কবিতার খাতা
তুমি দেখে নিয়ো – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী।
একে একে বানিয়ে তুলব সব, তুমি দেখে নিয়ো।
বাড়িঘর, খেতখামার,
উঠোনে লাউয়ের মাচা, জানলার পাশে
লতানে জুঁইয়ের ঝাড় –
একে একে সমস্ত বানাবো, তুমি
দেখে নিয়ো
দক্ষিণে পুকুর থাকলে ভাল হয়, তুমি বলেছিলে।
অবশ্য থাকবে।
পুকুরে হাঁসের স্নান দেখতে চাও, সে আর এমন
কী বেশী কথা,
সাদা ও বাদামী হাঁস ছেড়ে দেব।
যা চাও সমস্ত হবে,
একই সঙ্গে হয়ত হবে না, কিন্তু
একে-একে হবে।
ভালবাসা থাকলে সব হয়।
দেখো, সব হবে।
যা-কিছু বানানো যায়, আমি সব
দুই হাতে
দিনে-দিনে বানিয়ে তুলব, তুমি দেখে নিয়ো।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতা।
কবিতার কথা –
আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম নিভৃত ও মায়াবী কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ‘তুমি দেখে নিয়ো‘ কবিতাটি পরম ভালোবাসা, ধৈর্য, আত্মবিশ্বাস এবং স্বপ্নের এক একটি ছোট ছোট ইট দিয়ে সুন্দর এক সংসার ও ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার এক পরম সংবেদনশীল আখ্যান। এটি কোনো জাঁকজমকপূর্ণ বা রূপকথার কোনো বিশাল প্রাসাদ গড়ার প্রতিশ্রুতি নয়; বরং এটি অত্যন্ত নিভৃত, মাটির কাছাকাছি থাকা এক সাধারণ মানুষের ভালোবাসার ওপর ভর করে সুন্দর একটি জীবন সাজানোর এক নিটোল আলেখ্য।
কবিতার প্রারম্ভেই এক পরম প্রত্যয় ও আস্থার সুর ধ্বনিত হয়। কবি তাঁর প্রিয়তমাকে উদ্দেশ্য করে বলছেন যে, তিনি নিজ হাতেই একে একে জীবনের সমস্ত স্বপ্ন সাজিয়ে তুলবেন। খুব বড় কোনো বৈভব না হলেও, সেখানে থাকবে একটি ছোট্ট নিবিড় বাড়িঘর, ধান-ফসলের খেতখামার, উঠোনে একটি সবুজ লাউয়ের মাচা আর শোবার ঘরের জানলার পাশে মিষ্টি সুবাস ছড়ানো লতানে জুঁইয়ের ঝাড়। কবির এই দৃঢ় ও বিনম্র উচ্চারণ—”একে একে সমস্ত বানাবো, তুমি দেখে নিয়ো”—প্রিয়তমার কাছে কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, বরং ভালোবাসার এক পরম নির্ভরতা।
কবিতার মধ্যভাগে ফুটে ওঠে প্রিয়তমার ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেওয়ার এবং তাঁর জীবনের ছোট ছোট পছন্দগুলোকে পূর্ণতা দেওয়ার এক অপরূপ ব্যাকুলতা। কবি স্মৃতিচারণ করে মনে করেন, প্রিয়তমা একদিন বলেছিল—বাড়ির দক্ষিণে একটি পুকুর থাকলে খুব ভালো হয়। কবি অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল ভঙ্গিতে সেই আবদার মেনে নিয়ে বলেন—পুকুর অবশ্যই থাকবে। আর সেই পুকুরে যদি সে সাদা ও বাদামী রঙের হাঁসের জলকেলি ও স্নান দেখতে চায়, তবে তা-ও হবে; কবি নিজেই সেখানে সেই মায়াবী হাঁসগুলো এনে ছেড়ে দেবেন। জীবনের এই ছোট ছোট সাধারণ ইচ্ছেগুলো পূর্ণ করার মাঝেই যে পরম আনন্দ লুকিয়ে থাকে, কবিতাটিতে তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
পরবর্তী চরণে কবি এক পরম জীবনদর্শনের মুখোমুখি দাঁড়ান। তিনি বাস্তবতার কঠিন রূপটিকে অস্বীকার করেননি। তিনি জানেন, জীবনের সমস্ত চাওয়া বা স্বপ্ন হয়তো একদিনে বা একসাথে পূরণ করা সম্ভব নয়; কিন্তু তাই বলে পিছিয়ে যাওয়ারও কোনো সুযোগ নেই। অল্প অল্প করে, ধাপে ধাপে, এক একটি স্বপ্ন সত্য হয়ে উঠবে। কারণ কবি বিশ্বাস করেন—“ভালবাসা থাকলে সব হয়।” খাঁটি প্রেম ও মনের ইচ্ছা থাকলে জীবনের সব প্রতিকূলতা জয় করে সুন্দর একটি ভবিষ্যৎ তৈরি করা সম্ভব।
সমাপ্তির চরণে কবিতাটি এক পরম আত্মনিবেদন ও সৃষ্টির আনন্দে গিয়ে পূর্ণতা পায়। কবি পরম আস্থায় প্রিয়তমাকে আশ্বাস দেন যে, ভালোবাসার শক্তিতে বলীয়ান হয়ে তিনি তাঁর নিজের দুই হাতে দিনে দিনে সবকিছু নতুন করে গড়ে তুলবেন।
ভালোবাসার অলৌকিক শক্তি, যৌথ জীবনের সুন্দর একটি স্বপ্ন এবং সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার জন্য একজন প্রেমিকের যে নিরলস প্রয়াস ও অবিচল আস্থা—তারই এক অত্যন্ত স্নিগ্ধ, সুকোমল ও কাব্যিক রূপায়ণ ঘটেছে এই কালজয়ী কবিতায়।






