কবিতার খাতা
ইচ্ছে হয় – হাসান হাফিজুর রহমান।
ইচ্ছে হয়, ফিরে যাই মার বুকে
শৈশবের অমলিন খেলাঘরে
সেখানে হাঁটি হাঁটি পা পা শিখি পুনরায়
ধুলোকে সোনার চেয়েও দামি জেনে
বানাই প্রাসাদ,
অভাবনীয় সেই স্বর্গে যাই ফিরে;
ইচ্ছে হয়, পিতার সান্নিধ্যে যাই পুত্র হয়ে পুনর্বার
অপত্য স্নেহের যে ঋণ বুঝি নাই কোনোদিন
দুহাতে কুড়াই সেই অপরিমেয়;
ইচ্ছে হয়, যৌবনের রাঙা জাদু দণ্ডে
দু পা ছড়িয়ে বসি নিরুদ্বেগ কিছুকাল
রক্তের মাতাল রস করি পান, যার স্বাদ কিছু জানি নাই;
ইচ্ছে হয়, এখনো সময় আছে
যথার্থই পিতা হই হাস্যমুখ সুখী পরিবারে-
স্নায়ুর দারুণ প্রতাপ বেঘোরে তাড়ায় শুধু;
ইচ্ছে হয় ফিরে যাই শৈশবে, কৈশোরে, যৌবনে।
সময়ের অতুলন মণিগুলো হাতের মুঠোয় পেয়েও
এসেছি ছড়িয়ে ছিটিয়ে কেবল, শিখিনি গোছাতে।
শুধু ইচ্ছে নিয়ে মরি, ফেরবার পথ জানা নেই।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। হাসান হাফিজুর রহমানের কবিতা।
কবিতার কথা— হাসান হাফিজুর রহমানের ‘ইচ্ছে হয়’ কবিতাটি মানুষের জীবনের এক চিরন্তন আক্ষেপ এবং ফেলে আসা সময়ের প্রতি এক গভীর নস্টালজিয়ার প্রতিফলন। জীবনের অপরাহ্ণে দাঁড়িয়ে মানুষ যখন তার ফেলে আসা দিনগুলোর দিকে ফিরে তাকায়, তখন তার মনে হয় কত অমূল্য রতন সে অবহেলায় হারিয়েছে। কবিতার শুরুতেই কবির সেই আদিম ও অকৃত্রিম বাসনা—মায়ের বুকে ফিরে যাওয়া। শৈশবের সেই অমলিন খেলাঘর, যেখানে ‘হাঁটি হাঁটি পা পা’ শেখার মাঝে ছিল এক অপার বিস্ময়। সেই সময়ে ধুলোবালিও ছিল সোনার চেয়ে দামি, আর সেই ধুলো দিয়ে প্রাসাদ বানানোর যে অনাবিল আনন্দ, তা কোনো রাজকীয় ঐশ্বর্যের চেয়ে কম ছিল না। কবি সেই ‘অভাবনীয় স্বর্গে’ পুনরায় ফিরে যেতে চান, যেখানে অভাব বা জাগতিক জটিলতা স্পর্শ করতে পারত না।
কবিতার দ্বিতীয় স্তবকে কবি পিতার সান্নিধ্য কামনা করেছেন। শৈশব বা কৈশোরে আমরা বাবার যে অকৃপণ স্নেহ ও ত্যাগের ঋণ বুঝতে পারি না, পরিণত বয়সে এসে সেই ঋণের ভার আমাদের আপ্লুত করে। কবি সেই অপরিমেয় পিতৃস্নেহ এখন দুহাতে কুড়িয়ে নিতে চান। একইভাবে তাঁর ইচ্ছে হয় যৌবনের সেই ‘রাঙা জাদু দণ্ডে’র স্পর্শে ফিরে যেতে। যৌবন যখন রক্তে মাতাল রস ছড়িয়ে দেয়, তখন আমরা তার প্রকৃত স্বাদ বা গুরুত্ব অনুভব করার চেয়ে উদযাপনেই বেশি মগ্ন থাকি। কবি সেই নিরুদ্বেগ সময়টিতে দু পা ছড়িয়ে বসে জীবনকে নতুন করে আস্বাদন করতে চান। প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের জটিলতা আর স্নায়ুর প্রবল চাপ তাঁকে আজ এতটাই দিশেহারা করে দিয়েছে যে, তিনি একজন ‘হাস্যমুখ সুখী পিতা’ হওয়ার যে স্বাভাবিক স্বপ্ন, তা বাস্তবায়নেও নিজেকে অক্ষম মনে করেন। সময়ের দারুণ প্রতাপ তাঁকে কেবল তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে, সুস্থির হতে দিচ্ছে না।
কবির সবচেয়ে বড় আক্ষেপটি ফুটে উঠেছে যখন তিনি বলেন, সময়ের অতুলন মণিগুলো হাতের মুঠোয় পেয়েও তিনি কেবল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে এসেছেন, গুছিয়ে নিতে শেখেননি। এটি আসলে আমাদের সবারই জীবনের সত্য—আমরা যখন বর্তমানে থাকি, তখন সেই সময়ের মূল্য বুঝি না; আর যখন বুঝি, তখন সেই সময় অতীত হয়ে যায়। শৈশব, কৈশোর আর যৌবনের সেই দিনগুলো ছিল একেকটি রত্ন, যা অবহেলায় হারিয়ে গিয়েছে। এখন যখন সেই হারানো দিনগুলোর গুরুত্ব অনুধাবন করছেন, তখন ফিরে যাওয়ার সব পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে। জীবনের এই প্রান্তে এসে মানুষ কেবল ‘ইচ্ছে’ নিয়েই বেঁচে থাকে, কিন্তু সময়ের একমুখী স্রোত তাকে আর পেছনে ফেরার সুযোগ দেয় না।
পরিশেষে বলা যায়, ‘ইচ্ছে হয়’ কবিতাটি মানুষের অক্ষমতা আর সময়ের অমোঘ শাসনের এক করুণ আখ্যান। আমরা সবাই আমাদের অতীতে ফিরতে চাই, মা-বাবার সেই কোল আর যৌবনের সেই তেজ পুনরায় ফিরে পেতে চাই, কিন্তু প্রকৃতির নিয়মে তা অসম্ভব। হাসান হাফিজুর রহমান অত্যন্ত সহজ কিন্তু মরমী ভাষায় আমাদের জীবনের এই অপ্রাপ্তিগুলোকে তুলে ধরেছেন। এই কবিতাটি পাঠ করতে গিয়ে পাঠক নিজের অজান্তেই তাঁর হারানো দিনগুলোর ভিড়ে হারিয়ে যান এবং এক ধরণের সুক্ষ্ম হাহাকার অনুভব করেন। ফিরে যাওয়ার পথ না জানার এই যে যন্ত্রণা, তা-ই কবিতার মূল সুর হয়ে আমাদের হৃদয়কে সিক্ত করে। এই নিটোল বিশ্লেষণটি একটি নিরবচ্ছিন্ন চিন্তার প্রবাহ হিসেবে সাজানো হয়েছে যাতে কোনো যান্ত্রিক বিভাজন নেই এবং প্রতিটি শব্দ আপনার দেওয়া গাম্ভীর্য ও গভীরতা বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নির্বাচন করা হয়েছে। এটি হারানো সময়ের এক নিঃশব্দ বিলাপ।






