কবিতার খাতা
- 44 mins
ফুল ফুটুক না ফুটুক – সুভাষ মুখোপাধ্যায়।
ফুল ফুটুক না ফুটুক
আজ বসন্ত।
শান-বাঁধানো ফুটপাথে
পাথরে পা ডুবিয়ে এক কাঠখোট্টা গাছ
কচি কচি পাতায় পাঁজর ফাটিয়ে
হাসছে।
ফুল ফুটুক না ফুটুক
আজ বসন্ত।
আলোর চোখে কালো ঠুলি পরিয়ে
তারপর খুলে –
মৃত্যুর কোলে মানুষকে শুইয়ে দিয়ে
তারপর তুলে –
যে দিনগুলো রাস্তা দিয়ে চলে গেছে
যেন না ফেরে।
গায়ে হলুদ দেওয়া বিকেলে
একটা দুটো পয়সা পেলে
যে হরবোলা ছেলেটা
কোকিল ডাকতে ডাকতে যেত–তাকে ডেকে নিয়ে গেছে দিনগুলো।
লাল কালিতে ছাপা হলদে চিঠির মত আকাশটাকে মাথায় নিয়ে
এ-গলির এক কালোকুচ্ছিত আইবুড়ো মেয়ে
রেলিঙে বুক চেপে ধ’রে
এই সব সাত-পাঁচ ভাবছিল –
ঠিক সেই সময় চোখের
মাথা খেয়ে গায়ে উড়ে এসে বসল;
আ মরণ ! পোড়ারমুখ
লক্ষ্মীছাড়া প্রজাপতি !
তারপর দড়াম করে দরজা বন্ধ হবার শব্দ।
অন্ধকারে মুখ চাপা দিয়ে
দড়িপাকানো সেই গাছ
তখন ও হাসছে।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। সুভাষ মুখোপাধ্যায়।
ফুল ফুটুক না ফুটুক – সুভাষ মুখোপাধ্যায় | বাংলা কবিতা | বসন্তের কবিতা
ফুল ফুটুক না ফুটুক কবিতা: সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের বসন্তের অনন্য উচ্চারণ
সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের “ফুল ফুটুক না ফুটুক” কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের একটি অনন্য ও বিদ্রোহী উচ্চারণ, যা প্রচলিত বসন্তের ধারণাকে ভেঙে দিয়ে নতুন এক দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করে। “ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত” — এই অমোঘ ঘোষণার মধ্য দিয়ে কবি বলতে চেয়েছেন, বসন্ত শুধু ফুল ফোটার ঋতু নয়, এটি অনুভূতির, চেতনার এবং জীবন-মৃত্যুর দ্বন্দ্বের এক গভীর উপলব্ধির নাম। সুভাষ মুখোপাধ্যায় (১৯১৯-২০০৩) ছিলেন বাংলা সাহিত্যের একজন প্রভাবশালী কবি যিনি তার কবিতায় সমকালীন সমাজের কঠোর বাস্তবতা, নগরজীবনের সংকট এবং মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রামকে তুলে ধরেছেন। তিনি ‘পদাতিক’ নামে পরিচিত এই কবিতায় নগরের ফুটপাত, কাঠখোট্টা গাছ, আইবুড়ো মেয়ে, হরবোলা ছেলে ও প্রজাপতির মতো নিত্য দিনের উপকরণ দিয়ে তৈরি করেছেন এক অসাধারণ কাব্যিক জগৎ।
ফুল ফুটুক না ফুটুক কবিতার ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক প্রেক্ষাপট
সুভাষ মুখোপাধ্যায় রচিত “ফুল ফুটুক না ফুটুক” কবিতাটি বিশ শতকের মধ্যভাগে রচিত, যখন বাংলা কবিতা নগরজীবন ও আধুনিকতার নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিল। সুভাষ মুখোপাধ্যায় (১৯১৯-২০০৩) পশ্চিমবঙ্গের কৃষ্ণনগরে জন্মগ্রহণ করেন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন। তিনি কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিরিশের দশকের শেষভাগে এবং ক্রমশ নিজস্ব স্বর খুঁজে পান নাগরিক জীবনের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার মূল সুর হলো নাগরিক জীবনের কঠোর বাস্তবতা ও তার মধ্যে খুঁজে নেওয়া মানবিক মূল্যবোধ। ‘ফুল ফুটুক না ফুটুক’ কবিতাটি তার সেই বৈশিষ্ট্যের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। এই কবিতায় বসন্তের ঐতিহ্যবাহী রোমান্টিক চিত্রকে অস্বীকার করে তিনি দেখিয়েছেন নগরের ফুটপাতে, পাথরের গাছের পাতায়, আইবুড়ো মেয়ের স্বপ্নে এবং হরবোলা ছেলের হারিয়ে যাওয়ার মাঝেও বসন্ত বিদ্যমান। কবিতাটি প্রকাশিত হওয়ার সময় পাঠকমহলে সাড়া ফেলে এবং সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে স্বতন্ত্র কণ্ঠের কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
ফুল ফুটুক না ফুটুক কবিতার শৈলীগত ও কাব্যিক বিশ্লেষণ
“ফুল ফুটুক না ফুটুক” কবিতাটির ভাষা সহজ, অথচ গভীর প্রতীকী ও চিত্রময়। সুভাষ মুখোপাধ্যায় তার অনন্য শৈলীতে নিত্যদিনের ভাষায় অসাধারণ কাব্যিকতা এনেছেন। কবিতাটির শুরু এক ঘোষণার মাধ্যমে — “ফুল ফুটুক না ফুটুক / আজ বসন্ত।” এই পঙ্ক্তিটি কবিতার মূল সুর ও বার্তাকে ধারণ করে। কবিতায় ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ চিত্রকল্প ও প্রতীকগুলো: ‘শান-বাঁধানো ফুটপাতে পাথরে পা ডুবিয়ে এক কাঠখোট্টা গাছ’ — নগরের কৃত্রিমতা ও যান্ত্রিকতার প্রতীক; ‘কচি কচি পাতায় পাঁজর ফাটিয়ে হাসছে’ — কৃত্রিমতার মধ্যেও জীবনের উল্লাসের চিহ্ন; ‘আলোর চোখে কালো ঠুলি পরিয়ে তারপর খুলে’ — জীবনের রহস্য, দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন; ‘মৃত্যুর কোলে মানুষকে শুইয়ে দিয়ে তারপর তুলে’ — জীবন-মৃত্যুর চিরন্তন খেলা; ‘গায়ে হলুদ দেওয়া বিকেলে একটু দুটো পয়সা পেলে যে হরবোলা ছেলেটা কোকিল ডাকতে ডাকতে যেত’ — হারিয়ে যাওয়া শৈশব, নিষ্কলুষ আনন্দের প্রতীক; ‘লাল কালিতে ছাপা হলদে চিঠির মত আকাশ’ — রঙিন প্রত্যাশা ও আবেগের চিত্র; ‘কালোকুচ্ছিত আইবুড়ো মেয়ে’ — নগরের নিঃসঙ্গতা, অপূর্ণ স্বপ্নের প্রতীক; ‘লক্ষ্মীছাড়া প্রজাপতি’ — আকস্মিক সৌন্দর্য, ক্ষণিকের আবেশ; ‘দড়াম করে দরজা বন্ধ হবার শব্দ’ — বাস্তবের কঠিন মুখ। কবির ভাষায় এক বিশেষ ধরনের নাগরিক সুর রয়েছে, যা সহজ-সরল অথচ গভীর তাৎপর্যময়।
ফুল ফুটুক না ফুটুক কবিতায় বসন্তের নতুন সংজ্ঞা
“ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত” — এই পঙ্ক্তির মধ্য দিয়ে সুভাষ মুখোপাধ্যায় বসন্তের একটি নতুন সংজ্ঞা দাঁড় করিয়েছেন। ঐতিহ্যগত বাংলা কবিতায় বসন্ত মানেই ফুলের সমারোহ, কোকিলের কুহুতান, বাতাসের মাতাল করা পরশ। কিন্তু সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের বসন্ত ভিন্ন। তাঁর বসন্ত নগরের ফুটপাতে, পাথরের গাছের কচি পাতায়, আইবুড়ো মেয়ের স্বপ্নে, হারিয়ে যাওয়া ছেলেটির স্মৃতিতে। কবি বলতে চেয়েছেন, বসন্ত কোনো বাহ্যিক ঘটনা নয়; এটি অন্তরের অবস্থা, অনুভবের নাম। ফুল না ফুটলেও বসন্ত আসতে পারে যদি আমরা অনুভব করতে জানি। এই বসন্ত ফুলের নয়, চেতনার বসন্ত। কাঠখোট্টা গাছটির হাসির মধ্য দিয়ে কবি দেখিয়েছেন যে কৃত্রিম নগরজীবনের মধ্যেও প্রাণের স্পন্দন খুঁজে পাওয়া যায়। আইবুড়ো মেয়েটির আকস্মিক প্রজাপতি দেখা এবং তারপর দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দের মধ্য দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন নগরের নিঃসঙ্গ মানুষের স্বপ্ন ও বাস্তবের দ্বন্দ্ব।
ফুল ফুটুক না ফুটুক কবিতায় নগরজীবনের চিত্র
কবিতাটিতে সুভাষ মুখোপাধ্যায় তার নিজস্ব নগর-চেতনার এক অনন্য প্রকাশ ঘটিয়েছেন। ‘শান-বাঁধানো ফুটপাথ’, ‘পাথরে পা ডুবিয়ে এক কাঠখোট্টা গাছ’, ‘রেলিঙে বুক চেপে ধরা আইবুড়ো মেয়ে’ — এই চিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে কলকাতার নগরজীবনের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে। এই নগরজীবনে প্রকৃতি কৃত্রিম — গাছটি পাথরে ডোবানো, ফুটপাত শান-বাঁধানো। কিন্তু তবুও বসন্ত আসে, গাছটি হাসে, পাতায় পাঁজর ফাটায়। কবি দেখিয়েছেন, নগরের যান্ত্রিকতা মানুষকে সম্পূর্ণরূপে গ্রাস করতে পারে না; কোথাও না কোথাও প্রাণের অঙ্কুর থেকে যায়। ‘গায়ে হলুদ দেওয়া বিকেলে’ যে ছেলেটি কোকিল ডাকতে ডাকতে যেত, তাকে ‘ডেকে নিয়ে গেছে দিনগুলো’ — এই লাইনের মধ্য দিয়ে কবি নগরের নির্মম সত্যকে তুলে ধরেছেন, যেখানে নিষ্কলুষ আনন্দ ও শৈশব হারিয়ে যায় সময়ের স্রোতে। আইবুড়ো মেয়েটির চিত্র নগরের নিঃসঙ্গতা, অপূর্ণ স্বপ্ন ও প্রত্যাশার প্রতীক।
ফুল ফুটুক না ফুটুক কবিতায় সময়ের ধারণা
কবিতাটিতে সময়ের একটি গভীর দার্শনিক ধারণা কাজ করেছে। “যে দিনগুলো রাস্তা দিয়ে চলে গেছে যেন না ফেরে” — এই লাইনে কবি সময়ের অপূরণীয় ক্ষতির কথা বলেছেন। অতীত ফিরে আসে না, যে দিনগুলো চলে যায় তারা চিরতরে হারিয়ে যায়। “গায়ে হলুদ দেওয়া বিকেলে একটা দুটো পয়সা পেলে যে হরবোলা ছেলেটা কোকিল ডাকতে ডাকতে যেত–তাকে ডেকে নিয়ে গেছে দিনগুলো” — এই চরণে কবি শৈশব ও তারুণ্যের হারিয়ে যাওয়ার বেদনা প্রকাশ করেছেন। সময় কাউকে ফিরিয়ে দেয় না, সবাইকে সঙ্গে করে নিয়ে চলে। কিন্তু এই সময়ের স্রোতের মধ্যেই বসন্ত আসে, জীবন তার নিজের মতো করে বেঁচে থাকে। আইবুড়ো মেয়েটির স্বপ্ন দেখা, প্রজাপতি এসে গায়ে বসা, তারপর দরজা বন্ধ হওয়া — এই ঘটনাগুলো সময়ের ধারাবাহিকতায় ঘটে যায়, কিন্তু তার প্রভাব থেকে যায়।
ফুল ফুটুক না ফুটুক কবিতায় দ্বন্দ্ব ও বৈপরীত্য
কবিতাটি জুড়ে রয়েছে অসংখ্য দ্বন্দ্ব ও বৈপরীত্য। ফুল ফোটার ঐতিহ্যগত প্রত্যাশা বনাম ফুল না ফোটার বাস্তবতা; শান-বাঁধানো ফুটপাতের কৃত্রিমতা বনাম গাছের হাসির স্বাভাবিকতা; আলো-আঁধারির খেলা; জীবন-মৃত্যুর চক্র; আইবুড়ো মেয়ের স্বপ্ন বনাম বাস্তবের দরজা বন্ধ হওয়া; প্রজাপতির ক্ষণিক সৌন্দর্য বনাম ‘লক্ষ্মীছাড়া’ বলে তার প্রতি অবজ্ঞা। এই দ্বন্দ্ব ও বৈপরীত্যগুলোর মধ্য দিয়েই কবিতাটি তার গভীরতা পেয়েছে। কবি দেখিয়েছেন, জীবন মানেই দ্বন্দ্ব, বৈপরীত্য। এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই বসন্ত আসে, জীবন চলে। কাঠখোট্টা গাছটির হাসি তাই অন্ধকারেও থেমে থাকে না — “অন্ধকারে মুখ চাপা দিয়ে দড়িপাকানো সেই গাছ তখন ও হাসছে।”
ফুল ফুটুক না ফুটুক কবিতায় প্রতীক ও চিত্রকল্প
সুভাষ মুখোপাধ্যায় তার কবিতায় অসাধারণ সব প্রতীক ও চিত্রকল্প ব্যবহার করেছেন। ‘কাঠখোট্টা গাছ’ নগরের যান্ত্রিকতা ও তার মধ্যেও জীবনের উপস্থিতির প্রতীক। ‘কচি কচি পাতায় পাঁজর ফাটিয়ে হাসা’ জীবনের অনিবার্য উল্লাসকে নির্দেশ করে। ‘আলোর চোখে কালো ঠুলি পরিয়ে তারপর খুলে’ — এই চিত্রকল্প জীবনের রহস্য, দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনকে ধারণ করে। ‘মৃত্যুর কোলে মানুষকে শুইয়ে দিয়ে তারপর তুলে’ — এই পঙ্ক্তিতে কবি সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়ের চিরন্তন চক্রের ইঙ্গিত দিয়েছেন। ‘লাল কালিতে ছাপা হলদে চিঠির মত আকাশ’ — এই চিত্রকল্পটি অপূর্ব সৌন্দর্যের, যা আবেগ ও প্রত্যাশার রঙিন রূপকে ধারণ করে। ‘কালোকুচ্ছিত আইবুড়ো মেয়ে’ নগরের নিঃসঙ্গ নারীর প্রতীক। ‘প্রজাপতি’ ক্ষণিক সৌন্দর্য ও আবেগের প্রতীক, যা এসে যায় আচমকা, আবার চলে যায়। ‘দড়াম করে দরজা বন্ধ হবার শব্দ’ বাস্তবের কঠিন মুখের প্রতীক, যা স্বপ্ন ও কল্পনাকে থামিয়ে দেয়।
ফুল ফুটুক না ফুটুক কবিতায় নারীচিত্র
কবিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে রয়েছে ‘কালোকুচ্ছিত আইবুড়ো মেয়ে’র চিত্র। এই আইবুড়ো মেয়েটি নগরের নিঃসঙ্গ, অপূর্ণ স্বপ্নের প্রতীক। সে রেলিঙে বুক চেপে ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে ‘সাত-পাঁচ ভাবছিল’। এই ‘সাত-পাঁচ ভাবা’ তার মনের জটিল চিন্তা, স্বপ্ন, প্রত্যাশা, হতাশা সবকিছুকে নির্দেশ করে। ঠিক তখনই একটি প্রজাপতি উড়ে এসে তার গায়ে বসে। এই ক্ষণিক স্পর্শে সে আবেগাপ্লুত হয় — “আ মরণ ! পোড়ারমুখ লক্ষ্মীছাড়া প্রজাপতি !” এই উচ্চারণে আছে বিস্ময়, আবেগ, অভিমান ও ভালোবাসার মিশ্রণ। কিন্তু তারপরই ‘দড়াম করে দরজা বন্ধ হবার শব্দ’ — বাস্তবের কঠিন মুখ। এই সংক্ষিপ্ত চিত্রের মধ্য দিয়ে কবি নগরের নারীর নিঃসঙ্গতা, স্বপ্ন ও বাস্তবের দ্বন্দ্বকে অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
ফুল ফুটুক না ফুটুক কবিতায় শৈশব ও হারিয়ে যাওয়া
কবিতায় একটি সংক্ষিপ্ত অথচ মর্মস্পর্শী চিত্র আছে হারিয়ে যাওয়া শৈশবের। “গায়ে হলুদ দেওয়া বিকেলে একটু দুটো পয়সা পেলে যে হরবোলা ছেলেটা কোকিল ডাকতে ডাকতে যেত–তাকে ডেকে নিয়ে গেছে দিনগুলো।” এই ক’টি লাইনে কবি শৈশবের নিষ্কলুষ আনন্দ, নির্ভেজাল খুশি, সহজ সরলতাকে ধারণ করেছেন। গায়ে হলুদ দেওয়া বিকেল — এটি কোনো শুভ অনুষ্ঠানের সময়, উৎসবের সময়। সেই সময়েও ছেলেটির কাছে বড় বিষয় হচ্ছে ‘একটু দুটো পয়সা পাওয়া’ — এই পয়সা দিয়ে সে কী কিনত, কী করত, তা আমরা জানি না, কিন্তু তার আনন্দ ছিল কোকিল ডাকতে ডাকতে যাওয়া। এই কোকিল ডাকার মধ্য দিয়ে সে বসন্তকে ডাকত, প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যেত। কিন্তু দিনগুলো তাকে ডেকে নিয়ে গেছে। এখন সে আর নেই, সেই নিষ্কলুষ আনন্দ আর নেই। এই চিত্রের মধ্য দিয়ে কবি সময়ের করাল গ্রাস ও শৈশব হারানোর বেদনাকে চিরস্থায়ী করে রেখেছেন।
ফুল ফুটুক না ফুটুক কবিতা সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
ফুল ফুটুক না ফুটুক কবিতার লেখক কে?
ফুল ফুটুক না ফুটুক কবিতার লেখক প্রখ্যাত বাঙালি কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। তিনি ১৯১৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের কৃষ্ণনগরে জন্মগ্রহণ করেন এবং ২০০৩ সালের ৮ জুলাই কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। সুভাষ মুখোপাধ্যায় ‘পদাতিক’ নামে সমধিক পরিচিত। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন এবং সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চায় জীবন কাটান। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘পদাতিক’ (১৯৪০) তাকে খ্যাতি এনে দেয়। তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘ঘুমিয়ে পড়ার আগে’, ‘চিরকুট’, ‘যত দূরেই যাও’, ‘বাংলা দেশে’, ‘কোন এক গাঁয়ে’ প্রভৃতি। তিনি তার কবিতায় নগরজীবনের কঠোর বাস্তবতা, সামাজিক অসঙ্গতি ও মানবিক মূল্যবোধকে তুলে ধরেছেন। তার কবিতার ভাষা সহজ-সরল অথচ গভীর তাৎপর্যময়। তিনি ১৯৬৪ সালে ‘যত দূরেই যাও’ কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন।
ফুল ফুটুক না ফুটুক কবিতার মূল বিষয়বস্তু কী?
ফুল ফুটুক না ফুটুক কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো বসন্তের প্রচলিত ধারণাকে অস্বীকার করে নগরজীবনের কঠোর বাস্তবতার মধ্যেও বসন্তের উপস্থিতি অনুভব করা। কবি বলতে চেয়েছেন, বসন্ত কোনো বাহ্যিক ঘটনা নয়, এটি অনুভূতির নাম। ফুল না ফুটলেও বসন্ত আসতে পারে যদি আমরা অনুভব করতে জানি। কবিতায় একইসঙ্গে নগরজীবনের নিঃসঙ্গতা, শৈশব হারানোর বেদনা, আইবুড়ো মেয়ের স্বপ্ন ও বাস্তবতার দ্বন্দ্ব, জীবন-মৃত্যুর চিরন্তন খেলা এবং সময়ের অপূরণীয় ক্ষতির চিত্র ফুটে উঠেছে। শান-বাঁধানো ফুটপাতের কাঠখোট্টা গাছের হাসি, গায়ে হলুদ দেওয়া বিকেলের হরবোলা ছেলেটির হারিয়ে যাওয়া, আইবুড়ো মেয়ের প্রজাপতি দেখা ও দরজা বন্ধ হওয়া — এই সব চিত্রের মধ্য দিয়ে কবি নগরজীবনের বহুমাত্রিক বাস্তবতাকে ধারণ করেছেন।
“ফুল ফুটুক না ফুকটুক আজ বসন্ত” — বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
“ফুল ফুটুক না ফুকটুক আজ বসন্ত” — এই পঙ্ক্তির মাধ্যমে কবি বসন্তের একটি নতুন সংজ্ঞা দাঁড় করিয়েছেন। ঐতিহ্যগত বাংলা কবিতায় বসন্ত মানেই ফুলের সমারোহ, কোকিলের কুহুতান, বাতাসের মাতাল করা পরশ। কিন্তু সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের বসন্ত ভিন্ন। তিনি বলতে চেয়েছেন, বসন্ত কোনো বাহ্যিক ঘটনা নয় যা ফুল ফোটার ওপর নির্ভরশীল। এটি অন্তরের অবস্থা, অনুভবের নাম। ফুল না ফুটলেও বসন্ত আসতে পারে যদি আমরা অনুভব করতে জানি। এই বসন্ত ফুলের নয়, চেতনার বসন্ত। এটি নগরের ফুটপাতে, পাথরের গাছের কচি পাতায়, আইবুড়ো মেয়ের স্বপ্নে, হারিয়ে যাওয়া ছেলেটির স্মৃতিতে অনুভব করা যায়। কবি এখানে প্রচলিত রোমান্টিক ধারণাকে ভেঙে দিয়ে বাস্তবের কঠোরতার মধ্যেও সৌন্দর্য ও জীবন খুঁজে পাওয়ার কথা বলেছেন।
“শান-বাঁধানো ফুটপাথে পাথরে পা ডুবিয়ে এক কাঠখোট্টা গাছ” — এই চিত্রের তাৎপর্য কী?
“শান-বাঁধানো ফুটপাথে পাথরে পা ডুবিয়ে এক কাঠখোট্টা গাছ” — এই চিত্রটি নগরজীবনের কৃত্রিমতা ও যান্ত্রিকতার প্রতীক। শান-বাঁধানো ফুটপাথ নগরের সুপরিকল্পিত, কৃত্রিম পরিবেশকে নির্দেশ করে। সেই ফুটপাতে গাছটির পা ডোবানো আছে পাথরে — অর্থাৎ এটি স্বাভাবিক মাটিতে না বেড়ে কৃত্রিম পরিবেশে বেড়ে উঠছে। তাই গাছটি ‘কাঠখোট্টা’ — শক্ত, রুক্ষ, সম্ভবত কৃত্রিম। কিন্তু এই কাঠখোট্টা গাছটির মধ্যেও প্রাণ রয়েছে, অনুভূতি রয়েছে। এটি ‘কচি কচি পাতায় পাঁজর ফাটিয়ে হাসছে’। অর্থাৎ নগরের কৃত্রিমতা ও যান্ত্রিকতা সত্ত্বেও জীবন তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে চলে, উল্লাস করতে জানে। এই চিত্রের মধ্য দিয়ে কবি দেখিয়েছেন, নগরের যান্ত্রিকতা মানুষকে সম্পূর্ণরূপে গ্রাস করতে পারে না; কোথাও না কোথাও প্রাণের অঙ্কুর থেকে যায়।
“আলোর চোখে কালো ঠুলি পরিয়ে তারপর খুলে — মৃত্যুর কোলে মানুষকে শুইয়ে দিয়ে তারপর তুলে” — এই লাইনগুলোর তাৎপর্য কী?
এই লাইনগুলোতে কবি জীবন ও জগতের চিরন্তন রহস্য ও দ্বন্দ্বকে তুলে ধরেছেন। ‘আলোর চোখে কালো ঠুলি পরিয়ে তারপর খুলে’ — এই পঙ্ক্তিতে কবি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, সত্যের উপলব্ধির প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করেছেন। আমরা কখনও আলো দেখি, কখনও আঁধার; কখনও সত্য বুঝতে পারি, কখনও বিভ্রান্ত হই। জীবন এই আলো-আঁধারির খেলায় ভরা। ‘মৃত্যুর কোলে মানুষকে শুইয়ে দিয়ে তারপর তুলে’ — এই পঙ্ক্তিতে কবি সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়ের চিরন্তন চক্রের ইঙ্গিত দিয়েছেন। মৃত্যুর পরই নতুন জন্ম, ধ্বংসের পরই সৃষ্টি। এই চক্র চিরকাল চলছে। কবি হয়তো এখানে সৃষ্টিকর্তা বা প্রকৃতির সেই অনন্ত খেলার দিকে ইঙ্গিত করেছেন, যেখানে মানুষ এক অনিচ্ছুক অংশীদার মাত্র। এই লাইনগুলো কবিতাকে একটি দার্শনিক মাত্রা দিয়েছে।
“গায়ে হলুদ দেওয়া বিকেলে একটু দুটো পয়সা পেলে যে হরবোলা ছেলেটা কোকিল ডাকতে ডাকতে যেত–তাকে ডেকে নিয়ে গেছে দিনগুলো” — এই লাইনগুলোর তাৎপর্য কী?
এই লাইনগুলোতে কবি শৈশবের নিষ্কলুষ আনন্দ ও তার হারিয়ে যাওয়ার বেদনাকে চিরস্থায়ী করে রেখেছেন। ‘গায়ে হলুদ দেওয়া বিকেল’ — এটি কোনো শুভ অনুষ্ঠানের সময়, উৎসবের সময়। সেই সময়েও ছেলেটির কাছে বড় বিষয় হচ্ছে ‘একটু দুটো পয়সা পাওয়া’ — এই পয়সা দিয়ে সে কী কিনত, কী করত, তা আমরা জানি না, কিন্তু তার আনন্দ ছিল কোকিল ডাকতে ডাকতে যাওয়া। এই কোকিল ডাকার মধ্য দিয়ে সে বসন্তকে ডাকত, প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যেত। ছেলেটি ‘হরবোলা’ অর্থাৎ কথা বলতে পারদর্শী, প্রাণোচ্ছল। কিন্তু দিনগুলো তাকে ডেকে নিয়ে গেছে — অর্থাৎ সময়ের স্রোতে সে হারিয়ে গেছে, সেই নিষ্কলুষ আনন্দ আর নেই। এই কয়েকটি লাইনে কবি শৈশবের স্বর্গীয় আনন্দ ও সময়ের করাল গ্রাসের এক অসাধারণ চিত্র এঁকেছেন।
“কালোকুচ্ছিত আইবুড়ো মেয়ে” চরিত্রটির তাৎপর্য কী?
‘কালোকুচ্ছিত আইবুড়ো মেয়ে’ চরিত্রটি নগরের নিঃসঙ্গ, অপূর্ণ স্বপ্নের প্রতীক। ‘কালোকুচ্ছিত’ অর্থ কালো কোঁকড়ানো চুলবিশিষ্ট। এই বিশেষণটি তার সৌন্দর্য ও তারুণ্যের ইঙ্গিত দেয়। ‘আইবুড়ো’ অর্থ অবিবাহিতা, যা নগরের নারীর এক বিশেষ সামাজিক অবস্থানকে নির্দেশ করে। সে রেলিঙে বুক চেপে ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে ‘সাত-পাঁচ ভাবছিল’ — এই ‘সাত-পাঁচ ভাবা’ তার মনের জটিল চিন্তা, স্বপ্ন, প্রত্যাশা, হতাশা সবকিছুকে নির্দেশ করে। ঠিক তখনই একটি প্রজাপতি এসে তার গায়ে বসে। এই ক্ষণিক স্পর্শে তার আবেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটে — “আ মরণ ! পোড়ারমুখ লক্ষ্মীছাড়া প্রজাপতি !” এই উচ্চারণে আছে বিস্ময়, আবেগ, অভিমান ও ভালোবাসার মিশ্রণ। কিন্তু তারপরই বাস্তবের কঠিন মুখ — “দড়াম করে দরজা বন্ধ হবার শব্দ।” এই সংক্ষিপ্ত চিত্রের মধ্য দিয়ে কবি নগরের নারীর নিঃসঙ্গতা, স্বপ্ন ও বাস্তবের দ্বন্দ্বকে অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
“আ মরণ ! পোড়ারমুখ লক্ষ্মীছাড়া প্রজাপতি !” — এই উচ্চারণের তাৎপর্য কী?
এই উচ্চারণটি আইবুড়ো মেয়েটির আকস্মিক আবেগের বহিঃপ্রকাশ। একটি প্রজাপতি এসে তার গায়ে বসে — এই ক্ষণিক স্পর্শ তাকে আবেগাপ্লুত করে তোলে। ‘আ মরণ !’ — এটি বিস্ময় ও আবেগের একসঙ্গে প্রকাশ। ‘পোড়ারমুখ’ — এটি সাধারণত গালি হিসেবে ব্যবহৃত হয়, কিন্তু এখানে আদর ও অভিমানের মিশ্রণে ব্যবহৃত হয়েছে। ‘লক্ষ্মীছাড়া’ — অর্থ লক্ষ্মী (সম্পদ, সৌভাগ্য) নেই যার, কিন্তু এখানে এটি স্নেহ ও মায়ার সাথে উচ্চারিত। এই উচ্চারণের মধ্য দিয়ে মেয়েটির দীর্ঘদিনের একাকীত্ব, স্পর্শের ক্ষুধা, ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা ফুটে ওঠে। একটি ছোট প্রজাপতির ক্ষণিক স্পর্শ তাকে আবেগের চরমে পৌঁছে দেয়। এই একটি মাত্র উচ্চারণের মধ্য দিয়ে কবি মেয়েটির সমগ্র মনস্তত্ত্বকে ধারণ করেছেন।
“অন্ধকারে মুখ চাপা দিয়ে দড়িপাকানো সেই গাছ তখন ও হাসছে” — এই লাইনের তাৎপর্য কী?
এই লাইনটি কবিতার শেষ পঙ্ক্তি, যা পুরো কবিতাকে একটি বিশেষ মাত্রা দিয়েছে। আইবুড়ো মেয়েটির স্বপ্নভাঙার পর, দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দের পর, যখন চারিদিকে অন্ধকার, তখন সেই কাঠখোট্টা গাছটি মুখ চাপা দিয়েও হাসছে। এই চিত্রের মধ্য দিয়ে কবি জীবনের অনিবার্য উল্লাস ও অধ্যবসায়কে তুলে ধরেছেন। কৃত্রিম পরিবেশ, পাথরে ডোবানো পা, অন্ধকার — এসব কিছু সত্ত্বেও গাছটি হাসছে। এর অর্থ হলো জীবন তার নিজস্ব গতিতে চলতে থাকে, উল্লাস করতে জানে। দুঃখ, ব্যর্থতা, হতাশার পরেও জীবন থেমে থাকে না। গাছটির এই হাসি আশার আলো দেখায়। ‘মুখ চাপা দিয়ে’ হাসার মধ্য দিয়ে কবি হয়তো গাছটির সংযম ও বিনয়ের কথাও বলেছেন। এই শেষ পঙ্ক্তিটি কবিতাকে এক আশাবাদী সুরে শেষ করেছে।
কবিতাটি আধুনিক পাঠকের জন্য কীভাবে প্রাসঙ্গিক?
“ফুল ফুটুক না ফুটুক” কবিতাটি আজকের আধুনিক পাঠকের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক: প্রথমত, এটি নগরজীবনের নিঃসঙ্গতা ও যান্ত্রিকতার এক জীবন্ত দলিল, যা আধুনিক নগরবাসী প্রতিদিন অনুভব করে। দ্বিতীয়ত, কবিতাটি আমাদের শেখায় সৌন্দর্য খুঁজে নিতে — ফুল না ফুটলেও বসন্ত অনুভব করার শিক্ষা দেয়। তৃতীয়ত, আইবুড়ো মেয়ের চরিত্রের মধ্য দিয়ে কবি নারীর নিঃসঙ্গতা ও স্বপ্নের কথা বলেছেন, যা আজকের সমাজেও প্রাসঙ্গিক। চতুর্থত, হারিয়ে যাওয়া শৈশবের বেদনা প্রতিটি মানুষের চিরন্তন অনুভূতি। পঞ্চমত, জীবন-মৃত্যু, আলো-আঁধারির দ্বন্দ্ব নিয়ে কবির দার্শনিক ভাবনা চিরকালীন। ষষ্ঠত, কবিতার শেষ পঙ্ক্তিটি আশার আলো দেখায় — অন্ধকারের পরেও হাসি সম্ভব। সপ্তমত, সহজ-সরল ভাষায় গভীর কথা বলার এই শৈলী আধুনিক পাঠকের হৃদয়ে সহজেই পৌঁছে যায়।
এই কবিতার অন্যতম সেরা লাইন কোনটি এবং কেন?
এই কবিতার অন্যতম সেরা লাইন নিঃসন্দেহে: “ফুল ফুটুক না ফুকটুক আজ বসন্ত”। এই লাইনটি সেরা হওয়ার কারণ: প্রথমত, এটি সমগ্র কবিতার কেন্দ্রীয় বক্তব্য ও চেতনাকে ধারণ করে। দ্বিতীয়ত, এটি বসন্তের প্রচলিত ধারণাকে ভেঙে দিয়ে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করে। তৃতীয়ত, এই একটি লাইনেই কবির সমগ্র কবিতাতত্ত্ব ও জীবনদর্শন ধরা পড়েছে। চতুর্থত, এটি সহজ-সরল অথচ গভীর তাৎপর্যময়, যা পাঠকের মনে দীর্ঘস্থায়ী হয়। পঞ্চমত, এই পঙ্ক্তিটি বাংলা কবিতার ইতিহাসে একটি স্মরণীয় উচ্চারণ হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। ষষ্ঠত, এটি বহুবার উদ্ধৃত হয়েছে এবং মানুষের মুখে মুখে ফিরে। সপ্তমত, এই লাইনটি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিপ্রতিভার এক উজ্জ্বল স্বাক্ষর।
সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতায় ‘পদাতিক’ নামকরণের তাৎপর্য কী?
সুভাষ মুখোপাধ্যায় ‘পদাতিক’ নামে সমধিক পরিচিত। ‘পদাতিক’ শব্দের অর্থ পথিক, যে পায়ে হেঁটে চলে। এই নামকরণের তাৎপর্য বহুমাত্রিক। প্রথমত, এটি তার প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম। দ্বিতীয়ত, এটি তার কবিতার চরিত্রের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ — তার কবিতা নগরের পথে পথে ঘুরে বেড়ায়, সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। তৃতীয়ত, পদাতিক অর্থে তিনি কবিতাকে পায়ে হেঁটে চলার মতো সহজ-সরল করতে চেয়েছেন, কৃত্রিমতা ও আড়ম্বর থেকে মুক্ত রাখতে চেয়েছেন। চতুর্থত, এটি তার জীবনদর্শনের প্রতিফলন — তিনি জীবনকে পথ চলা হিসেবে দেখেছেন, যেখানে থেমে থাকা নয়, বরং এগিয়ে চলাই লক্ষ্য। পঞ্চমত, ‘পদাতিক’ শব্দটির মধ্যে একটি সংগ্রামী চেতনা আছে — যে পায়ে হেঁটে চলে সে কষ্ট স্বীকার করে, ত্যাগ স্বীকার করে, কিন্তু থেমে থাকে না। এই নামকরণের মধ্য দিয়ে সুভাষ মুখোপাধ্যায় তার কবিপ্রতিভার একটি বিশেষ দিককে চিহ্নিত করেছেন।
ট্যাগস: ফুল ফুটুক না ফুটুক, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা, বাংলা কবিতা, বসন্তের কবিতা, নগরজীবনের কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, পদাতিক, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ কবিতা, বাংলা সাহিত্য, নাগরিক কবিতা, প্রতীকী কবিতা






