কবিতার খাতা
মানুষের কেউ কেউ – পূর্ণেন্দু পত্রী।
সবাই মানুষ থাকবে না।
মানুষের কেউ কেউ ঢেউ হবে, কেউ কেউ নদী
প্রকাশ্যে যে ভাঙে ও ভাসায়।
সমুদ্র সদৃশ কেউ, ভয়ঙ্কর তথাপি সুন্দর।
কেউ কেউ সমুদ্রের গর্ভজাত উচ্ছৃঙ্খল মাছ।
কেউ নবপল্লবের গুচ্ছ, কেউ দীর্ঘবাহু গাছ।
সকলেই গাছ নয়, কেউ কেউ লতার স্বভাবে
অবলম্বনের যোগ্য অন্য কোনো বৃক্ষ খুঁজে পাবে।
মানুষ পর্বতচূড়া হয়ে গেছে দেখেছি অনেক
আকাশের পেয়েছে প্রণাম।
মানুষ অগ্নির মতো
নিজে জ্বলে জ্বালিয়েছে বহু ভিজে হাড়
ঘুমের ভিতরে সংগ্রাম।
অনেক সাফল্যহীন মরুভূমি পৃথিবীতে আছে টের পেয়ে
ভীষণ বৃষ্টির মতো মানুষ ঝরেছে অবিরল
খরা থেকে জেগেছে শ্যামল
মানুষেরই রোদে,
বহু দুর্দিনের শীত মানুষ হয়েছে পার
সার্থকতাবোধে।
সবাই মানুষ থাকবে না।
কেউ কেউ ধুলো হবে, কেউ কেউ কাঁকর ও বালি
খোলামকুচির জোড়াতালি।
কেউ ঘাস, অযত্নের অপ্রীতির অমনোযোগের
বংশানুক্রমিক দূর্বাদল।
আঁধারে প্রদীপ কেউ নিরিবিলি একাকী উজ্জ্বল।
সন্ধ্যায় কুসুমগন্ধ,
কেউ বা সন্ধ্যার শঙ্খনাদ।
অনেকেই বর্ণমালা
অল্প কেউ প্রবল সংবাদ।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। পূর্ণেন্দু পত্রীর কবিতা।
কবিতার কথা —
পূর্ণেন্দু পত্রীর ‘মানুষের কেউ কেউ’ কবিতাটি মানুষের বিচিত্র রূপ, স্বভাব এবং অস্তিত্বের এক অসাধারণ মনস্তাত্ত্বিক ও রূপকধর্মী বিশ্লেষণ। কবি এখানে প্রথাগত ‘মানুষ’ সংজ্ঞার বাইরে গিয়ে মানুষের অন্তরের শক্তি, দুর্বলতা এবং প্রকৃতির সাথে তার নিবিড় সাদৃশ্যকে অন্বেষণ করেছেন। কবিতার শুরুতেই এক অমোঘ ঘোষণা—‘সবাই মানুষ থাকবে না’। এই পঙক্তিটি দিয়ে কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, কেবল জৈবিক গঠন বা আকৃতিতে মানুষ হওয়া যায় না; বরং মানুষের কর্ম, স্বভাব এবং অবদানই তাকে ভিন্ন ভিন্ন পরিচয়ে অভিষিক্ত করে। কেউ হয়ে ওঠে নদীর মতো প্রবহমান, যে প্রকাশ্যে যেমন সমাজকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, তেমনি নতুনের পত্তন করে। সমুদ্রের বিশালতা আর ভয়ংকর সৌন্দর্যের সাথে মানুষের তুলনাটি জীবনের সেই গভীর ও রহস্যময় দিকটিকে নির্দেশ করে, যেখানে শান্তি ও উন্মাদনা হাত ধরাধরি করে চলে।
কবিতার দ্বিতীয় স্তবকে মানুষের পরনির্ভরশীলতা এবং আত্মনির্ভরশীলতার এক চমৎকার বৈপরীত্য ফুটে উঠেছে। কেউ যদি ‘দীর্ঘবাহু গাছ’ বা বটের মতো আশ্রয়দাতা হয়, তবে কেউ আবার ‘লতার স্বভাবে’ অন্য কোনো বৃক্ষকে জড়িয়ে ধরে বেঁচে থাকে। এটি জীবনের এক রূঢ় সত্য যে, সবাই সমান শক্তিশালী নয়; কারো কারো অস্তিত্ব টিঁকে থাকে অন্য কারো অবলম্বনকে পুঁজি করে। আবার মানুষ যখন সাফল্যের শিখরে পৌঁছায়, তখন সে ‘পর্বতচূড়া’র মতো আকাশের প্রণাম লাভ করে। কিন্তু এই উচ্চতায় পৌঁছানোর পথটি কুসুমাস্তীর্ণ নয়। কবি এখানে মানুষের অন্তরের সেই সংগ্রামের কথা বলেছেন, যা ‘অগ্নির মতো’ নিজেকে পুড়িয়ে অন্যকে পথ দেখায়। ‘ভিজে হাড়’ জ্বালানোর যে রূপক কবি ব্যবহার করেছেন, তা আসলে চরম প্রতিকূলতার মাঝেও মানুষের টিকে থাকার ও লড়াই করার এক অনন্য বীরত্বগাথা।
মানুষের আত্মত্যাগের মহিমা এই কবিতায় এক ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। পৃথিবীর ‘সাফল্যহীন মরুভূমি’ বা হাহাকার ঘুচিয়ে দিতে কিছু মানুষ ‘ভীষণ বৃষ্টির মতো’ ঝরে পড়ে। এই ঝরে পড়া আসলে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া, যার ফলে রুক্ষ খরা থেকে জেগে ওঠে শ্যামল প্রকৃতি। মানুষেরই রোদে, মানুষেরই ঘামে এবং সার্থকতাবোধে শীতের মতো কঠিন দুর্দিনগুলো পার হওয়া সম্ভব হয়। পূর্ণেন্দু পত্রী এখানে মানুষের মানবিকতাকে এক ঐশ্বরিক ক্ষমতায় উন্নীত করেছেন, যেখানে মানুষই মানুষের রক্ষক এবং পুনর্জন্মের কারিগর। মানুষের এই পরহিতৈষণা ও সৃষ্টিশীলতা তাকে সাধারণ জৈবিক পরিচিতির ঊর্ধ্বে নিয়ে যায়।
কবিতার শেষাংশটি বিনয় এবং ক্ষুদ্রতার মাঝে মহত্ত্ব খোঁজার এক দলিল। সবাই পর্বত বা সমুদ্র হবে না; কেউ কেউ ধুলো, কাঁকর বা বালি হয়ে মিশে থাকবে মাটির সাথে। এই ক্ষুদ্রতাও জীবনের অংশ। কেউ অযত্নের ‘দূর্বাদল’ হয়ে টিকে থাকে বংশানুক্রমিক অবহেলায়, অথচ তার অস্তিত্বও প্রকৃতির জন্য অপরিহার্য। আঁধারে প্রদীপ হয়ে একা জ্বলে ওঠা কিংবা সন্ধ্যার কুসুমগন্ধ হয়ে ছড়িয়ে পড়া—এগুলো মানুষের সেই সব নীরব গুণের পরিচয় যা পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে তোলে। কবি এখানে মানুষকে ‘বর্ণমালা’র সাথে তুলনা করেছেন—অনেকেই বর্ণমালার মতো ছড়িয়ে থাকে সাধারণ চেনা ছকে, কিন্তু তাদের মধ্য থেকেই কেউ কেউ ‘প্রবল সংবাদ’ হয়ে উঠে আসে যা ইতিহাসকে বদলে দেয়।
পরিশেষে বলা যায়, ‘মানুষের কেউ কেউ’ কবিতাটি মানবচরিত্রের এক অনন্ত মানচিত্র। পূর্ণেন্দু পত্রী এখানে মানুষের বৈচিত্র্যকে সম্মান জানিয়েছেন এবং মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, মহত্ত্ব কেবল শিখরে আরোহণে নয়, বরং বৃষ্টির মতো ঝরে পড়া বা প্রদীপের মতো নিভৃতে জ্বলে ওঠার মাঝেও নিহিত। মানুষের স্বভাবের এই যে অনন্ত বিস্তার—তা কখনো লতার মতো কোমল, কখনো অগ্নির মতো দহনকারী—এই সত্যটিই কবি অত্যন্ত সাবলীল ও নিপুণ শব্দশৈলীতে ফুটিয়ে তুলেছেন।






