কবিতার খাতা
তুমি ডাক দিলে – হেলাল হাফিজ।
একবার ডাক দিয়ে দেখো আমি কতোটা কাঙাল,
কতো হুলুস্থুল অনটন আজন্ম ভেতরে আমার |
তুমি ডাক দিলে
নষ্ট কষ্ট সব নিমেষেই ঝেড়ে মুছে
শব্দের অধিক দ্রুত গতিতে পৌছুবো
পরিণত প্রণয়ের উৎসমূল ছোঁব
পথে এতোটুকু দেরিও করবো না
তুমি ডাক দিলে
সীমাহীন খাঁ খাঁ নিয়ে মরুদ্যান হবো,
তুমি রাজি হলে
যুগল আহলাদে এক মনোরম আশ্রম বানাবো |
একবার আমন্ত্রণ পেলে
সব কিছু ফেলে
তোমার উদ্দেশ্যে দেব উজাড় উড়াল,
অভয়ারণ্য হবে কথা দিলে
লোকালয়ে থাকবো না আর
আমরণ পাখি হয়ে যাব, – খাবো মৌনতা তোমার।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। হেলাল হাফিজের কবিতা।
কবিতার কথা-
কবি হেলাল হাফিজের ‘তুমি ডাক দিলে’ কবিতাটি মূলত এক অকৃত্রিম আত্মিক বুভুক্ষা, অবদমিত প্রেমের তীব্র ব্যাকুলতা, সমর্পণের সর্বোচ্চ পরাকাষ্ঠা এবং পরিশেষে লোকালয়ের সমস্ত কোলাহল পেরিয়ে ভালোবাসার মানুষের মাঝে এক পরম আশ্রয় খোঁজার এক নান্দনিক ও আর্তিভরা আখ্যান। কবি এখানে খুব মিতবাক ও সংবেদনশীল শব্দের বুননে একজন প্রেমিকের ভেতরের আজন্ম হাহাকার ও আকুলতাকে মেলে ধরেছেন।
কবিতার শুরুতেই এক চরম ও ঋজু স্বীকারোক্তি—‘একবার ডাক দিয়ে দেখো আমি কতোটা কাঙাল’। এই কাঙালপনা কোনো জাগতিক বৃত্তের নয়, এটি হলো এক পরম আত্মিক শূন্যতা। কবির ভেতরে বাস করে ‘কতো হুলুস্থুল অনটন আজন্ম ভেতরে আমার’। এই ‘অনটন’ ভালোবাসার অনটন, চেনা আশ্রয়ের অনটন। কিন্তু এই আজন্মের শূন্যতা এক লহমায় দূর হতে পারে যদি ওপার থেকে একটিমাত্র কাঙ্ক্ষিত ডাক আসে। কবি প্রতিজ্ঞা করছেন, প্রিয়তমা ডাক দিলে জীবনের সমস্ত ‘নষ্ট কষ্ট সব নিমেষেই ঝেড়ে মুছে’ তিনি শব্দের চেয়েও দ্রুত গতিতে ছুটে যাবেন। কোনো বাধা, কোনো দ্বিধা বা পথের কোনো ক্লান্তি তাঁকে আটকে রাখতে পারবে না; তিনি সোজা গিয়ে পৌঁছাবেন ‘পরিণত প্রণয়ের উৎসমূল’ যেখানে লুকিয়ে আছে প্রেমের আসল সার্থকতা।
দ্বিতীয় স্তবকে কবির এই সমর্পণ ও রূপান্তরের ক্ষমতা এক মহাজাগতিক ও আধ্যাত্মিক মাত্রা লাভ করে। প্রিয়তমার একটি ডাকে কবির ভেতরের ‘সীমাহীন খাঁ খাঁ’ করা মরুভূমি এক লহমায় রূপ নিতে পারে সুশীতল ও সবুজ ‘মরুদ্যান’-এ। আর প্রিয়তমা যদি কেবল রাজি হয়, তবে দুজনে মিলে ‘যুগল আহলাদে এক মনোরম আশ্রম বানাবো’। এই আশ্রম আসলে কোনো পাথুরে দেয়ালের ঘর নয়, এটি হলো দুটি হৃদয়ের এক নিভৃত ও পবিত্র শান্তিনিকেতন, যেখানে কোনো জাগতিক মালিন্য প্রবেশ করতে পারে না। একবার আমন্ত্রণ পেলে কবি এই পৃথিবীর সমস্ত দায়-দায়িত্ব, নিয়ম-কানুন আর বৈষয়িক মায়া এক পলকে ফেলে রেখে প্রিয়তমার উদ্দেশ্যে এক ‘উজাড় উড়াল’ দেবেন, যেখানে নিজেকে সম্পূর্ণ নিঃশেষ করে দেওয়ার এক পরম আনন্দ লুকিয়ে আছে।
কবিতার শেষাংশে এসে এই প্রেম আর কেবল মানুষের স্তরে আটকে থাকে না, তা একাত্ম হয়ে যায় এক অলৌকিক ও নৈঃশব্দ্যের প্রকৃতির সাথে। কবি প্রিয়তমার কাছে এক পরম ‘অভয়ারণ্য’ বা চিরস্থায়ী নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চান। যদি সেই অভয় চেনা যায়, তবে কবি এই কোলাহলময় ও কুটিল ‘লোকালয়ে থাকবো না আর’। তিনি আমরণ এক মুক্ত পাখি হয়ে যাবেন, যার একমাত্র কাজ হবে প্রিয়তমার ‘মৌনতা’ বা নীরবতাকে পরম তৃপ্তিতে পান করা। এই ‘মৌনতা খাওয়া’ আসলে দুটি হৃদয়ের এমন এক স্তরের মিলন, যেখানে কোনো ভাষার প্রয়োজন হয় না; কেবল নীরবতা দিয়েই একে অপরের আত্মার ভাষা পড়ে নেওয়া যায়।
সৃষ্টির সার্থকতা লৌকিক হাততালিতে নয়, বরং স্রষ্টার নিজের মানসিক মুক্তি এবং অস্তিত্বের তাগিদে—যা এই কবিতায় হেলাল হাফিজের নিজস্ব অনন্য, ধারালো ও গভীর আবেগঘন কাব্যিক ভাষায়, কাঙাল হৃদয়ের আজন্ম অনটন আর সমর্পণের এক অবিনশ্বর প্রেমের ইশতেহার হিসেবে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য ও কালজয়ী প্রেমের কবিতা হিসেবে অমর করে রেখেছে।






