পাওয়ার সময় – অমিতাভ দাশগুপ্ত।

কুঁড়ি থেকে ছিঁড়ো না। এখন
ফুল-কে নিজের মত
ঠিকঠাক ফুটে উঠতে দাও।
না হলে পাথরে জাগে ক্ষয়,
গোড়া থেকে ছিঁড়ে নেওয়া মানে, তাকে পেয়ে যাওয়া নয় ।

ফুলের নিবিড় ছুঁতে
কীভাবে একটি কীট নীরবে ভিতরে যায়, দ্যাখো।
এইভাবে যেতে যেতে
নরম, নিভৃত শয্যা একদিন পেয়ে যাবে ঠিক।
ফুলের বুকের পরে
সে বসেছে শান্ত কাপালিক।

তার কাছে শিখে নাও পাঠ।
উপক্রমণিকা সেরে
মূল গ্রন্থে যেতে যদি বেলা হয়, হোক।
তুমি প্রতীক্ষায় থাকো।আসেনি সময় –
গোড়া থেকে ছিঁড়ে নেওয়া মানে,তাকে পেয়ে যাওয়া নয়।

আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। অমিতাভ দাসগুপ্তের কবিতা।

কবিতার কথা –

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম বিশিষ্ট কবি অমিতাভ দাশগুপ্তের ‘পাওয়ার সময়’ কবিতাটি ধৈর্য, আত্মসংযম, প্রেমের প্রকৃত সূক্ষ্মতা এবং পরম প্রাপ্তির এক অসাধারণ দর্শনভিত্তিক আখ্যান। কবি এখানে জীবনের যেকোনো সৌন্দর্য, প্রেম কিংবা কাঙ্ক্ষিত বস্তুকে জোর করে দখল করার মানসিকতাকে নাকচ করে দিয়ে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম ও দীর্ঘ প্রতীক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।

কবিতার প্রারম্ভেই কবি এক সতর্কবাণী ও পরম নির্দেশ দিয়ে শুরু করেন। গাছের কাঁচা কুঁড়িকে তার বিকাশ ঘটার আগেই হুট করে ছিঁড়ে ফেলা অনুচিত; তাকে তার নিজস্ব গতিতে, স্বাভাবিক নিয়মে সুন্দর ফুল হয়ে ফুটতে দেওয়া উচিত। জোর করে বা অধৈর্য হয়ে গোড়া থেকে কোনো কিছু উপড়ে বা ছিঁড়ে নেওয়া মানে তাকে প্রকৃত অর্থে লাভ করা নয়, বরং তার সৌন্দর্য ও জীবনকে ধ্বংস করে দেওয়া। জোরজবরদস্তির এই অধৈর্য প্রবণতা এতটাই নিষ্ঠুর যে, তা কঠিন পাথরেও ক্ষয়ের সৃষ্টি করে।

পরবর্তী অংশে কবি প্রকৃতির বুক থেকে এক অনন্য ও সুক্ষ্ম উদাহরণ তুলে ধরেছেন। একটি ক্ষুদ্র কীট কীভাবে কোনো তাড়াহুড়ো না করে পরম নীরবে ও নিভৃতে একটি ফুলের গভীরে প্রবেশ করে—কবি তা মনোযোগ দিয়ে দেখতে বলেছেন। কীটটি কোনো জোর খাটায় না; সে ধীরে ধীরে, আলতো ছন্দে ফুলের হৃদয়ে মিশে গিয়ে একদিন ঠিকই তার নরম ও নিভৃত শয্যা লাভ করে। ফুলের বুকের গভীরে সেই কীটের এই যে শান্ত ও নিশ্চল অবস্থান, কবি তাকে এক ধ্যানমগ্ন “শান্ত কাপালিক”-এর সাথে তুলনা করেছেন, যে সাধনায় সিদ্ধি লাভ করেছে পরম ধৈর্যের মাধ্যমে।

কবিতার শেষভাগে কবি মানুষকে নির্দেশ দিয়েছেন সেই কীটের থেকে জীবনের প্রকৃত পাঠ বা শিক্ষা গ্রহণ করতে। কোনো কিছু পাওয়ার আগে তার ভূমিকা বা প্রস্তুতিতেই যদি অনেকটা সময় পেরিয়ে যায়, তবুও অধৈর্য হওয়া চলবে না। বেলা গড়িয়ে গেলেও শান্ত মনে প্রতীক্ষায় থাকতে হবে, কারণ উপযুক্ত সময় আসার আগে কোনো কিছু জোর করে ছিনিয়ে নেওয়ার ফল হয় ভয়াবহ।

অমিতাভ দাশগুপ্ত মূলত এই কবিতায় এটিই বোঝাতে চেয়েছেন যে, অধৈর্য ও তাড়াহুড়ো ভালোবাসাকে কেবল ধ্বংসই করে। ধৈর্য ও পরম শ্রদ্ধার সাথে প্রতীক্ষা করাই হলো প্রকৃত পাওয়ার একমাত্র উপায়—কারণ “গোড়া থেকে ছিঁড়ে নেওয়া মানে, তাকে পেয়ে যাওয়া নয়।”

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x