কবিতার শুরুতেই এক গ্রাম্য বাংলার চিরন্তন ছবি ফুটে ওঠে। কুমড়োর ফুল, সজনে ডাঁটা আর রোদে শুকানো ডালের বড়ি—এসবই মায়ের পরম যত্নে সাজানো এক প্রতীক্ষা। মা তাঁর প্রবাসী বা শহরবাসী ছেলের জন্য অপেক্ষা করছেন। তিনি জানতে চান—‘খোকা তুই কবে আসবি? কবে ছুটি?’ মায়ের কাছে ছুটি মানে ছেলের ঘরে ফেরা, কিন্তু ছেলের কাছে তখন ছুটি মানে এক বৃহত্তর মুক্তি, যা অর্জিত হবে তার মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।
কবিতার সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক অংশ হলো সেই পকেটে থাকা ‘ছেঁড়া আর রক্তে ভেজা’ চিঠিটি। ছেলেটি তার মাকে চিঠিতে লিখেছিল যে, ‘ওরা বলে সবার কথা কেড়ে নেবে’। এখানে ‘ওরা’ বলতে সেই শাসকগোষ্ঠীকে বোঝানো হয়েছে যারা বাঙালির মুখের ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল। ছেলেটি তার মাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, সে ‘কথার ঝুরি’ নিয়ে বাড়ি ফিরবে। অর্থাৎ, সে তার মাতৃভাষাকে জয় করে তবেই মায়ের কোলে মাথা রেখে গল্প শুনতে ফিরতে চেয়েছিল। ছেলের এই সংকল্প তাকে আন্দোলনে আটকে রেখেছিল, যা মা প্রথমে বুঝতে পারেননি।
ছেলের ফেরার অপেক্ষায় মা নারকেলের চিড়ে কোটেন, উরকি ধানের মুড়কি ভাজেন। কিন্তু সময়ের আবর্তে কুমড়ো ফুল শুকিয়ে যায়, সজনে ডাঁটা ঝরে পড়ে। প্রকৃতির এই পরিবর্তন আসলে ছেলের আর ফিরে না আসারই ইঙ্গিত। মা যখন ‘ঝাপসা চোখে’ উঠানের দিকে তাকান, তখন তিনি দেখেন তাঁর আদরের খোকা ফিরেছে ঠিকই, কিন্তু সে এক নিথর দেহ বা ‘শব’, যা শকুনীরা ব্যবচ্ছেদ করছে। এই চিত্রকল্পটি অত্যন্ত ভয়াবহ এবং নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলে।
কবিতার শেষভাগে এক অভাবনীয় রূপান্তর লক্ষ্য করা যায়। যে মা প্রথমে কেবল একজন স্নেহময়ী জননী ছিলেন, সন্তানের মৃত্যু তাঁকে এক প্রতিবাদী শক্তিতে রূপান্তরিত করে। ‘মা’র চোখে চৈত্রের রোদ’ এখন শকুনীদের পুড়িয়ে দেয়। এটি শোষকের বিরুদ্ধে বাঙালির জেগে ওঠার প্রতীক। মা আবার ধান ভানেন, খই ভাজেন—এটি যেন এক অনন্ত প্রতীক্ষা এবং বিশ্বাস যে, তাঁর খোকা কোনোদিন হারায়নি, বরং সে বেঁচে আছে প্রতিটি বাঙালির উচ্চারিত শব্দে।
পরিশেষে বলা যায়, ‘মাগো ওরা বলে’ কবিতাটি ব্যক্তিগত শোককে জাতীয় শক্তিতে পরিণত করার এক অসাধারণ কাব্যিক নিদর্শন। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমাদের ভাষার প্রতিটি অক্ষর কেন এত মূল্যবান।
মাগো ওরা বলে – আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ | আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর মুক্তিযুদ্ধের কবিতা | মায়ের অপেক্ষা ও খোকার রক্তভেজা চিঠি | শকুনীর ব্যবচ্ছেদ ও যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতা
মাগো ওরা বলে: আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত মায়ের করুণ অপেক্ষার গাথা, খোকার রক্তভেজা চিঠি ও শকুনীর ব্যবচ্ছেদের অসাধারণ কাব্য
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর “মাগো ওরা বলে” বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য, করুণ ও বাস্তবচিত্রময় সৃষ্টি। “কুমড়ো ফুলে-ফুলে, নুয়ে প’ড়েছে লতাটা, সজনে ডাঁটায় ভরে গেছে গাছটা” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে এক মায়ের অপেক্ষার কাহিনি, যে তার সন্তানের জন্য ছাদের ডালের বড়ি শুকিয়ে রাখে, নারকেলের চিড়ে কোটে, উরকি ধানের মুড়কি ভাজে; মুক্তিযুদ্ধে যাওয়া খোকার পকেট থেকে পাওয়া রক্তভেজা ছেঁড়া চিঠি, যাতে লেখা ‘মাগো ওরা বলে সবার কথা কেড়ে নেবে, তোমার কোলে শুয়ে গল্প শুনতে দেবে না’; এবং শেষ পর্যন্ত খোকার শব শকুনীরা ব্যবচ্ছেদ করছে, আর মা সেই শকুনীদের দিকে চৈত্রের রোদে পুড়িয়ে তাকিয়ে, তারপর আবার ধান ভানে, বিন্নি ধানের খই ভাজে — খোকা কখন আসে কখন আসে। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ (১৯৩৪-২০০১) বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট কবি, লেখক ও সাংবাদিক। তিনি মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত কবিতায় গণমানুষের বেদনা, মায়ের অপেক্ষা, সন্তানহারা পরিবারের করুণ চিত্র, এবং যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতা ফুটিয়ে তুলেছেন। “মাগো ওরা বলে” তাঁর সেই স্বকীয় কাব্যভাষার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যেখানে তিনি এক মায়ের চোখে মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে নির্মম দৃশ্য দেখিয়েছেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই মা আবার ধান ভানে, খই ভাজে — কারণ খোকা আসবে, এখনো আসেনি।
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ: মুক্তিযুদ্ধের কবি ও গণমানুষের কণ্ঠস্বর
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ ১৯৩৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের নেত্রকোনা জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একজন বিশিষ্ট কবি, লেখক ও সাংবাদিক ছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা উত্তর কবিতায় তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত কবিতায় গণমানুষের বেদনা, মায়ের অপেক্ষা, সন্তানহারা পরিবারের করুণ চিত্র, এবং যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতা ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘বাংলাদেশ’, ‘পদ্মা নদীর সত্তর বছর পরে’, ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি’, ‘মাগো ওরা বলে’ ইত্যাদি।
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সরল গ্রামীণ ভাষায় গভীর বেদনা, মায়ের অপেক্ষার চিত্র, খোকার চিঠির করুণতা, শকুনীর ব্যবচ্ছেদের নির্মম বাস্তবতা, এবং যুদ্ধশেষে মায়ের আবার ধান ভাঙার চিরন্তন আশা। ‘মাগো ওরা বলে’ সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ — যেখানে তিনি কুমড়ো ফুল, সজনে ডাঁটা, ডালের বড়ি, নারকেলের চিড়ে, উরকি ধানের মুড়কি, বিন্নি ধানের খই — গ্রামীণ জীবনের সরল উপকরণ দিয়ে মায়ের অপেক্ষার অসাধারণ কাব্য তৈরি করেছেন, আর তার সাথে যুক্ত করেছেন রক্তভেজা চিঠি, শকুনীর ব্যবচ্ছেদ, চৈত্রের রোদ ও শিশির-ভোরের স্নেহ।
মাগো ওরা বলে: শিরোনামের তাৎপর্য ও কবিতার পটভূমি
শিরোনাম ‘মাগো ওরা বলে’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘মাগো’ — মাকে সম্বোধন। ‘ওরা বলে’ — তারা (শত্রুপক্ষ, পাকিস্তানি হানাদার বা তাদের দোসররা) বলে। খোকার চিঠিতে লেখা — ‘মাগো, ওরা বলে সবার কথা কেড়ে নেবে। তোমার কোলে শুয়ে গল্প শুনতে দেবে না।’ এই ‘ওরা বলে’ শব্দটি যুদ্ধের সময় শাসকগোষ্ঠীর হুমকি ও ভীতি প্রদর্শনের প্রতীক। কিন্তু খোকা সেই হুমকির কাছে মাথা নত করেনি — সে লড়াই করতে গেছে, এবং মরে গেছে।
কবিতাটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের (১৯৭১) পটভূমিতে রচিত। কোটি কোটি মা তাদের সন্তানদের যুদ্ধে পাঠিয়েছিল। অনেক সন্তান ফিরে আসেনি। এই কবিতা সেই সব মায়ের অপেক্ষার কাহিনি — যারা এখনো ভাবে তাদের খোকা আসবে, এখনো বাড়ি ফিরবে।
কবি শুরুতে বলছেন — কুমড়ো ফুলে-ফুলে নুয়ে পড়েছে লতাটা, সজনে ডাঁটায় ভরে গেছে গাছটা, আর আমি ডালের বড়ি শুকিয়ে রেখেছি। খোকা তুই কবে আসবি? কবে ছুটি?
চিঠিটা তার পকেটে ছিল ছেঁড়া আর রক্তে ভেজা।
মাগো, ওরা বলে সবার কথা কেড়ে নেবে। তোমার কোলে শুয়ে গল্প শুনতে দেবে না। বলো, মা, তাই কি হয়? তাইতো আমার দেরি হচ্ছে। তোমার জন্য কথার ঝুরি নিয়ে তবেই না বাড়ি ফিরবো। লক্ষ্মী মা, রাগ কোরো না, মাত্রতো আর ক’টা দিন।
পাগল ছেলে, মা পরে আর হাসে, তোর ওপরে রাগ করতে পারি! নারকেলের চিড়ে কোটে, উরকি ধানের মুড়কি ভাজে, এটা-সেটা আরও কত কী! তার খোকা যে বাড়ি ফিরবে ক্লান্ত খোকা।
কুমড়ো ফুল শুকিয়ে গেছে, ঝরে পড়েছে ডাঁটা, পুঁই লতাটা নেতানো। খোকা এলি? ঝাপসা চোখে মা তাকায় উঠানে-উঠানে — যেখানে খোকার শব শকুনীরা ব্যবচ্ছেদ করে।
এখন মা’র চোখে চৈত্রের রোদ পুরিয়ে দেয় শকুনীদের। তারপর দাওয়ায় বসে মা আবার ধান ভানে, বিন্নি ধানের খই ভাজে, খোকা তার কখন আসে কখন আসে।
এখন মার চোখে শিশির-ভোর স্নেহের রোদে ভিটে ভরেছে।
মাগো ওরা বলে: স্তবকভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ
প্রথম স্তবক: কুমড়ো ফুল, সজনে ডাঁটা ও ডালের বড়ি — মায়ের অপেক্ষা
“কুমড়ো ফুলে-ফুলে, / নুয়ে প’ড়েছে লতাটা, / সজনে ডাঁটায় / ভরে গেছে গাছটা, / আর আমি / ডালের বড়ি শুকিয়ে রেখেছি। / খোকা তুই কবে আসবি ? / কবে ছুটি?”
প্রথম স্তবকে মায়ের অপেক্ষার চিত্র। কুমড়ো ফুলে-ফুলে লতা নুয়ে পড়েছে — সময় কেটে গেছে। সজনে ডাঁটায় গাছ ভরে গেছে — আরেক ফসল। আর মা ডালের বড়ি শুকিয়ে রেখেছে — খোকার জন্য অপেক্ষা করে। ‘খোকা তুই কবে আসবি? কবে ছুটি?’ — এই সরল প্রশ্নটির ভেতর লুকিয়ে আছে অপরিসীম মমতা ও উদ্বেগ।
দ্বিতীয় স্তবক: চিঠি — ছেঁড়া ও রক্তে ভেজা
“চিঠিটা তার পকেটে ছিল / ছেঁড়া আর রক্তে ভেজা।”
দ্বিতীয় স্তবকটি অত্যন্ত ছোট কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী। মাত্র দুটি লাইনে পুরো কবিতার করুণ রসের ভিত্তি তৈরি হয়েছে। ‘ছেঁড়া আর রক্তে ভেজা’ — এই চিঠিটি কার? খোকার? নাকি খোকার পকেটে পাওয়া গেছে? এটি খোলা প্রশ্ন। চিঠি ছেঁড়া ও রক্তে ভেজা — অর্থাৎ যুদ্ধের নির্মমতায় চিঠিটি ছিড়ে গেছে, রক্ত মাখা হয়েছে।
তৃতীয় স্তবক: খোকার চিঠির ভাষা — ওরা বলে ও মায়ের কাছে ফেরার প্রতিজ্ঞা
“মাগো, ওরা বলে / সবার কথা কেড়ে নেবে। / তোমার কোলে শুয়ে / গল্প শুনতে দেবে না। / বলো, মা, / তাই কি হয়? / তাইতো আমার দেরি হচ্ছে। / তোমার জন্য / কথার ঝুরি নিয়ে / তবেই না বাড়ি ফিরবো।”
তৃতীয় স্তবকে খোকার চিঠির ভাষা। ‘ওরা বলে’ — যুদ্ধের শাসকরা হুমকি দিচ্ছে — সবার কথা কেড়ে নেবে, মায়ের কোলে গল্প শোনা বন্ধ করে দেবে। খোকা প্রশ্ন করে — ‘বলো, মা, তাই কি হয়?’ অর্থাৎ ওরা যা বলে, তা কি আদৌ সম্ভব? মায়ের কোলে গল্প শোনা কি কেউ বন্ধ করতে পারে? ‘তাইতো আমার দেরি হচ্ছে’ — এই দেরির কারণ হলো শত্রুর সাথে লড়াই করা। ‘কথার ঝুরি নিয়ে’ — খোকা মায়ের জন্য গল্পের ঝুলি নিয়ে ফিরবে। ‘তবেই না বাড়ি ফিরবো’ — এই ‘তবেই না’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ — খোকা ফিরবে, কিন্তু শুধু গল্প নিয়ে ফিরবে।
চতুর্থ স্তবক: মায়ের হাসি ও খোকার জন্য খাবারের আয়োজন
“লহ্মী মা, / রাগ ক’রো না, / মাত্রতো আর ক’টা দিন। / পাগল ছেলে, / মা পরে আর হাসে, / তোর ওপরে রাগ করতে পারি! / নারকেলের চিড়ে কোটে, / উরকি ধানের মুড়কি ভাজে, / এটা-সেটা / আরও কত কী! / তার খোকা যে বাড়ি ফিরবে / ক্লান্ত খোকা।”
চতুর্থ স্তবকে খোকা মাকে বলে — ‘লক্ষ্মী মা, রাগ করো না, মাত্র আর ক’টা দিন।’ মা হাসে — ‘পাগল ছেলে, তোর ওপরে রাগ করতে পারি!’ এই হাসির ভেতর লুকিয়ে আছে অপরিসীম স্নেহ ও গর্ব। তারপর মা নারকেলের চিড়ে কোটে, উরকি ধানের মুড়কি ভাজে, আরও কত কী করে। ‘তার খোকা যে বাড়ি ফিরবে ক্লান্ত খোকা’ — মা জানেন খোকা ক্লান্ত হয়ে ফিরবে, তাই তার জন্য সব প্রস্তুত করে রাখেন। এই দৃশ্যটি অত্যন্ত স্নেহময় ও করুণ — কারণ পরবর্তী স্তবকে জানা যাবে খোকা আর ফিরবে না।
পঞ্চম ও ষষ্ঠ স্তবক: কুমড়ো ফুল শুকানো, পুঁই লতা নেতানো ও শকুনীর ব্যবচ্ছেদ
“কুমড়ো ফুল / শুকিয়ে গেছে, / ঝরে পরেছে ডাঁটা, / পুঁই লতাটা নেতানো। / খোকা এলি? / ঝাপসা চোখে মা তাকায় / উঠানে-উঠানে / যেখানে খোকার শব / শকুনীরা ব্যবচ্ছেদ করে।”
পঞ্চম ও ষষ্ঠ স্তবকে সময়ের ব্যবধান। কুমড়ো ফুল শুকিয়ে গেছে, ঝরে পড়েছে ডাঁটা, পুঁই লতা নেতানো। মা ‘খোকা এলি?’ বলে জিজ্ঞাসা করে। ঝাপসা চোখে মা উঠানে-উঠানে তাকায় — যেখানে খোকার শব শকুনীরা ব্যবচ্ছেদ করে। এই লাইনটি কবিতার সবচেয়ে নির্মম ও ভয়ঙ্কর লাইন। খোকার মৃতদেহ শকুনীরা খাচ্ছে — আর মা সেদিকে তাকিয়ে আছে, খোকা এলি বলে ডাকছে। ‘ঝাপসা চোখে’ — হয়তো অশ্রুতে, হয়তো বয়সের কারণে, হয়তো সত্য দেখতে না চাওয়ার কারণে।
সপ্তম ও অষ্টম স্তবক: চৈত্রের রোদে শকুনীদের পুড়িয়ে দেওয়া ও আবার ধান ভাঙা
“এখন / মা’র চোখে চৈত্রের রোদ / পুরিয়ে দেয় শকুনীদের। / তারপর / দাওয়ায় ব’সে / মা আবার ধান ভানে, / বিন্নি ধানের খই ভাজে, / খোকা তার / কখন আসে কখন আসে।”
সপ্তম ও অষ্টম স্তবকে মায়ের চোখের শক্তি। ‘মা’র চোখে চৈত্রের রোদ পুরিয়ে দেয় শকুনীদের’ — মায়ের চোখের একদৃষ্টি এত তীব্র যে তা যেন শকুনীদের পুড়িয়ে দেয়। তারপর মা দাওয়ায় বসে আবার ধান ভানে, বিন্নি ধানের খই ভাজে — খোকা কখন আসে কখন আসে। অর্থাৎ মা সত্য বুঝতে পারেন না বা বুঝতে চান না। তিনি মনে করেন খোকা এখনো আসবে। তাই প্রস্তুতি চলতে থাকে।
নবম ও শেষ স্তবক: শিশির-ভোরের স্নেহের রোদে ভিটে ভরা
“এখন / মার চোখে শিশির-ভোর / স্নেহের রোদে ভিটে ভ’রেছে।”
শেষ স্তবকটি অত্যন্ত সুন্দর ও স্নিগ্ধ। ‘মার চোখে শিশির-ভোর’ — সকালের শিশিরের মতো স্নিগ্ধতা। ‘স্নেহের রোদে ভিটে ভরেছে’ — মায়ের স্নেহের আলোতে পুরো ভিটা (ঘরের আঙ্গিনা) ভরে গেছে। অর্থাৎ মা এখন শান্ত, এখন তিনি কেবল স্নেহেই আছেন, যন্ত্রণা ও শকুনীর দৃশ্য পেরিয়ে তিনি পৌঁছেছেন এক স্নেহময় জগতে। কিন্তু এই স্নেহ কি বাস্তব, নাকি বিভ্রম? খোকা নেই, কিন্তু মা তাকে যেন পেয়ে গেছেন স্নেহের রোদে।
কবিতার গঠনশৈলী, ছন্দ ও শিল্পরূপ
কবিতাটি গদ্যছন্দে রচিত, লাইন ছোট। এটি দুই ভাগে বিভক্ত — প্রথম অংশে খোকার চিঠি ও মায়ের প্রস্তুতি, দ্বিতীয় অংশে খোকার মৃত্যু ও মায়ের অপেক্ষা। সময়ের ব্যবধান চিহ্নিত করতে ‘এখন’ শব্দটি এসেছে।
প্রতীক ব্যবহার অত্যন্ত শক্তিশালী। ‘কুমড়ো ফুলে-ফুলে লতা নুয়ে পড়া’ — সময় কেটে যাওয়ার প্রতীক। ‘সজনে ডাঁটায় ভরে যাওয়া’ — আরেক ফসল, আরেক সময়ের প্রতীক। ‘ডালের বড়ি শুকিয়ে রাখা’ — অপেক্ষার প্রতীক। ‘খোকা তুই কবে আসবি’ — মাতৃস্নেহের প্রতীক। ‘ছেঁড়া ও রক্তে ভেজা চিঠি’ — যুদ্ধের নির্মমতার প্রতীক। ‘ওরা বলে’ — শাসকগোষ্ঠীর হুমকির প্রতীক। ‘কথার ঝুরি’ — গল্পের ঝুলি, যা স্বাধীনতা ও সংস্কৃতির প্রতীক। ‘নারকেলের চিড়ে কোটানো, উরকি ধানের মুড়কি ভাজা’ — মাতৃস্নেহ ও খোয়ার প্রস্তুতির প্রতীক। ‘কুমড়ো ফুল শুকিয়ে যাওয়া, পুঁই লতা নেতানো’ — মৃত্যু ও ধ্বংসের প্রতীক। ‘খোকার শব শকুনীরা ব্যবচ্ছেদ করে’ — যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতার প্রতীক। ‘ঝাপসা চোখ’ — অশ্রু ও অন্ধত্বের প্রতীক। ‘চৈত্রের রোদ পুরিয়ে দেয় শকুনীদের’ — মাতৃক্রোধের প্রতীক। ‘দাওয়ায় বসে ধান ভানা ও খই ভাজা’ — অপেক্ষার চক্রের প্রতীক। ‘শিশির-ভোরের স্নেহের রোদে ভিটে ভরা’ — মাতৃস্নেহের চিরন্তনতার প্রতীক।
বৈপরীত্য ব্যবহার অত্যন্ত দক্ষ। খোকার চিঠির আশা ও শকুনীর ব্যবচ্ছেদের বাস্তবতার বৈপরীত্য। মায়ের খাবার প্রস্তুতি ও খোকার মৃতদেহের বৈপরীত্য। চৈত্রের তীব্র রোদ ও শিশির-ভোরের স্নিগ্ধতার বৈপরীত্য।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য ও দার্শনিক মাত্রা
“মাগো ওরা বলে” আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর এক অসাধারণ সৃষ্টি। তিনি এখানে মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে এক মায়ের অপেক্ষার করুণ কাহিনি বলেছেন।
প্রথম স্তবকে — মায়ের অপেক্ষা ও প্রস্তুতি। দ্বিতীয় স্তবকে — রক্তভেজা ছেঁড়া চিঠি। তৃতীয় স্তবকে — খোকার চিঠির ভাষা: ‘ওরা বলে’ ও মায়ের কাছে ফেরার প্রতিজ্ঞা। চতুর্থ স্তবকে — মায়ের হাসি ও খাবারের আয়োজন। পঞ্চম ও ষষ্ঠ স্তবকে — কুমড়ো ফুল শুকানো, পুঁই লতা নেতানো ও শকুনীর ব্যবচ্ছেদ। সপ্তম ও অষ্টম স্তবকে — চৈত্রের রোদে শকুনীদের পুড়িয়ে দেওয়া ও আবার ধান ভাঙা। নবম ও শেষ স্তবকে — শিশির-ভোরের স্নেহের রোদে ভিটে ভরা।
এই কবিতা আমাদের শেখায় — যুদ্ধে সন্তান হারানো মায়ের অপেক্ষার অন্ত নেই; ‘ওরা বলে’ হুমকি দিয়ে গেলেও মায়ের কোলে গল্প শোনা কেউ বন্ধ করতে পারে না; খোকার রক্তভেজা চিঠি মুক্তিযুদ্ধের সব বেদনার প্রতীক; শকুনীর ব্যবচ্ছেদ যুদ্ধের নির্মমতার প্রতীক; কিন্তু মা চৈত্রের রোদে শকুনীদের পুড়িয়ে দিয়ে আবার ধান ভানে, খই ভাজে — কারণ খোকা আসবে; শেষ পর্যন্ত মায়ের চোখে শিশির-ভোরের স্নেহের রোদে ভিটে ভরে যায় — হয়তো বিভ্রম, কিন্তু সেই বিভ্রমই তাকে বাঁচিয়ে রাখে।
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর মুক্তিযুদ্ধের কবিতায় মাতৃবেদনা ও অপেক্ষা
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর মুক্তিযুদ্ধের কবিতায় মাতৃবেদনা ও অপেক্ষা একটি পুনরাবৃত্ত বিষয়। তিনি ‘মাগো ওরা বলে’ কবিতায় এক মায়ের অপেক্ষার অসাধারণ কাব্যিক চিত্র এঁকেছেন। তিনি দেখিয়েছেন — কীভাবে মা ডালের বড়ি শুকিয়ে রাখে, খোকা কবে আসবে বলে অপেক্ষা করে; কীভাবে খোকার রক্তভেজা চিঠি পাওয়া যায়; কীভাবে খোকা বলে ‘ওরা বলে সবার কথা কেড়ে নেবে, তোমার কোলে শুয়ে গল্প শুনতে দেবে না’; কীভাবে মা হেসে খাবার তৈরি করে; কীভাবে শকুনীরা খোকার শব ব্যবচ্ছেদ করে; কীভাবে মা চৈত্রের রোদে শকুনীদের পুড়িয়ে দিয়ে আবার ধান ভানে; আর শেষ পর্যন্ত কীভাবে মায়ের চোখে শিশির-ভোরের স্নেহের রোদে ভিটে ভরে যায়।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলা সাহিত্যের মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক পাঠ্যক্রমে আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর ‘মাগো ওরা বলে’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত থাকার যোগ্য। এই কবিতাটি শিক্ষার্থীদের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি, যুদ্ধে সন্তান হারানো মায়ের বেদনা, ‘ওরা বলে’ হুমকির প্রতীক, শকুনীর ব্যবচ্ছেদের নির্মম বাস্তবতা, এবং আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর বাস্তববাদী কাব্যভাষা সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করে। বিশেষ করে ‘কুমড়ো ফুলে-ফুলে’ দিয়ে শুরু হওয়া অপেক্ষার চিত্র, ‘ছেঁড়া আর রক্তে ভেজা চিঠি’, ‘ওরা বলে’ হুমকি, ‘কথার ঝুরি নিয়ে ফেরার প্রতিজ্ঞা’, ‘নারকেলের চিড়ে কোটানো ও মুড়কি ভাজা’, ‘শকুনীর ব্যবচ্ছেদ’, ‘চৈত্রের রোদে শকুনীদের পুড়িয়ে দেওয়া’, ‘দাওয়ায় বসে আবার ধান ভাঙা’, এবং শেষের ‘শিশির-ভোরের স্নেহের রোদে ভিটে ভরা’ — এসব বিষয় শিক্ষার্থীদের কাব্যবোধ, ইতিহাসচেতনা, মানবিক মূল্যবোধ ও যুদ্ধের বাস্তবতাবোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মাগো ওরা বলে সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: মাগো ওরা বলে কবিতাটির রচয়িতা কে এবং এটি কোন প্রেক্ষাপটে রচিত?
এই কবিতাটির রচয়িতা আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ (১৯৩৪-২০০১)। এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের (১৯৭১) প্রেক্ষাপটে রচিত। কবিতাটি এক মায়ের অপেক্ষার কাহিনি — যে তার সন্তানকে যুদ্ধে পাঠিয়েছে, খোকার ফিরে আসার জন্য ডালের বড়ি শুকিয়ে রেখেছে, নারকেলের চিড়ে কোটে, মুড়কি ভাজে, কিন্তু খোকা ফিরে আসেনি — শকুনীরা তার শব ব্যবচ্ছেদ করছে।
প্রশ্ন ২: ‘খোকা তুই কবে আসবি? কবে ছুটি?’ — এই প্রশ্নটির তাৎপর্য কী?
মা সরল ভাষায় প্রশ্ন করছেন — ‘কবে আসবি, কবে ছুটি?’ এটি যুদ্ধে যাওয়া সন্তানের জন্য মায়ের অপেক্ষার চরম প্রকাশ। ‘ছুটি’ শব্দটি যুদ্ধকে স্কুলের মতো কল্পনা করা — শিশুসুলভ সরলতা, কিন্তু ভেতরে লুকিয়ে আছে অপরিসীম বেদনা।
প্রশ্ন ৩: ‘চিঠিটা তার পকেটে ছিল ছেঁড়া আর রক্তে ভেজা’ — এই চিঠি কার এবং কেন ছেঁড়া ও রক্তে ভেজা?
চিঠিটি সম্ভবত খোকার লেখা — যা তিনি মাকে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু চিঠিটি খোকার পকেটে পাওয়া গেছে — অর্থাৎ খোকার মৃতদেহ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। ‘ছেঁড়া আর রক্তে ভেজা’ — যুদ্ধের সময় চিঠিটি ছিড়ে গেছে এবং খোকার রক্তে ভিজে গেছে। এটি যুদ্ধের নির্মমতার প্রতীক।
প্রশ্ন ৪: ‘ওরা বলে সবার কথা কেড়ে নেবে, তোমার কোলে শুয়ে গল্প শুনতে দেবে না’ — ‘ওরা’ কারা এবং তাদের হুমকির তাৎপর্য কী?
‘ওরা’ হলো পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা। তারা হুমকি দিচ্ছে — সবার কথা কেড়ে নেবে, মায়ের কোলে গল্প শোনা বন্ধ করে দেবে। অর্থাৎ বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি ধ্বংস করে দেবে, মাতৃভাষায় কথা বলা বন্ধ করে দেবে। এই হুমকির বিরুদ্ধেই খোকা লড়াই করতে গিয়েছিল।
প্রশ্ন ৫: ‘কথার ঝুরি নিয়ে তবেই না বাড়ি ফিরবো’ — ‘কথার ঝুরি’ কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
‘কথার ঝুরি’ মানে গল্পের ঝুলি। খোকা বলছে — সে মায়ের জন্য গল্পের ঝুলি নিয়ে বাড়ি ফিরবে। অর্থাৎ সে শুধু নিজে ফিরবে না, ফিরিয়ে আনবে গল্প, সংস্কৃতি, স্বাধীনতার কথা। ‘তবেই না বাড়ি ফিরবো’ — এই ‘তবেই না’ গুরুত্বপূর্ণ — ফিরতে হলে গল্প নিয়ে ফিরতে হবে।
প্রশ্ন ৬: ‘পাগল ছেলে, মা পরে আর হাসে, তোর ওপরে রাগ করতে পারি!’ — মায়ের এই হাসির তাৎপর্য কী?
খোকা মাকে বলে — ‘রাগ করো না, মাত্র আর ক’টা দিন।’ মা হেসে বলে — ‘পাগল ছেলে, তোর ওপরে রাগ করতে পারি!’ এই হাসির ভেতর লুকিয়ে আছে অপরিসীম স্নেহ ও গর্ব। মা সন্তানের ওপর রাগ করতে পারেন না, কারণ তিনি তাকে ভালোবাসেন। কিন্তু এই হাসি পরে বেদনায় পরিণত হবে — কারণ খোকা আর ফিরবে না।
প্রশ্ন ৭: ‘যেখানে খোকার শব শকুনীরা ব্যবচ্ছেদ করে’ — লাইনটির ভয়াবহতা ও তাৎপর্য কী?
এটি কবিতার সবচেয়ে নির্মম ও ভয়ঙ্কর লাইন। খোকার মৃতদেহ শকুনীরা খাচ্ছে — ব্যবচ্ছেদ করছে। মা উঠানে-উঠানে তাকিয়ে দেখছেন এই দৃশ্য, আর ডাকছেন — ‘খোকা এলি?’ এটি যুদ্ধের নৃশংসতার চরম চিত্র। এত বড় ত্যাগের পরও খোকার দেহের এত অবমাননা — এই বাস্তবতা কবিতাটিকে হৃদয়বিদারক করে তুলেছে।
প্রশ্ন ৮: ‘মা’র চোখে চৈত্রের রোদ পুরিয়ে দেয় শকুনীদের’ — লাইনটির তাৎপর্য কী?
চৈত্রের রোদ অত্যন্ত তীব্র ও প্রখর। মায়ের চোখের একদৃষ্টি এত তীব্র যে তা যেন চৈত্রের রোদের মতো শকুনীদের পুড়িয়ে দেয়। এটি মাতৃক্রোধের প্রতীক। যে শকুনীরা তার সন্তানের দেহ খাচ্ছে, মা তাদের চোখের আগুনে পুড়িয়ে দিচ্ছেন।
প্রশ্ন ৯: ‘দাওয়ায় ব’সে মা আবার ধান ভানে, বিন্নি ধানের খই ভাজে, খোকা তার কখন আসে কখন আসে’ — মা কেন আবার ধান ভানছেন?
মা শকুনীদের পুড়িয়ে দেওয়ার পর আবার দাওয়ায় বসে ধান ভানছেন, খই ভাজছেন। কারণ তিনি এখনো বিশ্বাস করেন — খোকা আসবে। তিনি সত্য স্বীকার করতে পারেন না বা করতে চান না। এই অপেক্ষা তাকে বাঁচিয়ে রাখে। এটি যুদ্ধে সন্তান হারানো মায়ের অস্বীকার ও আশার চিরন্তন প্রতীক।
প্রশ্ন ১০: ‘মার চোখে শিশির-ভোর স্নেহের রোদে ভিটে ভরেছে’ — শেষ লাইনটির তাৎপর্য কী?
শেষ লাইনটি অত্যন্ত সুন্দর ও স্নিগ্ধ। ‘শিশির-ভোর’ — সকালের শিশিরের মতো স্নিগ্ধতা। ‘স্নেহের রোদে ভিটে ভরেছে’ — মায়ের স্নেহের আলোয় পুরো ঘরের আঙ্গিনা ভরে গেছে। অর্থাৎ মা এখন শান্ত, তিনি কেবল স্নেহেই আছেন। যন্ত্রণা ও শকুনীর দৃশ্য পেরিয়ে তিনি পৌঁছেছেন এক স্নেহময় জগতে। কিন্তু এই স্নেহ কি বাস্তব, নাকি বিভ্রম? খোকা নেই, কিন্তু মা তাকে যেন পেয়ে গেছেন স্নেহের রোদে। এটি মাতৃস্নেহের চিরন্তনতার অসাধারণ প্রকাশ।
প্রশ্ন ১১: কবিতার মূল শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা কী?
কবিতাটি আমাদের শেখায় — যুদ্ধে সন্তান হারানো মায়ের অপেক্ষার অন্ত নেই; ‘ওরা বলে’ হুমকি দিয়ে গেলেও মায়ের কোলে গল্প শোনা কেউ বন্ধ করতে পারে না; খোকার রক্তভেজা চিঠি মুক্তিযুদ্ধের সব বেদনার প্রতীক; শকুনীর ব্যবচ্ছেদ যুদ্ধের নির্মমতার প্রতীক; কিন্তু মা চৈত্রের রোদে শকুনীদের পুড়িয়ে দিয়ে আবার ধান ভানে, খই ভাজে — কারণ খোকা আসবে; শেষ পর্যন্ত মায়ের চোখে শিশির-ভোরের স্নেহের রোদে ভিটে ভরে যায়। এই কবিতাটি আজকের দিনে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক — যুদ্ধের বেদনা, সন্তানহারা মায়ের করুণ অবস্থা, স্বাধীনতার মূল্য, এবং মাতৃস্নেহের চিরন্তনতা — সবকিছুই চিরন্তন ও সময়োপযোগী বিষয়।
ট্যাগস: মাগো ওরা বলে, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর মুক্তিযুদ্ধের কবিতা, মায়ের অপেক্ষা, খোকার রক্তভেজা চিঠি, শকুনীর ব্যবচ্ছেদ, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতা
© Kobitarkhata.com – কবি: আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ | কবিতার প্রথম লাইন: “কুমড়ো ফুলে-ফুলে, নুয়ে প’ড়েছে লতাটা” | মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে মায়ের অপেক্ষার অমর কবিতা বিশ্লেষণ | আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কাব্যধারার অসাধারণ নিদর্শন