কৌটোর ইচ্ছেগুলো – জিয়া হায়দার।

তুই একবার কাছে আয়, বোস্ এখানে, কপালে
হাতটা রাখ, দ্যাখ্ কি যে ঝাঁ ঝাঁ জ্বরে
গা পুড়ছে। বিষ্টি হয়না ক’দিন,
তায় গুমোট গরম। বুকে তুই কান পেতে দে, তাহলে
শুনতে পাবি, কদ্দিন বিষ্টির দেখা নেই;
রেহেলে কোরাণ পাক, পানবাটা, পিঁড়ি,
আর যেন কি কি সম্পত্তি আমার
তুলে রাখবি কিন্তু সেই সব ভালো করে;

সামনের বছর, কিংবা তার পরের বছর,
কিংবা তারো পরে একদিন না একদিন খুব বিষ্টি হবে,
সে বিষ্টিতে দোরগোড়ায় যে ফুলগাছটা; তাতে ফুল ফুটলে-

জানিস, তখন আমি বারো বছরের,
সংসারের বড়ো বউ, নিজ হাতে লাগিয়েছিলাম,
কিন্তু ফুল দেয়নি কোনো সকালেই;
তা সেই বিষ্টির পর ভোরে ফুল ফুটলে তুই
আমার কবরে রেখে আসবি, শিয়রের দিকে;

সে সময় খুব ফসল উঠবে, ইচ্ছেমতো গান করিস,
দোহারে ধুয়ো ধরিস, বাঁশির গান,
আর সে সময়ই কিন্তু আমার ছোটকুর বিয়ে দিবি,
নতুন বউমাকে বলবি নিজহাতে উঠোনটা নিকোতে,
তারপর উঠোনে, দাওয়ায় আলপনা কাটতে,
তা’তে যেন অবশ্যই ধানশীষ আর পায়রা থাকে;

ওই যে বললাম, কোরাণশরীফ, পানবাটা,
এগুলো বউমাকে দিবি;

মা হাসলেন, নিবন্ত প্রদীপ হঠাৎ জোরালো যেন,
এ জন্যেই তুলে রাখতে বলছি ওগুলো;

আর শোন, এতোক্ষণ বলাই হয়নি,
আমার মাথার নীচে একটা কৌটো আছে,

সেটাও বউমাকে দিবি,
জানিস ওতে কী আছে,
আমার কয়েকটুকরো ইচ্ছে-
ফুল, বিষ্টি, পায়রা, ধানশীষ, গান;
ইচ্ছেগুলো কৌটোর ঢাকনা খুলে
বেরোতে পারেনি কোনোদিন,
তোর হাতে, না, তোর না,
তুই, তোরা বড়ো অলক্ষুনে,
পয়মন্ত বউমার হাতে পড়ে’
দেখিস একদিন
ইচ্ছেগুলো বেরোবেই ঠিক,
রং বেরঙের প্রজাপতি হয়ে,
সারা বাড়ি, ঘরময় ঘুরবে,
উড়ে উড়ে আরো, আরো
নতুন ইচ্ছের রেশম বানাবে,
তখন আমার নামে একটা মিলাদ দিস;

তুই কিছু বল্ এখন, যা মনে ধরে বল্;
আরো অনেক, অনেক দিন আমাদের মাটিতে
বিষ্টি হবে না, ফুটবে না ফুলও;
কেন, আমি তা জানি না,
আমরা কেউ নয়, কেউ-ই জানি না-

মাকে একথাটা বলবো কি বলবো না;
অসহায় বিহ্বল সংকোচ
বলবো কি বলবো না!

আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। জিয়া হায়দারের কবিতা।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x