কবিতার খাতা
বাতাসী – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী।
‘বাতাসী! বাতাসী! — লোকটা ভয়ঙ্কর চেঁচাতে চেঁচাতে
গুমটির পিছন দিকে ছুটে গেল।
ধাবিত ট্রেনের থেকে এই দৃশ্য চকিতে দেখলুম।
কে বাতাসী? জোয়ান লোকটা অত ভয়ঙ্করভাবে
তাকে ডাকে কেন? কেন
হাওয়ার ভিতরে বাবরি-চুল উড়িয়ে
পাগলের মত
‘বাতাসী! বাতাসী!’ বলে ছুটে যায়?
টুকরো-টুকরো কথাগুলি ইদানীং যেন বড় বেশী
গোঁয়ার মাছির মত
জ্বালাচ্ছে। কে যেন কাকে বাসের ভিতরে
বলেছিল, ‘ভাবতে হবে না,
এবারে দুদ্দাড় করে হেমাঙ্গ ভীষণভাবে উঠে যাবে, দেখে নিস।’
কে হেমাঙ্গ? কে জানে, এখন
সত্যিই দুদ্দাড় করে সে কোথাও উঠে যাচ্ছে কি না।
কিংবা সেই ছেলেটা, যে ট্রাম-স্টপে দাঁড়িয়ে পাশের
মেয়েটাকে অদ্ভূত কঠিন স্বরে বলেছিল
‘চুপ করো, নাহলে আমি
সেইরকম শাস্তি দেব আবার’ — কে জানে
‘সেইরকম’ মানে কী-রকম। আমি ভেবে যাচ্ছি,
ক্রমাগত ভেবে যাচ্ছি, তবু
গল্পের সবটা যেন নাগালে পাচ্ছি না।
গল্পের সবটা আমি নাগালে পাব না।
শুধু শুনে যাব। শুধু এখানে ওখানে,
অথবা ফুটপাথে, কিংবা ট্রেনের জানলায়
টুকরো-টুকরো কথা শুনব, শুধু শুনে যাব। আর
হঠাৎ কখনও কোনো ভুতুড়ে দুপুরে
কানে বাজবে : ‘বাতাসী! বাতাসী!’
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতা।
কবিতার কথা –
আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় ও নাগরিক চেতনার কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ‘বাতাসী’ কবিতাটি আধুনিক জীবনের একাকীত্ব, খণ্ডতা (Fragmentation), বিচ্ছিন্নতাবোধ (Alienation) এবং মানুষের চিরন্তন কৌতূহলী মনের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক আখ্যান। কবি এখানে যান্ত্রিক নাগরিক সভ্যতার এক নির্মম সত্যকে উন্মোচন করেছেন—যেখানে আমরা প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের জীবনের মুখোমুখি হই, তাদের সুখ-দুঃখের খণ্ডাংশ প্রত্যক্ষ করি, কিন্তু আধুনিক জীবনের দ্রুততার কারণে কখনোই কোনো মানুষের সম্পূর্ণ জীবনের গল্প বা তার পেছনের সত্যটুকু জানতে পারি না।
কবিতার প্রারম্ভেই একটি তীব্র ও নাটকীয় দৃশ্যের অবতারণা ঘটে। কবি চলন্ত ট্রেনের জানালা দিয়ে হঠাৎ এক ঝলক দেখলেন—একটা জোয়ান লোক অত্যন্ত ভয়ংকরভাবে ‘বাতাসী! বাতাসী!’ বলে চিৎকার করতে করতে রেলওয়ের গুমটির (কেবিন বা ঘর) পিছন দিকে ছুটে যাচ্ছে। হাওয়ায় তার বাবরি চুল উড়ছে, আর তাকে দেখতে অবিকল এক পাগলের মতো লাগছে। ট্রেনটি দ্রুত গতিতে এগিয়ে যায়, দৃশ্যটিও চোখের পলকে হারিয়ে যায়। কিন্তু কবির মনের ভেতর এক অন্তহীন কৌতূহল ও অস্থিরতা জেগে ওঠে—কে এই বাতাসী? কেন ওই লোকটা তাকে অত আর্তনাদ করে, অমন ভয়ংকরভাবে ডাকছিল? তাদের জীবনের ট্র্যাজেডি বা গল্পটা আসলে কী?
কবিতার মধ্যভাগে কবিতাটি ট্রেনের জানালা ছাড়িয়ে কবির প্রাত্যহিক নাগরিক জীবনের অন্যান্য স্মৃতির দিকে মোড় নেয়। কবি উপলব্ধি করেন, এই ব্যস্ত শহরে আমরা প্রতিদিন বাসে, ট্রামে, ফুটপাতে চলতে ফিরতে এমন কত শত মানুষের ভাঙা-ভাঙা, টুকরো-টুকরো কথা শুনতে পাই। সেই খণ্ডাংশগুলো ইদানীং কবির মনে “গোঁয়ার মাছির মতো” অনবরত ভনভন করে জ্বালাতন করছে। কবির মনে পড়ে যায় বাসের ভেতরের এক অচেনা সহযাত্রীর কথা, যে অন্য কাউকে বলছিল—”ভাবতে হবে না, এবারে দুদ্দাড় করে হেমাঙ্গ ভীষণভাবে উঠে যাবে”। কবি ভাবেন, কে এই হেমাঙ্গ? সে কি সত্যিই জীবনে বা কোনো জাঁকজমকপূর্ণ জায়গায় দুদ্দাড় করে উঠে যেতে পারল? কিংবা ট্রাম স্টপে দাঁড়িয়ে এক যুবকের সেই কঠোর কণ্ঠস্বর, যে তার পাশের মেয়েটিকে শাসাচ্ছিল—”চুপ করো, নাহলে আমি সেইরকম শাস্তি দেব আবার”। কবি আজও ভেবে আকুল হন—সেই ‘সেইরকম’ শাস্তির স্বরূপ আসলে কী ছিল? জীবনের এই খণ্ড চিত্রগুলো কবিকে অনবরত ভাবিয়ে তোলে, কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও তিনি এই বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোর পেছনের মূল গল্পের বা ইতিহাসের নাগাল পান না।
শেষাংশে এসে কবিতাটি আধুনিক মানুষের এক পরম অসহায়তা ও দার্শনিক সত্যে থিতু হয়। কবি অত্যন্ত বিষণ্ণ মনে মেনে নেন যে—”গল্পের সবটা আমি নাগালে পাব না।” আধুনিক যান্ত্রিক জীবনের গতি এত তীব্র যে, কারো জীবনের সম্পূর্ণ গল্প আদ্যোপান্ত জানার অবসর বা সুযোগ এই নাগরিক সভ্যতায় নেই। আমাদের নিয়তিই হলো—বাসে, ট্রামে, ফুটপাতে কিংবা ট্রেনের জানালায় অপরের জীবনের কেবল কিছু বিচ্ছিন্ন টুকরো কথা বা দৃশ্য শোনা আর দেখা।
পুরো সম্পূর্ণতার অবর্তমানে, এই খণ্ডতার বেদনা বুকে নিয়েই মানুষকে বেঁচে থাকতে হয়। আর তাই, জীবনের কোলাহলের মাঝে হঠাৎ কোনো এক নিঝুম, অলৌকিক ও “ভুতুড়ে দুপুরে” কবির অবচেতন মনে ও কানে আবার এক পরম হাহাকার নিয়ে বেজে ওঠে সেই চেনা আর্তনাদ—”বাতাসী! বাতাসী!”। আধুনিক জীবনের খণ্ডতা, অপরের দুঃখের অংশীদার হতে চাওয়ার এক মানবিক ব্যাকুলতা এবং তার বিপরীতে এক পরম অপূর্ণতার দীর্ঘশ্বাস ফুটিয়ে তোলার মধ্য দিয়েই কবিতাটি পূর্ণতা লাভ করে।






