(কবি এই কবিতাটি লেখেন তাঁর স্ত্রী কবি মল্লিকা সেনগুপ্তর, ভয়ানক ব্যধি ক্যানসারে মৃত্যুর পর। কবিতাটি প্রকাশিত হয়
“দেশ” পত্রিকার সেপ্টেম্বর ২০১১-র সংখ্যায়।)
তুমি গঙ্গার একটা অংশ ছেড়ে চলে যাচ্ছ
কিন্তু তোমার আঁচলে নদীর আত্মজীবনী লেখা রইল |
বিছানার নীচ থেকে কয়েক লক্ষ কর্কট
বিছানা-সমেত তোমাকে তুলে নিয়ে চলেছে মহাকাশযানে |
ম়ৃত্যুর কয়েক মিনিট আগে তাও তুমি কাজল পড়েছ,
কাজল ও কান্নার মাঝখানে তোমার মুখে এক চামচ জল
হ্যাঁ, আমি এক চামচ জল হয়ে
এক চামচ অন্তর্জলী হয়ে, এক চামচ অঞ্জলি হয়ে,
তোমার ভেতরে একটা পূর্ণিমায় ভেসে যাওয়া
বিমানবন্দরে আমি বসে থাকতে চেয়েছিলাম |
আমি বলেছিলাম এটা বিমানবন্দর নয়
এটা একটা গ্রাম, লোকে বিরহী বলে ডাকে
এখানেই আমরা জীবনে প্রথম চুম্বন করেচিলাম
তুমি ছিলে চাবুকের মত তেজি এবং সটান
বেতস পাতার মতো ফার্স্ট ইয়ার এবং সেনসুয়াল কাঠবেড়ালি
বৃষ্টিতে ভিজলে তোমাকে আন্তিগোনের মতো দেখাত |
আমি ছিলাম গাঙচিল,
দু’লাইন কাফকা পড়া অসংগঠিত আঁতেল |
তুমি যমুনার একটা অংশ ছেড়ে চলে যাচ্ছ
ডাক্তার তোমার হাতের শিরা খুঁজে পায়নি |
দোষ তোমার নয়, ডাক্তারের
এতবার তোমার শরীর ফুটো করেছিল ওরা
ইরাকের মৃত্তিকাও অতবার বার ফুটো করেনি আমেরিকা
কিন্তু তোমার ধমনী আসলে একটা নদীর আত্মজীবনী
তুমি তিস্তার একটা ঢেউ ছেড়ে চলে যাচ্ছ
আমার মাছরাঙা সেই ঢেউয়ের ভেতর আটকে গেছে |
সেই মাছরাঙার ঠোঁটে তোমার সংসার
বোরো যেখানে নিউক্লিয়ার ফিজিক্স না পড়ে পড়ছে সাতটি তারার
. তিমির |
কিন্তু আমি নদীর পলিমাটি মেখে , হারে রে রে রে রে
একদিন শহরে ঢুকে পড়েছিলাম
কার্জন পার্কে শুয়ে কালপুরুষের সঙ্গে তর্ক করেছি
এসে দাঁড়ালেন বাত্সায়ন এবং নিৎসে
কালপুরুষ বলল, নাও, দুই মহান খচ্চর এসে গেছে,
যৌনতা এবং মৃত্যু
ওরা দুই সহোদর, কে তোমাকে বেছে নেয় সেটাই তোমার
. সেমিফাইনাল
ডব্লু, ডব্লু, ডব্লু ড্যাশ ডটকম |
রাত দুটোর এ্যাম্বুলেন্সের ভেতর বসে আমি তোমার
হাত দুটি ধরে বলেছিলাম, বলো কোথায় কষ্ট ?
তুমি বলেছিলে, কৃষ্ণচূড়ায়, পারমানবিক পলিমাটিতে
তোমার অসংখ্য জুঁইফুলে জ্বালা করছে |
হাত থেকে একটানে চ্যানেল খুলে ফেলে বললে,
আমাকে বাঁচাও, ভালবাসা, আমি বাঁচতে চাই |
পৃথিবীতে আমি একটু শিউলির গন্ধ পেতে পারি ?
আমার নাক থেকে রাইস টিউব সরিয়ে দাও |
আমি বললাম এটা ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট,
এখানে কোনও শিউলি গাছ নেই |
তুমি বললে, ছেলেটা কোথায় গেল, কার সঙ্গে গেল ?
ওকে একটু দেখো,রাত করে বাড়ি ফিরো না |
নার্সিংহোমের বারান্দায় বসে আমি একা, একেবারে একা
‘দ্য এম্পারার অফ অল ম্যালাডিজ’ পড়ছিলাম |
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাক্তার, তুমি ঠিক বলেছ
অন্ধকারে দাবা খেলছেন সারা পৃথিবীর অনকোলজিস্ট
উল্টোদিকে এ্যান্টিচেম্বার ড্রাগ-মাফিয়ারা বসে আছে
মানুষের গভীরতম দুঃখ যাদের ব্যবসা |
তুমি আমাকে বারবার বলতে সিগারেট খেও না
আমি উড়িয়ে দিয়ে বলতাম, আমরা সবাই চিমনি সুইপার
আমরা কার্বনের সঙ্গে প্রণয় আর প্রণয়ের সঙ্গে
মেটাস্টেসিস বহন করে চলেছি |
কে একদিন রাস্তা থেকে ধরাধরি করে বাড়ি নিয়ে আসবে
তার আগে আজ, এখনই, আমি প্রজাপতিদের সঙ্গে দৌড়তে চাই,
আজ, এখনই মিলন করতে চাই, আশিরনখ মিলন
দেবতা না চড়ুই, কে দেখে ফেলল, কিছু যায় আসে না |
মনে নেই আমরা একবার ভাঙা মসজিদে ঢুকেছিলাম
প্রচুর সাপের ভিতর আল্লা পা ছড়িয়ে বসে কাঁদছিলেন |
বললেন, আয় পৃথিবীতে যাদের কোনও জায়গা নেই
আমি তাদের জুন্নত এবং জাহানারার মাঝখানে
একটা বিকেল বাঁচিয়ে রেখেছি ভালবাসার জন্য
গাছ থেকে ছিড়ে আনা আপেলে কামড় দিবি বলে |
তুমি তমসার একটা অংশ ছেড়ে চলে যাচ্ছ
কিন্তু তোমার আঁচল ধরে টানছে ছেলের উচ্চমাধ্যমিক |
ছেলে বলছে, মা, আমাকে কুজ্ঝটিকা বানান বলে দিয়ে যাও
আইসিইউ-তে কেউ কুজ্ঝটিকা বানান বলতে পারে না |
ছেলের বাবা বসে আছে, মেডিক্যাল বোর্ড বসেছে বারোতলায়
যেন হাট বসেছে বক্সিগঞ্জে, পদ্মাপারে |
কে যেন বলল, আরে বেরিয়ে আসুন তো ফার্নেস থেকে,
এরা পিঁপড়ে ধরতে পারে না, কর্কট ধরবে ?
একটা পানকৌড়ি ডুব দিচ্ছে গগনবাবুর পুকুরে
কেমোথেরাপির পর তোমাকে গোয়ায় নিয়ে গিয়েছিলাম |
একটা কোঙ্কনি কবিকে বললে, ‘পানকৌড়ি দেখাও’,
একটা পর্তুগিজ গ্রামে গিয়ে কী দেখেছিলে আমাকে বলনি |
তুমি জলঢাকার একটা অংশ ছেড়ে চলে যাচ্ছ
যে বড় বড় টিপ পরতে তারা গাইছে, আমার মুক্তি আলোয় আলোয় |
তুমি সুবর্ণরেখার একটা অংশ ছেড়ে চলে যাচ্ছ
তোমার লিপস্টিক বলছে, আমাদের নিয়ে চলো আয়না |
তুমি রোরো নামে একটা চাইবাসার নদী ছেড়ে চলে যাচ্ছ
সে বলছে, মা দাঁড়াও, স্কুল থেকে এক্ষনি মার্কশিট তুলে আসছি |
তুমি ভল্গা নামে একটা নদীর অংশ ছেড়ে চলে যাচ্ছ
পারস্যের রানি আতোসা তোমায় ডাকছে
পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর স্তন ছিল রানি আতোসার
কাটা হয়েছিল খড়গ দিয়ে, কেটেছিল এক গ্রিক ক্রিতদাস |
ইস্তানবুলের নদী বসফরাস ছেড়ে তুমি চলে যাচ্ছ
তোমার এক পা ইউরোপ, এক পা এশিয়া |
তুমি জিপসিদের হাটে তেজপাতা-মোড়ানো ওষুধ আনতে চলেছ
ইহুদি মেয়েরা তোমাকে নিয়ে গুহায় ঢুকে গেল |
জিপসিরাই পৃথিবীতে প্রথম ব্যথার ওষুধ কুড়িয়ে পেয়েছে
তোমার বিশ্বাস ছিল শেষ ওষুধটাও ওরাই কুড়িয়ে আনবে |
শেষ একটা ওষুধের জন্য গোটা মানবজাতি দাঁড়িয়ে আছে
যে সেটা কুড়িয়ে আনবে, সে বলবে, দাঁড়াও
আমি একটা আগুনের মধ্যে দিয়ে আসছি
বাবাকে বারণ করো হাসপাতালে বসে রাত জাগতে |
আমাকে য়দি কোনও ম্যাটাডোর বা মার্সিডিজ ধাক্কা না মারে
ভোর হওয়ার আগে আমি যে করে হোক শহরে ঢুকব |
এমন একটা অসুখ যার কোনও ‘আমরা ওরা’ নেই
ভিখিরি এবং প্রেসিডেন্টকে একই ড্রাগ নিতে হবে |
ডাক্তার, ভাল যদি নাই পারো এত সুঁচ ফোটালে কেন ?
সুঁচগুলো একবার নিজের পশ্চাতে ফুটিয়ে দেখলে হত না ?
তুমি গঙ্গার একটা অংশ ছেড়ে চলে যাচ্ছ, সত্যি চলে যাচ্ছ—–
রোরো তোমার আঁচল ধরে আছে, আমি তোমার রোদ্দুর ।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। সুবোধ সরকার।
মৃত্যুর আগে তুমি কাজল পড়েছিলে – সুবোধ সরকার | সুবোধ সরকারের কবিতা | আধুনিক বাংলা কবিতা | ক্যানসার, মৃত্যু, স্মৃতি ও প্রেমের অসাধারণ কাব্যভাষা
মৃত্যুর আগে তুমি কাজল পড়েছিলে: সুবোধ সরকারের স্ত্রী-স্মৃতিকাব্য, ক্যানসারের বেদনা ও অনন্ত ভালোবাসার অসাধারণ কাব্যভাষা
সুবোধ সরকারের “মৃত্যুর আগে তুমি কাজল পড়েছিলে” আধুনিক বাংলা কবিতার এক অনন্য, বেদনাবিধুর ও অসাধারণ সৃষ্টি। কবি এই কবিতাটি লেখেন তাঁর স্ত্রী কবি মল্লিকা সেনগুপ্তর ক্যানসারে মৃত্যুর পর। এটি একটি স্মৃতিকাব্য — যেখানে মৃত্যুর কয়েক মিনিট আগেও স্ত্রী কাজল পড়েছিলেন। “তুমি গঙ্গার একটা অংশ ছেড়ে চলে যাচ্ছ / কিন্তু তোমার আঁচলে নদীর আত্মজীবনী লেখা রইল” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া এই দীর্ঘ কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে এক অসুস্থ নারীর শেষ সময়ের চিত্র — আইসিইউতে শুয়ে তিনি শিউলির গন্ধ চান, ছেলের কুজ্ঝটিকা বানান বলে দিতে চান, ‘আমাকে বাঁচাও, ভালোবাসা, আমি বাঁচতে চাই’ বলেন। কবি স্বামী এ্যাম্বুলেন্সে হাত ধরে বসে থাকেন। নার্সিংহোমের বারান্দায় বসে একা ‘দ্য এম্পারার অফ অল ম্যালাডিজ’ পড়ছিলেন। কবিতার শেষে তিনি বলেন — “তুমি গঙ্গার একটা অংশ ছেড়ে চলে যাচ্ছ, সত্যি চলে যাচ্ছ—— / রোরো তোমার আঁচল ধরে আছে, আমি তোমার রোদ্দুর।” সুবোধ সরকার একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কবি ও প্রাবন্ধিক। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতায় প্রান্তিকের কণ্ঠস্বর, মৃত্যু ও বেদনার চিত্রায়ণ, এবং স্ত্রী-স্মৃতিকাব্যে অসাধারণ আবেগের জন্য পরিচিত। ‘মৃত্যুর আগে তুমি কাজল পড়েছিলে’ তাঁর সেই স্বকীয় কাব্যভাষার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যা বাংলা কবিতায় মৃত্যু ও প্রেমের এক বিরল দলিল।
সুবোধ সরকার: স্মৃতি, মৃত্যু ও প্রেমের কবি
সুবোধ সরকার একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কবি ও প্রাবন্ধিক। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতায় প্রান্তিকের কণ্ঠস্বর, মৃত্যু ও বেদনার চিত্রায়ণ, এবং স্ত্রী-স্মৃতিকাব্যে অসাধারণ আবেগের জন্য পরিচিত। ‘মৃত্যুর আগে তুমি কাজল পড়েছিলে’ তাঁর স্ত্রী কবি মল্লিকা সেনগুপ্তর ক্যানসারে মৃত্যুর পর লেখা একটি স্মৃতিকাব্য। এটি বাংলা কবিতায় মৃত্যু ও প্রেমের এক বিরল দলিল।
কাজল ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী এক চামচ জল
শিরোনামটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ — ‘মৃত্যুর আগে তুমি কাজল পড়েছিলে’। মৃত্যু ও কাজল — দুই বিপরীত মেরু। কাজল সাজের, জীবনের প্রতীক। মৃত্যুর আগে তিনি কাজল পড়েছিলেন — অর্থাৎ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি বাঁচার, সাজগোজের, স্বাভাবিক জীবনের আকাঙ্ক্ষা ধরে রেখেছিলেন। কবি বলেন — ‘কাজল ও কান্নার মাঝখানে তোমার মুখে এক চামচ জল’। এই এক চামচ জল তিনি হয়ে যান ‘এক চামচ অন্তর্জলী, এক চামচ অঞ্জলি’। এটি একটি অসাধারণ রূপক — তিনি নিজেই সেই জল, যে জল দিয়ে তিনি তার মুখ স্পর্শ করতে চান।
নদীর আত্মজীবনী ও শরীরের ভূগোল
কবিতায় বারবার ফিরে আসে নদীর চিত্র — গঙ্গা, যমুনা, তিস্তা, তমসা, সুবর্ণরেখা, ভল্গা, বসফরাস। স্ত্রীর শরীর ও মৃত্যু নদীর মতো বয়ে চলেছে। ‘তোমার আঁচলে নদীর আত্মজীবনী লেখা রইল’ — অর্থাৎ তিনি চলে যাচ্ছেন, কিন্তু তার স্মৃতি নদীর মতো প্রবাহিত থাকবে। ‘তোমার ধমনী আসলে একটা নদীর আত্মজীবনী’ — তার রক্তনালি, তার জীবনী সবই নদীর মতো।
আইসিইউ-তে শিউলির গন্ধ ও ছেলের কুজ্ঝটিকা
কবিতার সবচেয়ে স্পর্শকাতর অংশগুলোর একটি — মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে স্ত্রী বলেন, ‘আমাকে বাঁচাও, ভালোবাসা, আমি বাঁচতে চাই’। তিনি বলেন, ‘পৃথিবীতে আমি একটু শিউলির গন্ধ পেতে পারি? / আমার নাক থেকে রাইস টিউব সরিয়ে দাও’। কবি উত্তর দেন — ‘এটা ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট, এখানে কোনও শিউলি গাছ নেই’। স্ত্রী বলেন, ‘ছেলেটা কোথায় গেল, কার সঙ্গে গেল? / ওকে একটু দেখো, রাত করে বাড়ি ফিরো না’। মৃত্যুর মুখেও তিনি ছেলের জন্য উদ্বিগ্ন। ছেলে বলে — ‘মা, আমাকে কুজ্ঝটিকা বানান বলে দিয়ে যাও’। আইসিইউতে কেউ কুজ্ঝটিকা বানান বলতে পারে না। এটি এক করুণ বাস্তবতা — মৃত্যুর সময়ও সাধারণ জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা।
ডাক্তার, কেমোথেরাপি ও ব্যথার রাজনীতি
কবি বলেন — ‘ডাক্তার তোমার হাতের শিরা খুঁজে পায়নি / দোষ তোমার নয়, ডাক্তারের / এতবার তোমার শরীর ফুটো করেছিল ওরা / ইরাকের মৃত্তিকাও অতবার বার ফুটো করেনি আমেরিকা’। এটি একটি তীক্ষ্ণ উপমা — যুদ্ধের চেয়েও বেশি বার তার শরীর ফুটো করা হয়েছে। তিনি বলেন — ‘এমন একটা অসুখ যার কোনও ‘আমরা ওরা’ নেই / ভিখিরি এবং প্রেসিডেন্টকে একই ড্রাগ নিতে হবে’। ক্যানসার কারও জন্য কম যায় না।
প্রেম, যৌনতা ও মৃত্যুর ত্রিকোণ
কবিতায় একটি অসাধারণ দৃশ্য আছে — কার্জন পার্কে শুয়ে কালপুরুষের সঙ্গে তর্ক। কালপুরুষ বলেন — ‘নাও, দুই মহান খচ্চর এসে গেছে, / যৌনতা এবং মৃত্যু / ওরা দুই সহোদর, কে তোমাকে বেছে নেয় সেটাই তোমার সেমিফাইনাল’। যৌনতা ও মৃত্যু — দুই সহোদর। প্রেমের সঙ্গে মৃত্যুর সম্পর্ক গভীর।
আমি তোমার রোদ্দুর
শেষ লাইনটি অত্যন্ত শক্তিশালী — ‘তুমি গঙ্গার একটা অংশ ছেড়ে চলে যাচ্ছ, সত্যি চলে যাচ্ছ—— / রোরো তোমার আঁচল ধরে আছে, আমি তোমার রোদ্দুর’। তিনি চলে যাচ্ছেন, কিন্তু রোরো (ছেলে) তার আঁচল ধরে আছে, আর কবি নিজে ‘রোদ্দুর’ — যে তার শেষ সময়েও আলো দিয়েছে, এখনো দেয়।
প্রশ্নোত্তর: গভীর পাঠের জন্য
প্রশ্ন ১: কবিতাটির পটভূমি কী?
উত্তর: কবি সুবোধ সরকারের স্ত্রী কবি মল্লিকা সেনগুপ্ত ক্যানসারে মারা যান। এই কবিতা তাঁর মৃত্যুর পর লেখা একটি স্মৃতিকাব্য।
প্রশ্ন ২: ‘তুমি গঙ্গার একটা অংশ ছেড়ে চলে যাচ্ছ’ — কেন গঙ্গা?
উত্তর: গঙ্গা প্রবহমান নদী, জীবন ও মৃত্যুর সাক্ষী। এখানে স্ত্রীর জীবন ও মৃত্যুকে নদীর প্রবাহের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। তিনি জীবনের প্রবাহ থেকে সরে যাচ্ছেন।
প্রশ্ন ৩: ‘তোমার আঁচলে নদীর আত্মজীবনী লেখা রইল’ — কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: তিনি চলে যাচ্ছেন, কিন্তু তার স্মৃতি, তার জীবনকাহিনি, তার ভালোবাসা — সবকিছু তার আঁচলে (স্মৃতিতে) লিখিত হয়ে রইল। নদী প্রবাহিত হয়, কিন্তু তার আত্মজীবনী থেকে যায়।
প্রশ্ন ৪: ‘কাজল ও কান্নার মাঝখানে তোমার মুখে এক চামচ জল’ — লাইনটির গভীরতা কী?
উত্তর: কাজল জীবনের প্রতীক, কান্না মৃত্যুবেদনার প্রতীক। এই দুইয়ের মাঝখানে এক চামচ জল — যা কবি নিজে। তিনি হয়ে ওঠেন সেই জল, যা তাকে স্পর্শ করতে চায়।
প্রশ্ন ৫: ‘ইরাকের মৃত্তিকাও অতবার বার ফুটো করেনি আমেরিকা’ — কেন এই উপমা?
উত্তর: ক্যানসারের চিকিৎসায় রোগীর শরীর বারবার সুঁচ ফুটানো হয়। কবি বলছেন — ইরাকে আমেরিকা যতবার বোমা ফেলেনি, ততবার তোমার শরীর ফুটো করা হয়েছে। এটি একটি তীব্র ব্যঙ্গ ও বেদনার প্রকাশ।
প্রশ্ন ৬: ‘এমন একটা অসুখ যার কোনও ‘আমরা ওরা’ নেই’ — কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: ক্যানসার ধনী-গরীব, বড়-ছোট কাউকে বেছে দেখে না। ভিখিরি আর প্রেসিডেন্টকে একই ড্রাগ নিতে হয়। এটি মৃত্যুর সামনে সাম্যের কথা বলে।
প্রশ্ন ৭: ‘যৌনতা এবং মৃত্যু ওরা দুই সহোদর’ — কেন বলা হয়েছে?
উত্তর: যৌনতা ও মৃত্যু — দুটোই অনিবার্য, দুটোই জীবনের অংশ। কালপুরুষ বলছেন — এরা দুই ভাই, কে তোমাকে বেছে নেয় সেটাই তোমার সেমিফাইনাল।
প্রশ্ন ৮: ‘আমাকে বাঁচাও, ভালোবাসা, আমি বাঁচতে চাই’ — লাইনটির আবেগিক প্রভাব কী?
উত্তর: মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে তিনি স্বামীকে ডাকছেন। ‘ভালোবাসা’ বলে সম্বোধন — এটি প্রেম ও মৃত্যুর চরম মুহূর্তের এক অসাধারণ চিত্র।
প্রশ্ন ৯: ‘আমি তোমার রোদ্দুর’ — লাইনটির অর্থ কী?
উত্তর: তিনি চলে যাচ্ছেন, কিন্তু কবি নিজেকে বলেন ‘রোদ্দুর’ — অর্থাৎ তিনি তার শেষ সময়ে আলো দিয়েছেন, এখনো দিচ্ছেন। রোদ্দুর কখনও শেষ হয় না।
প্রশ্ন ১০: কবিতার মূল শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা কী?
উত্তর: এই কবিতা শেখায় — মৃত্যুকে আমরা থামাতে পারি না, কিন্তু ভালোবাসা ও স্মৃতি কখনও মরে না। ক্যানসারের যন্ত্রণা, চিকিৎসার বর্বরতা, রোগীর শেষ ইচ্ছা — সবকিছু এই কবিতায় ধরা আছে। এটি বাংলা সাহিত্যের একটি বিরল স্মৃতিকাব্য, যা মৃত্যু ও প্রেমের দ্বান্দ্বিকতাকে অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
ট্যাগস: মৃত্যুর আগে তুমি কাজল পড়েছিলে, সুবোধ সরকার, সুবোধ সরকারের কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, ক্যানসার ও মৃত্যু, স্ত্রী-স্মৃতিকাব্য, মল্লিকা সেনগুপ্ত, প্রেমের কবিতা
© Kobitarkhata.com – কবি: সুবোধ সরকার | কবিতার প্রথম লাইন: “তুমি গঙ্গার একটা অংশ ছেড়ে চলে যাচ্ছ কিন্তু তোমার আঁচলে নদীর আত্মজীবনী লেখা রইল” | ক্যানসার, মৃত্যু ও প্রেমের অসাধারণ কাব্যভাষা | আধুনিক বাংলা কবিতার বিরল দলিল