কবিতার শুরুতেই এক বিশাল মানবিক আবেদন—‘আর মারণাস্ত্র নয়’। পৃথিবী আজ যুদ্ধের বারুদে ঠাসা, মানুষের হাতে আজ ধ্বংসের সরঞ্জাম। কবি এর বিপরীতে চাইছেন ‘ভোরের ফুটপাতে’ ছড়ানো কিছু ‘ছুটির দিন’। এখানে ‘খুদকুড়ো’ এবং ‘কবুতর’-এর রূপকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কবুতর হলো শান্তির প্রতীক। খুদকুড়ো যেমন অতি সামান্য অথচ পাখিদের পরম তৃপ্তি দেয়, মানুষের জীবনের ছোট ছোট আনন্দের মুহূর্তগুলোও তেমনই। কবি চান মানুষ যেন মারণাস্ত্র ছেড়ে সেই খুদকুড়োর মতো সামান্য শান্তিতেই নিজেদের তৃপ্ত করতে পারে।
কবিতার দ্বিতীয় স্তবকে ফুটে উঠেছে এক বিষণ্ণ জীবনবোধ। ‘পিছনেতে কষ্টের সংসার’—এটি প্রতিটি সাধারণ মানুষের গল্প। কবি এখানে মহাভারতের কর্ণের রূপকটি অত্যন্ত নিপুণভাবে ব্যবহার করেছেন। কর্ণের যেমন সহজাত কবচ-কুণ্ডল ছিল যা তাঁর সুরক্ষাকবচ ছিল, মানুষেরও তেমনি কিছু আশা ও স্বপ্ন থাকে যা তাকে দারিদ্র্য আর কষ্টের মাঝে টিকিয়ে রাখে। কিন্তু ‘দারিদ্র্য ব্রাহ্মণ বেশে’ (যেমন ইন্দ্র কর্ণের কবচ নিয়েছিলেন) এসে মানুষের সেই স্বপ্ন বা সুরক্ষাকবচ কেড়ে নিয়ে গেছে। আজ মানুষ অনাবৃত, তার পালানোর তৃষ্ণা আজ আর গোপন নেই। বুকের ভেতর যে ছটফটানি এতদিন ঢাকা ছিল, তা আজ প্রকট হয়ে উঠেছে।
তৃতীয় স্তবকে কবি এক ‘অজানা দেশের’ কথা বলেছেন। এই দেশ কোনো মানচিত্রের দেশ নয়, এটি হলো সেই জগত যেখানে সীমান্ত পেরোলেই কেবল মনোরম ছুটির প্রহর পাওয়া যায়। এখানে ‘সীমান্ত’ বলতে জীবনের সীমাবদ্ধতা বা পার্থিব জগতের শেষ সীমানাকে বোঝানো হয়েছে। কবি পদব্রজে ভ্রমণ করতে চান না, কারণ তিনি ক্লান্ত। তিনি চান এক অনায়াস যাত্রা। খুদকুড়ো ছড়ানো ফুটপাতে কবুতরের ঘুরে ঘুরে নামার দৃশ্যটি এক পরম প্রশান্তির ছবি, যা কবির কাম্য।
কবিতার শেষাংশে এসে কবির ব্যক্তিত্বের সেই ঋজু রূপটি ধরা পড়ে। তিনি স্বীকার করেছেন যে একসময় জেলের কুলুপ বা প্রতিকূলতা তাঁকে আটকাতে চেয়েছিল, কিন্তু তিনি বরাবরই ‘ঘাড় উঁচু করে’ বা মেরুদণ্ড সোজা রেখে চলেছেন। অথচ এই দৃঢ় মানুষটিই আজ বলছেন, ‘বরং ছুটির দিন দিলে আমি জব্দ’। অর্থাৎ কষ্টের বিরুদ্ধে লড়াই করা সহজ, কিন্তু অখণ্ড অবসরের যে আমেজ, যে শীতলতা—তার সামনে আত্মসমর্পণ করা অনেক বেশি সুখকর। কবি এতটাই ক্লান্ত যে তিনি মানুষ পরিচয়ের ভার নামিয়ে রেখে ‘কবুতর’ হতেও রাজি আছেন, যদি সেই শান্তির জনপদে যাওয়ার ‘ছাড়পত্র’ বা ‘টিকিট’ মিলে যায়।
কৃপা করো ছুটি দাও – সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় | সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের আধুনিক কবিতা | যুদ্ধ ও কষ্টের ক্লান্তিতে ছুটির দিন চাওয়ার আর্তি | খুদকুড়ো ছড়ালে কবুতরের মতো সরল আনন্দে ফেরার আকুলতা
কৃপা করো ছুটি দাও: সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ক্লান্ত ও যুদ্ধক্লান্ত আত্মার ছুটির দিনের জন্য প্রার্থনা, খুদকুড়ো ও কবুতরের সরল আনন্দ, দারিদ্র্য ব্রাহ্মণ বেশে উধাও হওয়ার ব্যঙ্গ, এবং ‘আমি কবুতর হতে রাজি আছি’ বলে চূড়ান্ত আত্মসমর্পণের অসাধারণ কাব্য
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের “কৃপা করো ছুটি দাও” বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য, ক্লান্ত ও প্রার্থনাময় সৃষ্টি। “আর মারণাস্ত্র নয় প্রভু, তুমি কিছু ছুটির দিন ভোরের ফুটপাতে ছড়াতে পারো” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে যুদ্ধ ও মারণাস্ত্রের ক্লান্তিতে ছুটির দিন চাওয়ার আর্তি; ভোরের ফুটপাতে খুদকুড়ো ছড়ালে কবুতর এসে ঠোকরায় — সেই সরল আনন্দে ফেরার আকুলতা; পিছনে কষ্টের সংসার ও দারিদ্র্য ব্রাহ্মণ বেশে উধাও হয়ে যাওয়ার ব্যঙ্গ; সীমান্ত পেরিয়ে অজানা সমুদ্রতীর ও অজানা দেশের স্বপ্ন; ‘আমি ঘাড় উঁচু করেই ছিলাম বরাবর’ বলে আত্মসম্মানের কথা; এবং শেষ পর্যন্ত ‘আমি কবুতর হতে রাজি আছি যদি তুমি ছাড়পত্র দাও, কৃপা করে পাঠাও টিকিট’ বলে চূড়ান্ত আত্মসমর্পণের অসাধারণ কাব্যচিত্র। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (১৯৩৩-২০২০) একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কবি। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতায় ক্লান্তি, নিঃসঙ্গতা, নাগরিক জীবনের জটিলতা ও সরল আনন্দের সন্ধান নিয়ে লিখেছেন। তাঁর কবিতায় সহজ-সরল ভাষায় গভীর বেদনা ও প্রার্থনা ফুটে উঠেছে। “কৃপা করো ছুটি দাও” সেই স্বকীয় কাব্যভাষার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যেখানে তিনি প্রভুর কাছে অস্ত্র নয়, ছুটির দিন চেয়েছেন; কবুতর হতে রাজি হয়েছেন; টিকিট চেয়েছেন।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়: ক্লান্তি ও সরল আনন্দের সন্ধানী কবি
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ১৯৩৩ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একজন বিশিষ্ট আধুনিক বাঙালি কবি। তিনি ক্লান্তি, নিঃসঙ্গতা, নাগরিক জীবনের জটিলতা ও সরল আনন্দের সন্ধান নিয়ে লিখেছেন। তাঁর কবিতায় সহজ-সরল ভাষায় গভীর বেদনা ও প্রার্থনা ফুটে উঠেছে।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘কৃপা করো ছুটি দাও’, ‘অন্য নামে ডাকো’, ‘নির্বাচিত কবিতা’ ইত্যাদি। তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো যুদ্ধ ও মারণাস্ত্রের ক্লান্তিতে ছুটির দিন চাওয়া, ভোরের ফুটপাতে খুদকুড়ো ছড়ানো ও কবুতরের সরল আনন্দের প্রতীক, দারিদ্র্যের ব্যঙ্গাত্মক চিত্রায়ণ, সীমান্ত পেরিয়ে অজানা দেশের স্বপ্ন, আত্মসম্মানের কথা, এবং ‘কবুতর হতে রাজি’ বলে আত্মসমর্পণ। ‘কৃপা করো ছুটি দাও’ সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ — যেখানে তিনি ‘প্রভু’কে সম্বোধন করে সরাসরি ছুটির দিন চেয়েছেন।
কৃপা করো ছুটি দাও: শিরোনামের তাৎপর্য ও কবিতার পটভূমি
শিরোনাম ‘কৃপা করো ছুটি দাও’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘কৃপা করো’ — প্রার্থনা, অনুনয়। ‘ছুটি দাও’ — ক্লান্ত জীবনে বিশ্রামের দিন চাওয়া। এটি একটি প্রভুর কাছে প্রার্থনা। কবি আর মারণাস্ত্র চান না, বরং ছুটির দিন চান।
কবিতাটি যুদ্ধ বা জীবনযুদ্ধের ক্লান্তির পটভূমিতে রচিত। কবি প্রভুর কাছে ছুটির দিন চাইছেন — ভোরের ফুটপাতে খুদকুড়ো ছড়াতে চান, কবুতর এসে ঠোকরায় — সেই সরল দৃশ্য দেখতে চান।
কবি শুরুতে বলছেন — আর মারণাস্ত্র নয় প্রভু, তুমি কিছু ছুটির দিন ভোরের ফুটপাতে ছড়াতে পারো। খুদকুড়ো ছড়ালেই দেখো দেখো কত কবুতর এসে ঠোকরায়।
পিছনেতে কষ্টের সংসার পড়ে আছে। সহজাত কুণ্ডল ছিল একই। আশা অবিরত। দারিদ্র্য ব্রাহ্মণ বেশে কবে নিয়ে হয়েছে উধাও। কবচে যা ঢাকা ছিল অনাবৃত পড়ে আছে। পালানোর তৃষ্ণা ঢাকা ছিল বুকের ভিতর, পড়ে আছে।
ছুটি পেলে পালাবই। সীমান্ত পার হতে পারলেই আরো মনোরম ছুটির দিন। অজানা সমুদ্রতীর, অজানা সে দেশ, সেথাকার লাগি যেতে পারি অনেক ভ্রমণ করে। দেখো প্রভু সে ভ্রমণ পদব্রজে যেন না হয়। সীমান্ত পেরলেই মনোরম ছুটির প্রহর। খুদকুড়ো ছড়ানো রয়েছে ফুটপাতে, কবুতর ঘুরে ঘুরে নামে।
আর মারণাস্ত্র নয়, দারিদ্র্য নৈব চ। মনে আছে জেলের কুলুপ এঁটেছিল, আমি ঘাড় উঁচু করেই ছিলাম বরাবর।
বরং ছুটির দিন দিলে আমি জব্দ। পরদেশী মেঘলোক, আমেজে সুগোল শীতলতা লেগে থাকে।
আমি কবুতর হতে রাজি আছি যদি তুমি ছাড়পত্র দাও। কৃপা করে পাঠাও টিকিট!
কৃপা করো ছুটি দাও: স্তবকভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ
প্রথম স্তবক: আর মারণাস্ত্র নয় — ছুটির দিন চাওয়া ও ফুটপাতে কবুতরের স্বপ্ন
“আর মারণাস্ত্র নয় / প্রভু, তুমি কিছু ছুটির দিন / ভোরের ফুটপাতে ছড়াতে পারো / খুদকুড়ো ছড়ালেই / দেখো দেখো কত কবুতর এসে ঠোকরায়।”
প্রথম স্তবকে কবি প্রভুকে সম্বোধন করছেন। ‘আর মারণাস্ত্র নয়’ — যুদ্ধের অস্ত্র আর চান না। বরং ‘কিছু ছুটির দিন’ চান। ‘ভোরের ফুটপাতে ছড়াতে পারো’ — প্রভু যদি ফুটপাতে ছুটি ছড়িয়ে দেন। ‘খুদকুড়ো ছড়ালেই কত কবুতর এসে ঠোকরায়’ — খুদকুড়ো ছড়ালে কবুতর আসে, ঠোকরায় — এটি সরল, নিস্পাপ আনন্দের প্রতীক।
দ্বিতীয় স্তবক: কষ্টের সংসার, দারিদ্র্য ব্রাহ্মণ বেশে উধাও ও পালানোর তৃষ্ণা
“পিছনেতে কষ্টের সংসার পড়ে আছে / সহজাত কুণ্ডল ছিল একই / আশা অবিরত / দারিদ্র্য #ব্রাহ্মণ বেশে کবে নিয়ে হয়েছে উধাও কবচে যা ঢাকা ছিল / অনাবৃত পড়ে আছে / পালানোর তৃষ্ণা ঢাকা ছিল / বুকের ভিতর / পড়ে আছে।”
দ্বিতীয় স্তবকে কষ্টের বাস্তবতা। ‘পিছনেতে কষ্টের সংসার পড়ে আছে’ — অতীতে কষ্টের সংসার। ‘সহজাত কুণ্ডল ছিল একই’ — স্বাভাবিক কুণ্ডলিনী একই ছিল। ‘আশা অবিরত’ — আশা কখনো শেষ হয়নি। ‘দারিদ্র্য ব্রাহ্মণ বেশে কবে নিয়ে হয়েছে উধাও’ — দারিদ্র্য ব্রাহ্মণের বেশ ধরে উধাও হয়ে গেছে — একটি ব্যঙ্গাত্মক চিত্র। ‘কবচে যা ঢাকা ছিল অনাবৃত পড়ে আছে’ — যা ঢাকা ছিল, তা এখন খোলা পড়ে আছে। ‘পালানোর তৃষ্ণা ঢাকা ছিল বুকের ভিতর, পড়ে আছে’ — পালানোর ইচ্ছা বুকের ভেতর চাপা ছিল, এখনও পড়ে আছে।
তৃতীয় স্তবক: ছুটি পেলে সীমান্ত পেরিয়ে অজানা দেশের স্বপ্ন ও পদব্রজে না যাওয়ার অনুরোধ
“ছুটি পেলে পালাবই / সীমান্ত পার হতে পারলেই / আরো মনোরম ছুটির দিন / অজানা সমুদ্রতীর অজানা সে দেশ / سেথাকার লাগি / যেতে পারি অনেক ভ্রমণ করে / দেখো প্রভু সে ভ্রমণ পদব্রজে যেন না হয় / সীমান্ত পেরলেই মনোরম ছুটির প্রহর / খুদকুড়ো ছড়ানো রয়েছে ফুটপাতে / কবুতর ঘুরে ঘুরে নামে۔”
তৃতীয় স্তবকে ছুটি পেলে পালানোর স্বপ্ন। ‘সীমান্ত পার হতে পারলেই আরো মনোরম ছুটির দিন’ — সীমানা পেরোলেই ছুটি আরও সুন্দর। ‘অজানা সমুদ্রতীর অজানা সে দেশ’ — স্বপ্নের দেশ। ‘যেতে পারি অনেক ভ্রমণ করে’ — অনেক পথ পাড়ি দিয়ে। ‘দেখো প্রভু সে ভ্রমণ পদব্রজে যেন না হয়’ — পায়ে হেঁটে নয়, বরং অন্য কোনো উপায়ে। ‘সীমান্ত পেরলেই মনোরম ছুটির প্রহর’ — সীমানা পার হলেই ছুটির সময় শুরু। ‘খুদকুড়ো ছড়ানো রয়েছে ফুটপাতে, কবুতর ঘুরে ঘুরে নামে’ — স্বপ্নের জায়গায়ও সেই খুদকুড়ো ও কবুতরের দৃশ্য ফিরে আসে।
চতুর্থ স্তবক: মারণাস্ত্র নয়, দারিদ্র্য নয় ও জেলের কুলুপের স্মৃতিতে ঘাড় উঁচু করে থাকা
“আর মারণাস্ত্র নয় / দারিদ্র্য নৈব চ / মনে আছে জেলের কুলুপ এঁটেছিল / আমি ঘাড় উঁচু করেই ছিলাম বরাবর”
চতুর্থ স্তবকে আত্মসম্মানের কথা। ‘আর মারণাস্ত্র নয়’ — প্রথম স্তবকের পুনরাবৃত্তি। ‘দারিদ্র্য নৈব চ’ — দারিদ্র্যও নয়। ‘মনে আছে জেলের কুলুপ এঁটেছিল’ — একবার জেলের কুলুপ পড়েছিল। ‘আমি ঘাড় উঁচু করেই ছিলাম বরাবর’ — কারাবন্দি হয়েও তিনি মাথা উঁচু করে রেখেছিলেন। এটি আত্মসম্মানের প্রতীক।
পঞ্চম ও শেষ স্তবক: ছুটির দিন দিলে জব্দ হওয়া ও ‘আমি কবুতর হতে রাজি আছি’ বলে টিকিট চাওয়া
“بরং ছুটির দিন দিলে আমি جب্দ / পরদেশী মেঘলোক / আমেজে সুগোল শীতলতা লেগে থাকে – / আমি কবুতর হতে রাজি আছি / যদি তুমি ছাড়পত্র দাও / কৃপা করে পাঠাও টিকিট !”
পঞ্চম ও শেষ স্তবকে কবির চূড়ান্ত আত্মসমর্পণ। ‘বরং ছুটির দিন দিলে আমি জব্দ’ — ছুটির দিন দিলে তিনি ‘জব্দ’ (অর্থাৎ বাধ্য, পরাধীন) হয়ে যাবেন। ‘পরদেশী মেঘলোক’ — বিদেশের মেঘের দেশ। ‘আমেজে সুগোল শীতলতা লেগে থাকে’ — সেই দেশের আবহাওয়ায় সুগোল শীতলতা। ‘আমি কবুতর হতে রাজি আছি’ — তিনি কবুতর হতে রাজি। ‘যদি তুমি ছাড়পত্র দাও’ — প্রভু যদি অনুমতি দেন। ‘কৃপা করে পাঠাও টিকিট!’ — সরাসরি টিকিট চাওয়া। এটি চূড়ান্ত আত্মসমর্পণ ও ছুটির দিন পাওয়ার আকুল প্রার্থনা।
কবিতার গঠনশৈলী, ছন্দ ও শিল্পরূপ
কবিতাটি গদ্যছন্দে রচিত। লাইন ছোট-বড় মিশ্রিত। ‘প্রভু’ সম্বোধন বারবার এসেছে। ‘আর মারণাস্ত্র নয়’ — দুবার পুনরাবৃত্তি। ‘খুদকুড়ো ছড়ালেই কবুতর এসে ঠোকরায়’ — চিত্রকল্পটি বারবার এসেছে।
প্রতীক ব্যবহার অত্যন্ত শক্তিশালী। ‘মারণাস্ত্র’ — যুদ্ধ ও সহিংসতার প্রতীক। ‘ছুটির দিন’ — বিশ্রাম, শান্তি, স্বাধীনতার প্রতীক। ‘ভোরের ফুটপাত’ — সাধারণ মানুষের জায়গার প্রতীক। ‘খুদকুড়ো’ — ছোট ছোট টুকরো, যা কবুতর খায় — তুচ্ছতার প্রতীক, সরল আনন্দের প্রতীক। ‘কবুতর’ — শান্তির প্রতীক, সরল জীবনের প্রতীক। ‘কষ্টের সংসার’ — জীবনযন্ত্রণার প্রতীক। ‘দারিদ্র্য ব্রাহ্মণ বেশে উধাও’ — দারিদ্র্যের ব্যঙ্গাত্মক রূপ। ‘পালানোর তৃষ্ণা’ — মুক্তির আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। ‘সীমান্ত’ — বাধা, সীমাবদ্ধতার প্রতীক। ‘অজানা সমুদ্রতীর ও অজানা দেশ’ — স্বপ্নের জায়গার প্রতীক। ‘পদব্রজে ভ্রমণ নয়’ — সহজ পথ চাওয়ার প্রতীক। ‘জেলের কুলুপ’ — কারাবন্দিত্বের প্রতীক। ‘ঘাড় উঁচু করে থাকা’ — আত্মসম্মানের প্রতীক। ‘পরদেশী মেঘলোক’ — বিদেশের স্বপ্নের প্রতীক। ‘কবুতর হতে রাজি হওয়া’ — সরল, নিস্পাপ জীবনে ফিরে যাওয়ার প্রতীক। ‘টিকিট’ — মুক্তি ও যাত্রার প্রতীক।
পুনরাবৃত্তি শৈলী অত্যন্ত কার্যকর। ‘আর মারণাস্ত্র নয়’ — দুবার। ‘খুদকুড়ো ছড়ানো’ — দুবার। ‘কবুতর’ — তিনবার।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য ও দার্শনিক মাত্রা
“কৃপা করো ছুটি দাও” সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের এক অসাধারণ সৃষ্টি। তিনি এখানে যুদ্ধ ও কষ্টের ক্লান্তিতে ছুটির দিনের জন্য প্রার্থনা করেছেন, সরল আনন্দের প্রতীক কবুতরের স্বপ্ন দেখেছেন, এবং শেষ পর্যন্ত কবুতর হতে রাজি হয়ে টিকিট চেয়েছেন।
প্রথম স্তবকে — আর মারণাস্ত্র নয় — ছুটির দিন চাওয়া ও ফুটপাতে কবুতরের স্বপ্ন। দ্বিতীয় স্তবকে — কষ্টের সংসার, দারিদ্র্য ব্রাহ্মণ বেশে উধাও ও পালানোর তৃষ্ণা। তৃতীয় স্তবকে — ছুটি পেলে সীমান্ত পেরিয়ে অজানা দেশের স্বপ্ন ও পদব্রজে না যাওয়ার অনুরোধ। চতুর্থ স্তবকে — মারণাস্ত্র নয়, দারিদ্র্য নয় ও জেলের কুলুপের স্মৃতিতে ঘাড় উঁচু করে থাকা। পঞ্চম ও শেষ স্তবকে — ছুটির দিন দিলে জব্দ হওয়া ও ‘আমি কবুতর হতে রাজি আছি’ বলে টিকিট চাওয়া।
এই কবিতা আমাদের শেখায় — জীবন খুব ক্লান্তিকর; যুদ্ধ ও মারণাস্ত্র থেকে মুক্তি চাই; ছুটির দিন চাই; ভোরের ফুটপাতে খুদকুড়ো ছড়াতে চাই; কবুতর এসে ঠোকরায় — সেই সরল আনন্দে ফিরতে চাই; পিছনে কষ্টের সংসার পড়ে আছে; দারিদ্র্য ব্রাহ্মণ বেশে উধাও হয়ে গেছে; পালানোর তৃষ্ণা বুকের ভেতর চাপা আছে; ছুটি পেলে সীমান্ত পেরিয়ে অজানা সমুদ্রতীরে যেতে চাই; পদব্রজে নয়, অন্য উপায়ে যেতে চাই; জেলের কুলুপ এঁটেছিল, কিন্তু ঘাড় উঁচু করেই ছিলাম; বরং ছুটির দিন দিলে জব্দ হব; পরদেশী মেঘলোকে শীতলতা লেগে থাকে; আর শেষ পর্যন্ত — ‘আমি কবুতর হতে রাজি আছি যদি তুমি ছাড়পত্র দাও, কৃপা করে পাঠাও টিকিট!’
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় ক্লান্তি, প্রার্থনা ও সরল আনন্দের সন্ধান
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় ক্লান্তি, প্রার্থনা ও সরল আনন্দের সন্ধান একটি পুনরাবৃত্ত বিষয়। তিনি ‘কৃপা করো ছুটি দাও’ কবিতায় যুদ্ধ ও কষ্টের ক্লান্তিতে ছুটির দিনের জন্য প্রার্থনা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন — কীভাবে ‘আর মারণাস্ত্র নয়’ বলে অস্ত্র প্রত্যাখ্যান; কীভাবে ‘খুদকুড়ো ছড়ালেই কবুতর এসে ঠোকরায়’ সরল দৃশ্যের স্বপ্ন; কীভাবে ‘পালানোর তৃষ্ণা বুকের ভিতর পড়ে আছে’; কীভাবে ‘সীমান্ত পেরলে মনোরম ছুটির প্রহর’; কীভাবে ‘জেলের কুলুপ এঁটেছিল, কিন্তু ঘাড় উঁচু করেই ছিলাম’; আর কীভাবে শেষ পর্যন্ত ‘আমি কবুতর হতে রাজি আছি, কৃপা করে পাঠাও টিকিট’।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলা সাহিত্যের উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক পাঠ্যক্রমে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘কৃপা করো ছুটি দাও’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত থাকার যোগ্য। এই কবিতাটি শিক্ষার্থীদের ক্লান্তি, যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, সরল আনন্দের মূল্য, আত্মসম্মান, এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রার্থনাময় কাব্যভাষা সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করে। বিশেষ করে ‘আর মারণাস্ত্র নয়’, ‘ভোরের ফুটপাতে খুদকুড়ো ছড়ানো’, ‘কবুতর এসে ঠোকরায়’, ‘দারিদ্র্য ব্রাহ্মণ বেশে উধাও’, ‘পালানোর তৃষ্ণা’, ‘সীমান্ত পেরলে মনোরম ছুটির প্রহর’, ‘জেলের কুলুপ এঁটেছিল কিন্তু ঘাড় উঁচু করেই ছিলাম’, ‘আমি কবুতর হতে রাজি আছি’, এবং ‘কৃপা করে পাঠাও টিকিট’ — এসব বিষয় শিক্ষার্থীদের কাব্যবোধ, শান্তিচেতনা ও আত্মসম্মানবোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কৃপা করো ছুটি দাও সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: কৃপা করো ছুটি দাও কবিতাটির রচয়িতা কে?
এই কবিতাটির রচয়িতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (১৯৩৩-২০২০)। তিনি একজন বিশিষ্ট আধুনিক বাঙালি কবি। তিনি ক্লান্তি, নিঃসঙ্গতা, নাগরিক জীবনের জটিলতা ও সরল আনন্দের সন্ধান নিয়ে লিখেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘কৃপা করো ছুটি দাও’, ‘অন্য নামে ডাকো’, ‘নির্বাচিত কবিতা’ ইত্যাদি।
প্রশ্ন ২: ‘আর মারণাস্ত্র নয় প্রভু, তুমি কিছু ছুটির দিন ভোরের ফুটপাতে ছড়াতে পারো’ — লাইনটির তাৎপর্য কী?
কবি এখানে প্রভুকে সম্বোধন করে বলছেন — তিনি আর মারণাস্ত্র (যুদ্ধের অস্ত্র) চান না। বরং তিনি চান ‘কিছু ছুটির দিন’। ‘ভোরের ফুটপাতে ছড়াতে পারো’ — প্রভু যদি ফুটপাতে ছুটি ছড়িয়ে দেন। এটি যুদ্ধ ও সহিংসতার ক্লান্তিতে শান্তি ও বিশ্রাম চাওয়ার প্রার্থনা।
প্রশ্ন ৩: ‘খুদকুড়ো ছড়ালেই দেখো দেখো কত কবুতর এসে ঠোকরায়’ — লাইনটির সৌন্দর্য কী?
‘খুদকুড়ো’ ছোট ছোট টুকরো — যা কবুতর খায়। কবি বলছেন — খুদকুড়ো ছড়ালেই কবুতর এসে ঠোকরায়। এটি একটি সরল, নিস্পাপ, সুন্দর দৃশ্য। যুদ্ধ ও কষ্টের জটিল জীবন থেকে কবি এই সরল আনন্দে ফিরতে চান।
প্রশ্ন ৪: ‘দারিদ্র্য ব্রাহ্মণ বেশে কবে নিয়ে হয়েছে উধাও’ — লাইনটির ব্যঙ্গাত্মকতা কোথায়?
‘ব্রাহ্মণ বেশ’ — ব্রাহ্মণের সাজ, পবিত্রতার প্রতীক। ‘দারিদ্র্য ব্রাহ্মণ বেশে উধাও হয়েছে’ — অর্থাৎ দারিদ্র্য পবিত্র সাজে অদৃশ্য হয়ে গেছে। এটি একটি ব্যঙ্গাত্মক চিত্র — দারিদ্র্যকে পবিত্র করার চেষ্টার বিরুদ্ধে বিদ্রূপ।
প্রশ্ন ৫: ‘পালানোর তৃষ্ণা ঢাকা ছিল বুকের ভিতর, পড়ে আছে’ — লাইনটির তাৎপর্য কী?
‘পালানোর তৃষ্ণা’ — এই পৃথিবী, এই কষ্ট, এই যুদ্ধ সব ছেড়ে পালানোর ইচ্ছা। ‘ঢাকা ছিল বুকের ভিতর’ — এটি চাপা ছিল, লুকানো ছিল। ‘পড়ে আছে’ — এখনও তা পড়ে আছে, যায়নি। এটি মুক্তির আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।
প্রশ্ন ৬: ‘দেখো প্রভু সে ভ্রমণ পদব্রজে যেন না হয়’ — কেন পদব্রজে ভ্রমণ চান না?
পদব্রজে ভ্রমণ মানে পায়ে হেঁটে যাওয়া — যা কষ্টকর, ধীর ও পরিশ্রমসাধ্য। কবি চান না তাঁর স্বপ্নের ভ্রমণ কষ্টকর হোক। তিনি সহজ পথ চান, দ্রুত পথ চান। এটি আরাম ও স্বাচ্ছন্দ্যের আকাঙ্ক্ষা।
প্রশ্ন ৭: ‘মনে আছে জেলের কুলুপ এঁটেছিল, আমি ঘাড় উঁচু করেই ছিলাম বরাবর’ — লাইনটির তাৎপর্য কী?
‘জেলের কুলুপ এঁটেছিল’ — একবার কবি কারাবন্দি হয়েছিলেন। ‘আমি ঘাড় উঁচু করেই ছিলাম বরাবর’ — তিনি কারাবন্দি হয়েও মাথা উঁচু করে রেখেছিলেন। এটি আত্মসম্মান ও প্রতিরোধের প্রতীক। কারাগার তাকে ভাঙতে পারেনি।
প্রশ্ন ৮: ‘বরং ছুটির দিন দিলে আমি জব্দ’ — ‘জব্দ’ শব্দটির প্রয়োগ কেন?
‘জব্দ’ মানে বাধ্য, পরাধীন, নিয়ন্ত্রিত। কবি বলছেন — ছুটির দিন দিলে তিনি ‘জব্দ’ হয়ে যাবেন। অর্থাৎ ছুটির দিন তাকে শাসন করবে, নিয়ন্ত্রণ করবে। এটি এক ধরনের বিদ্রূপ — সাধারণ মানুষ ছুটি পেলেও তার ওপর নিয়ম থাকে।
প্রশ্ন ৯: ‘আমি কবুতর হতে রাজি আছি যদি তুমি ছাড়পত্র দাও, কৃপা করে পাঠাও টিকিট!’ — শেষ লাইনের তাৎপর্য কী?
এটি কবিতার চূড়ান্ত আত্মসমর্পণ ও প্রার্থনা। ‘কবুতর হতে রাজি আছি’ — কবুতর শান্তির প্রতীক, সরল জীবনের প্রতীক। তিনি সেই সরল জীবনে ফিরতে চান। ‘ছাড়পত্র দাও’ — অনুমতি দাও। ‘টিকিট পাঠাও’ — যাত্রার টিকিট চান। এটি একটি শিশুর মতো সরল প্রার্থনা — ‘আমি যেতে চাই, আমাকে টিকিট দাও’।
প্রশ্ন ১০: কবিতার মূল শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা কী?
কবিতাটি আমাদের শেখায় — জীবন খুব ক্লান্তিকর; যুদ্ধ ও মারণাস্ত্র থেকে মুক্তি চাই; ছুটির দিন চাই; ভোরের ফুটপাতে খুদকুড়ো ছড়াতে চাই; কবুতর এসে ঠোকরায় — সেই সরল আনন্দে ফিরতে চাই; পিছনে কষ্টের সংসার পড়ে আছে; দারিদ্র্য ব্রাহ্মণ বেশে উধাও হয়ে গেছে; পালানোর তৃষ্ণা বুকের ভেতর চাপা আছে; ছুটি পেলে সীমান্ত পেরিয়ে অজানা সমুদ্রতীরে যেতে চাই; পদব্রজে নয়, অন্য উপায়ে যেতে চাই; জেলের কুলুপ এঁটেছিল, কিন্তু ঘাড় উঁচু করেই ছিলাম; বরং ছুটির দিন দিলে জব্দ হব; পরদেশী মেঘলোকে শীতলতা লেগে থাকে; আর শেষ পর্যন্ত — ‘আমি কবুতর হতে রাজি আছি যদি তুমি ছাড়পত্র দাও, কৃপা করে পাঠাও টিকিট!’ এই কবিতাটি আজকের দিনে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক — যুদ্ধ ও সহিংসতার ক্লান্তি, সরল আনন্দের জন্য আকুলতা, আত্মসম্মান বজায় রাখা, এবং মুক্তির প্রার্থনা — সবকিছুই চিরন্তন ও সময়োপযোগী বিষয়।
ট্যাগস: কৃপা করো ছুটি দাও, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের আধুনিক কবিতা, ছুটির দিন চাওয়া, খুদকুড়ো ও কবুতর, দারিদ্র্য ব্রাহ্মণ বেশে, কবুতর হতে রাজি, টিকিট চাওয়া
© Kobitarkhata.com – কবি: সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় | কবিতার প্রথম লাইন: “আর মারণাস্ত্র নয় প্রভু, তুমি কিছু ছুটির দিন ভোরের ফুটপাতে ছড়াতে পারো” | যুদ্ধ ও কষ্টের ক্লান্তিতে ছুটির দিনের প্রার্থনার অমর কবিতা বিশ্লেষণ | সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের আধুনিক কাব্যধারার অসাধারণ নিদর্শন