কবিতার খাতা
ভালোবাসা – আর্যতীর্থ।
সে যখন চায় না আমায়, আমি কেন এত চাই তাকে?
কেন ওর ভাবনাতে দিনের রুটিন ভরে থাকে,
কেন রাতে স্বপ্নরা ওর দিকে টানে আমাকে?
একটানা এই অবধি বলে মানুষটা হঠাৎ একটু চুপ করে যায়,
তারপর খুব আস্তে আস্তে বলে,
ফিসফিসে,
তবু জোর প্রতিটা কথায়..
‘ভালোবাসা না পেয়ে তবু ভালোবেসে যাওয়া
হয়তো ভীষণ অন্যায়।’
আমি তার বিপরীতে বসে, বোঝার চেষ্টা করে যাই,
অলীক নক্ষত্র্র-লক্ষ্যে নিজেকে পুড়িয়ে পাওয়া বৃথা রোশনাই,
হাউই-উড়ান শেষে যেরকম শেষে শুধু ছাই,
এ কি সেরকমই,
তিল তিল করে শেষ করে ফেলা আয়ুকাল,
যেন হ্যামলিন বাঁশি হাতে খাদের কিনারে নেয় কালের রাখাল,
যেন নিশ্চিত ডুবে যাবে জেনে নাবিকের তবু তুলে দেওয়া পাল,
মানুষের লাভ যে কী হয় এরকম বেঁচে থেকে মরে!
কী আশ্চর্য,
মানুষটা মনের কথা কীভাবে ফেললো যেন পড়ে,
বিপরীত থেকে উঠে আমার দিকে এসে সরে,
বললো সে ফিসফিস করে,
সে-ও তার খবর জানে না ,
অন্তরে যে ভাবে সে আছে অন্দরে,
ভালো বাসা বানিয়েছি দুজনে ভেতরে।
জানবেন, একলা হাঁটি না আমি জীবন-সফরে।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। আর্যতীর্থের কবিতা।
কবিতার কথা –
আর্যতীর্থের ‘ভালোবাসা’ কবিতাটি আধুনিক প্রেমের এক বিমূর্ত অথচ অত্যন্ত বাস্তব মনস্তাত্ত্বিক আখ্যান। কবি এখানে ভালোবাসার সেই চিরন্তন দ্বন্দ্বকে তুলে ধরেছেন, যেখানে দাতা এবং গ্রহীতার মধ্যে কোনো সমীকরণ মেলে না। কবিতার শুরুতেই এক গভীর হাহাকার আমাদের স্পর্শ করে—যাকে পাওয়া সম্ভব নয়, তাকেই কেন মন বারবার ফিরে পেতে চায়? এই যে দিনের রুটিন থেকে শুরু করে রাতের স্বপ্ন পর্যন্ত একজনের অনুপস্থিত উপস্থিতিতে ভরে থাকা, এটি আসলে মানব মনের এক রহস্যময় দাসত্ব। কবি এখানে প্রেমকে কেবল আবেগ হিসেবে দেখেননি, বরং একে একটি অবাধ্য অভ্যাসের মতো চিত্রিত করেছেন যা যুক্তির তোয়াক্কা করে না।
কবিতাটির মধ্যভাগে এক তীব্র আত্মোপলব্ধি ফুটে ওঠে যখন বক্তা নিজেই স্বীকার করেন যে, প্রতিদানহীন ভালোবাসা হয়তো এক ধরনের অন্যায়। এই ‘অন্যায়’ শব্দটি এখানে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি নিজের প্রতি নিজের অবিচার। যখন কেউ জানে যে তার ভালোবাসার কোনো গন্তব্য নেই, তবুও সে নিজেকে বিলিয়ে দেয়, তখন সেটি এক আত্মঘাতী দহনে পরিণত হয়। কবি এখানে অলীক নক্ষত্রের লক্ষ্য এবং হাউই-উড়ানের রূপক ব্যবহার করে দেখিয়েছেন যে, আগুনের শিখা যেমন শেষে কেবল ছাই হয়ে পড়ে থাকে, প্রতিদানহীন প্রেমের পরিণতিও ঠিক তেমনই শূন্যতা। হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালার মতো এই প্রেম মানুষকে এক সম্মোহনী ঘোরে খাদের কিনারে নিয়ে যায়, যেখানে ধ্বংস অনিবার্য জেনেও নাবিক পাল তুলে দেয়। এই অংশটি জীবনের এক চরম বৈপরীত্যকে তুলে ধরে—মানুষ কেন জেনেবুঝে নিজেকে শেষ করে ফেলে?
কবিতার পরের অংশে আমরা দেখতে পাই এক অদ্ভুত মানসিক সংযোগ। বক্তার বিপরীতে বসে থাকা চরিত্রটি যখন এই ধ্বংসাত্মক প্রেমের নিরর্থকতা বোঝার চেষ্টা করছেন, ঠিক তখনই এক নাটকীয় মোড় আসে। বক্তা যেন মনের কথা পড়ে ফেলতে পারেন। তিনি যখন ফিসফিস করে বলেন যে, যাকে তিনি ভালোবাসেন সে হয়তো তার এই খবর জানেই না, তখন প্রেমের এক নতুন সংজ্ঞা উন্মোচিত হয়। এখানে ভালোবাসা আর কেবল পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে এক নিভৃত নির্মাণ। ‘ভালো বাসা’ শব্দবন্ধটি এখানে দ্ব্যর্থবোধক—এটি যেমন একটি উত্তম গৃহের ইঙ্গিত দেয়, তেমনি মনের গহীনে গড়ে তোলা এক গোপন জগতের কথা বলে।
কবিতার শেষ দিকে এসে প্রেমের এক পরম সান্ত্বনার চিত্র ফুটে ওঠে। বাইরে থেকে যাকে একলা মনে হয়, তার অন্দরে হয়তো অন্য কারোর নিবিড় বসবাস। কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, প্রকৃত ভালোবাসা সবসময় প্রতিদান বা স্বীকৃতির ওপর নির্ভর করে না। অন্তরের অন্তস্তলে যাকে লালন করা হয়, সেই ছায়া-সঙ্গীই জীবনের দীর্ঘ সফরে একাকীত্ব দূর করার জন্য যথেষ্ট। কবিতার এই পরিনতি বিষাদকে ছাপিয়ে এক ধরনের আধ্যাত্মিক শান্তিতে রূপ নেয়। জীবন-সফরে মানুষ যখন একা হাঁটে বলে মনে হয়, আসলে সে তার হৃদয়ে লালন করা সেই প্রিয় মানসপ্রতিমার হাত ধরেই পথ চলে।
আর্যতীর্থের এই সৃষ্টিটি মূলত প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির মাঝখানের এক ধূসর এলাকাকে স্পর্শ করেছে। এটি আমাদের শেখায় যে ভালোবাসা মানে কেবল মিলন নয়, বরং কাউকে নিজের ভেতরে সযত্নে বাঁচিয়ে রাখাও এক ধরনের সার্থকতা। বাহ্যিক বিচারে যা ‘বৃথা রোশনাই’ বা ‘ছাই’, আত্মিক বিচারে তাই হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার একমাত্র রসদ। কবির ভাষায়, এই অন্দরের ‘ভালো বাসা’ নির্মাণের মাধ্যমেই মানুষ তার নিঃসঙ্গতাকে জয় করে এবং নিশ্চিত ধ্বংসের কিনারে দাঁড়িয়েও এক অদ্ভুত সার্থকতা খুঁজে পায়। কবিতার প্রতিটি পংক্তি তাই কেবল বিরহের কথা বলে না, বরং প্রেমের সেই শক্তির কথা বলে যা মানুষকে একলা পথেও পূর্ণতা দান করে।






