কবিতার খাতা
ইতরের দেশে – নবারুণ ভট্টাচার্য।
আমি একটি ইতরের দেশে থাকি
এখানে বনিকেরা
লেখকদের উদ্ভাবন করে, এবং লেখকেরা উদ্ভাবিত হয়।
আমি একটি ইতরের দেশে থাকি
যে দেশের বুদ্ধিজীবী-অধ্যুষিত সরকার
শীতের ইথারের মধ্যে
গরীব মানুষের ঘর ভেঙে দেয়।
আমি একটি ইতরের দেশে থাকি
যেখানে অবশ অক্ষরমালা চিবোতে চিবোতে
কবিরা গরু হয়ে যায়,
উল্টোটাও যে হয় না এমন বলা যায় না।
আমার ভাগ্য আমি নিজের হাতেই ভেঙেছি,
তাই বাতিল স্টিমরোলারদের কাছে বসে থাকি,
বসে থাকি আর,
নতুন কাল্পনিক রাস্তা বানাবার গল্প শুনি।
আরো কবিতা লিখতে ক্লিক করুন। নবারুন ভট্টাচার্যের কবিতা।
কবিতার কথা –
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম দ্রোহী, সমাজ-সচেতন ও প্রতিষ্ঠানবিরোধী সাহিত্যিক নবারুণ ভট্টাচার্যের ‘ইতরের দেশে‘ কবিতাটি রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, পুঁজিবাদের নগ্ন থাবা, সুবিধাবাদী বুদ্ধিজীবীদের ভণ্ডামি এবং তথাকথিত প্রগতিশীল সাহিত্যের অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে এক তীব্র, কঠোর ও শ্লেষাত্মক (Satirical) সামাজিক-রাজনৈতিক আখ্যান। কবি এখানে কোনো ছদ্মবেশ বা অলংকারের আশ্রয় না নিয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ও চাঁছাছোলা ভাষায় তাঁর সময়কাল ও সমাজকে এক “ইতরের দেশ” হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যেখানে ক্ষমতার দাপটে মানবিকতা ও নৈতিকতার চরম অবক্ষয় ঘটেছে।
কবিতার প্রারম্ভেই কবি শোষণের এক নগ্ন কাঠামোর উন্মোচন করেছেন। তিনি এমন এক ‘ইতরের দেশে’ বসবাস করছেন, যেখানে শিল্প-সাহিত্য ও চিন্তা মুক্ত নয়; বরং এখানে ধনাঢ্য বনিকেরা বা পুঁজিপতিরা নিজেদের কায়েমি স্বার্থ হাসিলের জন্য ‘লেখক’ তৈরি করে, আর বিকিয়ে যাওয়া লেখকেরাও স্বেচ্ছায় বা লোভে তাদের হাতের পুতুলে পরিণত হতে আনন্দ পায়। এরপর কবি রাষ্ট্রের নিষ্ঠুর রূপটিকে ধরেন—যে দেশের সরকার নিজেদের ‘বুদ্ধিজীবী-অধ্যুষিত’ বা পরম প্রগতিশীল বলে দাবি করে, অথচ শীতের তীব্র কনকনে বাতাসের (ইথারের) মাঝেই তারা অসহায় ও দরিদ্র মানুষের আশ্রয় ও ঘরবাড়ি নির্মমভাবে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। তথাকথিত সুশীল ও বুদ্ধিজীবীদের এই চরম অমানবিকতা ও দ্বিমুখী চরিত্রকে কবি চরম ধিক্কার জানিয়েছেন।
কবিতার মধ্যভাগে কবি তৎকালীন কবি-সাহিত্যিকদের সুবিধাবাদী ও মেরুদণ্ডহীন রূপকে তীব্র ব্যঙ্গ করেছেন। কবিদের কাজ যেখানে ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া, সেখানে এই নষ্ট দেশে তারা ক্ষমতার দাসত্ব করতে করতে এবং নিষ্ফল ও “অবশ অক্ষরমালা” চিবোতে চিবোতে নিজেদের বিবেক বিসর্জন দিয়ে গবাদিপশু বা ‘গরু’তে পরিণত হয়েছে। আর সমাজের এই রূপান্তর এতটাই বীভৎস যে, গরু বা পশুর মতো অসংবেদনশীল প্রাণীরাও যেন আজ সমাজনিয়ন্তার ভূমিকা পালন করছে—উল্টোটাও ঘটা বিচিত্র কিছু নয়।
সমাপ্তির চরণে কবিতাটি এক গভীর রাজনৈতিক চেতনা, একাকীত্ব ও দূরদর্শী আশাবাদে গিয়ে পৌঁছায়। কবি নিজেকে এই বিকিয়ে যাওয়া ব্যবস্থার অংশ করেননি; তিনি পাওয়ার রাজনীতি বা রাজানুগ্রহের কাছে মাথা নত না করে নিজের হাতেই নিজের পার্থিব ভাগ্য ভেঙে ফেলেছেন। তাই তিনি শাসক বা পুঁজিপতিদের বিলাসী দরবারে নন, বরং সমাজের বাতিল ও ব্রাত্য হয়ে যাওয়া “স্টিমরোলারদের” পাশে গিয়ে বসেন। এই বাতিল স্টিমরোলার মূলত বিপ্লবের সেই পুরনো, ক্ষয়ে যাওয়া কিন্তু অপরাজেয় যন্ত্র বা শক্তির প্রতীক। কবি তাদের পাশে বসে নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকেন না, বরং সেখান থেকেই তিনি অনাগত ভবিষ্যতের জন্য এক শোষহীন, নতুন ও মানবিক “কাল্পনিক রাস্তা” বা সমাজ বানানোর গল্প শোনেন ও স্বপ্ন বোনেন।
পুঁজিবাদ, রাষ্ট্রীয় বর্বরতা ও বিকিয়ে যাওয়া বুদ্ধিজীবীদের বিরুদ্ধে এক তীব্র ধিক্কার এবং একই সাথে প্রান্তিক ও বিদ্রোহী সত্তাকে সাথে নিয়ে নতুন এক সমাজ গড়ার অলৌকিক স্বপ্ন দেখার মধ্য দিয়েই কবিতাটি এক অত্যন্ত বলিষ্ঠ, ক্ষুরধার ও স্নিগ্ধ পূর্ণতা লাভ করে।






