রাজা কোনো সাহায্য দেওয়ার পরিবর্তে উল্টো ভিখারীর কাছে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “আমায় কিছু দাও গো”। এই এক বাক্যেই ভিখারীর সমস্ত ভাবনা ওলোটপালোট হয়ে গেল। যার ভাণ্ডার অসীম, যিনি জগতের ঈশ্বর, তিনি কেন এক নগণ্য ভিখারীর কাছে ভিক্ষা চাইবেন? ভিখারী ক্ষণকালের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তিনি ভাবলেন, এটি হয়তো রাজার কোনো কৌতুক বা প্রবঞ্চনা। সংশয় আর কৃপণতার বশবর্তী হয়ে তিনি তাঁর ভিক্ষার ঝুলি থেকে অতি ক্ষুদ্র একটি শস্যের কণা রাজার হাতে তুলে দিলেন। এই ছোট কণাটি আসলে মানুষের সেই সংকীর্ণ মনের প্রতীক, যা ত্যাগের মহিমা বোঝে না এবং পরমেশ্বরের ডাক সত্ত্বেও নিজের জাগতিক সম্পদকে আঁকড়ে ধরতে চায়। রাজা সেই সামান্য দানটুকু নিয়ে চলে গেলেন এবং ভিখারীও সেদিনকার মতো তাঁর ভিক্ষার পাত্র নিয়ে ঘরে ফিরলেন।
কবিতার সবচেয়ে বিষ্ময়কর ও মর্মস্পর্শী অংশটি উন্মোচিত হয় তখন, যখন ভিখারী ঘরে ফিরে তাঁর ভিক্ষার পাত্রটি উপুড় করলেন। তিনি স্তম্ভিত হয়ে দেখলেন, সাধারণ চাল বা শস্যের মাঝখানে একটি ছোট সোনার কণা জ্বলজ্বল করছে। তখনই তিনি বুঝতে পারলেন, রাজার হাতে তিনি যে একটি কণা তুলে দিয়েছিলেন, সেটিই আসলে সোনা হয়ে ফিরে এসেছে। জীবনের এই এক গূঢ় রহস্য—পরমেশ্বর আমাদের কাছ থেকে যা নেন, তা আসলে আমাদের সম্পদ কমানোর জন্য নয়, বরং তা সহস্রগুণ বাড়িয়ে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য। ভিখারী তখন চোখের জলে ভেসে আকুল হয়ে কাঁদতে লাগলেন। তাঁর আক্ষেপের সীমা রইল না যখন তিনি ভাবলেন, “তোমায় কেন দিই নি আমার সকল শূন্য করে”। যদি তিনি সেদিন কৃপণতা না করে তাঁর সবটুকু রাজাকে দিয়ে দিতেন, তবে তাঁর সারা জীবনের শূন্যতা আজ ঐশ্বর্যে ভরে যেত।
পরিশেষে বলা যায়, ‘কৃপণ’ কবিতাটি আমাদের শেখায় যে ত্যাগই আসলে প্রকৃত ভোগের পথ। আমরা যখন ঈশ্বরকে বা মানবতাকে কিছু দিই, তখন আমরা আসলে রিক্ত হই না, বরং সমৃদ্ধ হই। আমাদের সংকীর্ণ মন সবসময় হারানোর ভয়ে থাকে, কিন্তু সত্য এই যে, ত্যাগের মাধ্যমেই পরম প্রাপ্তি ঘটে। রবীন্দ্রনাথ এখানে আধ্যাত্মিক সমর্পণের কথা বলেছেন—যেখানে নিজেকে সম্পূর্ণ শূন্য করে দিতে পারলেই অসীমের আশীর্বাদ লাভ করা সম্ভব। ভিখারীর কান্না আসলে আমাদের সবারই অনুশোচনা, যারা জীবনের পথে ক্ষুদ্র স্বার্থকে আঁকড়ে ধরে পরম প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হই। এই কবিতাটি কেবল একটি কাহিনী নয়, এটি মানুষের মনের কৃপণতা আর মহাজীবনের উদারতার মধ্যকার সংঘাতের এক অনন্য দলিল। প্রতিটি পঙক্তি এখানে আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ত্যাগের হাত ধরেই সোনার দিন ফিরে আসে। এই বিশ্লেষণটি একটি নিরবচ্ছিন্ন চিন্তার প্রবাহ হিসেবে সাজানো হয়েছে যেখানে কোনো যান্ত্রিক সংকেত নেই এবং প্রতিটি শব্দ আপনার দেওয়া গাম্ভীর্য ও গভীরতা বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নির্বাচন করা হয়েছে। এটি জীবনের এক চরম সত্যের কাব্যিক রূপান্তর।
কৃপণ – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেরা কবিতা | আধুনিক বাংলা কবিতা | ভিক্ষুক ও রাজার কাব্য | স্বর্ণরথ ও স্বর্ণকণার উপমা | ভিক্ষা দেওয়া ও ফিরে পাওয়ার অসাধারণ কাব্য | আত্মস্বীকারোক্তি ও অনুতাপের কবিতা
কৃপণ: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভিক্ষুক, রাজা ও স্বর্ণকণার অসাধারণ কাব্যদর্শন — “তোমায় কেন দিই নি আমার সকল শূন্য করে”
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “কৃপণ” আধুনিক বাংলা কবিতার এক অনন্য, গভীর ও আত্মবিশ্লেষণী সৃষ্টি। এই কবিতাটি এক ভিক্ষুক ও এক রাজার মায়াবী সাক্ষাতের কাহিনি। “আমি ভিক্ষা করে ফিরতেছিলেম গ্রামের পথে পথে” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে এক চমকপ্রদ ঘটনা — স্বর্ণরথে চলা এক রাজা ভিক্ষুকের কাছে এসে হাত পাতেন। ভিক্ষুক তাঁর ঝুলি থেকে একটি ছোটো কণা দেন। পরে ঘরে ফিরে দেখেন — সেই কণাটি সোনার কণা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) বিশ্বকবি। তিনি শুধু প্রেম ও প্রকৃতির কবি নন, তিনি আত্মস্বীকারোক্তি ও আধ্যাত্মিক উপলব্ধির কবিও। “কৃপণ” সেই ধারার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যেখানে তিনি ভিক্ষার ঝুলিতে থাকা সামান্য কণাটি সোনায় রূপান্তরিত হওয়ার চিত্রে আত্মার অমূল্য সম্পদের কথা বলেছেন। শেষে তিনি অনুতপ্ত হয়ে বলেন — “তোমায় কেন দিই নি আমার সকল শূন্য করে” — অর্থাৎ তিনি সবটুকু দিয়ে দিলে সোনায় রূপান্তরিত হতো, তিনি কৃপণতার পরিচয় দিয়েছেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: বিশ্বকবি ও আত্মস্বীকারোক্তির অমর কণ্ঠস্বর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৬১ সালের ৭ মে কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, সুরকার ও চিত্রশিল্পী। ১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে — ‘মানসী’, ‘সোনার তরী’, ‘চিত্রা’, ‘ক্ষণিকা’, ‘গীতাঞ্জলি’, ‘বলাকা’, ‘পুনশ্চ’, ‘শেষ সপ্তক’ প্রভৃতি।
রবীন্দ্রনাথের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো — প্রেম ও প্রকৃতির গভীর অনুভব, আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক উপলব্ধি, আত্মস্বীকারোক্তি ও অনুতাপের সরল প্রকাশ, ভিক্ষুক ও রাজার প্রতীকী সাক্ষাৎ, ছোটো কণা ও সোনায় রূপান্তরের চমৎকার ব্যঞ্জনা। ‘কৃপণ’ সেই ধারার এক অসাধারণ উদাহরণ — যেখানে তিনি নিজেকে কৃপণ বলে আখ্যা দিয়ে আত্মস্বীকার করেছেন।
কৃপণ: শিরোনামের তাৎপর্য ও কবিতার পটভূমি
শিরোনাম ‘কৃপণ’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও আত্মবিশ্লেষণী। ‘কৃপণ’ মানে যিনি দিতে পারেন না, যিনি সামান্য দিয়েও নিজেকে ধন্য মনে করেন না। কবি এখানে নিজেকেই কৃপণ বলেছেন। তিনি রাজাকে সামান্য একটি কণা দিয়েছিলেন, যা পরে সোনায় পরিণত হয়। তিনি ভেবেছিলেন রাজার কাছে তাঁর কী অভাব, যা তিনি ভিক্ষা চাইলেন; সেটা নিছক কৌতুক। কিন্তু সেই ছোটো কণাটি ছিল সোনা। তিনি অনুতপ্ত — কেন তিনি তাঁর সবটুকু দিলেন না? কেন শূন্য করে দিলেন না? এই অনুতাপ থেকেই ‘কৃপণ’ শিরোনামের সার্থকতা।
কবিতার শুরুতে কবি বলছেন — তিনি গ্রামের পথে পথে ভিক্ষা করে ফিরতেছিলেন। তখন রাজা স্বর্ণরথে চলেছিলেন। তাঁর শোভা ও সাজ অপূর্ব স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছিল। কবি ভাবছিলেন — আজ রাত পোহালে ভিক্ষা করতে হবে না, রাজা। তবে ধনধান্য ছড়াবে দুই ধারে, তিনি মুঠা মুঠা কুড়িয়ে নেবেন। কিন্তু রথ এসে তাঁর কাছে থামল। রাজা হেসে নামলেন, তাঁর মুখের প্রসন্নতায় সব ব্যথা জুড়োল। তারপর রাজা বলেন — “আমায় কিছু দাও গো’।” ভিক্ষুক স্তম্ভিত। তিনি ভাবেন রাজার কী অভাব? এ নিছক কৌতুক। তিনি ঝুলি থেকে একটি ছোটো কণা দিলেন। পরে ঘরে ফিরে উজাড় করে দেখেন — সেই কণাটি সোনার কণা। তখন তিনি কাঁদেন — কেন তিনি তাঁর সব শূন্য করে দিলেন না?
কৃপণ: স্তবকভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ
প্রথম স্তবক: ভিক্ষা করে ফেরা, রাজার স্বর্ণরথ, অপূর্ব স্বপ্নের মতো শোভা, মনে ভাবা এ কোনো মহারাজ
“আমি ভিক্ষা করে ফিরতেছিলেম গ্রামের পথে পথে, / তুমি তখন চলেছিলে তোমার স্বর্ণরথে। / অপূর্ব এক স্বপ্ন-সম লাগতেছিল চক্ষে মম– / কী বিচিত্র শোভা তোমার, কী বিচিত্র সাজ। / আমি মনে ভাবতে ছিলেম, এ কোন্ মহারাজ।”
প্রথম স্তবকের গভীর বিশ্লেষণ: ‘ভিক্ষা করে ফেরা’ — কবি নিজেকে ভিক্ষুক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। ‘স্বর্ণরথে চলা’ — রাজার প্রতীক। ‘অপূর্ব স্বপ্নের মতো শোভা, বিচিত্র সাজ’ — রাজসিক জাঁকজমক। ‘এ কোন মহারাজ’ — বিস্ময় ও কৌতুহল।
দ্বিতীয় স্তবক: আজ রাত পোহালো, দ্বারে দ্বারে ফিরতে হবে না, রথ ধনধান্য ছড়াবে, মুঠা মুঠা কুড়িয়ে নেব
“আজি শুভক্ষণে রাত পোহালো ভেবেছিলেম তবে, / আজ আমারে দ্বারে দ্বারে ফিরতে নাহি হবে। / বাহির হতে নহিতে কাহার দেখা পেলেম পথে, / চলিতে রথ ধনধান্য ছড়াবে দুই ধারে– / মুঠা মুঠা কুড়িয়ে নেব, নেব ভারে ভারে।”
দ্বিতীয় স্তবকের গভীর বিশ্লেষণ: ‘শুভক্ষণে রাত পোহালো’ — ভোরের আলো, নতুন দিনের সম্ভাবনা। ‘দ্বারে দ্বারে ফিরতে নাহি হবে’ — ভিক্ষা শেষ হবে বলে আশা। ‘ধনধান্য ছড়াবে দুই ধারে’ — রাজার দান। ‘মুঠা মুঠা কুড়িয়ে নেব’ — স্বপ্ন ও লোভ।
তৃতীয় স্তবক: রথ থেমে গেল কাছে, রাজা নামলেন হেসে, মুখের প্রসন্নতায় জুড়োল ব্যথা, কিসের লাগি অকস্মাৎ ‘আমায় কিছু দাও গো’
“দেখি সহসা রথ থেমে গেল আমার কাছে এসে, / আমার মুখপানে চেয়ে নামলে তুমি হেসে। / দেখে মুখের প্রসন্নতা জুড়িয়ে গেল সকল ব্যথা, / হেনকালে কিসের লাগি তুমি অকস্মাৎ / “আমায় কিছু দাও গো’ বলে বাড়িয়ে দিলে হাত।”
তৃতীয় স্তবকের গভীর বিশ্লেষণ: ‘সহসা রথ থেমে গেল’ — আকস্মিক ঘটনা। ‘হেসে নামলে’ — রাজার সৌজন্যপূর্ণ আচরণ। ‘মুখের প্রসন্নতায় জুড়িয়ে গেল ব্যথা’ — স্নিগ্ধ আচরণে স্বস্তি। ‘কিসের লাগি অকস্মাৎ আমায় কিছু দাও গো’ — বিস্ময় ও দ্বিধা। রাজা ভিক্ষা চাইছেন।
চতুর্থ স্তবক: মরি এ কী কথা রাজাধিরাজ, ‘আমায় দাও গো কিছু’! শুনে ক্ষণকাল মাথানিচু হওয়া, কৌতুকের বশে প্রবঞ্চনা মনে করে ঝুলি থেকে একটি ছোটো কণা দেওয়া
“মরি, এ কী কথা রাজাধিরাজ, / “আমায় দাও গো কিছু’! / শুনে ক্ষণকালের তরে রইনু মাথা-নিচু। / তোমার কী-বা অভাব আছে ভিখারী ভিক্ষুকের কাছে। / এ কেবল কৌতুকের বশে আমায় প্রবঞ্চনা। / ঝুলি হতে দিলেম তুলে একটি ছোটো কণা”
চতুর্থ স্তবকের গভীর বিশ্লেষণ: ‘মরি এ কী কথা রাজাধিরাজ’ — শক ও অবিশ্বাস। ‘মাথানিচু হওয়া’ — লজ্জা ও বিব্রত। ‘তোমার কী বা অভাব আছে ভিখারি ভিক্ষুকের কাছে’ — যুক্তির প্রশ্ন। ‘কেবল কৌতুকের বশে প্রবঞ্চনা’ — ভাবেন রাজা ঠাট্টা করছেন। ‘ঝুলি হতে একটি ছোটো কণা দেওয়া’ — সামান্য দান।
পঞ্চম স্তবক: ঘরে ফিরে উজাড় করে দেখা — একটি ছোটো সোনার কণা, কাঁদা, দিতে পারিনি সবশূন্য করে
“যবে পাত্রখানি ঘরে এনে উজাড় করি– এ কী! / ভিক্ষামাঝে একটি ছোটো সোনার কণা দেখি। / দিলেম যা রাজ-ভিখারীরে স্বর্ণ হয়ে এল ফিরে, / তখন কাঁদি চোখের জলে দুটি নয়ন ভরে– / তোমায় কেন দিই নি আমার সকল শূন্য করে।”
পঞ্চম স্তবকের গভীর বিশ্লেষণ: ‘ঘরে এনে উজাড় করি, এ কী!’ — চমক ও বিস্ময়। ‘ভিক্ষামাঝে একটি ছোটো সোনার কণা’ — যে কণাটি দিয়েছিলেন, তা সোনার কণা। ‘রাজ-ভিখারীরে স্বর্ণ হয়ে এল ফিরে’ — দানই সোনায় রূপ নেয়। ‘কাঁদি চোখের জলে’ — অনুতাপ ও আক্ষেপের অশ্রু। ‘তোমায় কেন দিই নি আমার সকল শূন্য করে’ — চূড়ান্ত অনুতাপ। কেন সবটুকু দিলেন না? কেন নিজেকে শূন্য করলেন না? তাহলে সবটাই সোনা হয়ে ফিরত।
কবিতার গঠনশৈলী, ছন্দ ও শিল্পরূপ
কবিতাটি পাঁচটি স্তবকে বিভক্ত, ছোট ছোট লাইন, রবীন্দ্রনাথের অনন্য গদ্যছন্দে রচিত। ভাষা অত্যন্ত সরল, কাহিনীর ধারায় বলা। প্রতীক ও চিহ্নের ব্যবহার অসাধারণ — ‘ভিক্ষা করে ফেরা’ (আত্মার দীনতা), ‘স্বর্ণরথ’ (ঐশ্বর্য ও আধ্যাত্মিক সম্পদ), ‘অপূর্ব স্বপ্নের শোভা’ (আকর্ষণীয় সত্ত্বা), ‘রাত পোহানো’ (নতুন আশা), ‘ধনধান্য ছড়ানো’ (প্রাচুর্যের প্রতিশ্রুতি), ‘মুঠা মুঠা কুড়িয়ে নেওয়া’ (লোভ), ‘হেসে নামা’ (সৌজন্যপূর্ণ দেবতুল্য আচরণ), ‘মুখের প্রসন্নতায় ব্যথা জুড়ানো’ (সান্ত্বনা), ‘আমায় কিছু দাও গো’ (দানের অনুরোধ), ‘মাথানিচু হওয়া’ (লজ্জা), ‘কৌতুক ও প্রবঞ্চনা’ (সন্দেহ), ‘ছোটো কণা’ (সামান্য দান), ‘উজাড় করে দেখা’ (পর্যালোচনা), ‘সোনার কণা’ (আধ্যাত্মিক সম্পদের রূপ), ‘কাঁদা ও অনুতাপ’ (আত্মস্বীকারোক্তি), ‘সকল শূন্য করে দেওয়া’ (সম্পূর্ণ আত্মদান)। শেষের ‘কৃপণ’ শব্দটি এখান থেকেই আসে — আরও দিতে পারতাম, দেইনি — এই আক্ষেপের নামই কৃপণতা।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য ও দার্শনিক মাত্রা
“কৃপণ” রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এক অসাধারণ আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক কাব্য। তিনি এখানে ভিক্ষুক ও রাজার সাক্ষাতের ছলে আত্মার সম্পদ ও দানের মূল্যের কথা বলেছেন। সামান্য কণা দান করেও যদি তা সোনা হয়ে ফেরে, তাহলে সবটুকু দিলে কী হতো না? কবি নিজেকে কৃপণ বলেছেন — সকল শূন্য করে দিতে পারেননি। এটি জীবনের এক গভীর শিক্ষা — যা কিছু আপন, তা অনায়াসে দান করো, তাহলেই তা বহুগুণে বেড়ে ফিরে আসে।
রবীন্দ্রনাথের কবিতায় দান, অর্জন ও আত্মস্বীকারোক্তি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কৃপণ’ কবিতায় দান ও আত্মস্বীকারোক্তির অসাধারণ দর্শন ফুটে উঠেছে। ‘কৃপণ’ শুধু অর্থের নয়, আত্মার দানেও কৃপণতা। শেষ লাইন ‘তোমায় কেন দিই নি আমার সকল শূন্য করে’ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সেরা অনুতাপের পঙ্ক্তি।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলা সাহিত্যের পাঠ্যক্রমে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কৃপণ’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত থাকার যোগ্য। এই কবিতাটি শিক্ষার্থীদের দান ও অর্জনের দর্শন, আত্মস্বীকারোক্তি ও অনুতাপের কাব্যরূপ এবং প্রতীকী ভাষার ব্যবহার সম্পর্কে ধারণা দেয়।
কৃপণ সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: ‘কৃপণ’ কবিতাটির লেখক কে?
এই কবিতাটির লেখক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) — বিশ্বকবি।
প্রশ্ন ২: ‘আমি ভিক্ষা করে ফিরতেছিলেম গ্রামের পথে পথে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
কবি নিজেকে ভিক্ষুক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন — আত্মার দীনতা ও অভাব।
প্রশ্ন ৩: ‘তুমি তখন চলেছিলে তোমার স্বর্ণরথে’ — এখানে ‘তুমি’ কে?
‘তুমি’ হচ্ছেন রাজা — যার রথ স্বর্ণময়। প্রতীক অর্থে, তিনি ঈশ্বর বা আধ্যাত্মিক গুরুও হতে পারেন।
প্রশ্ন ৪: ‘আমি মনে ভাবতে ছিলেম, এ কোন্ মহারাজ’ — কী ভাবছিলেন?
রাজার জাঁকজমক দেখে বিস্মিত ও কৌতুহলী হয়ে ভাবছিলেন — এ কোন মহারাজ।
প্রশ্ন ৫: ‘আমায় কিছু দাও গো’ বলে বাড়িয়ে দিলে হাত’ — কেন তিনি হাত বাড়ালেন?
রাজা ভিক্ষার ছলে ভিক্ষুকের কাছ থেকে কিছু নিতে চাইলেন — প্রকৃত অর্থে দান চাইলেন।
প্রশ্ন ৬: ‘এ কেবল কৌতুকের বশে আমায় প্রবঞ্চনা’ — কেন মনে করলেন কৌতুক?
রাজার কোনো অভাব নেই, তাই ভিক্ষা চাওয়াকে কৌতুক ও প্রবঞ্চনা ভেবেছেন।
প্রশ্ন ৭: ‘ঝুলি হতে দিলেম তুলে একটি ছোটো কণা’ — কেন ছোটো কণা দিলেন?
সামান্য দান, বড় কিছু নয়। হয়তো রাজার কৌতুক মনে করে মন খুলে দিতে পারেননি।
প্রশ্ন ৮: ‘ভিক্ষামাঝে একটি ছোটো সোনার কণা দেখি’ — লাইনটির তাৎপর্য কী?
যা দিয়েছেন, তা ছিল সোনার কণা — অর্থাৎ সামান্য দানই অমূল্য সম্পদ হয়ে দেখা দিয়েছে।
প্রশ্ন ৯: ‘তোমায় কেন দিই নি আমার সকল শূন্য করে’ — শেষ লাইনের অনুতাপ ব্যাখ্যা করো।
কবি অনুতপ্ত — কেন তিনি সবটুকু দিয়ে নিজেকে শূন্য করে দিলেন না। তাহলে সবটাই সোনায় রূপান্তরিত হতো। এটি আত্মদানের শিক্ষা।
ট্যাগস: কৃপণ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথের সেরা কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, ভিক্ষুক ও রাজা, স্বর্ণরথ, স্বর্ণকণা, অনুতাপ, সকল শূন্য করে দেওয়া
© Kobitarkhata.com – কবি: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | কবিতার প্রথম লাইন: “আমি ভিক্ষা করে ফিরতেছিলেম গ্রামের পথে পথে” | দান, অর্জন ও আত্মস্বীকারোক্তির অসাধারণ কাব্যদর্শন | বিশ্বকবির শ্রেষ্ঠ কাব্যের অন্যতম