চিতা – অরুণ মিত্র।

চিতার আলোয় আনাচ-কানাচ ফর্সা হয়ে এল;
একটা দুর্দান্ত ভয়
যেখানে ওৎ পেতে থাকত ফুলে উঠত
মাটিতে ন্যাজের বাড়ি মারত
সেখানে কিছু নেই।

তাকে অনুভব করা যেত :
ক্ষেতের আলের কিনারে উইঢিবির ফোকরে
কারখানায় মেশিনের ইস্ক্রুপের খাঁজে
ডেসকের উপর লেজারের জাব্দা পাল্লায়
তার মুরমুখো অস্তিত্ব গরগর করত।

প্রেমের স্তব্ধ মন্দির হয়ে উঠেছিল
কিন্তু দমকা ভরে ধ্ব’সে পড়েছে তাদের ঘরের মতো,
তার কত যে শোচনীয় ভগ্নস্তূপ পড়ে থাকল ইতস্তত,
প্রত্নতত্ত্বের ধুলোমাখা পবিত্র সব গম্বুজ;
লতার মতো যারা জড়িয়ে জড়িয়ে উঠেছিল
তারা চমকে সাপের ছোঁয়া লাগিয়েছে,
তাদের মুখে চেরা কথার কামড়,
দেখা যাবে চেতনার বিষাক্ত দলগুলোয় তারা কিলবিল করছে।

দু’মুঠো লাল ভাতের স্বাদে চোখের জলের নুন এখনও মাখা আছে,
এই কয়েক মিনিট আগে সবাই তাতে মুখ দিয়েছে
এবং যথারীতি কুঁজো হয়ে ঘামের ফোঁটা ফেলে জমেছে এসে মশানে
ঘানি ঘোরার টানে
লাঙলের ফালে
লোহাগলানো আঁচে
কে বাঁচে কে বাঁচে? কে?
চিঠিপত্রে জমাখরচে দলিলদস্তাবেজে
কালোহলদে ডোরা
হাড়মাস চিবিয়ে-ফেলা শাসানি
একসঙ্গে পাহাড় হয়ে পুড়ছে;
গনগনে আনাচে-কানাচে
সেই বাঁকা অস্পষ্ট দুরন্ত রেখা আর নেই,
চিতার অবিশ্বাস্য আলোয়
এ-কোণ ও-কোণ ফর্সা হয়ে এল,
সকলের চেহারা ঝলসে উঠেছে
চামড়ায় ধরেছে টান,
আকাঙ্ক্ষায় প্রত্যাশায় সন্দেহের গভীরতায়
ধনুকের ছিলার মতো টনটন করছে এতগুলো প্রাণী।

কে বাঁচে?
ঘানিঘোরার টালে
লাঙলের ফালে
লোহাগলানো আঁচে
কে বাঁচে কে বাঁচে? কে?

আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। অরুণ মিত্রের কবিতা।

কবিতার কথা-

অরুণ মিত্রের ‘চিতা’ কবিতাটি শোষণের ভয়াল অস্তিত্ব, শ্রেণিশোষিত মানুষের দীর্ঘশ্বাস এবং অবশেষে মৃত্যুর এক চরম ও অনস্বীকার্য আলোয় জীবনের নির্ভেজাল সত্য উদ্ভাসনের এক অতি প্রগাঢ় ও সংবেদনশীল আখ্যান। অরুণ মিত্রের স্বাতন্ত্র্যসূচক আধুনিক কাব্যাঙ্গিকে এখানে প্রতিদিনের কায়িক শ্রম, ভয় এবং ব্যবস্থার অমানবিক রূপকে এক মহা-অগ্নিদাহের পটভূমিতে দাঁড় করানো হয়েছে।

কবিতার শুরুতেই এক অবসান ও অনাবৃত সত্যের উন্মেষ ঘটে। মৃত্যু বা ধ্বংসের প্রতীক চিতার আলো যখন চারিদিকের অন্ধকার ও আনাচ-কানাচ ফর্সা করে তোলে, তখন দেখা যায়—যে দুর্দান্ত ভয় বা ত্রাস এতকাল লেজ আছড়ে ফুলে উঠত, সেখানে আজ আর কিছু নেই। সেই আতঙ্কের হিংস্র উপস্থিতি এতকাল জীবনের সর্বক্ষেত্রে ওৎ পেতে থাকত—ক্ষেতের আইলে, কারখানার স্ক্রুর খাঁজে, অফিসের লেজার খাতায় কিংবা কায়িক শ্রমের প্রতিটি আনাচে-কানাচে। একটি চিতা বা মৃত্যুর অমোঘ আলো সেই বহু পুরোনো, ব্যাঘ্রসম বা হিংস্র ভয়ের অবসান ঘটিয়েছে।

কবিতাটিতে শ্রমজীবী মানুষের বেঁচে থাকার অসীম সংগ্রাম ও বঞ্চনার চিত্র অত্যন্ত করুণভাবে ফুটে উঠেছে। দু-মুঠো ভাত জোটাতে যাদের ঘাম ও চোখের জলের নুন মাখতে হয়, তারা বেঁচে থাকার তাগিদে প্রতিনিয়ত চরম শোষণের মুখোমুখি। ঘানি ঘোরার কষ্ট, লাঙলের ফাল, লোহা গলানো আঁচ কিংবা দাপ্তরিক নথি ও দলিলের কালো-হলুদ ডোরাকাটা শাসানি—সবকিছুতেই ছিল জীবনের হাড়মাংস চিবিয়ে খাওয়ার মতো অমানবিক নিপীড়ন। আর তার সাথে যুক্ত হয়েছিল সম্পর্কের ভাঙন, প্রেমের পবিত্র রূপ ধসে পড়ার যন্ত্রণা কিংবা চেতনার বিষাক্ত দংশন।

কিন্তু মৃত্যুর চরম মুহূর্ত বা চিতার অগ্নিকুণ্ড যেন এই সমস্ত বৈষম্য, ভয়, দলিলদস্তাবেজ ও শোষণের চিহ্নকে একসাথে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। চিতার সেই অবিশ্বাস্য অগ্নিশিখা যখন চারপাশ আলোকিত করে তোলে, তখন জীবনের সমস্ত ভয় ও আড়াল মুছে যায়। ভয়ংকর সেই আলোর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা অগণিত মানুষের টানটান চেহারা, তাদের আকাক্সক্ষা, সন্দেহ ও আশা এক অনিশ্চিত প্রশ্নের মুখোমুখি হয়। কবিতার অন্তিমে উচ্চারিত সেই বারবার ফিরে আসা করুণ প্রশ্ন—“কে বাঁচে? / ঘানিঘোরার টালে / লাঙলের ফালে / লোহাগলানো আঁচে / কে বাঁচে কে বাঁচে? কে?”—আমাদের পুরো ব্যবস্থার অমানবিকতা এবং জীবনের চরম অসহায়তাকে ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x