স্বদেশ আমার – শুভ দাশগুপ্ত।

একটা মাতাল বললো :
স্-শালা, দেশটা গোল্লায় চলে যাচ্ছে।
বাচ্চা বাচ্চা ছেলেরা দেখি
আজকাল মাল খাচ্ছে।

এক জন্মান্ধ ভদ্রলোক বললেন :
ভাগ্যে চোখে দেখি না-
এ শালার দেশের একশ কোটি
হাঁদা-ভোঁদারা এত পাপ দেখছে কী করে!

ব্যাঙ্কের কেরানী গেছেন ইলেকট্রিকের বিল জমা দিতে :
দাদা, তাড়াতাড়ি করুন না৷ বসে বসে গল্প করছেন
অথচ কাজ করছেন না – এতো ন্যাশানাল ক্রাইম।
বিলবাবু বলে উঠলেন :
গত সপ্তাহে নিজের টাকা তুলতে গেছিলাম ব্যাঙ্কে
তখন ইণ্ডিয়ার ওয়ানডে চলছিল-
ঝাড়া পঁয়তাল্লিশ মিনিট দাঁড় করিয়ে রেখে আপনারা
রিলে শুনছিলেন – এখন কেন?
দ্যাখ কেমন লাগে! হাঃ হাঃ হাঃ।

শাসকদল ঘোষণা করে দিল : হকার হঠাও।
তারপর লাঠি-পুলিশ-জলকামান-বুলডোজার।
বিরোধিরা রে রে করে পথে নামলেন : এ কী অমানবিকতা।
আমরাই হকার হব – বলে নেতা-নেত্রীরা
ফুটপাতে বসে জামা-কাপড় বিক্রি করলেন – কাগজে
টিভিতে গরমাগরম ছবি হল।

বছর ঘুরতে বিরোধিরা ক্ষমতায় এসে বললেন :
শহরকে সুন্দর করতে হবে – হকার ওঠাও।
এবার বিরোধিরা, যারা আগে শাসক ছিলেন
বললেন : মামদোবাজি! এতগুলো লোক কি না খেয়ে মরবে?

এক শিক্ষক আর এক অধ্যাপককে বললেন :
এরা দেখছি রাজনীতির ভেতরেও পলিটিক্স ঢুকিয়ে ছাড়ল।
এ দেশের কী হবে?

আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। শুভ দাশগুপ্তের কবিতা।

কবিতার কথা –

আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম তীক্ষ্ণ ও সামাজিক-রাজনৈতিক সচেতন কবি শুভ দাশগুপ্তের ‘স্বদেশ আমার’ কবিতাটি স্বাধীনোত্তর দেশের সামাজিক অবক্ষয়, ভণ্ডামি, পারস্পরিক দোষারোপের সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক দ্বিমুখী নীতি ও দেউলিয়াত্বের এক তীব্র ব্যঙ্গাত্মক (Satirical) ও বাস্তবসম্মত আখ্যান। কবি এখানে কোনো অলংকারময় কাব্যের চাদরে সত্যকে না ঢেকে, সমাজের বিভিন্ন পেশা ও স্তরের মানুষের প্রতিদিনের আচার-ব্যবহার ও চরিত্র উন্মোচনের মাধ্যমে আধুনিক স্বদেশের এক কঙ্কালসার চিত্র তুলে ধরেছেন।

কবিতার প্রারম্ভেই কবি সমাজের তথাকথিত নৈতিকতার অবক্ষয় ও দ্বিচারিতাকে ধরেছেন হাস্যরসের ছলে। একজন মাতাল নিজে মদ্যপ হয়েও আফসোস করে বলে যে দেশটা নাকি গোল্লায় যাচ্ছে, কারণ আজকাল ছোট ছোট ছেলেরাও মদ খাচ্ছে! নিজের অপরাধকে আড়াল করে অন্যের দোষ খোঁজার যে সার্বজনীন প্রবণতা, এই চরিত্রটি তারই প্রতীক। অন্যদিকে, এক জন্মান্ধ ব্যক্তি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলেন যে ভাগ্যিস তিনি চোখে দেখেন না! কিন্তু একই সাথে তিনি দেশের একশো কোটি চোখের দেখা মানুষকে ব্যঙ্গ করে প্রশ্ন তোলেন—তারা চারপাশের এতসব পাপ-অনাচার কীভাবে প্রতিদিন সহ্য করছে?

কবিতার মধ্যভাগে ফুটে উঠেছে আমাদের নাগরিক জীবনের প্রাত্যহিক অনাচার ও চরম প্রতিশোধপরায়ণ মনোভাব। ইলেকট্রিকের বিল জমা দিতে গিয়ে এক ব্যাংকের কেরানি যখন দ্রুত কাজ করার দাবি তুলে দায়িত্ব পালনে বিলম্ব করাকে “ন্যাশানাল ক্রাইম” বা জাতীয় অপরাধ বলে মন্তব্য করেন, তখন বিল কাউন্টারের বাবুটি পরম আনন্দে অতীতের প্রতিশোধ নেন। বিলবাবু মনে করিয়ে দেন, গত সপ্তাহে ভারতে একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ চলাকালে ব্যাংকে নিজের টাকা তুলতে গিয়ে সেই কেরানি তাঁকে ৪৫ মিনিট দাঁড় করিয়ে রেখে রেডিওতে রিলে শুনছিলেন! নাগরিক জীবনের এই যে স্বার্থপরতা—নিজের বেলায় নিয়ম শিথিল আর অন্যের বেলায় জাতীয় অপরাধের দোহাই দেওয়া—কবি তা অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

পরবর্তী অংশে কবিতার সবচেয়ে জোরালো প্রহারটি করা হয়েছে দেশের ভণ্ড রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর। ক্ষমতার হাতবদলের সাথে সাথে দলগুলোর চরিত্র কীভাবে ১৮০ ডিগ্রি বদলে যায়, কবি তা হকার উচ্ছেদ অভিযানের মধ্য দিয়ে উন্মোচন করেছেন:

  • শাসকদলের নীতি: তৎকালীন শাসকদল শহর পরিষ্কারের দোহাই দিয়ে “হকার হঠাও” অভিযান শুরু করে লাঠি, পুলিশ, জলকামান ও বুলডোজার নামিয়ে দেয়।
  • বিরোধীদলের নাটক: বিরোধীরা একে “অমানবিকতা” বলে চিৎকার তুলে পথে নেমে পড়ে। সংহতি জানানোর নাটক হিসেবে নেতা-নেত্রীরা ফুটপাতে বসে জামাকাপড় বিক্রি করে টিভিতে ও পত্রিকায় ছবি তোলার গরমাগরম রাজনীতি জমিয়ে তোলেন।
  • ক্ষমতা বদলের খেলা: বছর ঘুরে বিরোধীরা যখন নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসে, তখন তাদের সুর বদলে যায়—তারাও ঘোষণা করে “শহর সুন্দর করতে হকার ওঠাও”। আর আগের শাসকদল (যারা এখন বিরোধী) অমনি সুযোগ বুঝে মানবতাবাদের ঢোল পিটিয়ে বলে—এতগুলো লোক কি না খেয়ে মরবে?

সমাপ্তির চরণে কবিতাটি চরম একটি হাহাকার ও নিরুপায় বাস্তবতায় এসে থিতু হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর এই নগ্ন ভণ্ডামি, নীতিহীনতা ও জনস্বার্থ নিয়ে ছিনিমিনি খেলা দেখে এক শিক্ষক অন্য এক অধ্যাপককে অত্যন্ত হতাশ হয়ে বলেন—”এরা দেখছি রাজনীতির ভেতরেও পলিটিক্স ঢুকিয়ে ছাড়ল। এ দেশের কী হবে?”

রাজনীতি যেখানে গণমানুষের সেবার মাধ্যম হওয়ার কথা ছিল, তা আজ সস্তা ‘পলিটিক্স’ বা কুটিল চক্রান্তে রূপ নিয়েছে। আমলাতন্ত্রের অলসতা, সাধারণ মানুষের আত্মকেন্দ্রিকতা এবং নীতিহীন রাজনীতির চক্রে পিষ্ট আমাদের স্বদেশের করুণ ও নির্জীব দশাকেই কবি এক পরম শ্লেষ, রস ও বাস্তবতার ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলেছেন।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x