কবিতার খাতা
মশাল – রুদ্র গোস্বামী।
কন্যা সন্তান প্রসব করার অপরাধে
আসামের যে মেয়েটাকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল ?
আজ তার মৃত্যু বার্ষিকী।
যে কবি সেদিন তার নিরানব্বইতম কবিতাটি
মেয়েটাকে উৎসর্গ করেছিলেন,
তিনি এখন তার প্রিয় পাঠিকার অনুরোধে লিখছেন বসন্ত গল্প।
যে সংবাদপত্র গুলো সেদিন ফলাও করে ছেপেছিল
মেয়েটার গনগনে আর্তনাদ ,
তাদের প্রত্যেকটা ক্যামেরার ফ্লাশ
আজ তাক করে দাঁড়িয়ে আছে বুদ্ধিজীবী সম্বর্ধনা মঞ্চ ।
যে অধ্যাপক তার অনুগত ছাত্রদের বলেছিলেন,
– “আগুন জ্বালো।”
তিনি তার সদ্য বিবাহিত দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে
এইমাত্র চলে গেলেন সাচ্ছন্দ মধুচন্দ্রিমা যাপনে ।
তুমি কেমন আছো যুবক ?
তুমি কি মশাল জ্বেলেছো ?
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। রুদ্র গোস্বামী।
কবিতার কথা –
রুদ্র গোস্বামীর ‘মশাল’ কবিতাটি আমাদের সমাজের চরম সুবিধাবাদ, সুবিধাবাদী বুদ্ধিজীবী সমাজ এবং সাধারণ মানুষের স্বল্পস্থায়ী আবেগের বিরুদ্ধে এক তীব্র চাবুক। কবিতাটি একটি নির্মম হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে আবর্তিত—আসামের একটি মেয়েকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল কেবল কন্যা সন্তান প্রসব করার ‘অপরাধে’। এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে কবি দেখিয়েছেন কীভাবে সময়ের সাথে সাথে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরগুলো ব্যক্তিগত স্বার্থ আর প্রচারের আলোয় নিজেদের বিলীন করে দেয়। কবিতার শুরুতে দেখা যায়, সেই কবির কথা যিনি সেদিন শোকাতুর হয়ে মেয়েটিকে নিয়ে নিরানব্বইটি কবিতা লিখেছিলেন, কিন্তু আজ তিনি এক পাঠিকার তুষ্টিকল্পে ‘বসন্ত গল্প’ অর্থাৎ লঘু রোমান্টিকতায় মজেছেন। অর্থাৎ, শিল্পীর কাছে সেই মৃত্যুটি ছিল কেবলই একটি সাময়িক আবেগ বা সৃজনশীলতার খোরাক।
কবিতার দ্বিতীয় অংশে সংবাদপত্র এবং বুদ্ধিজীবীদের মুখোশ খুলে দিয়েছেন কবি। যে সংবাদমাধ্যমগুলো একদিন মেয়েটির আর্তনাদ বিক্রি করে কাটতি বাড়িয়েছিল, আজ তারা সেই ক্যামেরা নিয়ে ব্যস্ত বুদ্ধিজীবী সংবর্ধনার জৌলুস কভার করতে। এমনকি যে অধ্যাপক ছাত্রদের রাজপথে আগুন জ্বালানোর ডাক দিয়েছিলেন, তিনিও আজ নিজের ব্যক্তিগত সুখ আর দ্বিতীয় স্ত্রীর সাথে মধুচন্দ্রিমা যাপনে ব্যস্ত। এই বৈপরীত্য আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, অন্যের মৃত্যু বা ট্র্যাজেডি আমাদের কাছে কেবলই এক ধরণের ‘ইভেন্ট’ বা সস্তা সেন্টিমেন্ট, যা আমাদের ব্যক্তিগত বিলাসে কোনো ছেদ ঘটাতে পারে না।
সব শেষে কবি এক মোক্ষম প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন যুবসমাজের দিকে— ‘তুমি কেমন আছো যুবক? তুমি কি মশাল জ্বেলেছো?’ এই প্রশ্নটি আসলে প্রতিটি বিবেকবান মানুষের প্রতি। সমাজ যখন ভুলে যাওয়ার অসুখে ভোগে, শিল্পী যখন আদর্শ বিক্রি করে দেয়, আর সংবাদমাধ্যম যখন চাটুকারিতায় ব্যস্ত থাকে, তখন পরিবর্তনের মশালটি ধরার দায়িত্ব কার? কবি এখানে বোঝাতে চেয়েছেন যে, কেবল ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়া বা একদিনের মিছিলে মোমবাতি জ্বালানোই যথেষ্ট নয়; অন্যায়ের বিরুদ্ধে সেই প্রতিবাদের আগুনটি বা ‘মশাল’টি নিজের ভেতরে নিরন্তর জ্বালিয়ে রাখাটাই আসল সংগ্রাম।
পরিশেষে, রুদ্র গোস্বামী এখানে এক ধরণের সামাজিক ভণ্ডামিকে আক্রমণ করেছেন। আমরা শোক পালন করি ঠিকই, কিন্তু সেই শোক আমাদের জীবনযাত্রায় কোনো প্রভাব ফেলে না। সৃষ্টির সার্থকতা লৌকিক হাততালিতে নয়, বরং স্রষ্টার নিজের মানসিক মুক্তি এবং অস্তিত্বের তাগিদে। এই কবিতাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা অন্যের যন্ত্রণাকে নিজের বলে অনুভব না করছি এবং সেই প্রতিবাদের আগুনকে ব্যক্তিগত সুখের কাছে বিক্রি না করছি, ততক্ষণ পর্যন্ত সমাজ থেকে এই অন্ধকার ঘুচবে না।
মাকিদ হায়দার বা রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর মতো রুদ্র গোস্বামীও এখানে প্রতিবাদের এক নতুন ভাষা তৈরি করেছেন। এই কবিতাটি পড়ার পর সেই ‘মশাল’ কি আমাদের মনের কোণেও একটু হলেও শিখা ছড়ায় না?






