কবিতার খাতা
শান্তি পাই – শামসুর রাহমান।
যখন তুমি অনেক দূর থেকে
এখানে এই গলির মোড়ে আসো,
উঠোনে দাও পায়ের ছাপ এঁকে,
শান্তি পাই।
যখন তুমি দেহের বাঁকে বাঁকে
স্মৃতির ভেলা ভাসাও, তোলো পাল,
মুক্ত করো যমজ পায়রাকে,
শান্তি পাই।
যখন তুমি আমার পিপাসায়
নিমেষে হও আঁজলাভরা জল,
দৃষ্টিজাল ছড়াও কী আশায়,
শান্তি পাই।
যখন তুমি ঠোঁটের বন্দরে
বিছিয়ে দাও গালিচা রক্তিম,
প্রভাত জ্বালো চোখের কন্দরে,
শান্তি পাই।
ঝঞ্ঝাহত উজাড় এ বাগানে
আন্দোলিত তুমিই শেষ ফুল।
জাগাও তুমি সবুজ পাতা প্রাণে,
শান্তি পাই।
যখন তুমি দুপুরে ঘুমে ভাসো,
তোমার বুকে অতিথি প্রজাপতি;
থম্কে থাকে ভয়ে সর্বনাশও,
শান্তি পাই।
যখন তুমি জলের গান হয়ে
আমার দেহে আমার মজ্জায়
কী উজ্জ্বল জোয়ারে যাও ব’য়ে,
শান্তি পাই।
যখন তুমি আমার ঠোঁটে রাখো
একটি লাল গোলাপ, আত্মার
ঝরাও পাতা, আবেগভরে ডাকো
শান্তি পাই।
যখন তুমি হাওয়ায় দাও মেলে
তিমির ছেঁড়া আমার এ পতাকা,
কিংবা আসো বিরূপ জল ঠেলে,
শান্তি পাই।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। শামসুর রাহমানের কবিতা।
কবিতার কথা-
কবি শামসুর রাহমানের ‘শান্তি পাই’ কবিতাটি মূলত এক পরম নির্ভরতা, প্রেমের সঞ্জীবনী শক্তি এবং যাপিত জীবনের ক্লান্তি শেষে এক পরম আশ্রয়ের এক অনুপম ও গীতিময় আখ্যান। প্রাত্যহিক জীবনের কোলাহল, একাকীত্ব ও নানাবিধ সংকটের বিপরীতে দাঁড়িয়ে ভালোবাসার মানুষের সামান্য সান্নিধ্য কীভাবে একজন মানুষের আত্মাকে শান্ত ও পুনরুজ্জীবিত করতে পারে—কবিতাটি তারই এক চমৎকার ও বাঙ্ময় বহিঃপ্রকাশ। ‘শান্তি পাই’ শব্দবন্ধটির প্রতিটি স্তবকে পুনরাবৃত্তি যেন এক তৃষ্ণার্ত হৃদয়ের স্বস্তির নিঃশ্বাস।
কবিতার প্রথমাংশে এক অদ্ভুত রোমান্টিক ও নান্দনিক আবহ তৈরি হয়েছে। ভালোবাসার মানুষটি যখন ‘অনেক দূর থেকে’ সব ব্যস্ততা ফেলে কবির চেনা গলির মোড়ে এসে দাঁড়ায় কিংবা উঠোনে নিজের পায়ের ছাপ আঁকে, তখনই কবির বিষণ্ণ মনে এক পশলা শান্তির হাওয়া বয়ে যায়। কবি এখানে প্রিয়তমার অবয়ব ও তার চলনকে চমৎকার কিছু রূপকে বেঁধেছেন। দেহের বাঁকে বাঁকে স্মৃতির ভেলা ভাসানো কিংবা ‘যমজ পায়রাকে মুক্ত করা’র মতো অনুষঙ্গগুলো প্রেমের এক আদিম, মুক্ত ও পবিত্র রূপকে প্রকাশ করে। জীবনের তীব্র মরু-পিপাসায় সেই প্রিয় মানুষটিই নিমেষে হয়ে ওঠে ‘আঁজলাভরা জল’।
তৃতীয় ও চতুর্থ স্তবকে কবি প্রিয়তমার রূপ ও স্পর্শের এক অনন্য ক্যানভাস এঁকেছেন। ঠোঁটের বন্দরে ‘রক্তিম গালিচা’ বিছিয়ে দেওয়া কিংবা চোখের কন্দরে ‘প্রভাত’ বা ভোরের আলো জ্বালানোর মাধ্যমে কবি মূলত প্রিয়তমার প্রেমময় স্পর্শ ও আশাবাদী দৃষ্টির কথাই বলেছেন। এই নাগরিক ও যান্ত্রিক জীবনের নানা ‘ঝঞ্ঝাহত উজাড় বাগানে’ (যা মানুষের একাকী ও বিপর্যস্ত জীবনের প্রতীক) প্রিয়তমা হলো আন্দোলিত ‘শেষ ফুল’, যে কবির শুকনো প্রাণে আবার নতুন সবুজ পাতার স্পন্দন জাগিয়ে তোলে।
কবিতার পরের অংশে কবি এক আশ্চর্য শান্ত ও পরাবাস্তব দৃশ্য তৈরি করেছেন। তপ্ত দুপুরে প্রিয়তমা যখন ঘুমের ঘোরে ভাসে এবং তার বুকে এসে বসে কোনো ‘অতিথি প্রজাপতি’, তখন চারপাশের সমস্ত অশুভ শক্তি কিংবা ‘সর্বনাশও’ যেন সেই পবিত্র সুন্দরের সামনে ভয়ে থমকে দাঁড়ায়। প্রিয়তমা কেবল বাহ্যিক কোনো সত্তা নয়, সে কবির দেহে-মজ্জায় এক উজ্জ্বল জোয়ারের মতো ‘জলের গান’ হয়ে বয়ে যায়। তার ঠোঁটে রাখা লাল গোলাপ আর আবেগময় ডাক কবির আত্মার সমস্ত ঝরা পাতাকে ধুয়ে-মুছে এক আত্মিক মুক্তি এনে দেয়।
পরিশেষে, কবিতাটি এক গভীর জীবনদর্শন ও লড়াইয়ের রূপকে গিয়ে শেষ হয়। চারপাশের বৈরী সময় যখন কবির অস্তিত্বকে বিপন্ন করতে চায়, তখন সেই প্রিয় মানুষটিই এসে ‘হাওয়ায় মেলে দেয় তিমির ছেঁড়া পতাকা’। সমস্ত বিরূপ পরিস্থিতি বা উত্তাল জল ঠেলে তার এই চেনা আঙিনায় ফিরে আসাই কবির বেঁচে থাকার আসল শক্তি ও পরম শান্তি।
সৃষ্টির সার্থকতা লৌকিক হাততালিতে নয়, বরং স্রষ্টার নিজের মানসিক মুক্তি এবং অস্তিত্বের তাগিদে—যা এই কবিতার প্রতিটি চরণে জীবনের ক্লান্তি ও অন্ধকারকে জয় করে ভালোবাসার এক অবিনশ্বর, স্নিগ্ধ ও শান্তিময় জয়গান হয়ে প্রকাশ পেয়েছে।






