কবিতার শুরুতেই এক অদ্ভুত নিষ্পাপ ও শান্ত আবহের অবতারণা ঘটে। কবির ছোট্ট মেয়েটি প্রতিদিন বিকেলে কবুতরদের সাথে গল্প করে, যাদের সে নিজের ভাষায় ‘কবরী’ বলে ডাকে। এই সারল্যের পরেই কবি সজোরে ধাক্কা দেন স্মৃতির জানালায়। মায়ের মৃত্যুর সময় কবির বয়সটা ছিল এমন এক ‘বিশ্রী বয়স’ (কৈশোর বা প্রথম যৌবনের সন্ধিক্ষণ), যেখানে তীব্র শোকেও সমাজ বা লোকলজ্জার ভয়ে পুরুষালি অহংবোধ নিয়ে কাঁদতে লজ্জা পেয়েছিলেন তিনি। অথচ আজ পরিণত বয়সে এসে সামান্য শালিক পাখি দেখলেই সেই মায়ের হাতের পিঠা ভাজার নস্টালজিয়া আর ওম কবিকে ব্যাকুল করে তোলে—যা এক অলিখিত ও অপ্রকাশিত শোকের আজীবন বয়ে বেড়ানো।
তৃতীয় স্তবকে কবি এক রাজনৈতিক ও পারিবারিক প্রেক্ষাপট টেনে এনেছেন। মানুষকে ভালোবাসার অপরাধে (!) যে দেশপ্রেমিক ভাই জেলে গিয়েছিল, সে যেদিন মুক্তি পায়, সেদিন কবির ভেতরে ‘কান্না আর খুশি’ একসাথে গলায় আটকে গিয়েছিল। তীব্র আবেগে ভাইকে জড়িয়ে ধরে কাঁদার কথা থাকলেও, পুরুষতান্ত্রিক আবেগের জড়তার কারণে কবি কেবল একটু কৃত্রিমভাবে ‘কেশে’ সাধারণ গলায় বললেন—‘চল বাড়ি চল’। এই এক জোড়া শব্দের আড়ালে চাপা পড়ে যায় এক সমুদ্র আনন্দ ও কান্না। এমনকি প্রকৃতির ওপর যখন মানুষের অত্যাচার চলে—সেগুন, কৃষ্ণচূড়া, বোগেনভিলাকে হত্যা করা হয়, তখনও কবি ‘আহা আহা’ ছাড়া কোনো তীব্র প্রতিবাদী শব্দ খুঁজে পান না।
কবিতার চতুর্থ স্তবকে ব্যক্তিগত প্রেমের ব্যর্থতা মূর্ত হয়েছে। কবি প্রেমে কিংবা অপ্রেমে নারীর কাছে গিয়ে ‘ভালোবাসি’ শব্দটি উচ্চারণ করতে চেয়েছেন, কিন্তু তাঁর এই চিরকালের প্রকাশহীনতার কারণে নারী অপেক্ষা করেও শেষ পর্যন্ত মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। সেই বিশ্রী বয়স থেকে শুরু করে আজ অবধি কবি কেবল নিজের ভেতরে এক তীব্র আর্তি বয়ে বেরিয়েছেন—কাউকে বুক খোল ডাকবার, ভালোবাসার কথা জানাবার। কিন্তু সমাজ, বয়স আর চারপাশের দেয়াল তাঁকে কেবল অবরুদ্ধই করে রেখেছে।
পরিশেষে, কবিতাটি এক চমৎকার ও বৈপরীত্যের বৃত্ত সম্পূর্ণ করে। কবি যে ডাকটি সারা জীবন দিতে পারলেন না—লজ্জায়, জড়তায় কিংবা ভয়ে—তাঁর ছোট্ট মেয়েটি কিন্তু কোনো দ্বিধা ছাড়াই সেই ডাকটি অনায়াসে দিয়ে ফেলে। ছোট্ট মুঠোয় কয়েক দানা গম নিয়ে সে যখন ‘বাঁশির মতো’ সুরেলা কণ্ঠে ডাকে—‘আয় আয় আয়’, তখন কবুতরেরা (কবরীরা) ঠিকই তার কাছে ছুটে আসে। মেয়ের এই সহজ ডাক মূলত কবির নিজের জীবনের সেই আজন্ম না-পারা ডাকেরই এক পরম ও মুক্ত রূপান্তর।
সৃষ্টির সার্থকতা লৌকিক হাততালিতে নয়, বরং স্রষ্টার নিজের মানসিক মুক্তি এবং অস্তিত্বের তাগিদে—যা এই কবিতায় মানুষের ভেতরের এক আজন্ম প্রকাশহীনতার বেদনা এবং শিশুর সারল্যের ভেতর দিয়ে সেই অবদমিত আকাঙ্ক্ষার এক অনন্য ও বাঙ্ময় প্রকাশ ঘটিয়েছে।
ডাকতে চেয়েছি – আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ | আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর আত্মজীবনীমূলক কবিতা | মায়ের মৃত্যু, ভাইয়ের কারামুক্তি ও নারীর কাছে ‘ভালোবাসি’ বলতে না পারার বেদনা | ‘শুধু ডাকতে চেয়েছি কাছে ডাকতে চেয়েছি কাছে ডাকতে চেয়েছি’
ডাকতে চেয়েছি: আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর মৃত্যু, মুক্তি, ভালোবাসার অপ্রকাশিত বেদনার অসাধারণ কাব্য, ‘মা যখন মারা যান তখন এমন বিশ্রী বয়স ছিল যে কাঁদতে লজ্জা পেয়েছিলাম’ ও ‘শালিক দেখলে মনে হয় মা রান্না ঘরে পিঠা ভাজছেন’, ভাইয়ের জেল থেকে ফেরার দিন ‘কান্না আর খুশি গলায় আটকে যাওয়া’, সেগুন-কৃষ্ণচূড়া-বোগেনভিলা হত্যায় ‘আহা আহা’ ছাড়া কিছু বলতে না পারা, নারীর কাছে ‘ভালোবাসি’ বলতে চেয়েও বলা না হওয়া, ও ‘শুধু ডাকতে চেয়েছি কাছে’ বলে চূড়ান্ত স্বীকারোক্তির অমর সৃষ্টি
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর “ডাকতে চেয়েছি” বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য, আত্মজীবনীমূলক ও বেদনাভরা সৃষ্টি। “ওরা রোজ বিকালে আমার মেয়ের কাছে বেড়াতে আসে” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে মেয়ের কবুতর খেলা, মায়ের মৃত্যুতে কাঁদতে লজ্জা পাওয়া ও শালিক দেখলে মাকে মনে পড়ার স্মৃতি; ভাইয়ের জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার দিন কান্না আর খুশি গলায় আটকে যাওয়া ও ‘চল বাড়ি চল’ বলা; সেগুন, কৃষ্ণচূড়া, বোগেনভিলা হত্যায় ‘আহা আহা’ ছাড়া কিছু বলতে না পারা; নারীর কাছে ‘ভালোবাসি’ বলতে চেয়েও বলা না হওয়া ও নারী মুখ ফিরিয়ে নেওয়া; এবং শেষ পর্যন্ত ‘শুধু ডাকতে চেয়েছি কাছে ডাকতে চেয়েছি কাছে ডাকতে চেয়েছি’ বলে চূড়ান্ত স্বীকারোক্তির অসাধারণ কাব্যচিত্র। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ (১৯৩৪-২০০১) বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট কবি, লেখক ও সাংবাদিক। তিনি স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের কবিতায় বামপন্থী চেতনা, গণমানুষের কথা ও ব্যক্তিজীবনের বেদনা নিয়ে লিখেছেন। “ডাকতে চেয়েছি” সেই স্বকীয় কাব্যভাষার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যেখানে তিনি মায়ের মৃত্যু থেকে শুরু করে ভালোবাসার অপ্রকাশিত বেদনা পর্যন্ত জীবনের নানা স্তরের কথা বলেছেন।
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ: ব্যক্তিজীবনের বেদনা ও আত্মস্বীকারোক্তির কবি
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ ১৯৩৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের নেত্রকোনা জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একজন বিশিষ্ট কবি, লেখক ও সাংবাদিক ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা উত্তর কবিতায় তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি বামপন্থী চেতনা, গণমানুষের কথা ও ব্যক্তিজীবনের বেদনা নিয়ে লিখেছেন। তাঁর কবিতায় সরল ভাষায় গভীর আবেগ ও আত্মস্বীকারোক্তি ফুটে উঠেছে।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘বাংলাদেশ’, ‘পদ্মা নদীর সত্তর বছর পরে’, ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি’, ‘ডাকতে চেয়েছি’, ‘বাঙালির কবিতা’ ইত্যাদি।
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর আত্মজীবনীমূলক কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো মেয়ের কবুতর খেলা, ‘মা মারা গেলে কাঁদতে লজ্জা পাওয়া’, ‘শালিক দেখলে মাকে মনে পড়া’, ‘ভাই জেল থেকে মুক্তি পেলে কান্না আর খুশি গলায় আটকে যাওয়া’, ‘গাছ হত্যায় ‘আহা আহা’ ছাড়া কিছু বলতে না পারা’, ‘নারীর কাছে ভালোবাসি বলতে চেয়েও বলা না হওয়া’, এবং ‘শুধু ডাকতে চেয়েছি’ বলে চূড়ান্ত স্বীকারোক্তি। ‘ডাকতে চেয়েছি’ সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ — যেখানে তিনি জীবনের নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে ‘ডাকতে চেয়েছি’ এই একটাই কথা বারবার বলেছেন।
ডাকতে চেয়েছি: শিরোনামের তাৎপর্য ও কবিতার পটভূমি
শিরোনাম ‘ডাকতে চেয়েছি’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘ডাকতে চেয়েছি’ — ডাকতে চেয়েছি, কিন্তু হয়তো ডাকতে পারিনি। কাছে ডাকতে চেয়েছি — মাকে, ভাইকে, নারীকে, মানুষকে। কিন্তু বারবার ব্যর্থ হয়েছি।
কবিতাটি ব্যক্তিজীবনের নানা ঘটনার পটভূমিতে রচিত। মেয়ের কবুতর খেলা, মায়ের মৃত্যু, ভাইয়ের কারামুক্তি, গাছ হত্যা, প্রেমে ব্যর্থতা — এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে কবি বারবার ‘ডাকতে চেয়েছি’ বলেছেন।
কবি শুরুতে বলছেন — ওরা রোজ বিকালে আমার মেয়ের কাছে বেড়াতে আসে। একটা তিনটা পাঁচটা কবরী। আমার মেয়ে কবুতরকে কবরী বলে।
মা যখন মারা যান তখন এমন বিশ্রী বয়স ছিল যে কাঁদতে লজ্জা পেয়েছিলাম। অথচ এখন শালিক দেখলে মনে হয় মা রান্না ঘরে পিঠা ভাজছেন।
আমার ভাই যেদিন মুক্তি পেল, মানুষকে ভালোবাসে বলে সে জেলে গিয়েছিল, কান্না আর খুশি আমার গলায় আটকে গ্যালো। কিন্তু আমি একটু কেশে বললাম চল বাড়ি চল।
এই তো সেদিন সেগুন কৃষ্ণচূড়া বোগেনভিলাকে হত্যা করা হলো।
আমি রাগ করলাম দুঃখ পেলাম আহা আহা ছাড়া আর কিছুই বলতে পারলাম না।
আমি প্রেমে-অপ্রেমে নারীর কাছে গেছি বলতে চেয়েছি ভালোবাসি, নারী অপেক্ষা করে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। সেই বিশ্রী বয়স থেকে আজ পর্যন্ত শুধু ডাকতে চেয়েছি কাছে ডাকতে চেয়েছি কাছে ডাকতে চেয়েছি।
আমার মেয়ে কবুতরকে কবরী বলে। ছোট্ট মুঠোয় কয়েক দানা গম নিয়ে বাঁশির মতো ডাকে আয় আয় আয়।
ডাকতে চেয়েছি: স্তবকভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ (সংক্ষিপ্ত আকারে)
প্রথম স্তবক: মেয়ের কবুতর খেলা — ‘কবুতরকে কবরী বলে’
“ওরা রোজ বিকালে / আমার মেয়ের কাছে بےرাতে আসে। / একটা তিনটা পাঁচটা কবরী। / আমার মেয়ে কবুতরকে কবরী বলে।”
প্রথম স্তবকে মেয়ের কবুতর খেলার স্নিগ্ধ চিত্র। ‘ওরা’ — কবুতর। ‘কবরী’ — মেয়ের দেওয়া নাম। মেয়ে কবুতরকে ‘কবরী’ বলে ডাকে। এটি শৈশবের সরলতা ও সৌন্দর্যের প্রতীক।
দ্বিতীয় স্তবক: মায়ের মৃত্যুতে কাঁদতে লজ্জা ও শালিক দেখলে মাকে মনে পড়া
“মা যখন مারা যান তখন এমন বিশ্রী বয়স ছিল / যে কাঁদতে لজ্জা پেয়েছিলাম। / অথচ এখন شاليك দেখলে মনে হয় / مা رান্না ঘরে পিঠা ভাজছেন।”
দ্বিতীয় স্তবকে মায়ের মৃত্যুর স্মৃতি। ‘বিশ্রী বয়স’ — কৈশোর বা যৌবনের শুরুর দিক, যখন কান্না লজ্জাজনক মনে হয়। ‘শালিক দেখলে মনে হয় মা পিঠা ভাজছেন’ — পাখির মধ্যে মায়ের ছায়া দেখা।
তৃতীয় স্তবক: ভাইয়ের কারামুক্তি — ‘কান্না আর খুশি গলায় আটকে যাওয়া’
“আমার ভাই যেদিন মুক্তি পেল, / মানুষকে ভালোবাসে বলে সে জেলে গিয়েছিল, / كান্না আর খুশি আমার গলায় আটকে গ্যালো। / কিন্তু আমি একটু কেশে বললাম চল বাড়ি চল।”
তৃতীয় স্তবকে ভাইয়ের কারামুক্তির স্মৃতি। ‘মানুষকে ভালোবাসে বলে জেলে গিয়েছিল’ — ভাই রাজনৈতিক বন্দি। ‘কান্না আর খুশি গলায় আটকে যাওয়া’ — মিশ্র অনুভূতি। ‘একটু কেশে বললাম চল বাড়ি চল’ — কাশি দিয়ে আবেগ চাপা দিয়ে বাড়ি যাওয়ার কথা বলা।
চতুর্থ ও পঞ্চম স্তবক: গাছ হত্যায় ‘আহা আহা’ ছাড়া কিছু না বলা
“এই তো সেদিন سگون كৃষ্ণচূড়া بوجেনভিলাকে / هত্যা করা হলো। / আমি راغ করলাম দুঃখ পেলাম / আহا আহা ছাড়া আর কিছুই বলতে পারলাম না।”
চতুর্থ ও পঞ্চম স্তবকে গাছ হত্যার প্রতিবাদে অসহায়ত্ব। ‘সেগুন, কৃষ্ণচূড়া, বোগেনভিলা’ — গাছের নাম। ‘হত্যা করা হলো’ — গাছ কাটা। ‘আহা আহা ছাড়া কিছু বলতে না পারা’ — প্রতিবাদহীনতার স্বীকারোক্তি।
ষষ্ঠ ও সপ্তম স্তবক: নারীর কাছে ‘ভালোবাসি’ বলতে না পারা ও বারবার ডাকতে চাওয়া
“আমি প্রেমে-অপ্রেমে نارীর কাছে গেছি বলতে চেয়েছি ভালোবাসি, / نারী অপেক্ষা করে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। / সেই বিশ্রী বয়স থেকে আজ পর্যন্ত / শুধু ডাকতে چেয়েছি কাছে ডাকতে চেয়েছি কাছে ডাকতে চেয়েছি।”
ষষ্ঠ ও সপ্তম স্তবকে প্রেমের ব্যর্থতা ও ‘ডাকতে চাওয়ার’ পুনরাবৃত্তি। ‘প্রেমে-অপ্রেমে’ — সব সময়েই। ‘নারী অপেক্ষা করে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে’ — প্রত্যাখান। ‘সেই বিশ্রী বয়স থেকে আজ পর্যন্ত’ — দীর্ঘ সময় ধরে। ‘শুধু ডাকতে চেয়েছি কাছে ডাকতে চেয়েছি কাছে ডাকতে চেয়েছি’ — তিনবার পুনরাবৃত্তি, চূড়ান্ত স্বীকারোক্তি।
অষ্টম ও শেষ স্তবক: মেয়ের ‘আয় আয় আয়’ ডাক — কবুতরকে কবরী বলে ডাকার স্নিগ্ধতা
“আমার মেয়ে কবুতরকে কবরী বলে। / ছোট্ট মুঠোয় কয়েক دانه গম নিয়ে / بাঁশির মতো ডাকে আয় আয় আয়।”
অষ্টম ও শেষ স্তবকে প্রথম স্তবকের স্মৃতিতে ফিরে আসা। ‘বাঁশির মতো ডাকে’ — মিষ্টি, সুমধুর ডাক। ‘আয় আয় আয়’ — ডাকার শব্দ। কবি যা করতে চেয়েছিলেন (ডাকতে), মেয়ে সেটাই করছে — কবুতরকে কাছে ডাকছে।
কবিতার গঠনশৈলী, ছন্দ ও শিল্পরূপ
কবিতাটি গদ্যছন্দে রচিত, দীর্ঘ লাইনে প্রবাহিত। ‘ওরা রোজ বিকালে আমার মেয়ের কাছে বেড়াতে আসে’ — শুরু। ‘কবুতরকে কবরী বলে’ — স্নিগ্ধ প্রতীক। ‘মা মারা গেলে কাঁদতে লজ্জা’ — বাস্তব স্বীকারোক্তি। ‘শালিক দেখলে মা পিঠা ভাজছেন মনে হয়’ — স্মৃতির চিত্র। ‘কান্না আর খুশি গলায় আটকে যাওয়া’ — আবেগের দ্বান্দ্বিকতা। ‘আহা আহা ছাড়া কিছু বলতে না পারা’ — অসহায়ত্ব। ‘শুধু ডাকতে চেয়েছি কাছে’ — তিনবার পুনরাবৃত্তি। ‘বাঁশির মতো ডাকে আয় আয় আয়’ — স্নিগ্ধ সমাপ্তি।
প্রতীক ব্যবহার অত্যন্ত শক্তিশালী। ‘কবুতর ও কবরী’ — শৈশবের সরলতার প্রতীক। ‘মায়ের মৃত্যু ও কাঁদতে লজ্জা’ — বয়ঃসন্ধির বেদনার প্রতীক। ‘শালিক’ — মায়ের স্মৃতির প্রতীক। ‘ভাই জেলে যাওয়া’ — রাজনৈতিক বন্দিত্বের প্রতীক। ‘গাছ হত্যা’ — প্রকৃতি ধ্বংসের প্রতীক। ‘আহা আহা’ — অসহায় প্রতিবাদের প্রতীক। ‘নারীর মুখ ফিরিয়ে নেওয়া’ — প্রেমে ব্যর্থতার প্রতীক। ‘ডাকতে চাওয়া’ — যোগাযোগের, কাছে টানার আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। ‘মেয়ের বাঁশির মতো ডাক’ — সফল ডাকের প্রতীক, পরবর্তী প্রজন্মের মাধ্যমে আশার প্রতীক।
পুনরাবৃত্তি শৈলী অত্যন্ত কার্যকর। ‘শুধু ডাকতে চেয়েছি কাছে’ — তিনবার। ‘কবরী’ — তিনবার। ‘আয় আয় আয়’ — তিনবার। ‘আহা আহা’ — দুবার।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য ও দার্শনিক মাত্রা
“ডাকতে চেয়েছি” আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর এক অসাধারণ সৃষ্টি। তিনি এখানে জীবনের নানা স্তরের ঘটনার মধ্য দিয়ে ‘ডাকতে চাওয়ার’ এক গভীর কাব্যচিত্র এঁকেছেন।
প্রথম স্তবকে — মেয়ের কবুতর খেলা — ‘কবুতরকে কবরী বলে’। দ্বিতীয় স্তবকে — মায়ের মৃত্যুতে কাঁদতে লজ্জা ও শালিক দেখলে মাকে মনে পড়া। তৃতীয় স্তবকে — ভাইয়ের কারামুক্তি — ‘কান্না আর খুশি গলায় আটকে যাওয়া’ ও ‘চল বাড়ি চল’। চতুর্থ ও পঞ্চম স্তবকে — গাছ হত্যায় ‘আহা আহা’ ছাড়া কিছু না বলা। ষষ্ঠ ও সপ্তম স্তবকে — নারীর কাছে ‘ভালোবাসি’ বলতে না পারা ও বারবার ডাকতে চাওয়া। অষ্টম ও শেষ স্তবকে — মেয়ের ‘আয় আয় আয়’ ডাক — কবুতরকে কবরী বলে ডাকার স্নিগ্ধতা।
এই কবিতা আমাদের শেখায় — মেয়ে কবুতরকে ‘কবরী’ বলে ডাকে; মা মারা গেলে কাঁদতে লজ্জা পেয়েছিলাম, এখন শালিক দেখলে মনে হয় মা পিঠা ভাজছেন; ভাই জেল থেকে ফিরে কান্না আর খুশি গলায় আটকে গেল, শুধু বললাম ‘চল বাড়ি চল’; সেগুন-কৃষ্ণচূড়া-বোগেনভিলাকে হত্যা করা হলো, আমি ‘আহা আহা’ ছাড়া কিছু বলতে পারলাম না; প্রেমে-অপ্রেমে নারীর কাছে গিয়ে ‘ভালোবাসি’ বলতে চেয়েছি, নারী মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে; সেই বিশ্রী বয়স থেকে আজ পর্যন্ত শুধু ডাকতে চেয়েছি কাছে, ডাকতে চেয়েছি কাছে, ডাকতে চেয়েছি কাছে; আর মেয়ে বাঁশির মতো ডাকে ‘আয় আয় আয়’।
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর কবিতায় ব্যক্তিজীবনের বেদনা, স্বীকারোক্তি ও ডাকার আকাঙ্ক্ষা
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর কবিতায় ব্যক্তিজীবনের বেদনা, স্বীকারোক্তি ও ডাকার আকাঙ্ক্ষা একটি পুনরাবৃত্ত বিষয়। তিনি ‘ডাকতে চেয়েছি’ কবিতায় মায়ের মৃত্যু, ভাইয়ের কারামুক্তি, গাছ হত্যা, প্রেমে ব্যর্থতা — সব ঘটনার মধ্য দিয়ে ‘ডাকতে চাওয়ার’ অসাধারণ কাব্যিক চিত্র এঁকেছেন। তিনি দেখিয়েছেন — কীভাবে ‘মা মারা গেলে কাঁদতে লজ্জা পেয়েছিলাম’; কীভাবে ‘শালিক দেখলে মা পিঠা ভাজছেন মনে হয়’; কীভাবে ‘কান্না আর খুশি গলায় আটকে যায়’; কীভাবে ‘আহা আহা ছাড়া কিছু বলতে পারি না’; কীভাবে ‘নারীর কাছে ভালোবাসি বলতে চেয়েও বলা হয়নি’; আর কীভাবে ‘শুধু ডাকতে চেয়েছি কাছে’ — তিনবার।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলা সাহিত্যের উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক পাঠ্যক্রমে আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর ‘ডাকতে চেয়েছি’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত থাকার যোগ্য। এই কবিতাটি শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিজীবনের বেদনা, মায়ের মৃত্যু, ভাইয়ের কারামুক্তি, প্রেমের ব্যর্থতা, এবং আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর আত্মস্বীকারোক্তিমূলক কাব্যভাষা সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করে। বিশেষ করে ‘ওরা রোজ বিকালে আমার মেয়ের কাছে বেড়াতে আসে’, ‘কবুতরকে কবরী বলে’, ‘মা মারা গেলে কাঁদতে লজ্জা পেয়েছিলাম’, ‘শালিক দেখলে মনে হয় মা পিঠা ভাজছেন’, ‘কান্না আর খুশি গলায় আটকে গ্যালো’, ‘সেগুন কৃষ্ণচূড়া বোগেনভিলাকে হত্যা করা হলো’, ‘আহা আহা ছাড়া আর কিছুই বলতে পারলাম না’, ‘নারী অপেক্ষা করে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে’, ‘শুধু ডাকতে চেয়েছি কাছে ডাকতে চেয়েছি কাছে ডাকতে চেয়েছি’, এবং ‘বাঁশির মতো ডাকে আয় আয় আয়’ — এসব বিষয় শিক্ষার্থীদের কাব্যবোধ, মানবিক মূল্যবোধ ও আত্মস্বীকারোক্তির শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ডাকতে চেয়েছি সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: ডাকতে চেয়েছি কবিতাটির রচয়িতা কে?
এই কবিতাটির রচয়িতা আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ (১৯৩৪-২০০১)। তিনি বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট কবি, লেখক ও সাংবাদিক ছিলেন। তিনি স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের কবিতায় বামপন্থী চেতনা, গণমানুষের কথা ও ব্যক্তিজীবনের বেদনা নিয়ে লিখেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘বাংলাদেশ’, ‘পদ্মা নদীর সত্তর বছর পরে’, ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি’, ‘ডাকতে চেয়েছি’, ‘বাঙালির কবিতা’ ইত্যাদি।
প্রশ্ন ২: ‘মা যখন মারা যান তখন এমন বিশ্রী বয়স ছিল যে কাঁদতে লজ্জা পেয়েছিলাম’ — লাইনটির তাৎপর্য কী?
‘বিশ্রী বয়স’ মানে কৈশোর বা যৌবনের শুরুর দিক — যখন কান্নাকে দুর্বলতার চিহ্ন মনে করা হয়। মা মারা গেলেও কবি কাঁদতে লজ্জা পেয়েছিলেন। এটি বয়ঃসন্ধির জটিলতার প্রতীক।
প্রশ্ন ৩: ‘অথচ এখন শালিক দেখলে মনে হয় মা রান্না ঘরে পিঠা ভাজছেন’ — লাইনটির স্মৃতির সৌন্দর্য কী?
এখন শালিক পাখি দেখলে তার মধ্যে মায়ের ছায়া দেখেন। মা রান্না ঘরে পিঠা ভাজছেন — এমন ভ্রম হয়। এটি মায়ের জন্য চিরন্তন স্মৃতি ও আকুলতার প্রতীক।
প্রশ্ন ৪: ‘ভাই যেদিন মুক্তি পেল, কান্না আর খুশি আমার গলায় আটকে গ্যালো’ — লাইনটির তাৎপর্য কী?
ভাই জেল থেকে মুক্তি পেয়েছেন — খুশির বিষয়। কিন্তু সেই আবেগ এত তীব্র যে কান্না এসে যায়। কান্না আর খুশি একসঙ্গে গলায় আটকে যায়।
প্রশ্ন ৫: ‘সেই তো সেদিন সেগুন কৃষ্ণচূড়া বোগেনভিলাকে হত্যা করা হলো’ — লাইনটির প্রতিবাদ কোথায়?
গাছ কাটাকে ‘হত্যা’ বলা হয়েছে। সেগুন, কৃষ্ণচূড়া, বোগেনভিলা — এরা নিস্পাপ। তাদের হত্যার প্রতিবাদে কবি ‘আহা আহা’ ছাড়া কিছু বলতে পারেননি — এটি অসহায়ত্বের প্রতীক।
প্রশ্ন ৬: ‘আমি প্রেমে-অপ্রেমে নারীর কাছে গেছি বলতে চেয়েছি ভালোবাসি, নারী অপেক্ষা করে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে’ — লাইনটির তাৎপর্য কী?
প্রেমে হোক বা অপ্রেমে — সব সময় নারীর কাছে গিয়ে ‘ভালোবাসি’ বলতে চেয়েছেন। কিন্তু নারী অপেক্ষা করে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে — অর্থাৎ ‘ভালোবাসি’ শব্দটি হয়তো কখনো উচ্চারিত হয়নি।
প্রশ্ন ৭: ‘সেই বিশ্রী বয়স থেকে আজ পর্যন্ত শুধু ডাকতে চেয়েছি কাছে ডাকতে চেয়েছি কাছে ডাকতে চেয়েছি’ — তিনবার পুনরাবৃত্তির তাৎপর্য কী?
তিনবার পুনরাবৃত্তি ডাকার চরম আকাঙ্ক্ষাকে নির্দেশ করে। ‘বিশ্রী বয়স’ থেকে আজ পর্যন্ত — দীর্ঘ সময় ধরে। ‘শুধু ডাকতে চেয়েছি’ — অন্য কিছু নয়, শুধু ডাকতে চেয়েছি, কাছে টানতে চেয়েছি।
প্রশ্ন ৮: ‘আমার মেয়ে কবুতরকে কবরী বলে’ — লাইনটির তাৎপর্য কী?
প্রথম স্তবকের এই লাইনটি শেষ স্তবকে ফিরে এসেছে। মেয়ে কবুতরকে ‘কবরী’ বলে ডাকে — নামকরণের মাধ্যমে বন্ধুত্ব, স্নেহ ও আত্মীয়তা।
প্রশ্ন ৯: ‘বাঁশির মতো ডাকে আয় আয় আয়’ — লাইনটির সৌন্দর্য কী?
‘বাঁশির মতো ডাকে’ — মিষ্টি, সুমধুর, আকর্ষণীয়। ‘আয় আয় আয়’ — কবুতরকে কাছে ডাকার শব্দ। কবি যা করতে চেয়েছিলেন (ডাকতে), মেয়ে সেটাই করছে — সফলভাবে, নির্দ্বিধায়।
প্রশ্ন ১০: কবিতার মূল শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা কী?
কবিতাটি আমাদের শেখায় — মেয়ে কবুতরকে ‘কবরী’ বলে ডাকে; মা মারা গেলে কাঁদতে লজ্জা পেয়েছিলাম, এখন শালিক দেখলে মনে হয় মা পিঠা ভাজছেন; ভাই জেল থেকে ফিরে কান্না আর খুশি গলায় আটকে গেল, শুধু বললাম ‘চল বাড়ি চল’; সেগুন-কৃষ্ণচূড়া-বোগেনভিলাকে হত্যা করা হলো, আমি ‘আহা আহা’ ছাড়া কিছু বলতে পারলাম না; প্রেমে-অপ্রেমে নারীর কাছে গিয়ে ‘ভালোবাসি’ বলতে চেয়েছি, নারী মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে; সেই বিশ্রী বয়স থেকে আজ পর্যন্ত শুধু ডাকতে চেয়েছি কাছে, ডাকতে চেয়েছি কাছে, ডাকতে চেয়েছি কাছে; আর মেয়ে বাঁশির মতো ডাকে ‘আয় আয় আয়’। এই কবিতাটি আজকের দিনে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক — ব্যক্তিজীবনের বেদনা, মায়ের স্মৃতি, প্রেমের ব্যর্থতা, প্রতিবাদহীনতা, এবং ডাকার চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা — সবকিছুই চিরন্তন ও সময়োপযোগী বিষয়।
ট্যাগস: ডাকতে চেয়েছি, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর আত্মজীবনীমূলক কবিতা, কবুতরকে কবরী বলে, মায়ের মৃত্যুতে কাঁদতে লজ্জা, ভাইয়ের কারামুক্তি, আহা আহা, ডাকতে চেয়েছি কাছে
© Kobitarkhata.com – কবি: আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ | কবিতার প্রথম লাইন: “ওরা রোজ বিকালে আমার মেয়ের কাছে বেড়াতে আসে” | মায়ের মৃত্যু থেকে প্রেমের ব্যর্থতা পর্যন্ত অমর কবিতা বিশ্লেষণ | আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর আত্মস্বীকারোক্তিমূলক কাব্যধারার অসাধারণ নিদর্শন