্ডার আবার উদিত হয় সগৌরবে সব
সংবাদপত্রের
প্রথম পৃষ্ঠায় চমৎকার ফটোরূপে,
ফটোর তলায় নামাঙ্কিত টিক্কা খান।
কখনো নিঝুম পথে হঠাৎ লুটিয়ে পড়ে কেউ গুলির আঘাতে,
মনে হয়, ওরা গুলিবিদ্ধ করে স্বাধীনতাকেই।
দিনদুপুরেই জিপে একজন তরুণকে কানামাছি করে
নিয়ে যায় ওরা;
মনে হয়, চোখ-বাঁধা স্বাধীনতা যাচ্ছে বধ্যভূমিতে।
বেয়নেটবিদ্ধ লাশ বুড়িগঙ্গা কি শীতলক্ষ্যায় ভাসে;
মনে হয়, স্বাধীনতা লখিন্দর যেন,
বেহুলা বিহীন,
জলেরই ভেলায় ভাসমান।
যখন শহরে ফাটে বোমা, হাতবোমা, অকস্মাৎ
ফাটে ফৌজি ট্রাকের ভেতর,
মনে হয়, স্বাধীনতা গর্জে ওঠে ক্রোধান্বিত দেবতার মতো।
এরই মধ্যে মৃতগর্ন্ধময় শহরে যখন খুব
কুঁকড়ে থাকা কোনো শীর্ণ গলির ভেতর
আঁধারের নাড়ি ছেঁড়া নবজাতকের
প্রথম চিৎকার জেগে ওঠে,
মনে হয়, স্বাধীনতা একটি বিদ্রোহী
কবিতার মতো
তুমুল ঘোষণা করে অলৌকিক সজীব সংবাদ।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। শামসুর রাহমানের কবিতা।
কবিতার কথা –
শামসুর রাহমানের ‘স্বাধীনতা একটি বিদ্রোহী কবিতার মতো’ কবিতাটি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন অবরুদ্ধ ঢাকা তথা সমগ্র বাংলাদেশের এক নির্মম, বিভীষিকাময় ও মহাকাব্যিক বিবরণ। কবি এখানে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বর্বরোচিত নিপীড়ন, ভয়াল পরিবেশ এবং তার বিপরীতে ফুটে ওঠা বাঙালি জাতির অদম্য প্রতিরোধ ও আশার দ্যোতনাকে অনন্য রূপকে রূপায়িত করেছেন।
কবিতাটি শুরু হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সেই দুঃসহ সময়ের স্মৃতিচারণ দিয়ে। অবরুদ্ধ শহরের মানুষ তখন স্বজন হারানোর ভয়ে কখনো আহত পশুর মতো নিজের ঘরে বন্দি, আবার কখনো জীবন বাঁচাতে গ্রাম-গঞ্জে বা মফস্বলে আশ্রয়প্রার্থী। গ্রামের শান্ত-সবুজ প্রকৃতি—সর্ষেক্ষেত, বাঁশবন বা বাবুইপাখির বাসা—কোথাও নিস্তার ছিল না। পাকি হানাদারদের খাকি পোশাক আর রাইফেলের গর্জনকে কবি তুলনা করেছেন বদমেজাজী মোড়লের অবিরাম শাসনের সাথে। আবার প্রাণ বাঁচাতে শহর ছেড়ে পালানো কিংবা লেমিং পাখির মতো ধ্বংসের মুখে ফিরে আসার যে মানসিক যন্ত্রণা, তা ফুটে উঠেছে চমৎকার সংবেদনশীলতায়।
অবরুদ্ধ ঢাকার সেই ভয়াল দিনগুলোতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, হাসি-তামাশা সবই থমকে গিয়েছিল। মানুষের চোখগুলোতে খেলা করত কেবল অমঙ্গল আর মৃত্যুর আশঙ্কা। নিষ্পাপ বালক-বালিকারাও শৈশবের খেলাধুলা ভুলে আচমকা এক ভীতিকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়ে যেন একরাতেই বড় হয়ে গিয়েছিল। হানাদার বাহিনীর নৃশংসতাকে কবি তুলে ধরেছেন রক্তমাখা শিং-ওয়ালা এক হিংস্র ‘গণ্ডার’-এর রূপকে, যে ঘরে ঢুকে তছনছ করে সব, হত্যা করে সন্তান ও স্ত্রীকে। আর সেই চরম মিথ্যার প্রতীক হয়ে পরবর্তী দিনের সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় ভেসে ওঠে শাসক টিক্কা খানের ছবি।
তবে কবি কেবল যন্ত্রণার বিবরণ দিয়েই থেমে থাকেননি; পুরো কবিতাজুড়ে তিনি ‘স্বাধীনতা’কে একেকটি বিচিত্র রূপকে প্রত্যক্ষ করেছেন। পথে কোনো তরুণ গুলির আঘাতে লুটিয়ে পড়লে মনে হয় গুলিবিদ্ধ হয়েছে খোদ স্বাধীনতা। জিপে চেপে চোখ-বাঁধা তরুণকে বধ্যভূমিতে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্যে মনে হয় বন্দি স্বাধীনতাকেই নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। নদীতে ভেসে থাকা বেয়নোটবিদ্ধ লাশের মাঝে কবি খুঁজে পান বেহুলাহীন নিঃসঙ্গ লখিন্দরের প্রতিচ্ছবি।
কিন্তু পরাধীনতার এই চরম অন্ধকারের ভেতরেই স্পন্দিত হতে থাকে প্রতিরোধের আগুন। ফৌজি ট্রাকে যখন গেরিলা যোদ্ধাদের বোমা ফাটে, তখন মনে হয় স্বাধীনতা এক ক্রোধান্বিত দেবতার মতো গর্জে উঠেছে। কবিতার চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে কবি এক অবিশ্বাস্য আশার আলো জ্বালান—মৃত্যুপুরীতে পরিণত হওয়া শহরের শীর্ণ গলির ভেতর যখন কোনো নবজাতকের প্রথম কান্নাধ্বনি ভেসে আসে, তা যেন আঁধারের নাড়ি ছিঁড়ে জন্ম নেওয়া এক নতুন জীবন। সেই কান্না কবির কাছে মনে হয় ‘একটি বিদ্রোহী কবিতার মতো’, যা সমস্ত নিপীড়ন ও মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে জীবনের চূড়ান্ত জয়গাথা ও অলৌকিক সজীবতার সংবাদ ঘোষণা করে।






