মানুষের ঈশ্বর এবং যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা – রবিশঙ্কর মৈত্রী।

শিশুদের হাতে
যুদ্ধ যুদ্ধ খেলনা
বন্দুক মেশিনগান
বাহবা দিচ্ছে মা-বাবা
মারো, মারো, আরও মারো।
পাখিরা বলছে, ‘মরো না মেরো না
পারো তো মৃত্যুকে অবলুপ্ত করো।’

মানুষ কি ভুলে গেছে সেই
অন্ধকারের যুগ
মানুষ কি ভুলে গেছে
আগুন আবিষ্কারের ইতিহাস
মানুষ কি ভুলে গেছে
একদিন সাধারণ বন্যপ্রাণী ছিল তারা।
মানুষ কি ভুলে গেছে
দাঁড়াতে দাঁড়াতে, দৌড়াতে দৌড়াতে
মানুষ একদিন মানুষ হয়েছিল।

কে জানত সেদিন
আগুনের ভেতরেই ঘুমিয়ে ছিল
ভবিষ্যতের দানব।

শিকার করার জন্য—
ক্ষুধা মেটানোর জন্য।
মানুষ গুহার ভেতরে পাথর ঘষে ঘষে
অস্ত্র বানাতে শিখেছিল

তারপর হে মানুষ তুমি বুঝেছিলে
মানুষকেও মারা যায়
মানুষকেও মারতে হবে
আর সেদিনই পৃথিবীর ইতিহাসে
একটা অদৃশ্য দরজা খুলে গিয়েছিল

মানুষ জন্ম দিয়েছিল ঈশ্বরকে
তারপর তারা সেই অদৃশ্য ঈশ্বরকে দিয়ে
মানুষ হত্যাযজ্ঞ শুরু করেছিল।

শুধু মানুষকে শাস্তি দেবে বলে
মানুষ একদিন ধর্ম
রাজনীতি সমাজ রাষ্ট্র তৈরি করেছিল
শুরু হয়েছিল রক্তের খেলা।

মানুষ নগর বানিয়েছিল
নগর ঘিরে তুলেছিল দেয়াল
তারপর রাষ্ট্র বানিয়ে
মানুষের কারাগার রচনা করেছিল
রাষ্ট্রের সীমান্তে প্রাচীর তৈরি করে
তারা লিখে দিয়েছিল–এখানে প্রবেশ নিষেধ।

নিষেধ মানেই সন্দেহ
ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্র মানেই
একে অন্যের রাষ্ট্রদখল।
দখল মানেই পরের দ্রব্য এবং নারী লুষ্ঠন।
মানুষ দিনে দিনে ভুলে গেল সে মানুষ
সে শিখে নিল হত্যার ব্যাকরণ।
মানুষ জেনে গেল–রক্তের খেলায় জয়ী হলেই
ক্ষমতা বাড়ে, রক্ত যুদ্ধই তো ক্ষমতার উৎস
যুদ্ধ ছাড়া মানুষের আর ভাষা রইল না।

যুদ্ধের বিরতিতে জমাটবাঁধা রক্ত থেকে ফুল ফোটে
মানুষ আবার শান্তির মালা গাঁথে।
বহু যুগ যুগান্তরের যুদ্ধ শেষে
পৃথিবীর আকাশে আবার
নতুন বর্ণমালা রচিত হচ্ছে
পারমাণবিক অক্ষর
নতুন আগুনে এবার
চূড়ান্ত ধ্বংসের গদ্য রচিত হবে।

মাটির নিচে ঘুমিয়ে আছে হাজার হাজার বোমা
সমুদ্রের তলায় ঘুমিয়ে আছে মৃত্যু।
আকাশে উড়ছে লোহার পাখি—
মানুষের একেকটি আঙুল ছটফট করছে
কখন টিপে দেবে শেষ বোতাম?

মানুষের ধর্ম এখন উপাসনা নয়
মানুষ ধর্ম এখন আসন
মানুষের ধর্ম এখন শাসন
মানুষের ধর্ম এখন ত্রাসন।

মানুষের ঈশ্বর এখন ঠিকানা পাল্টে
অন্য গ্রহে নিবাস নিয়েছে
ঈশ্বর হয়তো জানেন
পৃথিবী আবার ভষ্মগ্রহ হবে।
ভিন গ্রহ থেকে ঈশ্বর ভাবছেন–
যারা একদিন মায়ের কোল থেকে
কাঁদতে কাঁদতে পৃথিবীতে এসেছিল

এরা কি সেই মানুষ?
এরা কি সেই মানুষ
যারা নদীতীরে বসে
বাঁশি বাজিয়েছিল?

পাতার কুঠিরের সেই মানুষগুলো
এখন শুধু যুদ্ধ চায়, কেন?
ঈশ্বর খুব লজ্জিত বিস্মিত আজ
মানুষ তাকে সৃষ্টি করে
তার নাম নিয়ে মানুষকেই হত্যা করছে, কেন?

ঈশ্বর নিরাপদ গ্রহ থেকে ভাবছেন–
মানুষ, তুমি এতদিনে
ভিন গ্রহের কাছে পৌঁছে গেছ
সমুদ্রের গভীরতা মেপে নিয়েছ
মহাকাশে তোমার নাম লিখেছ
অথচ নিজের বুকের মধ্যে
লিখতে পারোনি—ভালোবাসা।

আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। রবিশঙ্কর মৈত্রী।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x