কবিতার খাতা
এই শীতে – বুদ্ধদেব বসু।
আমি যদি ম’রে যেতে পারতুম
এই শীতে,
গাছ যেমন ম’রে যায়,
সাপ যেমন ম’রে থাকে
সমস্ত দীর্ঘ শীত ভ’রে।
শীতের শেষে গাছ নতুন হ’য়ে ওঠে
শিকড় থেকে ঊর্ধ্বে বেয়ে ওঠে তরুণ প্রাণরস,
ফুটে ওঠে চিক্কণ সবুজ পাতায়-পাতায়
আর অজস্র উদ্ধত ফুলে।
আর সাপ ঝরিয়ে দেয় তার খোলশ,
তার নতুন চামড়া শঙ্খের মতো কাজ-করা;
তার জিহ্বা ছুটে বেরিয়ে আসে আগুনের শিখার মতো,
যে-আগুন ভয় জানে না।
কেননা তারা ম’রে থাকে
সমস্ত দীর্ঘ শীত ভ’রে
কেননা তারা মরতে জানে।
যদি আমিও ম’রে থাকতে পারতুম—-
যদি পারতুম একেবারে শূন্য হ’য়ে যেতে,
ডুবে যেতে স্মৃতিহীন, স্বপ্নহীন অতল ঘুমের মধ্যে—
তবে আমাকে প্রতি মুহূর্তে ম’রে যেতে না হ’তো
এই বাঁচার চেষ্টায়,
খুশি হবার, খুশি করার,
ভালো লেখার, ভালোবাসার চেষ্টায়।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন । বুদ্ধদেব বসুর কবিতা।
কবিতার কথা-
আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম রূপকার, ‘কল্লোল’ যুগের প্রখ্যাত কবি ও প্রাবন্ধিক বুদ্ধদেব বসুর ‘এই শীতে’ কবিতাটি জীবনযন্ত্রণার চরম ক্লান্তি, বেঁচে থাকার ক্ষয়িষ্ণু সংগ্রাম এবং প্রকৃতির অমোঘ পুনর্জন্মের নিয়ম থেকে উৎসারিত এক পরম মনস্তাত্ত্বিক ও অস্তিত্ববাদী (Existential) আখ্যান। কবি এখানে জীবনের ক্লান্তি থেকে ক্ষণিকের জন্য মুক্তি পাওয়ার আকুলতা প্রকাশ করেছেন, কিন্তু তা চিরতরে নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার জন্য নয়—বরং প্রকৃতির মতো নিজেকে নতুন করে ফিরে পাওয়ার তাগিদে।
কবিতার প্রারম্ভেই কবি এক অদ্ভুত আত্মিক ক্লান্তির কথা প্রকাশ করেছেন। শীতের প্রকৃতিতে গাছ যেমন তার সমস্ত পাতা ঝরিয়ে আপাতদৃষ্টিতে মরে যায়, কিংবা সাপ যেমন শীতঘুমের (Hibernation) গভীরে গিয়ে সমস্ত শীতকালজুড়ে নির্জীব হয়ে পড়ে থাকে—কবিও এই হাড়কাঁপানো শীতে ঠিক তেমনভাবেই নিজেকে সাময়িকভাবে স্তব্ধ বা ‘মরে’ যেতে দিতে চান।
কবিতার মধ্যভাগে কবি প্রকৃতির এই আপাত মৃত্যুর পেছনের অলৌকিক সত্য ও সৌন্দর্যকে উন্মোচন করেছেন। গাছ কিংবা সাপের এই মরে থাকা আসলে কোনো শেষ নয়, বরং তা হলো এক নতুন জীবনের প্রস্তুতি। দীর্ঘ শীতের ক্লান্তি শেষে বসন্তের আগমন ঘটতেই গাছের শিকড় থেকে রক্তরসের মতো বেয়ে ওঠে তরুণ প্রাণরস; থোকা থোকা চিক্কণ সবুজ পাতা আর অজস্র উদ্ধত ফুলে গাছটি আবার যৌবন ফিরে পায়। অন্যদিকে, সাপ তার পুরনো জীর্ণ খোলসটা ঝেড়ে ফেলে বের হয়ে আসে এক নতুন ও কাজ-করা মসৃণ চামড়া নিয়ে; তার দ্বিধাবিভক্ত জিব থেকে আগুনের শিখার মতো ঠিকরে পড়ে এক ভয়হীন চেতনার তেজ। প্রকৃতি এই পুনর্জন্ম লাভ করতে পারে, কারণ তারা এক ঋতুতে পুরো মরে থাকতে জানে—তারা জানে কীভাবে নিজেকে একদম খালি করে দিয়ে নবজীবনের শক্তি সঞ্চয় করতে হয়।
সমাপ্তির চরণে কবিতাটি এক তীব্র অস্তিত্ববাদী হাহাকার ও মানসিক অবদমন থেকে মুক্তির আকুতিতে গিয়ে পৌঁছায়। কবি আক্ষেপ করে বলেন, তিনি যদি গাছ বা সাপের মতো সমস্ত শীত ভুরে নিজেকে একেবারে শূন্য করে দিতে পারতেন! যদি পারতেন অতীত স্মৃতি আর ভবিষ্যতের স্বপ্নের সমস্ত ভার ঝেড়ে ফেলে এক অতল, শান্ত নিদ্রায় তলিয়ে যেতে! তবে কবিকে আর সমাজের প্রথাসিদ্ধ বেঁচে থাকার মেকি ও ক্ষয়িষ্ণু চেষ্টার মুখোমুখি হতে হতো না। মানুষকে প্রতিনিয়ত সুখী হওয়ার ও অন্যকে খুশি রাখার অভিনয়ে, প্রতিনিয়ত ভালো লেখার তাগিদে এবং ভালোবাসার আপ্রাণ চেষ্টায় তিলে তিলে বা প্রতি মুহূর্তে ক্ষয়ে যেতে হতো না।
প্রাত্যহিক সামাজিক দায়িত্ব, সৃষ্টিশীলতার চাপ এবং বেঁচে থাকার অবিরত লড়াই মানুষকে যে আত্মিক নিঃস্বতা এনে দেয়—তা থেকে সাময়িক শূন্যতায় ডুবে গিয়ে প্রকৃতির মতো পূর্ণাঙ্গ পুনর্জন্ম বা নবজীবন লাভ করার এক পরম আকুলতাই এই কবিতায় ফুটে উঠেছে।






