কবিতার খাতা
মা বলেছিল – সুবোধ সরকার।
প্রথম আমি কলেজ যাব সেদিন কী যে ভয়!
মা বলেছিল যেতে হবে না আমার কাছে থাক।
প্রথম কলকাতায় আসা,একা কি করে আসি?
মা বলেছিল যেতে হবেনা আমার কাছে থাক।
‘কলকাতার চাইতে বড় আমার এই আঁচল ‘
মা বলেছিল যেতে হবে না আমার কাছে থাক।
আমেরিকার বিমান ছিল প্রথম, সে কী ভয়!
অতটা দূরে যেতেই হবে? না গেলেই কি নয়?
মা বলেছিল যেতে হবে না যাচ্ছে যারা যাক
তুই আমার মাঘ-নিশীথে আঁচল জুড়ে থাক।
আমি থাকিনি, মা-ও থাকেনি, থাকেনি বৈশাখ
স্বপ্নে আজও মা বলে যায় ‘আমার কাছে থাক’।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। সুবোধ সরকারের কবিতা।
কবিতার কথা –
আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম জনপ্রিয় ও জীবনমুখী কবি সুবোধ সরকারের ‘মা বলেছিল’ কবিতাটি মাতৃস্নেহের চিরন্তন আকুলতা, সন্তানের বড় হয়ে ওঠার অমোঘ নিয়তি, চেনা গণ্ডি পেরিয়ে অজানাকে জয়ের দ্বিধা এবং পরিশেষে এক গভীর নস্টালজিয়া ও শূন্যতাবোধের এক পরম মনস্তাত্ত্বিক দলিল। কবি এখানে অত্যন্ত সহজ-সরল ও আটপৌরে শব্দের বুননে এক পরম সত্যকে উন্মোচিত করেছেন—সন্তান বৈষয়িক ও জাগতিকভাবে যতই বড় হোক না কেন, মায়ের কাছে সে চিরকালই সেই ছোট্ট আশঙ্কায় ঘেরা অবুঝ শিশুই থেকে যায়।
কবিতার প্রারম্ভেই মানুষের জীবনের প্রথম বড় পরিবর্তনের চেনা ভয়টুকু ফুটে উঠেছে। জীবনের প্রথম দিন যখন কবি কলেজে পা রাখছেন, তখন মনের ভেতর অজানা এক ভয় দানা বেঁধেছিল। মায়াময়ী মা সন্তানের সেই মনের ভয়টুকু টের পেয়ে পরম মমতায় তাকে আগলে রেখে বলেছিলেন, এত দূরে যাওয়ার দরকার নেই, আমার কাছেই থেকে যাও। এরপর যখন জীবনের তাগিদে প্রথম বড় শহর কলকাতায় আসার পালা এলো, তখন চেনা গ্রামের গণ্ডি ছেড়ে একা একা অচেনা মহানগরে আসার তীব্র আশঙ্কা কবিকে গ্রাস করেছিল। মা তখনও একই ব্যাকুলতায় বলেছিলেন, “কলকাতার চাইতে বড় আমার এই আঁচল”। মায়ের এই আঁচল কেবল এক টুকরো কাপড় নয়, তা আসলে পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল ও বিপদ থেকে সন্তানকে লুকিয়ে রাখার এক নিরাপদ স্বর্গ।
পরবর্তী অংশে কবিতার পরিধি স্থানীয় গণ্ডি পেরিয়ে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে রূপ নেয়। ক্যারিয়ার ও সাফল্যের প্রয়োজনে যখন আমেরিকার বিমানে ওঠার প্রথম সুযোগ আসে, তখন দূর পরবাসের সেই বিপুল দূরত্ব কবিকে আবারও এক অদ্ভুত ভয়ের মুখোমুখি দাঁড় করায়। মা তখনও এক চিরন্তন মমতায় উদ্বেল হয়ে সন্তানকে বলেছিলেন—যাদের যাওয়ার তারা যাক, তুই শুধু আমার মাঘ-নিশীথের কনকনে শীতে এই চেনা আঁচলটুকু জুড়ে থাক। মায়ের কাছে সন্তানের এই বৈষয়িক সাফল্য বা গ্লোবাল আইডেন্টিটির চেয়ে তার চোখের সামনে থাকা এবং নিরাপদে থাকাটাই ছিল মুখ্য।
শেষের দুই চরণে এসে কবিতাটি এক নির্মম বাস্তবতায় থিতু হয় এবং পাঠককে এক চরম বিষাদের মুখোমুখি দাঁড় করায়। সময়ের অমোঘ নিয়মে কবি মায়ের সেই চেনা আঁচল ও নিষেধের বাঁধন ছিঁড়ে বহুদূরে চলে গেছেন, অর্থাৎ তিনি আর মায়ের কাছে থাকেননি। আবার প্রকৃতির নিয়ম মেনে মা-ও চিরকাল এই মর্ত্যলোকে বেঁচে থাকেননি, এমনকি জীবনের সেই যৌবনের উন্মাতাল ‘বৈশাখ’-ও আর অবশিষ্ট নেই। মায়ের অবর্তমানে এবং জীবনের সমস্ত সাফল্য ও ব্যস্ততার মাঝেও কবির অবচেতন মন আজও সেই ফেলে আসা অতীতেই হাতড়ে বেড়ায়। তাই জীবনের এই প্রান্তে এসেও, রাতের গভীর ঘুমে বা নিভৃত জাগরণে, স্বপ্নে আজও মায়ের সেই চেনা চিলতে কণ্ঠস্বর কবিকে তাড়া করে ফেরে—’আমার কাছে থাক’। মায়ের হারানো কোল আর সেই তীব্র সুরের অপূর্ণতার মাঝেই কবিতাটি এক গভীর হাহাকারে শেষ হয়।





