কবিতার শুরুতে এক ধরণের আকুল সমর্পণ ও প্রতিজ্ঞার সুর ধ্বনিত হয়েছে। ভালোবাসার মানুষের পক্ষে হাত তুলে দাঁড়িয়ে থাকা কবি তখনই ‘সুখদ যন্ত্রণায়’ রূপান্তরিত করতে পারেন, যদি তিনি একটু ‘প্রবেশাধিকার’ বা সান্নিধ্যের প্রতিশ্রুতি পান। প্রেম যেখানে একই সাথে আনন্দ ও বিরহের দহন তৈরি করে, তা-ই মূলত এই ‘সুখদ যন্ত্রণা’।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তবকে কবি ফিরে গেছেন গ্রামীণ শৈশবের সেই চিরচেনা পরিমণ্ডলে। হরিপদ বাবুর ক্লাসরুমের ব্ল্যাকবোর্ডের সেই না-পারা প্রশ্নের উত্তরে যখন কেউ হাত তোলে না, তখন প্রিয়তমার অক্ষমতা বা লজ্জা ঢাকতে কবি নিজেই তার ‘স্বপক্ষে’ হাত তুলে দাঁড়ান। এই যে প্রিয় মানুষের দুর্বলতাকে নিজের কাঁধে তুলে নেওয়ার সহজাত প্রবণতা, এটাই প্রকৃত প্রেমের প্রথম পাঠ। এর পরপরই যুক্ত হয় মেঠো স্কুলের মাঠে হারানের ছেলে শিবনাথের কুলপি বিক্রির অনুষঙ্গ। নিজের মুখে একটি কুলপি গুঁজে দিয়ে অন্যটি প্রিয়তমার জন্য উঁচিয়ে ধরার যে সরল ও আদিম আকুতি—তা-ই কবিকে এক অনন্ত সময়ের ফ্রেমে বন্দি করে দিয়েছে। সেই থেকে আজ অবধি কবির হাত নামেনি।
কবিতার মধ্যভাগে সময়ের এক দীর্ঘ প্রবহমানতা ফুটে উঠেছে। কত ‘বর্ষা-শীত-গ্রীষ্ম’, সোনা ব্যাঙের ডাক কিংবা শৈশবের সেই আকুল ‘পূজোর ছুটি’ পার হয়ে গেছে, কিন্তু কবি এখনো সেই কুলপির কাঠি হাতে নিয়েই দাঁড়িয়ে আছেন। চারপাশের মানুষ তাদের তৃষ্ণা মিটিয়ে যার যার ঘরে ফিরে যায়, কেউ কেউ কবির এই অন্তহীন অপেক্ষা দেখে সমবেদনা বা দুঃখ প্রকাশ করে। কিন্তু কবি অত্যন্ত অবিচল চিত্তে সবাইকে বুকে জড়িয়ে ধরে নিজের এক ধরণের নিয়তিকে মেনে নেন। এই অপেক্ষা এখন আর কোনো ক্ষোভ নয়, এটিই তাঁর যাপিত জীবন।
কবিতার শেষাংশে এসে এক সামাজিক দূরত্বের দেয়াল ও মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরের চিত্রকল্প তৈরি হয়। বিকেলের দিকে এসডিও (Sub-Divisional Officer)-র মেয়েটির সবুজ লনে গোলাপের সাথে খেলা করার দৃশ্যটি এক ধরণের শ্রেণী-দূরত্ব বা দুর্লভতার প্রতীক। সেই আভিজাত্যের ঘেরাটোপে কবির প্রকাশ্য ‘প্রবেশাধিকার’ মেলে না বলেই তিনি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন ‘ভ্রমর’ হওয়ার—যাকে কোনো প্রাচীর বা দারোয়ান আটকে রাখতে পারে না। পরিশেষে, কবি আবার ফিরে যান তাঁর সেই আদি শিক্ষকের কাছে—‘হরিপদবাবু আমি এখনো হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছি।’ এই উচ্চারণটি প্রমাণ করে যে পৃথিবীর সব নিয়ম বদলে গেলেও, কবির সেই প্রথম প্রেমের নিষ্ঠা ও আনুগত্য বিন্দুমাত্র টলেনি।
সৃষ্টির সার্থকতা লৌকিক হাততালিতে নয়, বরং স্রষ্টার নিজের মানসিক মুক্তি এবং অস্তিত্বের তাগিদে—যা এই কবিতায় এক গ্রামীণ সারল্য, তীব্র সামাজিক শ্লেষ এবং এক চিরকালীন প্রেমের অবিনশ্বর ইশতেহার হয়ে বাংলা কবিতায় এক অনন্য রূপ ধারণ করেছে।
চাই – মাকিদ হায়দার | মাকিদ হায়দারের প্রেমের কবিতা | স্বপক্ষে হাত তোলার চিরন্তন প্রতিজ্ঞা | ‘একটি কুলপি মুখে গুঁজে দিয়ে আর একটি মাথার উপরে তুলে ধরেছিলাম’ ও ‘একদিন ভ্রমর হবো’
চাই: মাকিদ হায়দারের স্বপক্ষে হাত তোলার চিরন্তন প্রতিজ্ঞার অসাধারণ কাব্য, ‘তোমার স্বপক্ষেই হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছি’ বলে শুরু, হরিপদ বাবুর ক্লাসের প্রশ্নের উত্তর না জানার স্বীকারোক্তি, কুলপি বেচতে আসা শিবনাথের স্মৃতি ও ‘তোমাকে দেবার নামে কুলপি মাথার উপরে তোলা’, ‘কতো বর্ষা-শীত-গ্রীষ্ম সোনা ব্যাঙ পুজোর ছুটি, কুলপির কাঠি হাতে নিয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছি’ বলে চিরন্তন অপেক্ষা, ও ‘একদিন ভ্রমর হবো’ বলে চূড়ান্ত স্বপ্নের অমর সৃষ্টি
মাকিদ হায়দারের “চাই” বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য, প্রেমময় ও প্রতিজ্ঞাভরা সৃষ্টি। “তোমার স্বপক্ষেই হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছি” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে স্বপক্ষে হাত তোলার চিরন্তন প্রতিজ্ঞার কাহিনি; ‘যদি প্রতিশ্রুতি দাও, অথবা প্রবেশাধিকার, পাশে গিয়ে বসবো সুখদ যন্ত্রণায়’ বলে যে কোনো মূল্যে পাশে থাকার অঙ্গীকার; ‘হরিপদ বাবু ব্ল্যাকবোর্ডে একটি প্রশ্ন দিয়েছিলেন, উত্তরটা তুমি দিতে পারবে না বলেই তোমার স্বপক্ষে হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছি’ বলে শিক্ষকের প্রশ্নের উত্তর না জানার স্বীকারোক্তি ও সেই কারণেই সমর্থন; ‘প্রথম স্কুলের মাঠে কুলপি বেচতে এসেছিল হারানের ছেলে শিবনাথ; একটি কুলপি মুখে গুঁজে দিয়ে আর একটি মাথার উপরে তুলে ধরেছিলাম তোমাকে দেবার নামে’ বলে শৈশবের স্মৃতি ও অঙ্গীকার; ‘কতো বর্ষা-শীত-গ্রীষ্ম সোনা ব্যাঙ পুজোর ছুটি, কুলপির কাঠি হাতে নিয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছি’ বলে সময়ের দীর্ঘতা ও অটলতা; ‘কুলপির ঠান্ডা জলে কতো লোক পিপাসা নিবারণ করে ফিরে যায়, কেউ কেউ নিয়মিত এসে দুঃখ করে বলে যায়; আমি সকলকেই বুকে জড়িয়ে ধরি আর বলি, এই আমার নিয়তি’ বলে নিঃশর্ত ভালোবাসা ও দায়িত্ব; ‘বিকেলের দিকে এসডিও-র মেয়েটি সবুজ লনের ভেতর গোলাপের সাথে খেলা করে, আমি প্রবেশাধিকার চাই, পাই না বলেই মনে মনে প্রতিজ্ঞা করি একদিন ভ্রমর হবো’ বলে অপ্রাপ্তির স্বপ্ন; এবং শেষ পর্যন্ত ‘হরিপদবাবু আমি এখনো হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছি’ বলে চূড়ান্ত স্বীকারোক্তির অসাধারণ কাব্যচিত্র। মাকিদ হায়দার একজন সমসাময়িক বাঙালি কবি। তিনি প্রেম, প্রতিজ্ঞা, অপেক্ষা ও অপ্রাপ্তির স্বপ্ন নিয়ে লিখেছেন। তাঁর কবিতায় সহজ-সরল ভাষায় গভীর আবেগ ও নস্টালজিয়া ফুটে উঠেছে। “চাই” সেই স্বকীয় কাব্যভাষার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যেখানে তিনি ‘চাই’ বলতে চান প্রবেশাধিকার, ভালোবাসা, স্বপ্ন।
মাকিদ হায়দার: প্রেম ও প্রতিজ্ঞার কবি
মাকিদ হায়দার একজন সমসাময়িক বাঙালি কবি। তিনি প্রেম, প্রতিজ্ঞা, অপেক্ষা, অপ্রাপ্তির স্বপ্ন, স্মৃতি ও নস্টালজিয়া নিয়ে লিখেছেন। তাঁর কবিতায় সহজ-সরল ভাষায় গভীর আবেগ, কাব্যিক স্মৃতি ও বাস্তবের চিত্র ফুটে উঠেছে।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘চাই’, ‘মুমুর জন্যে’, ‘অন্য নামে ডাকো’, ‘নির্বাচিত কবিতা’ ইত্যাদি।
মাকিদ হায়দারের প্রেমের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ‘তোমার স্বপক্ষেই হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছি’ বলে বারবার ঘোষণা, হরিপদ বাবুর ক্লাসের স্মৃতি, ‘কুলপি বেচতে আসা শিবনাথ’ ও ‘কুলপি মাথার উপরে তোলা’, ‘কুলপির কাঠি হাতে নিয়ে এখনো দাঁড়িয়ে থাকা’, ‘কুলপির জলে পিপাসা নিবারণকারীদের বুকে জড়িয়ে ধরা’, ‘এসডিও-র মেয়েটির সঙ্গে গোলাপ খেলা ও ভ্রমর হওয়ার স্বপ্ন’, এবং ‘হরিপদবাবু আমি এখনো হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছি’ বলে চূড়ান্ত স্বীকারোক্তি। ‘চাই’ সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ — যেখানে তিনি ‘চাই’ বলেছেন প্রবেশাধিকার, ভালোবাসা, স্বপ্ন।
চাই: শিরোনামের তাৎপর্য ও কবিতার পটভূমি
শিরোনাম ‘চাই’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘চাই’ মানে ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, প্রার্থনা। কবি ‘চান’ — প্রবেশাধিকার, ভালোবাসা, স্বপ্ন। ‘চাই’ শব্দটি সরল, তীব্র ও আকুল।
কবিতাটি প্রেম ও প্রতিজ্ঞার পটভূমিতে রচিত। কবি প্রিয় মানুষের ‘স্বপক্ষে হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছেন’। তিনি হরিপদ বাবুর ক্লাসের প্রশ্নের উত্তর না জানলেও সেই কারণেই সমর্থন জানান। তিনি শৈশবে কুলপি মাথায় তুলে অঙ্গীকার করেছিলেন। এখনো সেই অঙ্গীকারে দাঁড়িয়ে আছেন।
কবি শুরুতে বলছেন — তোমার স্বপক্ষেই হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছি। যদি প্রতিশ্রুতি দাও, অথবা প্রবেশাধিকার, পাশে গিয়ে বসবো সুখদ যন্ত্রণায়।
আমি তোমার স্বপক্ষেই হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছি। হরিপদ বাবু ব্ল্যাকবোর্ডে একটি প্রশ্ন দিয়ে জানতে চেয়েছিলেন, এর উত্তরটা যদি কারো জানা থাকে তবে হাত তোল। উত্তরটা তুমি দিতে পারবে না বলেই তোমার স্বপক্ষে হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছি।
সেই বারই প্রথম স্কুলের মাঠে কুলপি বেচতে এসেছিলো হারানের ছেলে শিবনাথ। একটি কুলপি মুখে গুঁজে দিয়ে আর একটি মাথার উপরে তুলে ধরেছিলাম তোমাকে দেবার নামে। সেই থেকে আমি হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছি।
কতো বর্ষা-শীত-গ্রীষ্ম সোনা ব্যাঙ পুজোর ছুটি, কুলপির কাঠি হাতে নিয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছি।
কুলপির ঠান্ডা জলে কতো লোক পিপাসা নিবারণ করে যার যার ঘরে ফিরে যায়, কেউ কেউ নিয়মিত এসে দুঃখ করে বলে যায়। আমি সকলকেই বুকে জড়িয়ে ধরি আর বলি, এই আমার নিয়তি:
বিকেলের দিকে এসডিও-র মেয়েটি সবুজ লনের ভেতর গোলাপের সাথে খেলা করে, আমি প্রবেশাধিকার চাই, পাই না বলেই মনে মনে প্রতিজ্ঞা করি একদিন ভ্রমর হবো।
হরিপদবাবু আমি এখনো হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছি।
চাই: স্তবকভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ (সংক্ষিপ্ত আকারে)
প্রথম স্তবক: স্বপক্ষে হাত তোলা ও সুখদ যন্ত্রণায় বসার প্রতিজ্ঞা
“تومার স্বপক্ষেই হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছি। / যদি প্রতিশ্রুতি دাও, অথবা প্রবেশাধিকার / পাশে গিয়ে বসবো সুখদ যন্ত্রণায়।”
প্রথম স্তবকে স্বপক্ষে হাত তোলার প্রতিজ্ঞা। ‘সুখদ যন্ত্রণায়’ — সুখ ও যন্ত্রণা একসঙ্গে। যে কোনো মূল্যে পাশে থাকার অঙ্গীকার।
দ্বিতীয় স্তবক: হরিপদ বাবুর প্রশ্ন ও উত্তর না জানার কারণেই হাত তোলা
“আমি তোমার স্বপক্ষেই হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছি। / হরিপد بাবু ব্ল্যাকবোর্ডে একটি প্রশ্ন দিয়ে জানতে چেয়েছিলেন, / এর উত্তরটা যদি কারو জানা থাকে তবে হাত تোল۔ / উত্তরটা تومی দিতে পারবে না বলেই / তোমার স্বপক্ষে হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছি।”
দ্বিতীয় স্তবকে শিক্ষকের ক্লাসের স্মৃতি। প্রশ্নের উত্তর না জানলেও, কারণ প্রিয় মানুষটি উত্তর দিতে পারবে না — সেই কারণেই তিনি তার পক্ষে হাত তুলেছেন। এটি নিঃশর্ত সমর্থনের প্রতীক।
তৃতীয় স্তবক: কুলপি বেচতে আসা শিবনাথ ও কুলপি মাথায় তোলার অঙ্গীকার
“সেই বারই প্রথম স্কুলের মাঠে কুলপি বেচতে / এসেছিলো হারানের ছেলে শিবনাথ। / একটি কুলপি মুখে গুঁজে দিয়ে আর একটি / মাথার উপরে তুলে ধরেছিলাম তোমাকে دেবার নামে। / সেই থেকে আমি হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছি।”
তৃতীয় স্তবকে শৈশবের স্মৃতি। ‘কুলপি’ — এক ধরনের পানীয় বা ফল। একটি খেয়ে, আর একটি মাথায় তুলে প্রিয় মানুষটিকে দেওয়ার নামে অঙ্গীকার। সেই থেকে হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছেন।
চতুর্থ ও পঞ্চম স্তবক: কুলপির কাঠি হাতে এখনো দাঁড়িয়ে থাকা ও পিপাসা নিবারণকারীদের বুকে জড়িয়ে ধরা
“كতো বর্ষা-শীত-গ্রীষ্ম সোনا ব্যাঙ পুজোর ছুটি, / কুলপির كাঠি হাতে نিয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছি। / কুলপির ঠান্ডা جলে كتو لوك / পিপাসা নিবারণ করে যার যার ঘরে فیرে যায়, / كেউ كেউ নিয়মিত এসে দুঃখ করে বলে যায়। / আমি সকলকেই বুকে جড়িয়ে ধরি আর বলি, / এই আমার নিয়তি:”
চতুর্থ ও পঞ্চম স্তবকে সময়ের দীর্ঘতা ও নিঃশর্ত ভালোবাসা। ‘সোনা ব্যাঙ পুজোর ছুটি’ — গ্রামীণ উৎসবের স্মৃতি। ‘কুলপির কাঠি হাতে নিয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছি’ — অটলতা। ‘কুলপির ঠান্ডা জলে পিপাসা নিবারণকারীরা ফিরে যায়, কেউ কেউ দুঃখ করে বলে যায়’ — মানুষের কষ্টের কথা। ‘আমি সকলকেই বুকে জড়িয়ে ধরি’ — নিঃশর্ত ভালোবাসা। ‘এই আমার নিয়তি’ — এটাই তার ভাগ্য।
ষষ্ঠ ও সপ্তম স্তবক: এসডিও-র মেয়েটির গোলাপ খেলা ও ভ্রমর হওয়ার স্বপ্ন
“বিকেলের দিকে এসডিও-র মেয়েটি সবুজ لনের ভেতর / গোলাপের সাথে খেলা করে, / আমি প্রবেশাধিকার চাই, পাই না বলেই মনে মনে প্রতিজ্ঞা করি / একদিন ভ্রমর هبم।”
ষষ্ঠ ও সপ্তম স্তবকে অপ্রাপ্তির স্বপ্ন। ‘এসডিও-র মেয়েটি’ — উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার মেয়ে। ‘সবুজ লনের ভেতর গোলাপের সাথে খেলা’ — সুন্দর, দূরবর্তী জগৎ। ‘প্রবেশাধিকার চাই, পাই না’ — অধিকার নেই। ‘মনে মনে প্রতিজ্ঞা করি একদিন ভ্রমর হবো’ — ভ্রমর ফুলের চারপাশে উড়ে, গোলাপের কাছে যেতে পারে। ‘ভ্রমর হওয়া’ মানে কাছাকাছি যাওয়ার স্বপ্ন।
অষ্টম ও শেষ স্তবক: হরিপদবাবু আমি এখনো হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছি
“হরিপদবাবু আমি এখনو هات তুলে দাঁড়িয়ে আছি।”
অষ্টম ও শেষ স্তবকে চূড়ান্ত স্বীকারোক্তি। ‘হরিপদবাবু’ — সেই পুরনো শিক্ষককে সম্বোধন। ‘আমি এখনো হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছি’ — অটলতা, চিরন্তন অপেক্ষা ও প্রতিজ্ঞা।
কবিতার গঠনশৈলী, ছন্দ ও শিল্পরূপ
কবিতাটি গদ্যছন্দে রচিত। ‘তোমার স্বপক্ষেই হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছি’ — বারবার পুনরাবৃত্তি। ‘হরিপদ বাবু’ — শিক্ষকের চরিত্র। ‘কুলপি’ — গ্রামীণ স্মৃতির প্রতীক। ‘শিবনাথ’ — নাম উল্লেখ করে বাস্তবতা। ‘সোনা ব্যাঙ পুজোর ছুটি’ — গ্রামীণ সংস্কৃতি। ‘কুলপির কাঠি হাতে নিয়ে এখনো দাঁড়িয়ে থাকা’ — চিরন্তন অপেক্ষার প্রতীক। ‘এসডিও-র মেয়েটি ও গোলাপ খেলা’ — অপ্রাপ্তির প্রতীক। ‘ভ্রমর হওয়া’ — স্বপ্নের প্রতীক। ‘হরিপদবাবু আমি এখনো হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছি’ — চূড়ান্ত স্বীকারোক্তি।
প্রতীক ব্যবহার অত্যন্ত শক্তিশালী। ‘হাত তুলে দাঁড়িয়ে থাকা’ — সমর্থন, প্রতিজ্ঞা, অপেক্ষার প্রতীক। ‘সুখদ যন্ত্রণা’ — ভালোবাসার দ্বান্দ্বিকতার প্রতীক। ‘হরিপদ বাবুর প্রশ্ন’ — শিক্ষা ও পরীক্ষার প্রতীক। ‘কুলপি’ — গ্রামীণ সরলতা ও শৈশবের প্রতীক। ‘কুলপির কাঠি’ — অপেক্ষার প্রতীক। ‘কুলপির ঠান্ডা জল’ — সান্ত্বনা ও পিপাসা নিবারণের প্রতীক। ‘এসডিও-র মেয়েটি ও গোলাপ’ — উচ্চ শ্রেণির প্রতীক, অপ্রাপ্তির প্রতীক। ‘ভ্রমর’ — ফুলের কাছে যাওয়ার ইচ্ছার প্রতীক। ‘হরিপদবাবু’ — অতীতের শিক্ষকের প্রতীক, সময়ের সাক্ষীর প্রতীক।
পুনরাবৃত্তি শৈলী অত্যন্ত কার্যকর। ‘তোমার স্বপক্ষেই হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছি’ — তিনবার। ‘এখনো’ — দুইবার।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য ও দার্শনিক মাত্রা
“চাই” মাকিদ হায়দারের এক অসাধারণ সৃষ্টি। তিনি এখানে স্বপক্ষে হাত তোলার চিরন্তন প্রতিজ্ঞার এক গভীর ও স্পর্শকাতর কাব্যচিত্র এঁকেছেন।
প্রথম স্তবকে — স্বপক্ষে হাত তোলা ও সুখদ যন্ত্রণায় বসার প্রতিজ্ঞা। দ্বিতীয় স্তবকে — হরিপদ বাবুর প্রশ্ন ও উত্তর না জানার কারণেই হাত তোলা। তৃতীয় স্তবকে — কুলপি বেচতে আসা শিবনাথ ও কুলপি মাথায় তোলার অঙ্গীকার। চতুর্থ ও পঞ্চম স্তবকে — কুলপির কাঠি হাতে এখনো দাঁড়িয়ে থাকা ও পিপাসা নিবারণকারীদের বুকে জড়িয়ে ধরা। ষষ্ঠ ও সপ্তম স্তবকে — এসডিও-র মেয়েটির গোলাপ খেলা ও ভ্রমর হওয়ার স্বপ্ন। অষ্টম ও শেষ স্তবকে — হরিপদবাবু আমি এখনো হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছি।
এই কবিতা আমাদের শেখায় — ‘তোমার স্বপক্ষেই হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছি’; প্রতিশ্রুতি বা প্রবেশাধিকার পেলে ‘পাশে গিয়ে বসবো সুখদ যন্ত্রণায়’; হরিপদ বাবুর প্রশ্নের উত্তর না জানলেও, তুমি দিতে পারবে না বলেই তোমার স্বপক্ষে হাত তুলেছি; কুলপি বেচতে আসা শিবনাথের কাছ থেকে একটি কুলপি খেয়ে আর একটি মাথায় তুলে ধরেছিলাম তোমাকে দেবার নামে; কতো বর্ষা-শীত-গ্রীষ্ম, সোনা ব্যাঙ পুজোর ছুটি পেরিয়ে, কুলপির কাঠি হাতে নিয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছি; কুলপির জলে পিপাসা নিবারণকারীরা ফিরে যায়, কেউ কেউ দুঃখ করে বলে যায়; আমি সকলকেই বুকে জড়িয়ে ধরি — এটাই নিয়তি; এসডিও-র মেয়েটি গোলাপের সাথে খেলা করে, আমি প্রবেশাধিকার পাই না বলে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করি ‘একদিন ভ্রমর হবো’; আর হরিপদবাবু — ‘আমি এখনো হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছি’।
মাকিদ হায়দারের কবিতায় স্বপক্ষে হাত তোলা, অপেক্ষা ও স্বপ্ন
মাকিদ হায়দারের কবিতায় স্বপক্ষে হাত তোলা, অপেক্ষা ও স্বপ্ন একটি পুনরাবৃত্ত বিষয়। তিনি ‘চাই’ কবিতায় স্বপক্ষে হাত তোলার চিরন্তন প্রতিজ্ঞার অসাধারণ কাব্যিক চিত্র এঁকেছেন। তিনি দেখিয়েছেন — কীভাবে ‘তোমার স্বপক্ষেই হাত তুলে দাঁড়িয়ে থাকা’; কীভাবে ‘হরিপদ বাবুর প্রশ্নে তুমি দিতে পারবে না বলেই হাত তোলা’; কীভাবে ‘কুলপি মাথায় তুলে তোমাকে দেবার নামে অঙ্গীকার’; কীভাবে ‘কুলপির কাঠি হাতে নিয়ে এখনো দাঁড়িয়ে থাকা’; কীভাবে ‘কুলপির জলে পিপাসা নিবারণকারীদের বুকে জড়িয়ে ধরা’; কীভাবে ‘এসডিও-র মেয়েটির কাছে প্রবেশাধিকার না পেয়ে ভ্রমর হওয়ার স্বপ্ন’; আর কীভাবে ‘হরিপদবাবু, আমি এখনো হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছি’।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলা সাহিত্যের মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক পাঠ্যক্রমে মাকিদ হায়দারের ‘চাই’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত থাকার যোগ্য। এই কবিতাটি শিক্ষার্থীদের প্রতিজ্ঞা, অপেক্ষা, অপ্রাপ্তির স্বপ্ন, গ্রামীণ স্মৃতি, এবং মাকিদ হায়দারের স্পর্শকাতর কাব্যভাষা সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করে। বিশেষ করে ‘তোমার স্বপক্ষেই হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছি’, ‘হরিপদ বাবুর প্রশ্ন’, ‘কুলপি বেচতে আসা শিবনাথ’, ‘একটি কুলপি মুখে গুঁজে দিয়ে আর একটি মাথার উপরে তুলে ধরেছিলাম’, ‘কুলপির কাঠি হাতে নিয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছি’, ‘আমি সকলকেই বুকে জড়িয়ে ধরি’, ‘একদিন ভ্রমর হবো’, এবং ‘হরিপদবাবু আমি এখনো হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছি’ — এসব বিষয় শিক্ষার্থীদের কাব্যবোধ, প্রেমের দর্শন ও স্মৃতিচারণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
চাই সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: চাই কবিতাটির রচয়িতা কে?
এই কবিতাটির রচয়িতা মাকিদ হায়দার। তিনি একজন সমসাময়িক বাঙালি কবি। তিনি প্রেম, প্রতিজ্ঞা, অপেক্ষা, অপ্রাপ্তির স্বপ্ন, স্মৃতি ও নস্টালজিয়া নিয়ে লিখেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘চাই’, ‘মুমুর জন্যে’, ‘অন্য নামে ডাকো’, ‘নির্বাচিত কবিতা’ ইত্যাদি।
প্রশ্ন ২: ‘তোমার স্বপক্ষেই হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছি’ — লাইনটির পুনরাবৃত্তির তাৎপর্য কী?
এই পঙ্ক্তিটি তিনবার পুনরাবৃত্তি হয়েছে। এটি প্রতিজ্ঞার দৃঢ়তা, অটলতা ও চিরন্তন অপেক্ষার প্রতীক।
প্রশ্ন ৩: ‘পাশে গিয়ে বসবো সুখদ যন্ত্রণায়’ — ‘সুখদ যন্ত্রণা’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘সুখদ’ মানে সুখ দেয়। ‘সুখদ যন্ত্রণা’ — যে যন্ত্রণা সুখ দেয়। ভালোবাসার যন্ত্রণা, প্রেমের বেদনা — যা কষ্ট দিলেও তাতে সুখ পাওয়া যায়।
প্রশ্ন ৪: ‘হরিপদ বাবু ব্ল্যাকবোর্ডে একটি প্রশ্ন দিয়েছিলেন’ — এই স্মৃতির তাৎপর্য কী?
এটি স্কুলজীবনের একটি স্মৃতি। শিক্ষক প্রশ্ন দিয়েছিলেন, যার উত্তর প্রিয় মানুষটি দিতে পারবে না — সেই কারণেই কবি তার পক্ষে হাত তুলেছেন। এটি নিঃশর্ত সমর্থনের প্রতীক।
প্রশ্ন ৫: ‘কুলপি’ কী এবং কবিতায় এর তাৎপর্য কী?
‘কুলপি’ এক ধরনের পানীয় বা ফল। এটি গ্রামীণ ও শৈশবের স্মৃতির প্রতীক। কুলপি মাথায় তোলার মাধ্যমে কবি শৈশবে অঙ্গীকার করেছিলেন। সেই অঙ্গীকার আজও বহাল।
প্রশ্ন ৬: ‘সোনা ব্যাঙ পুজোর ছুটি’ — লাইনটির সাংস্কৃতিক তাৎপর্য কী?
এটি গ্রামীণ সংস্কৃতির একটি চিহ্ন। সোনা ব্যাঙ পুজো একটি আঞ্চলিক উৎসব। এই পঙ্ক্তি সময়ের দীর্ঘতা ও গ্রামীণ জীবনের স্মৃতি ফুটিয়ে তুলেছে।
প্রশ্ন ৭: ‘কুলপির ঠান্ডা জলে পিপাসা নিবারণ করে যার যার ঘরে ফিরে যায়’ — লাইনটির তাৎপর্য কী?
কবি কুলপির ঠান্ডা জল দিয়ে মানুষের পিপাসা নিবারণ করেন। তারা ফিরে যায়, কেউ কেউ দুঃখ করে বলে যায়। কবি সকলকে বুকে জড়িয়ে ধরেন — এটি নিঃশর্ত ভালোবাসার প্রতীক।
প্রশ্ন ৮: ‘এসডিও-র মেয়েটি সবুজ লনের ভেতর গোলাপের সাথে খেলা করে’ — লাইনটির তাৎপর্য কী?
এসডিও-র মেয়ে — উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার মেয়ে, লনের ভেতর গোলাপ খেলা — একটি দূরবর্তী, সুন্দর ও অপ্রাপ্য জগতের প্রতীক।
প্রশ্ন ৯: ‘একদিন ভ্রমর হবো’ — এই স্বপ্নের তাৎপর্য কী?
ভ্রমর ফুলের চারপাশে উড়ে, গোলাপের কাছে যেতে পারে। ‘ভ্রমর হওয়া’ মানে কাছাকাছি যাওয়া, গোলাপের সঙ্গে মিশে যাওয়া। এটি অপ্রাপ্তির স্বপ্ন ও সান্ত্বনার প্রতীক।
প্রশ্ন ১০: কবিতার মূল শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা কী?
কবিতাটি আমাদের শেখায় — ‘তোমার স্বপক্ষেই হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছি’; প্রতিশ্রুতি বা প্রবেশাধিকার পেলে ‘পাশে গিয়ে বসবো সুখদ যন্ত্রণায়’; হরিপদ বাবুর প্রশ্নের উত্তর না জানলেও, তুমি দিতে পারবে না বলেই তোমার স্বপক্ষে হাত তুলেছি; কুলপি বেচতে আসা শিবনাথের কাছ থেকে একটি কুলপি খেয়ে আর একটি মাথায় তুলে ধরেছিলাম তোমাকে দেবার নামে; কতো বর্ষা-শীত-গ্রীষ্ম, সোনা ব্যাঙ পুজোর ছুটি পেরিয়ে, কুলপির কাঠি হাতে নিয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছি; কুলপির জলে পিপাসা নিবারণকারীরা ফিরে যায়, কেউ কেউ দুঃখ করে বলে যায়; আমি সকলকেই বুকে জড়িয়ে ধরি — এটাই নিয়তি; এসডিও-র মেয়েটি গোলাপের সাথে খেলা করে, আমি প্রবেশাধিকার পাই না বলে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করি ‘একদিন ভ্রমর হবো’; আর হরিপদবাবু — ‘আমি এখনো হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছি’। এই কবিতাটি আজকের দিনে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক — নিঃশর্ত ভালোবাসা, অপেক্ষা, অপ্রাপ্তির স্বপ্ন, এবং চিরন্তন প্রতিজ্ঞা — সবকিছুই চিরন্তন ও সময়োপযোগী বিষয়।
ট্যাগস: চাই, মাকিদ হায়দার, মাকিদ হায়দারের প্রেমের কবিতা, স্বপক্ষে হাত তোলা, কুলপি, শিবনাথ, সোনা ব্যাঙ পুজো, ভ্রমর হবো
© Kobitarkhata.com – কবি: মাকিদ হায়দার | কবিতার প্রথম লাইন: “তোমার স্বপক্ষেই হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছি” | স্বপক্ষে হাত তোলার চিরন্তন প্রতিজ্ঞার অমর কবিতা বিশ্লেষণ | মাকিদ হায়দারের প্রেমের কাব্যধারার অসাধারণ নিদর্শন