কবিতার খাতা
মা তুমি – আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ।
এক.
মা তুমি
সোঁদা গন্ধ মাটি
মাটি ফলবতী
মা তুমি
আমাকে এনেছ।
মা তুমি
কোলে সাজিয়েছ
সহোদর ঘাস ঘাসফুল
মা তুমি আমাকে ভুলেছ।
দুই.
মা কি শালিক পাখি?
খয়েরি শাড়িতে তাঁর
হলুদের ছোপ
তারপর একদিন তিনি
শুভ্র কাফন পরে
শেফালির ফুল।
তিন.
তোমরা আমার কাছে
কেন কেন চাও?
কিছুই দেব না আমি।
ভালোবাসা দিলে মা মরে
যায় যুদ্ধ আসে, ভালোবেসে
মায়ের ছেলেরা চলে যায়।
তোমরা আমার কাছে
কেন কেন চাও?
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহের কবিতা।
কবিতার কথা –
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর ‘মা তুমি’ কবিতাটি মাতৃরূপের এক অনন্য নান্দনিক প্রকাশ, দেশমাতৃকার আদিম রূপক এবং একই সাথে যুদ্ধ ও বিচ্ছেদের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক আখ্যান। কবি এখানে ‘মা’ সত্তাকে কেবল একজন জন্মদাত্রী হিসেবে দেখেননি, বরং তাকে জীবনের উৎস, সুজলা-সুফলা ধরিত্রী এবং অবশেষে এক অলঙ্ঘনীয় বেদনার প্রতীক হিসেবে তিন খণ্ডে রূপায়িত করেছেন।
এক. সৃষ্টির আদি উৎস ও প্রকৃতির রূপক প্রথম অংশে কবি মাকে তুলনা করেছেন ‘সোঁদা গন্ধ মাটি’র সাথে। মাটি যেমন ফলবতী, যার বুক চিরে জীবনের জন্ম হয়, তেমনি মা-ও কবিকে এই পৃথিবীর আলো দেখিয়েছেন। কিন্তু এই সৃষ্টির পরেই মা কেবল কবিকে একাকী রাখেননি, তাঁর কোলে সাজিয়ে দিয়েছেন ‘সহোদর ঘাস ঘাসফুল’। অর্থাৎ, প্রকৃতির প্রতিটি সবুজ উপাদানই কবির সহোদর বা ভাই-বোন। তবে এই বিশ্ব-সংসারের বিশাল আবর্তে মা যখন নিজের সৃষ্টিকে প্রকৃতির নিয়মে ছেড়ে দেন, তখন কবির মনে হয়—‘মা তুমি আমাকে ভুলেছ’। এই ভুলে যাওয়া আসলে অবহেলা নয়, বরং সন্তানকে পৃথিবীর বুকে স্বাবলম্বী করে তোলার এক চিরন্তন মাতৃত্বের নিয়ম।
দুই. রূপান্তর ও অলৌকিক বিদায় দ্বিতীয় অংশে কবির শৈশব ও নস্টালজিয়ার সাথে জড়িয়ে গেছে মায়ের মৃত্যুর এক তীব্র বিষণ্ণ চিত্রকল্প। মায়ের খয়েরি শাড়িতে হলুদের ছোপ যেন গ্রামীণ চিরায়ত মায়ের এক চেনা রূপ, যাকে শালিক পাখির ডানার রঙের সাথে তুলনা করা হয়েছে। কিন্তু সময়ের অমোঘ নিয়মে একদিন সেই মা শুভ্র কাফন পরে বিদায় নেন। কবির চোখে সেই শ্বেত শুভ্র কাফন পরা মা যেন পবিত্র ‘শেফালির ফুল’ হয়ে ঝরে পড়েছেন। মায়ের এই চলে যাওয়া প্রকৃতির এক শান্ত অথচ বুক-ভাঙা রূপান্তর।
তিন. যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি ও ভালোবাসার হাহাকার তৃতীয় ও শেষ অংশটি কবিতাটিকে এক গভীর রাজনৈতিক ও দেশপ্রেমের ক্যানভাসে দাঁড় করিয়ে দেয়। এখানে কবির এক তীব্র অভিমানী ও প্রতিরক্ষামূলক কণ্ঠস্বর শোনা যায়—‘তোমরা আমার কাছে কেন কেন চাও? কিছুই দেব না আমি।’ কবি এক অদ্ভুত সমীকরণের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন—‘ভালোবাসা দিলে মা মরে যায় যুদ্ধ আসে’। যখনই দেশের প্রতি, মানুষের প্রতি ভালোবাসা তীব্র হয়, তখনই দেশের প্রয়োজনে, স্বাধীনতার প্রয়োজনে মায়ের ছেলেরা ঘর ছেড়ে যুদ্ধে চলে যায়। সেই যুদ্ধে কত মায়ের বুক খালি হয়, কত মা সন্তান হারিয়ে ধুঁকে ধুঁকে মরে। ভালোবাসার এই চরম মূল্য দিতে গিয়ে কবি ক্লান্ত। তাই তিনি নিজের ভেতরের অবশিষ্ট আবেগ আর সন্তানকে আর কোনো যুদ্ধের আগুনে বা বিচ্ছেদের যন্ত্রণায় সঁপে দিতে চান না।
পরিশেষে, কবিতাটি মায়ের প্রতি সন্তানের এক আদিম টান এবং যুদ্ধের পটভূমিতে মায়ের কোল খালি হওয়ার এক তীব্র মানবিক আর্তি প্রকাশ করে। সৃষ্টির সার্থকতা লৌকিক হাততালিতে নয়, বরং স্রষ্টার নিজের মানসিক মুক্তি এবং অস্তিত্বের তাগিদে—যা এই কবিতার প্রতিটি খণ্ডে মাতৃত্বের অসীম মমতা, হারানোর শোক এবং যুদ্ধের বিরুদ্ধে এক নীরব ও জোরালো প্রতিবাদ হয়ে মূর্ত হয়ে উঠেছে।






