কবিতার খাতা
এক লহমার উছলে ওঠা – আরণ্যক বসু।
বাউল তুই আবছা ভোরে
ঠিক আসছিস
বাউল , তুইকি ট্রেনের দোলায় ঘুমের কাছে
বাউল , এবার সঙ্গে সাধের ম্যান্ডোলীন কি?
বাউল, তোকে জাগিয়ে দেওয়ার লোক কি আছে ?
লোক নাকি সে একটি নারী , অহংকারী।
অহংকার তো তোকে ঘিরেই,খুব রূপসী ?
পড়ায় নাকি নিজেই পড়ে , চশমা আছে?
তোর প্রিয় সেই তোর্সা নদী আজ উপসী
বাউল তোরই জন্য সাজাই গেরস্থালী
উড়নচন্ডী সব ছড়াবি দেখবো আমি
প্রাণের দোসর হারমোনিয়াম ডুকরে কাঁদে
ছোট্ট হেসে হ্যালো বলবে আমার স্বামী
বরগুলো সব একইরকম খুব দেমাকী
আমার তাতে লবডঙ্কা, হেঁসেল হাড়ি
পাপড়ি ঝড়ায় উথলে ওঠা বেলকুঁড়িরা
বাউল এটা তোর বারান্দা তোরই বাড়ি।
জানি বাউল আমার দিকে তাকাবিও না
না তাকালি, আমার আছে মেঘ রোদ্দুর
এক অচেনা কবির আঁকা নীল মহাকাশ
আমারও এখন দূরের পাড়ি চোখ রোদ্দুর
বাউল তুই রাগ করলি অভিমানী
দুর পাগলা তোকে ছাড়িয়ে কোথায় যাব
তোরই গানে জেগে উঠে সন্ধেবেলায়
মফস্বলী চৌপথীতে ফুচকা খাবো
আকাশ হবো মেঘ ছড়াবো সঙ্গী হবি
লজ্জা পাব মুখ লুকাবো তোরই বুকে
তেমন কোনো শব্দ পেলে
দু আঙ্গুলে ঝাকড়া চুলে সাজিয়ে দিবি একটু ঝুঁকে ।
বাউল এখন মাঝ রাত্তির ঘুমিয়ে পড়ি
রিংটোন
ঠিক জাগিয়ে দেবে পাঁচটা দশে
বাউল তোকে আনতে যাব ইস্টিশনে
বাকি জীবন তোর মায়াতে তোরই বশে।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। আরণ্যক বসুর কবিতা।
কবিতার কথা –
আরণ্যক বসুর ‘এক লহমার উছলে ওঠা’ কবিতাটি প্রেম, বৈবাহিক বন্দিদশার বিপরীতে তীব্র আত্মিক ব্যাকুলতা, গোপন স্বপ্নের ফ্যান্টাসি এবং এক অচেনা মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় মোড়ানো এক প্রগাঢ় ও অনুভূতির আবেগময় আখ্যান। কবিতায় এক বিবাহিত নারীর মফস্বলী দৈনন্দিন জীবন ও সংসারক্লান্তির মাঝে এক বাউলরূপী প্রেমিকের আগমনকে কেন্দ্র করে অনুভূতির যে উছলে ওঠা ঢেউ তৈরি হয়, কবি অত্যন্ত নিপুণভাবে তা চিত্রায়িত করেছেন।
কবিতার প্রথমাংশে আবছা ভোরের ট্রেনের দোলায় ভেসে আসা সেই প্রেমিক বাউলের প্রতীক্ষায় ব্যাকুল এক গৃহবধূর মনস্তাত্ত্বিক ক্যানভাস ফুটে ওঠে। সাধের ম্যান্ডোলিন কাঁধে আসা বাউলকে জাগিয়ে দেওয়ার অচেনা নারীটি যে আদতে সে নিজেই—তা কবিতার ভাঁজে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তার সংসারের বৈচিত্র্যহীন রুটিন, অহংকার, এবং রূপের ব্যাকুলতার মাঝে যেন শুকনো তোর্সা নদীর মতো এক তৃষ্ণা জমে আছে। নারীটি তার সমস্ত উড়নচণ্ডী আবেগ ছড়ানোর জন্য এক গোপন গৃহস্থালী সাজায়। একদিকে তার প্রাণের দোসর হারমোনিয়ামের প্রচ্ছন্ন কান্না, আর অন্যদিকে সাংসারিক বাস্তবে স্বামীর ভারী উপস্থিতি—“বরগুলো সব একইরকম খুব দেমাকী”। কিন্তু সমস্ত সাংসারিক সীমানা আর হেঁসেল-হাঁড়ির বাধ্যবাধকতাকে ছাপিয়ে উঠে তার ভেতরে ফুটে ওঠে বেলকুঁড়ির প্রস্ফুটিত রূপ। পরম মমতায় ও অধিকারে সে তার হৃদয় ও স্থানকে বাউলের বারান্দা ও বাড়ি হিসেবে সঁপে দেয়।
কবিতার মধ্যভাগে বিরহ, মান-অভিমান এবং স্বাধীনতার এক অপরূপ ক্যানভাস উন্মোচিত হয়। বাউল যদি না-ও তাকায়, তবুও নারীর রয়েছে নিজস্ব মেঘ-রোদ্দুর, অচেনা কবির আঁকা নীল মহাকাশ আর অসীম আকাশ ছোঁয়ার আকুলতা। কিন্তু এই সমস্ত অভিমান পেরিয়ে আবার ফুটে ওঠে এক সহজ, নিখাদ প্রেম—“দূর পাগলা তোকে ছাড়িয়ে কোথায় যাব”। মফস্বলের চৌপথিতে ফুচকা খাওয়া, আকাশের মতো উদার হওয়া, প্রেমিকের বুকে মুখ লুকানো কিংবা ভালোবাসার আবেশে মাথার ঝাঁকড়া চুলে দুই আঙুলের স্পর্শ পাওয়ার মতো অতি সাধারণ অথচ গভীর আকুতিগুলো তাকে এক অদ্ভুত জীবন্ত রূপ দেয়।
কবিতার শেষাংশে এসে বাস্তবের ঘড়ির কাঁটা ও অনুভূতির তীব্র ব্যাকুলতা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। মাঝরাতের নীরবতায় ঘুমিয়ে পড়ার আগে ভোর পাঁচটা দশের রিংটোনের জন্য এই যে অধীর অপেক্ষা, এবং তারপর স্টেশনে গিয়ে বাউলকে নিয়ে আসার আকুলতা—তা কেবল কোনো পথচলতি বাউলকে বরণ করার আয়োজন নয়। এটি প্রকৃতপক্ষে সংসারের নিগড় ভেঙে নিজের খাঁটি ভালোবাসাকে গ্রহণ করার এবং বাকি জীবন সেই ভালোবাসার মায়ায় আত্মনিবেদন করার এক চিরন্তন ও আবেগঘন স্বপ্নগাঁথা।





