কবিতার খাতা
প্রিয়তমাসু – তারাপদ রায়।
অনেকদিন পর কাগজ-কলম নিয়ে বসে
প্রথম একটা চাঁদের ছবি আঁকি, সঙ্গে কিছু মেঘ।
তারপর যথেষ্ট হয়নি ভেবে গোটা তিনেক পাখি,
ক্রমশ একটা দেবদারু ও কয়েকটা কলাগাছ,
অবশেষে অনেকগুলি ছানাসহ একটা বেড়াল,
এইসব এঁকে এঁকে তবুও
কাগজের নীচে চার আঙুল জায়গা বাকি থাকে :
সেখানে প্রথমে লিখি, শ্রীচরণেষু
তার নীচে সবিনয় নিবেদন।
এবং কিছুক্ষণ পরে
সবিনয় নিবেদন কেটে লিখি প্রিয়তমাসু।
এবং একটু পরেই বুঝতে পারি
জীবনে এই প্রথম, প্রথমবার প্রিয়তমাসু লিখলাম।
প্রিয়তমাসু,
তুমি তো জানো না
জীবনে তোমাকে কোনদিন ঠিকমতো সম্বোধন করা হলো না।
প্রিয়তমাসু,
তুমি তো জানো না
জীবনে তোমাকে কোনোদিন ঠিকমতো ভালোবাসা হলো না।
শুধু হিজিবিজি ছবি, চাঁদ, মেঘ,
সবিনয় নিবেদন কাটাকুটি করে চিরদিন তোমার কাছে পৌঁছোনো।
কবিতার কথা—
তারাপদ রায়ের ‘প্রিয়তমাসু’ কবিতাটি অপ্রকাশিত প্রেম এবং এক গভীর অনুশোচনার শৈল্পিক দলিল। সাধারণত তারাপদ রায়ের লেখায় যে কৌতুক ও প্রসন্নতা থাকে, এই কবিতায় তা এক বিষণ্ণ ও মরমী রূপ ধারণ করেছে। এটি সেই সব হৃদয়ের গল্প, যারা সারাজীবন ভালোবাসার মানুষকে কাছে পেয়েও ঠিকমতো ‘ভালোবাসি’ বলতে পারেনি, কিংবা যান্ত্রিক আনুষ্ঠানিকতার আড়ালে আসল মনের কথাটি আড়াল করে রেখেছে।
কবিতার শুরুতেই এক ধরণের ইতস্তত ভাব লক্ষ্য করা যায়। কবি কাগজ-কলম নিয়ে বসে প্রথমেই লিখতে পারছেন না; বরং তিনি ছবি আঁকছেন—চাঁদ, মেঘ, পাখি, দেবদারু, এমনকি বিড়ালের ছানা। এই ছবিগুলো আসলে মনের আসল কথাটি প্রকাশ করতে না পারার এক ধরণের ‘প্রস্তুতি’ বা অজুহাত। যখন সব আঁকা শেষ হলো, তখন কাগজের নিচে যে সামান্য জায়গা বাকি রইল, সেখানে কবি প্রথমে লিখলেন অত্যন্ত আনুষ্ঠানিক ‘শ্রীচরণেষু’ বা ‘সবিনয় নিবেদন’। এটি সেই চিরাচরিত বাঙালি মধ্যবিত্ত জড়তা, যেখানে প্রেমকে সবসময় সম্ভ্রম বা দূরত্বের আবরণে ঢেকে রাখা হয়।
কবিতার মোড় ঘোরে যখন কবি সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা কেটে প্রথমবারের মতো লেখেন ‘প্রিয়তমাসু’। এই একটি শব্দ চয়ন করতে কবির একটি জীবন কেটে গিয়েছে। তিনি উপলব্ধি করেন, জীবনে এই প্রথম তিনি তাঁর ভালোবাসার মানুষকে সঠিক নামে বা সঠিক আবেগে সম্বোধন করলেন। কিন্তু ট্র্যাজেডি এখানেই যে, এই সম্বোধনটি করতে করতে অনেক দেরি হয়ে গেছে। কবি আক্ষেপ করে বলছেন—‘জীবনে তোমাকে কোনোদিন ঠিকমতো ভালোবাসা হলো না’।
এই ‘ঠিকমতো ভালোবাসা না হওয়া’ আসলে এক ধরণের অপূর্ণতার হাহাকার। আমরা অনেক সময় প্রিয়জনের সাথে সারাজীবন কাটিয়ে দিই, কিন্তু ঘরকন্না, দায়িত্ব আর সাংসারিক হিসেব-নিকেশের হিজিবিজি কাটাকুটির মাঝে হৃদয়ের সেই আদি ও অকৃত্রিম প্রকাশটি হারিয়ে যায়। চাঁদ, মেঘ আর আনুষ্ঠানিক চিঠির খসড়া তৈরি করতে করতেই জীবন ফুরিয়ে আসে, অথচ আসল গন্তব্যে পৌঁছানো হয় না।
পরিশেষে বলা যায়, ‘প্রিয়তমাসু’ কবিতাটি প্রতিটি মানুষের সেই না-বলা প্রেমের দীর্ঘশ্বাস, যা প্রকাশের অভাবে কেবল খসড়াতেই রয়ে গেছে।





