কবিতার খাতা
কেউ কি এখন – শামসুর রাহমান।
কেউ কি এখন এই অবেলায়
আমার প্রতি বাড়িয়ে দেবে হাত?
আমার স্মৃতির ঝোপেঝাড়ে
হরিণ কাঁদে অন্ধকারে,
এখন আমার বুকের ভেতর
শুকনো পাতা, বিষের মতো রাত।
দ্বিধান্বিত দাঁড়িয়ে আছি
সাঁকোর কাছাকাছি,
চোখ ফেরাতেই দেখি সাঁকো
এক নিমেষে ভাঙলো অকস্মাৎ।
গৃহে প্রবেশ করবো সুখে?
চৌকাঠে যায় কপাল ঠুকে
বাইরে থাকি নত মুখে,
নেকড়েগুলো দেখায় তীক্ষ্ণ দাঁত।
অপরাহ্নে ভালোবাসা
চক্ষে নিয়ে গহন ভাষা
গান শোনালো সর্বনাশা,
এই কি তবে মোহন অপঘাত?
কেউ কি এখন এই অবেলায়
আমার প্রতি বাড়িয়ে দেবে হাত?
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। শামসুর রাহমানের কবিতা।
কবিতার কথা –
আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান রূপকার ও নাগরিক কবি শামসুর রাহমানের ‘কেউ কি এখন’ কবিতাটি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এক চরম একাকীত্ব, অস্তিত্বের সংকট, স্বপ্নভঙ্গ এবং এক গভীর পরাবাস্তব বিষাদের মনস্তাত্ত্বিক আখ্যান। কবি এখানে ‘অবেলা’ বা জীবনের অপরাহ্নকে এক তীব্র নিঃসঙ্গতার ফ্রেম হিসেবে ব্যবহার করেছেন, যেখানে সমস্ত চেনা অনুষঙ্গ একে একে ভেঙে পড়ে এবং মানুষ এক অদ্ভুত সামাজিক ও আত্মিক নিরাপত্তার সংকটে ভোগে।
কবিতার প্রারম্ভেই এক তীব্র আকুলতা ও অসহায়ত্বের সুর ধ্বনিত হয়। জীবনের শেষলগ্নে বা এই অবেলায় এসে কবি আজ বড্ড একলা হয়ে পড়েছেন। তাঁর মনে হচ্ছে, এই কঠিন সময়ে সান্ত্বনা দিতে বা পাশে দাঁড়াতে কেউ কি তাঁর দিকে একটুখানি ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দেবে? কবির স্মৃতির গভীর অরণ্যে বা ঝোপেঝাড়ে এক অবুঝ ‘হরিণ’ যেন গভীর অন্ধকারে একা একা কাঁদছে—যা মূলত কবির নিজের ভেতরের সরল, নিষ্পাপ ও কাতর মনটিরই এক চমৎকার রূপক। কবির বুকের ভেতর এখন বসন্তের সতেজতা নেই, সেখানে কেবলই জমা হয়ে আছে ঝরে পড়া শুকনো পাতা আর এক বিষাক্ত, যন্ত্রণাদায়ক দীর্ঘ রাত।
পরবর্তী অংশে এক পরম অনিশ্চয়তা ও সম্পর্ক ভাঙনের চিত্র ফুটে ওঠে। কবি জীবনের এক ক্রান্তিকালে এক সাঁকো বা সেতুর কাছাকাছি দ্বিধান্বিত চিত্তে দাঁড়িয়ে ছিলেন, যা হয়তো তাঁর অতীত আর বর্তমানকে জুড়ে রেখেছিল। কিন্তু অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে, কবি যখনই একটু চোখ ফেরালেন, তখনই চেনা সেই সাঁকোটি এক নিমেষে আকস্মিকভাবে ভেঙে চূর্ণ হয়ে গেল। এই সাঁকো ভাঙা মূলত মানুষের জীবনের সমস্ত ভরসা, সামাজিক যোগাযোগ এবং সম্পর্কের সেতু চিরতরে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার এক নির্মম প্রতীক।
এরপর কবিতাটি এক তীব্র আশ্রয়হীনতা ও চারপাশের বৈরিতার দিকে মোড় নেয়। কবি যখন পরম সুখে নিজের গৃহ বা ঘরে প্রবেশ করতে যান, তখনই ঘরের চৌকাঠে তাঁর কপাল ঠুকে যায়, অর্থাৎ নিজের চেনা ঘরেও তিনি আজ অবাঞ্ছিত, শান্তিহীন। আবার ঘরের বাইরে যখন তিনি নত মুখে বা বিষণ্ণতায় দাঁড়িয়ে থাকেন, তখন বাইরের সমাজ বা পৃথিবীটাও তাঁর জন্য নিরাপদ থাকে না; সেখানে হিংস্র ‘নেকড়েগুলো’ তাঁর দিকে তাকিয়ে তীক্ষ্ণ দাঁত বের করে হাসে। এই নেকড়ে মূলত চারপাশের স্বার্থপর, নিষ্ঠুর ও সুযোগসন্ধানী মানুষের প্রতীক, যা একলা মানুষকে আরও বেশি বিপর্যস্ত করে তোলে।
শেষ স্তবকে এসে কবি এক মোহময় অথচ সর্বনাশা প্রেমের স্মৃতি রোমন্থন করেছেন। জীবনের এই অপরাহ্নে বা শেষ বয়সে এসে ভালোবাসা যখন চোখের কোণে এক গহন, রহস্যময় ও গভীর ভাষা নিয়ে কবির জীবনে ধরা দিয়েছিল, তখন সে এক অদ্ভুত সর্বনাশা গান শুনিয়েছিল। কবি নিজেকে প্রশ্ন করেন, জীবনের এই শেষবেলার ভালোবাসার ছোঁয়াটি কি তবে এক ‘মোহন অপঘাত’ বা সুন্দর কোনো ধ্বংসের হাতছানি ছিল? এই মধুর অথচ যন্ত্রণাদায়ক স্মৃতির আবর্তে ঘুরপাক খেতে খেতে কবি আবারও সেই শুরুর আকুল প্রশ্নেই ফিরে যান—”কেউ কি এখন এই অবেলায় / আমার প্রতি বাড়িয়ে দেবে হাত?” চারপাশের এই চেনা-অচেনা শূন্যতার মাঝে একটুখানি মানবিক স্পর্শ পাওয়ার এক অন্তহীন হাহাকারের মধ্য দিয়েই কবিতাটি শেষ হয়।





