সোনাকুসুম – সুবোধ সরকার।

আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি
পাড়ার একটা মেয়েকে দেখে পাগল হয়ে গেলাম-
সোনাকুসুম।
কিন্তু বাবা দেখলে আর রক্ষে নেই, মারবে
কী আর করি আমরা দু’জন একটা ভাঙা স্কুলবাড়িতে গেলাম।

সেখানে বসে কার্ল মার্কস
দাস ক্যাপিটল লিখছিলেন।
চশমা তুলে দেখলেন
আমি বললাম, এই মেয়েটা সোনকুসুম
তিনি একটা ফুঁ দিলেন
আমরা দু’জন উড়ে গেলাম মেঘে।

নেমে এলাম, নেমে এলাম ঝির ঝির ঝির বৃষ্টি হয়ে।

আজও আমরা নামি
আজও তোমরা ফোন ফেলে দিয়ে,
চুল খুলে দিয়ে ঝিরঝিরিয়ে মাত
আমার আর সোনামণির জলে।

একেই লোকে পাগল হওয়া বলে।

আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। সুবোধ সরকারের কবিতা।

কবিতার কথা –

সুবোধ সরকারের ‘সোনাকুসুম’ কবিতাটি কৈশোরের প্রেম, কল্পনা এবং রাজনীতির এক অদ্ভুত মেলবন্ধনে তৈরি এক মায়াবী আখ্যান। কবিতার শুরুতে আমরা দেখি নবম শ্রেণিতে পড়া এক কিশোরের চোখে প্রথম প্রেমের তীব্রতা, যা তাকে প্রায় পাগল করে তুলেছে। পাড়ার সেই মেয়েটি, যার নাম ‘সোনাকুসুম’, সে কেবল একটি চরিত্র নয় বরং এক শুদ্ধ অনুভূতির প্রতীক। কিশোর মনের সেই প্রেম যেমন ছিল পবিত্র, তেমনি ছিল সামাজিক বা পারিবারিক শাসনের ভয়ে কম্পমান। বাবার হাতে মার খাওয়ার ভয় আর প্রেমের আকুলতার মাঝে পড়ে কিশোর কবি আশ্রয় খুঁজে নেন এক ভাঙা স্কুলবাড়িতে। এই ‘ভাঙা স্কুলবাড়ি’ মূলত একটি জীর্ণ সমাজের বা পুরনো ব্যবস্থার রূপক হতে পারে, যেখানে নতুন কোনো স্বপ্ন বা বিপ্লব দানা বাঁধছে। এই সাধারণ এক প্রেমের গল্পের মধ্যে কবি হঠাৎ করে নিয়ে আসেন এক মহাজাগতিক ও রাজনৈতিক মোড়। সেখানে দেখা যায় কার্ল মার্কস নিবিষ্ট মনে ‘দাস ক্যাপিটাল’ লিখছেন। প্রেমের এই নিভৃত পরিসরে মার্কসের উপস্থিতি এক বিশেষ গভীরতা যোগ করে। মার্কস যখন চশমা তুলে তাঁদের দেখেন এবং একটি ‘ফুঁ’ দিয়ে তাঁদের মেঘে উড়িয়ে দেন, তখন প্রেম আর বিপ্লব একাকার হয়ে যায়। মার্কসের সেই ফুঁ যেন সমস্ত জাগতিক নিয়ম আর শাসনের শিকল ভেঙে দেওয়ার এক বৈপ্লবিক ইশারা।

কবিতার পরবর্তী অংশে এই প্রেমের এক অবিনশ্বর ও প্রাকৃতিক রূপ ফুটে উঠেছে। মেঘে উড়ে যাওয়া সেই প্রেমিক যুগল ঝিরঝির বৃষ্টি হয়ে পৃথিবীতে নেমে আসে। এই বৃষ্টি হওয়া আসলে প্রেমের এক শাশ্বত রূপান্তর। বৃষ্টি যেমন পৃথিবীর তৃষ্ণা মেটায় এবং সবকিছুকে সজীব করে তোলে, প্রেমও তেমনি মানুষের মনকে সতেজ করে। কবি এখানে দাবি করেছেন যে, তাঁদের সেই পুরনো প্রেম আজও ফুরিয়ে যায়নি; আজও যখন বৃষ্টি পড়ে, তখন তা আসলে সেই সোনামণি আর কবিরই জল হয়ে পৃথিবীতে ঝরে পড়ে। এই অংশটি অত্যন্ত রোমান্টিক এবং দার্শনিক, যেখানে ব্যক্তিগত প্রেম এক মহাজাগতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। বর্তমান প্রজন্মের তরুণ-তরুণীরা যখন ফোন ফেলে দিয়ে, চুল খুলে সেই বৃষ্টিতে মাতে, তখন তারা অজান্তেই সেই চিরন্তন প্রেমের উত্তরাধিকারী হয়ে ওঠে। বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা তখন এক একটি আবেগের গল্প বলে যায়। আধুনিক যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততা ভুলে বৃষ্টির এই ধারায় নিজেকে সঁপে দেওয়াটাই হলো প্রেমের সার্থকতা। কবির ভাষায়, এই যে যুক্তিহীন আনন্দ আর প্রকৃতির সাথে মিশে যাওয়া, একেই লোকে ‘পাগল হওয়া’ বলে।

পরিশেষে, কবিতাটি আমাদের জীবনের সেই সহজ ও সুন্দর সময়গুলোকে মনে করিয়ে দেয় যখন ভালোবাসা ছিল শর্তহীন। কার্ল মার্কসের মতো একজন গম্ভীর তাত্ত্বিকও যেখানে প্রেমের এই বৈপ্লবিক রূপকে সমর্থন দিয়ে আকাশে উড়িয়ে দিচ্ছেন, সেখানে প্রেমের এক মানবিক ও রাজনৈতিক জয়গান ধ্বনিত হয়। সুবোধ সরকার এখানে সমাজতত্ত্ব আর রোমান্টিসিজমকে এমনভাবে মিশিয়েছেন যে, প্রেম আর বিপ্লব আর আলাদা থাকে না। বৃষ্টির ঝিরঝির শব্দে কবি তাঁর হারানো সোনাকুসুমকে খুঁজে পান প্রতিটি নতুন প্রজন্মের মাঝে। জীবনের জটিলতা আর শাসনের ঊর্ধ্বে উঠে প্রেমের এই যে উন্মাদনা, তাই আসলে মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। সৃষ্টির সার্থকতা লৌকিক হাততালিতে নয়, বরং স্রষ্টার নিজের মানসিক মুক্তি এবং অস্তিত্বের তাগিদে। এই কবিতার প্রতিটি চরণে কৈশোরের সেই নস্টালজিয়া আর প্রেমের এক অপরাজেয় শক্তি মিশে আছে, যা পাঠককে এক মুহূর্তের জন্য হলেও সেই সোনাকুসুমের জগতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। এভাবেই কবিতাটি এক সাধারণ প্রেমের গল্প থেকে মহাজাগতিক এক অনুভবে উত্তীর্ণ হয়েছে।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x