কবিতার খাতা
চিঠি – মল্লিকা সেনগুপ্ত।
হঠাৎ বিকেলবেলা মনে এল চিঠি
আমাদের বেড়ে ওঠা ছিল পিঠোপিঠি।
বলো নি তো কোনওদিন আমাদেরও বাড়বে বয়েস!
জানলে সামলে নেব ভুলভাল, বেভুল চয়েস।
জানো, আজ সারাদিনে মনেই পড়েনি,
ঘরের কোণেই ছিল হাতুড়ি ও ছেনি।
রোরোদের কারপুল টাকা বাড়িয়েছে
মালিককে ফোন কোরো রাতে বাড়ি এসে।
আমি যে নশ্বর তাও কবে গেছি ভুলে
নিয়তির পাঞ্জা লড়ি একা নদী কূলে।
চিনির বিরুদ্ধে লড়ি মরণ লড়াই
ধমনিতে মিশে গেছে চিনির কড়াই।
তোমাকে হয়নি বলা ফোন এসেছিল
তুমিও বলোনি আদা ষাট টাকা কিলো।
চশমাটা ফেলে গেছ, ঘড়িও পারনি
কার কথা ভাবছিলে আজ সোনামণি।
মেট্রোরেলে দেখা হল, গড়িয়াতে থাকে
কবিতা পাগল তবু চেনে না আমাকে!
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। মল্লিকা সেনগুপ্তের কবিতা।
কবিতার কথা –
নারীবাদী ও প্রগতিশীল বাঙালি কবি মল্লিকা সেনগুপ্তের ‘চিঠি’ কবিতাটি মধ্যবিত্ত দাম্পত্য জীবনের এক অদ্ভুত বাস্তবতার দলিল, প্রাত্যহিক অভ্যস্ততার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক গভীর একাকীত্ব এবং সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাওয়া চেনা রোমান্টিসিজমের এক নিভৃত ও মায়াবী আখ্যান। খুব চেনা, ঘরোয়া এবং আটপৌরে সব অনুষঙ্গ ব্যবহার করে কবি এখানে জীবনের এক অমোঘ সত্যকে উন্মোচন করেছেন, যেখানে প্রেম আর প্রাত্যহিকতা একে অপরের সমান্তরালে হেঁটে চলে।
কবিতার শুরুতেই এক ঝটকায় ফিরে আসে পুরোনো স্মৃতির নস্টালজিয়া—‘হঠাৎ বিকেলবেলা মনে এল চিঠি / আমাদের বেড়ে ওঠা ছিল পিঠোপিঠি।’ এই চিঠি কোনো কাগজে লেখা বার্তা নয়, এটি এক অলীক মনস্তাত্ত্বিক ফ্লাশব্যাক। যে দম্পতি একসময় পিঠোপিঠি বড় হয়ে উঠেছিল, যাদের যৌথ জীবন শুরু হয়েছিল একরাশ স্বপ্ন নিয়ে, সময়ের আবর্তে তারা আজ সংসারের যাতাকলে পিষ্ট। কবি এক চিমটে আফসোস নিয়ে বলেন, কেউ তো আগে সতর্ক করেনি যে একদিন তাদেরও বয়স বাড়বে! যদি আগে থেকে জানা থাকত, তবে জীবনের অনেক ভুল সিদ্ধান্ত, অনেক ‘ভুলভাল, বেভুল চয়েস’ হয়তো অনায়াসেই সামলে নেওয়া যেত।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তবকে কবি মধ্যবিত্ত সংসারের একদম খাঁটি ও নগ্ন বাস্তব চিত্রটি তুলে ধরেছেন। ঘরের কোণে হাতুড়ি-ছেনি পড়ে থাকার মতো অবহেলা, কিংবা সন্তানের (রোরো) কারপুলের ভাড়া বেড়ে যাওয়ার প্রাত্যহিক চিন্তা—এই সব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাগতিক বিষয়ের ভিড়ে মানুষ কীভাবে নিজের রোমান্টিক সত্তাকে হারিয়ে ফেলে, কবিতাটি তা স্পষ্ট করে। দিনভর সাংসারিক হিসেব-নিকেশের ব্যস্ততায় প্রিয় মানুষের কথা মনেই পড়ে না। অথচ জীবনের এই ছোট ছোট লড়াইয়ের সমান্তরালে শরীর ও মনে নিঃশব্দে দানা বাঁধে মারাত্মক সব অসুখ। কবি বলেন, ‘আমি যে নশ্বর তাও কবে গেছি ভুলে’। একদিকে ডায়াবেটিসের মতো মরণব্যাধির সাথে লড়াই (চিনির বিরুদ্ধে লড়ি মরণ লড়াই), আর অন্যদিকে নিয়তির সাথে একা নদীকূলে দাঁড়িয়ে পাঞ্জা লড়া—এ যেন আধুনিক মানুষের এক চরম নিয়তি।
চতুর্থ স্তবকে দাম্পত্যের এক অদ্ভুত যোগাযোগের অভাব বা ‘কমিউনিকেশন গ্যাপ’ মূর্ত হয়েছে। যে কথাগুলো খুব জরুরি ছিল, তা বলা হয় না; আবার যে কথাগুলো না বললেও চলত, তা-ও আড়ালে রয়ে যায়। ফোন আসার জরুরি খবর কিংবা বাজারে আদার দাম চড়ার মতো তুচ্ছ বৈষয়িক আলাপ—সবকিছুর আড়ালে এক নিঃশব্দ দূরত্ব খেলা করে। চশমা বা ঘড়ি ফেলে যাওয়ার মতো আনমনা ভুলগুলোর দিকে তাকিয়ে কবি খুব আলতো করে এক পরম মমতায় প্রশ্ন করেন—‘কার কথা ভাবছিলে আজ সোনামণি।’ এই ‘সোনামণি’ সম্বোধনের ভেতরেই লুকিয়ে আছে সমস্ত প্রাত্যহিক দূরত্বের ওপরে টিকে থাকা এক আদিম ও অকৃত্রিম দাম্পত্য অধিকার।
পরিশেষে, কবিতাটি এক চমৎকার নাগরিক বিচ্ছিন্নতা ও আত্মোপলব্ধির ভেতর দিয়ে শেষ হয়। মেট্রো রেলে দেখা হওয়া গড়িয়ার সেই অচেনা সহযাত্রী, যে নিজে কবিতা পাগল অথচ কবিকে চেনে না—সে যেন এই আধুনিক সমাজ ব্যবস্থারই এক প্রতীক। আমরা সবাই এক গন্তব্যের যাত্রী, সবাই একই আবেগ ও কবিতার কাঙাল, অথচ কেউ কাউকে চিনি না, কারও ভেতরের খবর কেউ রাখি না।
সৃষ্টির সার্থকতা লৌকিক হাততালিতে নয়, বরং স্রষ্টার নিজের মানসিক মুক্তি এবং অস্তিত্বের তাগিদে—যা এই কবিতায় মল্লিকা সেনগুপ্তের নিজস্ব অন্ত্যমিলযুক্ত সহজ ছন্দ, আটপৌরে নাগরিক ভাষা এবং মধ্যবিত্ত জীবনের চিনি-আদা-মেট্রোরেলের খতিয়ানের ভেতর দিয়ে একুশ শতকের দাম্পত্য ও একাকীত্বকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য ও হৃদয়স্পর্শী কবিতা হিসেবে অমর করে রেখেছে।






