কবিতার খাতা
মনে রেখো – সব্যসাচী দেব।
মনে রেখো, আমরা এসেছিলাম।
হে রূপসী ধরিত্রী, জননীপ্রতিম মৃত্তিকা
তোমাদের ঋণ রক্তে।
যখন সময়ের উত্তুঙ্গচূড়ায় লাফিয়ে উঠেছে
মহিমময় অগ্নিশিখা,
সমুদ্রঢেউয়ের মাথায় নেচে উঠেছে
স্পন্দিত বিশ্বাস-
আমরা এসেছিলাম।
মনে রেখো, আমরা এসেছিলাম।
দিগন্তে নবজাত সূর্যকে দেখে আমাদের বোবা বিস্ময়
গুহার দেওয়ালে ফুটেছিল আঁচড় হয়ে,
দৃশদ্বতী আর সরস্বতীর মধ্যবর্তী ভূ-ভাগ থেকে
একদিন বিতাড়িত হয়েছিলাম আমরা-
অরণ্যের পশুরা সেই থেকে আমাদের সঙ্গী।
মনে রেখো, আমরা এসেছিলাম।
লালমাটির বুকে আমরা গড়েছিলাম জাঙাল,
আঠারোশো সাতান্নর রাতে আমরা ছুটন্ত ঘোড়সওয়ার,
আমরা এসেছিলাম ভাগনাদিহির মাঠে,
চট্টগ্রামের পাহাড়ে,
বোম্বাইয়ের সমুদ্রে আছড়ে পড়েছিল
আমাদের কামানের গোলা।
মনে রেখো, আমরা এসেছিলাম।
তেরোশো পঞ্চাশে কলকাতার পথে
আমার মৃতদেহ ঠুকরে খেয়েছে শকুন,
কাকদ্বীপের ফেরারি কৃষাণ আমি,
আমি অহল্যার মৃত সন্তান,
নক্সালবাড়ির প্রান্তরে আমার হাতে উঠে এসেছিল ক্ষমাহীন আয়ুধ।
মনে রেখো, আমরা এসেছিলাম।
হে আমার স্বদেশ, আমার স্বকাল-ভাবীকাল,
আমার প্রিয় মানুষেরা,
মনে রেখো-
আমাদেরও কঠিন মুঠিতে ধরা ছিল সময়ের সাধ,
কোনো দীর্ঘ আঁখিপল্লবের কাছে আমাদের প্রতিশ্রুতি ছিল,
শরীরে ছিল যুবতীর তপ্ত শরীরের স্বাদ।
মদির কোনো মুহূর্তে নক্ষত্রমণ্ডলীর কাছে
আমরা উচ্চারণ করেছিলাম ভালোবাসা,
মোহহীন, বোধহীন, বিষণ্ণতাহীন শিশুর নিশ্চিন্ত মুখাবয়বে
গচ্ছিত রেখেছিলাম আমাদের ভবিষ্যৎ।
মনে রেখো, আমরা এসেছিলাম।
আকাশ আর সমুদ্রের মাঝখানে
নেমে আসে কুয়াশা,
তরঙ্গিনী নদীর মাথায় নেচে ওঠে আলোকশিখা,
আর আমাদের অভিজ্ঞান ছুঁয়ে থাকে আগামী পৃথিবী।
মনে রেখো।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। সব্যসাচী দেবের কবিতা।
কবিতার কথা –
সব্যসাচী দেবের ‘মনে রেখো’ কবিতাটি মানব সভ্যতার ইতিহাস, শোষিত মানুষের যুগান্তকারী সংগ্রাম এবং অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে আত্মাহুতি দেওয়া নামহীন বিপ্লবীদের এক মহাকাব্যিক দলিল। ‘মনে রেখো, আমরা এসেছিলাম’—এই একটিমাত্র অবিনশ্বর ও বজ্রকঠিন ঘোষণার পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে কবি মূলত পৃথিবীর ইতিহাস থেকে উপেক্ষিত, বঞ্চিত ও লড়াকু মানুষের অস্তিত্বকে চিরন্তন ও বাঙ্ময় করে তুলেছেন। এটি কেবল এক অতীতের খতিয়ান নয়, এটি আগামী পৃথিবীর বুকে মানুষের দ্রোহ ও প্রেমের এক অক্ষয় অভিজ্ঞান।
কবিতার প্রথমাংশে মানব সভ্যতার আদিম সূচনা ও প্রকৃতির কাছে মানুষের ঋণের কথা বলা হয়েছে। জননীপ্রতিম মৃত্তিকার কাছে মানুষের যে ঋণ, তা শোধ হয়েছে সংগ্রামীদের বুকের তপ্ত ‘রক্তে’। সময়ের উত্তাল মুহূর্তে যখনই বিপ্লবের অগ্নিশিখা জ্বলে উঠেছে, তখনই এই লড়াকু মানুষেরা বুকের স্পন্দিত বিশ্বাস নিয়ে অবতীর্ণ হয়েছে ইতিহাসের পাতায়। গুহাবাসী মানুষের বোবা বিস্ময় থেকে শুরু করে ‘দৃশদ্বতী আর সরস্বতী’ নদীর মধ্যবর্তী বৈদিক ভূ-ভাগ থেকে আর্যদের দ্বারা অনার্য বা আদিবাসীদের বিতাড়িত হওয়ার প্রাচীন ইতিহাসকে কবি এখানে সুনিপুণভাবে ছুঁয়ে গেছেন, যেখানে অরণ্যের পশুরাই ছিল মানুষের আদিমতম সঙ্গী।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তবকে কবি অত্যন্ত তীব্রভাবে ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক ও বিপ্লবী সংগ্রামের ইতিহাসকে ধারণ করেছেন। লালমাটির বুকে ‘জাঙাল’ বা বাঁধ নির্মাণকারী এই শ্রমজীবী মানুষেরাই ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের সেই ‘ছুটন্ত ঘোড়সওয়ার’। এরাই সিধু-কানুর নেতৃত্বে সান্তাল বিদ্রোহের ‘ভাগনাদিহির মাঠ’, মাস্টারদা সূর্য সেনের ‘চট্টগ্রামের পাহাড়’ (অস্ত্রাগার লুণ্ঠন) এবং ‘বোম্বাইয়ের সমুদ্রে’ নৌ-বিদ্রোহের কামানের গোলার গর্জন। কবি এখানে ইতিহাসের ধারাবাহিকতাকে এক সুতোয় বেঁধেছেন। ১৩৫০-এর (বাংলা) পঞ্চাশের মন্বন্তরে কলকাতার রাস্তায় শকুন-কাকের ঠুকরে খাওয়া নিরন্ন মৃতদেহ, তেভাগা আন্দোলনের ‘কাকদ্বীপের ফেরারি কৃষাণ’, পুলিশের গুলিতে নিহত কৃষকজননী অহল্যার মৃত সন্তান থেকে শুরু করে সত্তরের দশকের ‘নকশালবাড়ির প্রান্তরে’ হাতে তুলে নেওয়া ক্ষমাহীন অস্ত্র—সবকিছুই আসলে এক অবিনশ্বর লড়াকু সত্তার ভিন্ন ভিন্ন রূপ।
কবিতার শেষাংশে এসে এই রুক্ষ ও রক্তস্নাত ইতিহাসের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক পরম মানবিক ও আবেগময় রূপ প্রকাশিত হয়। এই যে মানুষগুলো বুলেটের সামনে বুক পেতে দিল, জেলখানায় পচে মরল, তারা কিন্তু কেবলই রণক্লান্ত সৈনিক ছিল না। কবি মনে করিয়ে দিচ্ছেন—তাদেরও কঠিন মুঠিতে ধরা ছিল সুন্দর এক ‘সময়ের স্বাদ’। কোনো প্রিয়তমার দীর্ঘ আঁখিপল্লবের কাছে তাদেরও কিছু গোপন ‘প্রতিশ্রুতি’ ছিল, শরীরে ছিল যুবতীর তপ্ত স্পর্শের মোহময় স্বাদ। মদির কোনো রাতে নক্ষত্রকে সাক্ষী রেখে তারাও উচ্চারণ করেছিল নিখাদ ‘ভালোবাসা’। আর এক মোহহীন, বিষণ্ণতাহীন শিশুর নিশ্চিন্ত মুখের হাসির ভেতরেই তারা গচ্ছিত রেখে গিয়েছিল এই পৃথিবীর সুন্দর ‘ভবিষ্যৎ’।
পরিশেষে, কবি এক মহাজাগতিক চিত্রকল্প তৈরি করেছেন। আকাশ আর সমুদ্রের মাঝখানে কুয়াশা নেমে এসে চারপাশকে সাময়িক আচ্ছন্ন করতে পারে, কিন্তু তরঙ্গিনী নদীর মাথায় ঠিকই নেচে ওঠে আশার আলোকশিখা। এই আলোর মতোই বিপ্লবীদের রেখে যাওয়া ‘অভিজ্ঞান’ বা স্মারক স্পর্শ করে থাকবে আগামী দিনের মুক্ত পৃথিবীকে। তাই কবি তাঁর স্বদেশ, স্বকাল এবং ভাবিকালের প্রিয় মানুষদের কাছে এক চূড়ান্ত ও অমোঘ আর্তি রেখে যান—‘মনে রেখো’।
সৃষ্টির সার্থকতা লৌকিক হাততালিতে নয়, বরং স্রষ্টার নিজের মানসিক মুক্তি এবং অস্তিত্বের তাদিগে—যা এই কবিতায় শোষিত মানুষের বুকের রক্ত, চোখের জল এবং এক সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্নকে ইতিহাসের সোনালী অক্ষরে অমর করে রেখেছে।






