অবেলার ডাক – কাজী নজরুল ইসলাম | কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা | আধুনিক বাংলা কবিতা | প্রেম, অনুশোচনা ও হারানোর কবিতা | অবেলার ডাকের অসাধারণ কাব্যভাষা
অবেলার ডাক: কাজী নজরুল ইসলামের প্রেম, অনুশোচনা ও হারানোর অসাধারণ কাব্যভাষা
কাজী নজরুল ইসলামের “অবেলার ডাক” আধুনিক বাংলা কবিতার এক অনন্য, হৃদয়স্পর্শী ও আবেগধর্মী সৃষ্টি। এই কবিতাটি কাজী নজরুল ইসলামের একটি হৃদয়স্পর্শী রচনা, যেখানে কবি অতীত ভালোবাসা, হারানোর বেদনা এবং অনুশোচনার গভীর অনুভূতি প্রকাশ করেছেন। কবিতাটির ভাষা অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ও আবেগধর্মী, যা বাংলা সাহিত্যের প্রেম ও বিরহের কবিতায় বিশেষ স্থান দখল করে আছে। “অনেক ক’রে বাসতে ভালো পারিনি মা তখন যারে, / আজ অবেলায় তারেই মনে পড়ছে কেন বারে বারে।” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে এক অকাল অনুশোচনা ও অতীত ভালোবাসার স্মৃতির গভীর বেদনা। কবি স্বীকার করেছেন যে তিনি তখন ভালোবাসতে জানতেন না, কিন্তু আজ অবেলায় সেই মানুষটির স্মৃতি তাকে পীড়া দিচ্ছে। কাজী নজরুল ইসলাম তার অনন্য শৈলীতে মানব হৃদয়ের গভীরতম অনুভূতিগুলোকে স্পর্শ করতে সক্ষম হয়েছেন এই কবিতার মাধ্যমে।
কাজী নজরুল ইসলাম: বিদ্রোহ ও বিরহের কবি
কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের জাতীয় কবি। তিনি বিদ্রোহী কবি হিসেবে খ্যাত, কিন্তু প্রেম ও বিরহের কবিতায়ও তিনি অসাধারণ। তাঁর কবিতায় জীবনের অস্থিরতা, ভালোবাসার জটিলতা এবং প্রেমের অন্তর্নিহিত বেদনা ফুটে উঠেছে। ‘অবেলার ডাক’ কবিতাটি তার সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘অগ্নিবীণা’, ‘বিষের বাঁশি’, ‘সনাম চণ্ডী’, ‘চক্রবাক’ ইত্যাদি। তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতা তাকে অমরত্ব দিয়েছে। নজরুলের কবিতায় বিদ্রোহ, প্রেম, মানবতা, আধ্যাত্মিকতা এবং সামাজিক ন্যায়ের বিষয়গুলি বিশেষভাবে উঠে এসেছে।
অবেলার ডাক: শিরোনামের তাৎপর্য ও কবিতার পটভূমি
শিরোনাম ‘অবেলার ডাক’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘অবেলা’ — অসময়, ভুল সময়। ‘ডাক’ — আহ্বান। কবি এখন অবেলায় (ভুল সময়ে) তাকে ডাকছেন — যাকে তিনি তখন সঠিক সময়ে ভালোবাসতে পারেননি। এটি একটি অকাল অনুশোচনা ও অতীত ভালোবাসার স্মৃতির উপর নির্মিত কবিতা।
কবিতার পটভূমি একটি গভীর আত্মসমালোচনা এবং অনিবার্য হারানোর যন্ত্রণা। কবি মনে করছেন — তিনি তখন যাকে ভালোবাসতে পারেননি, আজ অবেলায় তার স্মৃতি বারবার মনে পড়ছে। তিনি অতীতের সেই মানুষটির কথা মনে করে গভীর অনুশোচনা করছেন। তিনি স্বীকার করছেন — তিনি তখন তাঁর ভালোবাসা বুঝতে পারেননি, তাঁর মূল্য দিতে পারেননি। আজ তিনি বুঝতে পেরেছেন, কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।
অবেলার ডাক: রূপক ও প্রতীক বিশ্লেষণ
কবিতায় অসংখ্য শক্তিশালী রূপক ও প্রতীক ব্যবহৃত হয়েছে। ‘রাজ-ভিখারী’ — ভালোবাসার ব্যক্তির দ্বৈত সত্তার প্রতীক, যিনি রাজার মতো মহান কিন্তু ভালোবাসায় ভিখারীর মতো নম্র ও বিনয়ী। ‘পথ-পাগলে’ — চিরন্তন ভ্রমণকারীর প্রতীক, যে কখনো এক জায়গায় থাকতে পারে না। ‘সোহাগ’ ও ‘আদর’ — প্রকৃত ভালোবাসার প্রতীক। ‘বুকের ক্ষুধা’ — মানব হৃদয়ের আবেগের চাহিদার প্রতীক। ‘পাষাণ ফেটেও রক্ত বহে’ — কঠোর হৃদয়েরও আবেগপ্রবণ হওয়ার প্রতীক। ‘ঝড়ের হাওয়া’ — অশান্ত মন ও আবেগের প্রতীক। এই সকল রূপক কবিতাকে একটি গভীর মানবিক মাত্রা দিয়েছে।
অবেলার ডাক: স্তবকভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ
প্রথম স্তবক: অনেক ক’রে বাসতে ভালো পারিনি মা তখন যারে, আজ অবেলায় তারেই মনে পড়ছে কেন বারে বারে।
“অনেক ক’রে বাসতে ভালো পারিনি মা তখন যারে, / আজ অবেলায় তারেই মনে পড়ছে কেন বারে বারে।”
প্রথম স্তবকে কবি তার গভীর অনুশোচনা প্রকাশ করেছেন। তিনি তখন যাকে অনেক ভালোবাসতে পারেননি, আজ অবেলায় তার স্মৃতি বারবার মনে পড়ছে। ‘অনেক ক’রে বাসতে ভালো পারিনি’ — তিনি স্বীকার করছেন যে তিনি তখন ভালোবাসতে জানতেন না, বা পারতেন না। ‘আজ অবেলায়’ — এখন অসময়ে, দেরি হয়ে গেছে। ‘বেয়ারা বারে’ — বারবার, বারংবার।
দ্বিতীয় স্তবক: আজ মনে হয় রোজ রাতে সে ঘুম পাড়াত নয়ন চুমে, চুমুর পরে চুম দিয়ে ফের হান্তে আঘাত ভোরের ঘুমে। ভাব্তুম তখন এ কোন্ বালাই! কর্ত এ প্রাণ পালাই পালাই। আজ সে কথা মনে হ’য়ে ভাসি অঝোর নয়ন-ঝরে। অভাগিনীর সে গরব আজ ধূলায় লুটায় ব্যথার ভারে।
“আজ মনে হয় রোজ রাতে সে ঘুম পাড়াত নয়ন চুমে, / চুমুর পরে চুম দিয়ে ফের হান্তে আঘাত ভোরের ঘুমে। / ভাব্তুম তখন এ কোন্ বালাই! / কর্ত এ প্রাণ পালাই পালাই। / আজ সে কথা মনে হ’য়ে ভাসি অঝোর নয়ন-ঝরে। / অভাগিনীর সে গরব আজ ধূলায় লুটায় ব্যথার ভারে।”
দ্বিতীয় স্তবকে কবি অতীতের স্মৃতি মনে করছেন। তখন সে রোজ রাতে চুমু দিয়ে ঘুম পাড়াত, আবার ভোরের ঘুমে আঘাত হানত। কবি তখন ভাবতেন — এ কোন বালাই! প্রাণ পালাতে চাইত। আজ সেই কথা মনে করে তিনি অঝোর নয়ন-ঝরে ভাসছেন। অভাগিনীর সেই গরব আজ ধূলায় লুটায় ব্যথার ভারে।
তৃতীয় স্তবক: তর”ণ তাহার ভরাট বুকের উপ্চে-পড়া আদর সোহাগ হেলায় দু’পায় দ’লেছি মা, আজ কেন হায় তার অনুরাগ? এই চরণ সে বক্ষে চেপে চুমেছে, আর দু’চোখ ছেপে জল ঝ’রেছে, তখনো মা কইনি কথা অহঙ্কারে, এম্নি দার”ণ হতাদরে ক’রেছি মা, বিদায় তারে।
“তর”ণ তাহার ভরাট বুকের উপ্চে-পড়া আদর সোহাগ / হেলায় দু’পায় দ’লেছি মা, আজ কেন হায় তার অনুরাগ? / এই চরণ সে বক্ষে চেপে / চুমেছে, আর দু’চোখ ছেপে / জল ঝ’রেছে, তখনো মা কইনি কথা অহঙ্কারে, / এম্নি দার”ণ হتادরে ক’রেছি মা, বিদায় তারে।”
তৃতীয় স্তবকে আরও গভীর অনুশোচনা। তার তরুণ ভরাট বুকের উপচে পড়া আদর-সোহাগ কবি হেলায় পায়ে দলেছেন। আজ কেন তার অনুরাগ মনে পড়ছে? সে চরণ বক্ষে চেপে চুমেছে, চোখ ছেপে জল ঝরিয়েছে — তখনো কবি অহঙ্কারে কথা বলেননি। এমন দারুণ হতাদরে (অবহেলা করে) তিনি তাকে বিদায় দিয়েছেন।
চতুর্থ স্তবক: দেখেওছিলাম বুক-ভরা তার অনাদরের আঘাত-কাঁটা, দ্বার হ’তে সে গেছে দ্বারে খেয়ে সবার লাথি-ঝাটা। ভেবেছিলাম আমার কাছে তার দরদের শানি- আছে, আমিও গো মা ফিরিয়ে দিলাম চিন্তে নেরে দেবতারে। ভিক্ষুবেশে এসেছিল রাজাধিরাজ দাসীর দ্বারে।
“দেখেওছিলাম বুক-ভরা তার অনাদরের আঘাত-কাঁটা, / দ্বার হ’তে সে গেছে দ্বারে খেয়ে সবার লাথি-ঝাটা। / ভেবেছিলাম আমার কাছে / তার দরদের শানি- আছে, / আমিও গো মা ফিরিয়ে দিলাম চিন্তে নেরে দেবতারে। / ভিক্ষুবেশে এসেছিল রাজাধিরাজ দাসীর দ্বারে।”
চতুর্থ স্তবকে কবি স্বীকার করছেন — তিনি দেখেছিলেন তার বুকভরা অনাদরের আঘাত-কাঁটা। সে দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে, সবার লাথি-ঝাটা খেয়েছে। কবি ভেবেছিলেন — তার কাছে তার দরদের শেষ আছে। কিন্তু তিনি নিজেও তাকে ফিরিয়ে দিলেন। ভিক্ষুবেশে এসেছিল রাজাধিরাজ (মহান রাজা) দাসীর দ্বারে।
পঞ্চম স্তবক: পথ ভুলে সে এসেছিল সে মোর সাধের রাজ-ভিখারী, মাগো আমি ভিখারিনী, আমি কি তাঁয় চিন্তে পারি? তাই মাগো তাঁর পূজার ডালা নিইনি, নিইনি মণির মালা, দেব্তা আমার নিজে আমায় পূজল ষোড়শ-উপচারে। পূজারীকে চিন্লাম না মা পূজা-ধূমের অন্ধকারে।
“পথ ভুলে সে এসেছিল সে মোর সাধের রাজ-ভিখারী, / মাগো আমি ভিখারিনী, আমি কি তাঁয় চিন্তে পারি? / তাই মাগো তাঁর পূজার ডালা / نিইনি, نিইনি مণির মালা, / দেব্তা আমার নিজে আমায় পূজল ষোড়শ-উপচারে। / পূজারীকে চিন্লাম না মা পূজা-ধূমের অন্ধকারে।”
পঞ্চম স্তবকে ‘রাজ-ভিখারী’ রূপকের ব্যাখ্যা। পথ ভুলে সে এসেছিল — মোর সাধের রাজ-ভিখারী। কবি নিজেকে ভিখারিনী মনে করেন — তিনি কি তাঁকে চিনতে পারেন? তাই তিনি তাঁর পূজার ডালা নেননি, মণির মালা নেননি। দেবতা নিজে এসে তাকে ষোড়শ-উপচারে পূজা করেছেন, কিন্তু পূজারীকে চিনতে পারেননি পূজা-ধূমের অন্ধকারে।
ষষ্ঠ স্তবক: আমায় চাওয়াই শেষ চাওয়া তার মাগো আমি তা কি জানি? ধরায় শুধু রইল ধরা রাজ-অতিথির বিদায়-বাণী। ওরে আমার ভালোবাসা! কোথায় বেঁধেছিলি বাসা যখন আমার রাজা এসে দাঁড়িয়েছিল এই দুয়ারে? নিঃশ্বসিয়া উঠছে ধরা, ’নেই রে সে নেই, খুঁজিস কারে!’
“আমায় চাওয়াই শেষ চাওয়া তার মাগো আমি তা কি জানি? / ধরায় শুধু রইল ধরা রাজ-অতিথির বিদায়-বাণী। / ওরে আমার ভালোবাসা! / কোথায় বেঁধেছিলি বাসা / যখন আমার রাজা এসে দাঁড়িয়েছিল এই দুয়ারে? / নিঃশ্বসিয়া উঠছে ধরা, ’নেই রে সে নেই, খুঁজিস কারে!’”
ষষ্ঠ স্তবকে কবি তার অজ্ঞতার কথা বলছেন। তাকে চাওয়াই ছিল তার শেষ চাওয়া — কবি তা জানতেন না। ধরায় শুধু ধরা রইল রাজ-অতিথির বিদায়-বাণী। ভালোবাসা, কোথায় বেঁধেছিলি বাসা যখন রাজা এসে দাঁড়িয়েছিল এই দুয়ারে? পৃথিবী নিঃশ্বাস ফেলে বলছে — নেই রে সে নেই, খুঁজিস কারে!
সপ্তম স্তবক: সে যে পথের চির-পথিক, তার কি সহে ঘরের মায়া? দূর হ’তে মা দূরন-রে ডাকে তাকে পথের ছায়া। মাঠের পারে বনের মাঝে চপল তাহার নূপুর বাজে, ফুলের সাথে ফুটে বেড়ায়, মেঘের সাথে যায় পাহাড়ে, ধরা দিয়েও দেয় না ধরা জানি না সে চায় কাহারে?
“সে যে পথের চির-পথিক, তার কি সহে ঘরের মায়া? / দূর হ’তে মা দূরন-রে ডাকে তাকে পথের ছায়া। / মাঠের পারে বনের মাঝে / চপল তাহার নূপুর বাজে, / ফুলের সাথে ফুটে বেড়ায়, মেঘের সাথে যায় পাহাড়ে, / ধরা দিয়েও দেয় না ধরা জানি না সে চায় কাহারে?”
সপ্তম স্তবকে ‘পথ-পাগলে’ রূপক। সে পথের চির-পথিক, তার ঘরের মায়া সহে না। দূর থেকে পথের ছায়া তাকে ডাকে। মাঠের পারে, বনের মাঝে তার চপল নূপুর বাজে। ফুলের সাথে ফুটে বেড়ায়, মেঘের সাথে যায় পাহাড়ে। ধরা দিয়েও ধরা দেয় না — জানি না সে চায় কাহারে?
অষ্টম স্তবক: মাগো আমায় শক্তি কোথায় পথ-পাগলে ধ’রে রাখার? তার তরে নয় ভালোবাসা সন্ধ্যা-প্রদীপ ঘরে ডাকার। তাই মা আমার বুকের কবাট খুলতে নারল তার করাঘাত, এ মন তখন কেমন যেন বাসত ভালো আর কাহারে, আমিই দূরে ঠেলে দিলাম অভিমানী ঘর-হারারে।
“মাগো আমায় শক্তি কোথায় পথ-পাগলে ধ’রে রাখার? / তার তরে নয় ভালোবাসা সন্ধ্যা-প্রদীপ ঘরে ডাকার। / তাই মা আমার বুকের কবাট / খুলতে নারল তার করাঘাত, / এ মন তখন কেমন যেন বাসত ভালো আর কাহারে, / আমিই দূরে ঠেলে দিলাম অভিমানী ঘর-হারারে।”
অষ্টম স্তবকে কবি তার অক্ষমতার কথা বলছেন। পথ-পাগলকে ধরে রাখার শক্তি তার কোথায়? তার জন্য ভালোবাসা নয় — সন্ধ্যা-প্রদীপ ঘরে ডাকার। তাই বুকের কবাট খুলতে পারেনি তার করাঘাত। মন তখন অন্য কাউকে ভালোবাসত। কবিই দূরে ঠেলে দিলেন অভিমানী ঘর-হারাকে।
নবম স্তবক: সোহাগে সে ধ’রতে যেত নিবিড় ক’রে বক্ষে চেপে, হতভাগী পারিয়ে যেতাম ভয়ে এ বুক উঠ্ত কেঁপে। রাজ ভিখারীর আঁখির কালো, দূরে থেকেই লাগ্ত ভালো, আসলে কাছে ক্ষুধিত তার দীঘল চাওয়া অশ্র”-ভারে। ব্যথায় কেমন মুষড়ে যেতাম, সুর হারাতাম মনে তরে।
“সোহাগে সে ধ’রতে যেত নিবিড় ক’রে বক্ষে চেপে, / হتوفاقী পারিয়ে যেতাম ভয়ে এ বুক উঠ্ত কেঁপে। / রাজ ভিখারীর আঁখির কালো, / দূরে থেকেই লাগ্ত ভালো, / আসলে কাছে ক্ষুধিত তার দীঘল চাওয়া অশ্র”-ভারে। / ব্যথায় কেমন মুষড়ে যেতাম, সুর হারাতাম মনে তরে।”
নবম স্তবকে কবি তার ভয়ের কথা বলছেন। সে সোহাগে নিবিড় করে বক্ষে চেপে ধরতে যেত, কবি ভয়ে বুক কেঁপে উঠত। রাজ-ভিখারীর আঁখির কালো দূরে থেকেই ভালো লাগত। কাছে এলে তার ক্ষুধিত দীর্ঘ চাওয়া অশ্রুভারে ব্যথায় মুষড়ে যেতেন, সুর হারাতেন মনে তরে।
দশম স্তবক: আজ কেন মা তারই মতন আমারো এই বুকের ক্ষুধা চায় শুধু সেই হেলায় হারা আদর-সোহাগ পরশ-সুধা, আজ মনে হয় তাঁর সে বুকে এ মুখ চেপে নিবিড় সুখে গভীর দুখের কাঁদন কেঁদে শেষ ক’রে দিই এ আমারে! যায় না কি মা আমার কাঁদন তাঁহার দেশের কানন-পারে?
“আজ কেন মা তারই মতন আমারো এই বুকের ক্ষুধা / চায় শুধু সেই হেলায় هارا আদর-সোহাগ পরশ-সুধা, / আজ মনে হয় তাঁর সে বুকে / এ মুখ চেপে نিবিড় সুখে / গভীর দুখের কাঁদন কেঁদে শেষ ক’রে দিই এ আমারে! / যায় না কি মা আমার কাঁদন তাঁহার দেশের কানন-পারে?”
দশম স্তবকে কবি তার বর্তমান অবস্থার কথা বলছেন। আজ তার বুকের ক্ষুধা চায় সেই হেলায় হারানো আদর-সোহাগের পরশ-সুধা। আজ মনে হয় — তাঁর বুকে মুখ চেপে নিবিড় সুখে গভীর দুখের কাঁদন কেঁদে শেষ করে দিতে নিজেকে। যায় না কি তার কাঁদন তাঁর দেশের কানন-পারে?
একাদশ স্তবক: আজ বুঝেছি এ-জনমের আমার নিখিল শানি–আরাম চুরি ক’রে পালিয়ে গেছে চোরের রাজা সেই প্রাণারাম। হে বসনে-র রাজা আমার! নাও এসে মোর হার-মানা-হারা! আজ যে আমার বুক ফেটে যায় আর্তনাদের হাহাকারে, দেখে যাও আজ সেই পাষাণী কেমন ক’রে কাঁদতে পারে!
“আজ বুঝেছি এ-জনমের আমার নিখিল শানি–আরাম / চুরি ক’রে পালিয়ে গেছে চোরের রাজা সেই প্রাণারাম। / হে বসনে-র রাজা আমার! / নাও এসে মোর হার-মানা-হারা! / আজ যে আমার বুক ফেটে যায় আর্তনাদের হাহাকারে, / দেখে যাও আজ সেই পাষাণী কেমন ক’রে কাঁদতে পারে!”
একাদশ স্তবকে কবি তার অনুশোচনার চরম পর্যায়ে পৌঁছেছেন। আজ বুঝেছেন — এই জন্মের তার নিখিল শান্তি-আরাম চুরি করে পালিয়ে গেছে চোরের রাজা সেই প্রাণারাম। তিনি তাকে ডাকছেন — বসনের রাজা! এসো, হার-মানা-হারাকে নাও। আজ তার বুক ফেটে যায় আর্তনাদের হাহাকারে — দেখে যাও আজ সেই পাষাণী কেমন করে কাঁদতে পারে!
দ্বাদশ স্তবক: তোমার কথাই সত্য হ’ল পাষাণ ফেটেও রক্ত বহে, দাবাললের দার”ণ দাহ তুষার-গিরি আজকে দহে। জাগল বুকে ভীষণ জোয়ার, ভাঙল আগল ভাঙল দুয়ার মূকের বুকে দেব্তা এলেন মুখর মুখে ভীম পাথারে। বুক ফেটেছে মুখ ফুটেছে-মাগো মানা ক’র্ছ কারে?
“তোমার কথাই সত্য হ’ল পাষাণ ফেটেও রক্ত বহে, / দাবাললের দার”ণ দাহ তুষার-গিরি আজকে দহে। / জাগল বুকে ভীষণ জোয়ার, / ভাঙল আগল ভাঙল দুয়ার / মূকের বুকে দেব্তা এলেন মুখর মুখে ভীম পাথারে। / বুক ফেটেছে মুখ ফুটেছে-মাগো মানা ক’র্ছ কারে?”
দ্বাদশ স্তবকে একটি শক্তিশালী ঘোষণা। ‘পাষাণ ফেটেও রক্ত বহে’ — পাথর ফাটলেও রক্ত বের হয় — এটি সত্য। দাবানলের দারুণ দাহ তুষার-গিরি আজকে দহে। বুকে ভীষণ জোয়ার জাগল, আগল-দুয়ার ভাঙল। মূকের বুকে দেবতা এলেন মুখর মুখে ভীম পাথারে। বুক ফেটেছে, মুখ ফুটেছে — এখন মানা করবে কে?
ত্রয়োদশ স্তবক: স্বর্গ আমার গেছে পুড়ে তারই চ’লে যাওয়ার সাথে, এখন আমার একার বাসার দোসরহীন এই দুঃখ-রাতে। ঘুম ভাঙাতে আস্বে না সে ভোর না হ’তেই শিয়র-পাশে, আস্বে না আর গভীর রাতে চুম-চুরির অভিসারে, কাঁদাবে ফিরে তাঁহার সাথী ঝড়ের রাতি বনের পারে।
“স্বর্গ আমার গেছে পুড়ে তারই চ’লে যাওয়ার সাথে, / এখন আমার একার বাসার দোসরহীন এই দুঃখ-রাতে। / ঘুম ভাঙাতে আস্বে না সে / ভোর না হ’তেই শিয়র-পাশে, / আস্বে না আর গভীর রাতে চুম-চুরির অভিসারে, / কাঁদাবে ফিরে তাঁহার সাথী ঝড়ের রাতি বনের পারে।”
ত্রয়োদশ স্তবকে হারানোর পরের অবস্থা। স্বর্গ পুড়ে গেছে তার চলে যাওয়ার সাথে। এখন একার বাসার দোসরহীন এই দুঃখ-রাতে। ঘুম ভাঙাতে আসবে না সে ভোর না হতেই শিয়র-পাশে। আসবে না আর গভীর রাতে চুম-চুরির অভিসারে। কাঁদাবে ফিরে তার সাথী ঝড়ের রাতি বনের পারে।
চতুর্দশ স্তবক: আজ পেলে তাঁয় হুম্ড়ি খেয়ে প’ড়তুম মাগো যুগল পদে, বুকে ধ’রে পদ-কোকনদ স্নান করাতাম আঁখির হ্রদে। ব’সতে দিতাম আধেক আঁচল, সজল চোখের চোখ-ভরা জল- ভেজা কাজল মুছতাম তার চোখে মুখে অধর-ধারে, আকুল কেশে পা মুছাতাম বেঁধে বাহুর কারাগারে।
“আজ পেলে তাঁয় হুম্ড়ি খেয়ে প’ড়তুম মাগো যুগল পদে, / বুকে ধ’রে পদ-কোকনদ স্নান করাতাম আঁখির হ্রদে। / ব’সতে দিতাম আধেক আঁচল, / সজল চোখের চোখ-ভরা জল- / ভেজা কাজল মুছতাম তার চোখে মুখে অধর-ধারে, / আকুল কেশে পা মুছাতাম বেঁধে বাহুর কারাগারে।”
চতুর্দশ স্তবকে কবি কল্পনা করছেন — আজ যদি তাকে পেতেন, হুমড়ি খেয়ে পড়তেন যুগল পদে। বুকে ধরে পদ-কোকনদ স্নান করাতেন আঁখির হ্রদে। বসতে দিতেন আধেক আঁচল, সজল চোখের চোখ-ভরা জল ভেজা কাজল মুছতেন তার চোখে মুখে অধর-ধারে, আকুল কেশে পা মুছাতেন বেঁধে বাহুর কারাগারে।
পঞ্চদশ স্তবক: দেখ্তে মাগো তখন তোমার রাক্ষুসী এই সর্বনাশী, মুখ থুয়ে তাঁর উদার বুকে ব’লত,’ আমি ভালোবাসি!’ ব’ল্তে গিয়ে সুখ-শরমে লাল হ’য়ে গাল উঠত ঘেমে, বুক হ’তে মুখ আস্ত নেমে লুটিয়ে যখন কোল-কিনারে, দেখ্তুম মাগো তখন কেমন মান ক’রে সে থাক্তে পারে!
“দেখ্তে মাগো তখন তোমার রাক্ষুসী এই সর্বনাশী, / মুখ থুয়ে তাঁর উদার বুকে ব’লত,’ আমি ভালোবাসি!’ / ব’ল্তে গিয়ে সুখ-শরমে / لال হ’য়ে গাল উঠত ঘেমে, / বুক হ’তে মুখ আস্ত নেমে لুটিয়ে যখন কোল-কিনারে, / দেখ্তুম মাগো তখন কেমন মান ক’রে সে থাক্তে পারে!”
পঞ্চদশ স্তবকে কবি আরেকটি কল্পনা। তখন তার রাক্ষুসী সর্বনাশী রূপ দেখতে। মুখ থুয়ে তাঁর উদার বুকে বলতেন — ‘আমি ভালোবাসি!’ বলতে গিয়ে সুখ-শরমে গাল লাল হয়ে ঘেমে উঠত। বুক থেকে মুখ নামতে নামতে লুটিয়ে যখন কোল-কিনারে, তখন দেখতেন কেমন মান করে সে থাকতে পারে!
ষোড়শ স্তবক: এম্নি এখন কতই আমা ভালোবাসার তৃষ্ণা জাগে তাঁর ওপর মা অভিমানে, ব্যাথায়, রাগে, অনুরাগে। চোখের জলের ঋণী ক’রে, সে গেছে কোন্ দ্বীপান-রে? সে বুঝি মা সাত সমুদ্দুর তের নদীর সুদূরপারে? ঝড়ের হাওয়া সেও বুঝি মা সে দূর-দেশে যেতে নারে?
“এম্নি এখন কতই আমা ভালোবাসার তৃষ্ণা জাগে / তাঁর ওপর মা অভিমানে, ব্যাথায়, রাগে, অনুরাগে। / চোখের জলের ঋণী ক’রে, / সে গেছে কোন্ দ্বীপান-রে? / সে বুঝি মা সাত সমুদ্দুর تیر নদীর সুদূরপারে? / ঝড়ের হাওয়া সেও বুঝি মা সে দূর-দেশে যেতে ناره?”
ষোড়শ স্তবকে কবি তার বর্তমান তৃষ্ণা ও তার সন্ধানের কথা বলছেন। এখন কত ভালোবাসার তৃষ্ণা জাগে তাঁর ওপর — অভিমানে, ব্যথায়, রাগে, অনুরাগে। চোখের জলের ঋণী করে সে গেছে কোন দ্বীপানে? সে বুঝি সাত সমুদ্র তের নদীর সুদূর পারে? ঝড়ের হাওয়া সেও বুঝি সে দূর-দেশে যেতে পারে না?
সপ্তদশ স্তবক: তারে আমি ভালোবাসি সে যদি তা পায় মা খবর, চৌচির হ’য়ে প’ড়বে ফেটে আনন্দে মা তাহার কবর। চীৎকারে তার উঠবে কেঁপে ধরার সাগর অশ্র” ছেপে, উঠবে ক্ষেপে অগ্নি-গিরি সেই পাগলের হুহুঙ্কারে, ভূধর সাগর আকাশ বাতাস ঘুর্ণি নেচে ঘিরবে তারে।
“তারে আমি ভালোবাসি সে যদি তা পায় মা খবর, / চৌচির হ’য়ে প’ড়বে ফেটে আনন্দে মা তাহার কবর। / চীৎকারে তার উঠবে কেঁপে / ধরার সাগর অশ্র” ছেপে, / উঠবে ক্ষেপে অগ্নি-গিরি সেই পাগলের হুহুঙ্কারে, / ভূধর সাগর আকাশ বাতাস ঘুর্ণি নেচে ঘিরবে তারে।”
সপ্তদশ স্তবকে একটি চরম কল্পনা। তাকে ভালোবাসার খবর যদি সে পায়, তাহলে চৌচির হয়ে ফেটে পড়বে আনন্দে তার কবর। চীৎকারে উঠবে কেঁপে ধরার সাগর অশ্রু ছেপে। উঠবে ক্ষেপে অগ্নি-গিরি সেই পাগলের হুহুঙ্কারে। ভূধর, সাগর, আকাশ, বাতাস — ঘূর্ণি নেচে তাকে ঘিরবে।
অষ্টাদশ স্তবক: ছি, মা! তুমি ডুকরে কেন উঠছ কেঁদে অমন ক’রে? তার চেয়ে মা তারই কোনো শোনা-কথা শুনাও মোরে! শুনতে শুনতে তোমার কোলে ঘুমিয়ে পড়ি। – ও কে খোলে দুয়ার ওমা? ঝড় বুঝি মা তারই মতো ধাক্কা মারে? ঝোড়ো হওয়া! ঝোড়ো হাওয়া! বন্ধু তোমার সাগর পারে!
“ছি, মা! তুমি ডুকরে কেন উঠছ কেঁদে অমন ক’রে? / তার চেয়ে মা তারই কোনো শোনা-কথা শুনাও মোরে! / শুনতে শুনতে তোমার কোলে / ঘুমিয়ে পড়ি। – ও কে খোলে / দুয়ার ওমা? ঝড় বুঝি মা তারই মতো ধাক্কা মারে? / ঝোড়ো হওয়া! ঝোড়ো হাওয়া! বন্ধু তোমার সাগর পারে!”
অষ্টাদশ স্তবকে কবি মাকে সম্বোধন করছেন। মা, তুমি ডুকরে কাঁদছ কেন? তার চেয়ে তার কোনো শোনা-কথা শুনাও তাকে। শুনতে শুনতে তোমার কোলে ঘুমিয়ে পড়ি। ও কে খোলে দোয়ার? ঝড় বুঝি তারই মতো ধাক্কা মারে? ঝোড়ো হাওয়া! বন্ধু তোমার সাগর পারে!
ঊনবিংশ স্তবক: সে কি হেথায় আসতে পারে আমি যেথায় আছি বেঁচে, যে দেশে নেই আমার ছায়া এবার সে সেই দেশে গেছে! تবু কেন থাকি’ থাকি’, ইচ্ছা করে তারেই ডাকি! যে কথা মোর رইল বাকী হায় যে কথা শুনাই কারে? মাগো আমার প্রাণের কাঁদন আছড়ে মরে বুকের দ্বারে!
“সে কি হেথায় আসতে পারে আমি যেথায় আছি বেঁচে, / যে দেশে নেই আমার ছায়া এবার সে সেই দেশে গেছে! / تবু কেন থাকি’ থাকি’, / ইচ্ছা করে তারেই ডাকি! / যে কথা মোর رইল বাকী হায় যে কথা শুনাই কারে? / مাগো আমার প্রাণের কাঁদন আছড়ে মরে বুকের দ্বারে!”
ঊনবিংশ স্তবকে কবি বাস্তবতার স্মরণ করছেন। সে কি এখানে আসতে পারে যেখানে তিনি বেঁচে আছেন? যে দেশে নেই তার ছায়া — এবার সে সেই দেশে গেছে! তবু কেন থাকি থাকি, ইচ্ছা করে তাকে ডাকি! যে কথা তার বাকি রইল — হায়, যে কথা কাকে শোনায়? মাগো, তার প্রাণের কাঁদন আছড়ে মরে বুকের দ্বারে!
বিংশ স্তবক: যাই তবে মা! দেকা হ’লে আমার কথা ব’লো তারে- রাজার পূজা-সে কি কভু ভিখারিনী ঠেলতে পারে? মাগো আমি জানি জানি, আসবে আবার অভিমানী খুঁজতে আমায় গভীর রাতে এই আমাদের কুটীর-দ্বারে, ব’লো তখন খুঁজতে তারেই হারিয়ে গেছি অন্ধকারে!
“যাই তবে মা! دیکা হ’লে আমার কথা ব’লো তারে- / রাজার পূজা-সে কি কভু ভিখারিনী ঠেলতে পারে? / مাগো আমি জানি জানি, / আসবে আবার অভিমানী / খুঁজতে আমায় গভীর রাতে এই আমাদের কুটীর-দ্বারে, / ب’লো তখন খুঁজতে তারেই হারিয়ে গেছি অন্ধকারে!”
বিংশ স্তবক — শেষ স্তবক — পুরো কবিতার চূড়ান্ত বার্তা। যাই তবে মা! দেখা হলে তারে বলো — রাজার পূজা কি কখনো ভিখারিনী ঠেলতে পারে? মাগো, আমি জানি জানি — আসবে আবার অভিমানী খুঁজতে আমায় গভীর রাতে এই আমাদের কুটীর-দ্বারে। বলো তখন — খুঁজতে তারেই হারিয়ে গেছি অন্ধকারে!
কবিতার গঠনশৈলী, ছন্দ ও শিল্পরূপ
কবিতাটি বিশটি স্তবকে বিভক্ত। ভাষা অত্যন্ত সরল, আবেগময় ও ছন্দময়। নজরুলের নিজস্ব ছন্দ ও মিলের বৈশিষ্ট্য এই কবিতায় প্রকট। প্রতিটি স্তবকের শেষে প্রায় ‘মা’ সম্বোধনটি এসেছে — এটি কবিতাকে একটি আবেদনময় ও আকুল সুর দিয়েছে।
কবিতার ভাষা অত্যন্ত সংবেদনশীল, সঙ্গীতময় এবং আবেগপ্রবণ, যা নজরুলের স্বকীয় কাব্যশৈলীকে প্রতিফলিত করে। ‘রাজ-ভিখারী’, ‘পথ-পাগলে’, ‘বুকের ক্ষুধা’, ‘পাষাণ ফেটেও রক্ত বহে’, ‘ঝড়ের হাওয়া’ — এই সকল রূপক কবিতাকে একটি গভীর মানবিক মাত্রা দিয়েছে।
পুনরাবৃত্তি — ‘মা’ সম্বোধনটি বারবার এসেছে, যা কবির আকুতি ও অনুশোচনাকে জোরালো করেছে। ‘জানি জানি’ — পুনরাবৃত্তি, আত্মবিশ্বাস ও আশার সুর।
শেষের ‘বলো তখন খুঁজতে তারেই হারিয়ে গেছি অন্ধকারে!’ — এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও অনিশ্চিত সমাপ্তি। কবি তার প্রিয়জনকে জানাতে বলছেন — সে যেন তাকে খুঁজতে না পায়, কারণ সে হারিয়ে গেছে অন্ধকারে। এটি এক চরম আত্মবিসর্জন ও করুণ সমাপ্তি।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য ও দার্শনিক মাত্রা
“অবেলার ডাক” কাজী নজরুল ইসলামের এক অসাধারণ সৃষ্টি। এটি অতীত ভালোবাসা, হারানোর বেদনা এবং অনুশোচনার গভীর অনুভূতির এক অসাধারণ কাব্যচিত্র।
কবি স্বীকার করছেন — তিনি তখন যাকে ভালোবাসতে পারেননি, আজ অবেলায় তার স্মৃতি বারবার মনে পড়ছে। তিনি সেই মানুষটিকে ‘রাজ-ভিখারী’, ‘পথ-পাগলে’, ‘রাজাধিরাজ’ নামে ডাকছেন। তিনি বুঝতে পেরেছেন — একজন মহান মানুষ তাকে ভালোবেসেছিলেন, কিন্তু তিনি তাকে চিনতে পারেননি, তার মূল্য দিতে পারেননি। তিনি তাঁর ভালোবাসাকে পায়ে দলেছেন, তাঁকে বিদায় দিয়েছেন। আজ তিনি অনুশোচনায় পুড়ছেন। তিনি তাকে খুঁজছেন — কিন্তু তিনি হয়ত সাত সমুদ্র তের নদীর পারে চলে গেছেন। শেষ পর্যন্ত তিনি মাকে বলছেন — দেখা হলে তাকে জানাতে, তিনি হারিয়ে গেছেন অন্ধকারে।
এই কবিতা আমাদের শেখায় — ভালোবাসাকে সঠিক সময়ে চিনতে হয়, মূল্য দিতে হয়। দেরি হয়ে গেলে কেবল অনুশোচনাই থাকে। রাজার পূজা ভিখারিনী ঠেলে দিতে পারে না — কিন্তু সেই ভিখারিনী যদি রাজাকে চিনতে না পারে, তবে তার অনুশোচনা অনন্ত।
কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় প্রেম, অনুশোচনা ও আত্মসমালোচনা
কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় প্রেম, অনুশোচনা ও আত্মসমালোচনা একটি পুনরাবৃত্ত বিষয়। তিনি ‘অবেলার ডাক’ কবিতায় এই ধারণাগুলোকে এক চরম মাত্রায় নিয়ে গেছেন। তিনি দেখিয়েছেন — কীভাবে একজন মানুষ তার অতীতের ভুল বুঝতে পারে, কীভাবে সে হারানো ভালোবাসার জন্য অনুশোচনা করে, কীভাবে সে নিজেকে অভিশাপ দেয়, এবং কীভাবে সে শেষ পর্যন্ত আশা করে যে হয়তো প্রিয়জন ফিরে আসবে — কিন্তু সেই আশাও অনিশ্চিত।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলা সাহিত্যের পাঠ্যক্রমে কাজী নজরুল ইসলামের ‘অবেলার ডাক’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত থাকার যোগ্য। এই কবিতাটি শিক্ষার্থীদের প্রেম ও বিরহের গভীর অনুভূতি, রূপক ব্যবহারের কৌশল, আত্মসমালোচনার মনস্তত্ত্ব, এবং নজরুলের আবেগময় কাব্যশৈলী সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করে।
অবেলার ডাক সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: ‘অবেলার ডাক’ কবিতাটির লেখক কে?
এই কবিতাটির লেখক কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি বাংলাদেশের জাতীয় কবি এবং বিদ্রোহী কবি হিসেবে খ্যাত।
প্রশ্ন ২: কবিতাটি কোন সাহিত্যধারায় পড়ে?
এটি বাংলা সাহিত্যের রোমান্টিক ও গীতি কবিতার ধারার অন্তর্গত একটি কালজয়ী রচনা। এটি প্রেম, কষ্ট এবং হারানোর অনুশোচনার আবেগ নিয়ে লেখা একটি কবিতা।
প্রশ্ন ৩: কবিতার মূল রূপক কী কী?
রাজ-ভিখারী, পথ-পাগলে, বুকের ক্ষুধা, পাষাণ, ঝড়ের হাওয়া等重要 রূপক ব্যবহৃত হয়েছে।
প্রশ্ন ৪: কবিতাটির প্রথম লাইন কী?
কবিতাটির প্রথম লাইন: “অনেক ক’রে বাসতে ভালো পারিনি মা তখন যারে, আজ অবেলায় তারেই মনে পড়ছে কেন বারে বারে।”
প্রশ্ন ৫: কবিতাটির মূল বিষয়বস্তু কী?
কবিতাটির মূল বিষয়বস্তু হলো অতীত ভালোবাসার জন্য অনুশোচনা, হারানোর বেদনা এবং অকাল স্মৃতির মর্মবেদনা।
প্রশ্ন ৬: কবিতায় ‘রাজ-ভিখারী’ রূপকের তাৎপর্য কী?
রাজ-ভিখারী রূপকটি ভালোবাসার ব্যক্তির দ্বৈত সত্তা নির্দেশ করে – যিনি আত্মিকভাবে রাজার মতো মহান কিন্তু ভালোবাসায় ভিখারীর মতো নম্র ও বিনয়ী।
প্রশ্ন ৭: ‘অবেলার ডাক’ শিরোনামের তাৎপর্য কী?
‘অবেলা’ — অসময়, ভুল সময়। ‘ডাক’ — আহ্বান। কবি এখন অবেলায় (ভুল সময়ে) তাকে ডাকছেন — যাকে তিনি তখন সঠিক সময়ে ভালোবাসতে পারেননি। এটি একটি অকাল অনুশোচনা ও অতীত ভালোবাসার স্মৃতির নির্দেশক।
প্রশ্ন ৮: ‘পাষাণ ফেটেও রক্ত বহে’ — লাইনটির গভীরতা কী?
এটি একটি শক্তিশালী ঘোষণা। পাথর ফাটলেও রক্ত বের হয় — অর্থাৎ কঠোর হৃদয়ও একসময় আবেগপ্রবণ হয়, ভাঙে। কবি এখন সেই অবস্থায় পৌঁছেছেন।
প্রশ্ন ৯: কবিতার শেষ লাইনের তাৎপর্য কী?
শেষ লাইন — “বলো তখন খুঁজতে তারেই হারিয়ে গেছি অন্ধকারে!” কবি তার প্রিয়জনকে জানাতে বলছেন — সে যেন তাকে খুঁজতে না পায়, কারণ সে হারিয়ে গেছে অন্ধকারে। এটি এক চরম আত্মবিসর্জন ও করুণ সমাপ্তি।
প্রশ্ন ১০: কবিতার মূল শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা কী?
কবিতাটি আমাদের শেখায় — ভালোবাসাকে সঠিক সময়ে চিনতে হয়, মূল্য দিতে হয়। দেরি হয়ে গেলে কেবল অনুশোচনাই থাকে। রাজার পূজা ভিখারিনী ঠেলে দিতে পারে না — কিন্তু সেই ভিখারিনী যদি রাজাকে চিনতে না পারে, তবে তার অনুশোচনা অনন্ত। আজকের দিনে, যখন মানুষ দ্রুত সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলে, এই কবিতা ভালোবাসার মূল্য ও সময়োপযোগিতা সম্পর্কে চিন্তা করতে বাধ্য করে।
ট্যাগস: অবেলার ডাক, কাজী নজরুল ইসলাম, কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, প্রেম ও বিরহের কবিতা, অনুশোচনার কবিতা, নজরুলের অবেলার ডাক
© Kobitarkhata.com – কবি: কাজী নজরুল ইসলাম | কবিতার প্রথম লাইন: “অনেক ক’রে বাসতে ভালো পারিনি মা তখন যারে, আজ অবেলায় তারেই মনে পড়ছে কেন বারে বারে” | প্রেম, অনুশোচনা ও হারানোর অসাধারণ কাব্যভাষা | আধুনিক বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন