কবিতার খাতা
- 30 mins
প্রতিদান – পল্লীকবি জসীমউদ্দীন।
আমার এ ঘর ভাঙিয়াছে যেবা আমি বাঁধি তার ঘর,
আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর।
যে মোরে করিল পথের বিবাগী-
পথে পথে আমি ফিরি তার লাগি,
দিঘল রজনী তার তরে জাগি ঘুম যে হরেছে মোর;
আমার এ ঘর ভাঙিয়াছে যেবা আমি বাঁধি তার ঘর।
আমার এ কূল ভাঙিয়াছে যেবা আমি তার কূল বাঁধি,
যে গেছে বুকে আঘাত হানিয়া তার লাগি আমি কাঁদি।
যে মোরে দিয়েছে বিষে-ভরা বাণ,
আমি দেই তারে বুকভরা গান,
কাঁটা পেয়ে তারে ফুল করি দান সারাটি জনম-ভর,-
আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর।
মোর বুকে যেবা কবর বেঁধেছে আমি তার বুক ভরি
রঙিন ফুলের সোহাগ-জড়ানো ফুল মালঞ্চ ধরি।
যে মুখে সে কহে নিঠুরিয়া বাণী,
আমি লয়ে সখি তারই মুখখানি,
কত ঠাঁই হতে কত কীযে আনি সাজাই নিরন্তর-
আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের কবিতা।
কবিতার কথা –
পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের ‘প্রতিদান’ কবিতাটি মানবপ্রেম ও উদারতার এক মহৎ বাণী বহন করে। সাধারণ মানুষের স্বভাব হলো কেউ আঘাত করলে তাকে পাল্টা আঘাত করা, কিন্তু কবি এখানে এক সম্পূর্ণ বিপরীত এবং মহত্তম জীবনবোধের পরিচয় দিয়েছেন। কবিকে যে পর করেছে, যে তাঁর ক্ষতি করেছে, কবি তাকেই আপন করে নেওয়ার জন্য আকুল হয়েছেন। অনিষ্টকারীর অনিষ্ট না করে, উল্টো তার মঙ্গল করার এই যে মানসিকতা—তা-ই এই কবিতার মূল উপজীব্য।
কবিতার প্রথমাংশে কবি দেখিয়েছেন, যে তাঁর ঘর ভেঙেছে, কবি তাঁর ঘর বেঁধে দিতে চান। যে তাঁর রাতের ঘুম কেড়ে নিয়ে তাঁকে পথের বিবাগী বা নিঃস্ব করেছে, কবি সারা রাত জেগে তারই কল্যাণ কামনা করেন। হিংসা বা প্রতিশোধের বদলে এখানে প্রকাশ পেয়েছে এক অসীম ক্ষমাশীলতা। যে বুকে আঘাত হেনেছে বা বিষাক্ত বাণে হৃদয় ক্ষতবিক্ষত করেছে, কবি তাকে কোনো কটু কথা না বলে বুকভরা গান এবং সারাজীবন ফুল উপহার দেওয়ার কথা বলেছেন। অর্থাৎ, আঘাতের বিপরীতে কবি ভালোবাসাকেই অস্ত্র হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
শেষাংশে কবির এই পরার্থপরতা ও ক্ষমাশীলতা এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। যে কবিকে জীবন্ত কবর দেওয়ার মতো কষ্ট দিয়েছে, কবি তার বুক রঙিন ফুলের বাগান দিয়ে ভরিয়ে দিতে চান। নিন্দুকের নিষ্ঠুর বাণীর জবাবে কবি তার সুন্দর মুখখানি মনে রেখে নানা উপাদানে তাকে সাজানোর আরাধনা করেন। সমস্ত কবিতা জুড়ে কবি এই শিক্ষাই দিয়েছেন যে, প্রতিশোধের চেয়ে ক্ষমা মহৎ এবং শত্রুতা নয়, বরং অকৃত্রিম ভালোবাসা দিয়েই কেবল শত্রুকে আপন করা ও সুন্দর পৃথিবী গড়ে তোলা সম্ভব।
প্রতিদান – পল্লীকবি জসীমউদ্দীন | জসীমউদ্দীনের কবিতা | আধুনিক বাংলা কবিতা | ক্ষমা ও মহত্ত্বের কবিতা
প্রতিদান: পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের অপমানের প্রতিদানে ভালোবাসা, ক্ষমা ও মানবিক মহত্ত্বের অসাধারণ কাব্যভাষা
পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের “প্রতিদান” আধুনিক বাংলা কবিতার এক অনন্য, মহৎ ও মানবিক সৃষ্টি। “আমার এ ঘর ভাঙিয়াছে যেবা আমি বাঁধি তার ঘর, / আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর।” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে ঘর ভাঙার প্রতিদানে ঘর বাঁধা, পর করে দেওয়ার প্রতিদানে আপন করতে কাঁদা, পথের বিবাগী করার প্রতিদানে পথে পথে ফেরা, ঘুম হারানোর প্রতিদানে রাত জাগা, কূল ভাঙার প্রতিদানে কূল বাঁধা, বুকে আঘাত হানার প্রতিদানে কাঁদা, বিষে-ভরা বাণের প্রতিদানে বুকভরা গান, কাঁটার প্রতিদানে ফুল দান, কবর বাঁধার প্রতিদানে বুক ভরিয়া ফুল মালঞ্চ, নিঠুর বাণীর প্রতিদানে মুখখানি সাজানো — এই সব মিলিয়ে এক অপমানের প্রতিদানে ভালোবাসা, ক্ষমা ও মানবিক মহত্ত্বের গভীর ও বহুমাত্রিক কাব্যচিত্র। পল্লীকবি জসীমউদ্দীন (১৯০৩-১৯৭৬) বাংলাদেশের জাতীয় কবি। তিনি বাংলা সাহিত্যে পল্লীকবি হিসেবে খ্যাত। তাঁর কবিতায় গ্রামবাংলার প্রকৃতি, প্রেম, কৃষকজীবন, নারীর ভালোবাসা, এবং লোকায়ত ধারা গভীরভাবে ফুটে উঠেছে। “প্রতিদান” তাঁর সেই স্বকীয় কাব্যভাষার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যেখানে তিনি শত্রুর প্রতিও ক্ষমা, ভালোবাসা ও মহত্ত্বের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
পল্লীকবি জসীমউদ্দীন: গ্রামবাংলার প্রকৃতি, প্রেম ও মানবিক মহত্ত্বের কবি
পল্লীকবি জসীমউদ্দীন ১৯০৩ সালে ফরিদপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেছেন। তাঁর কবিতায় গ্রামবাংলার প্রকৃতি, প্রেম, কৃষকজীবন, নারীর ভালোবাসা, এবং লোকায়ত ধারা গভীরভাবে ফুটে উঠেছে।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ (১৯২৯), ‘বেদের মেয়ে’ (১৯৫১), ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ (১৯৩৩), ‘পল্লীকবি’ (১৯৫৩), ‘রাখালী’ (১৯৬০) ইত্যাদি।
জসীমউদ্দীনের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো গ্রামীণ প্রকৃতির অপরূপ চিত্রায়ণ, প্রেম ও মানবিকতার সহজ-সরল প্রকাশ, ক্ষমা ও মহত্ত্বের উচ্চ আদর্শ, এবং সহজ-সরল ভাষায় গভীর আবেগ প্রকাশের দক্ষতা। ‘প্রতিদান’ সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ — যেখানে তিনি শত্রুর অপমানের প্রতিদানে ভালোবাসা, ক্ষমা ও মহত্ত্বের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
প্রতিদান: শিরোনামের তাৎপর্য ও কবিতার পটভূমি
শিরোনাম ‘প্রতিদান’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘প্রতিদান’ — প্রতিশোধ নয়, বরং ভালোর বদলে ভালো, ক্ষমার বদলে ক্ষমা নয় — অপমানের বদলেও ভালোবাসা। কবি সেই প্রতিদানের কথা বলছেন — যে আমার ঘর ভেঙেছে, আমি তার ঘর বাঁধি; যে আমাকে পর করেছে, তাকে আপন করতে কাঁদি; যে পথের বিবাগী করেছে, তার লাগি পথে পথে ফিরি; যে ঘুম হরেছে, তার তরে রাত জাগি; যে কূল ভেঙেছে, আমি তার কূল বাঁধি; যে বুকে আঘাত হেনেছে, তার লাগি কাঁদি; যে বিষে-ভরা বাণ দিয়েছে, আমি তাকে বুকভরা গান দেই; যে কাঁটা দিয়েছে, আমি তাকে ফুল দান করি; যে বুকের ওপর কবর বেঁধেছে, আমি তার বুক ফুলে ভরি; যে নিঠুর বাণী কহে, আমি তার মুখ সাজাই।
কবি শুরুতে বলছেন — আমার এ ঘর ভাঙিয়াছে যেবা আমি বাঁধি তার ঘর, আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর। যে মোরে করিল পথের বিবাগী- পথে পথে আমি ফিরি তার লাগি, দিঘল রজনী তার তরে জাগি ঘুম যে হরেছে মোর; আমার এ ঘর ভাঙিয়াছে যেবা আমি বাঁধি তার ঘর।
আমার এ কূল ভাঙিয়াছে যেবা আমি তার কূল বাঁধি, যে গেছে বুকে আঘাত হানিয়া তার লাগি আমি কাঁদি। যে মোরে দিয়েছে বিষে-ভরা বাণ, আমি দেই তারে বুকভরা গান, কাঁটা পেয়ে তারে ফুল করি দান সারাটি জনম-ভর,— আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর।
মোর বুকে যেবা কবর বেঁধেছে আমি তার বুক ভরি রঙিন ফুলের সোহাগ-জড়ানো ফুল মালঞ্চ ধরি। যে মুখে সে কহে নিঠুরিয়া বাণী, আমি লয়ে সখি তারই মুখখানি, কত ঠাঁই হতে কত কীযে আনি সাজাই নিরন্তর— আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর।
প্রতিদান: স্তবকভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ
প্রথম স্তবক: ঘর ভাঙার প্রতিদানে ঘর বাঁধা, পর করার প্রতিদানে আপন করতে কাঁদা, পথের বিবাগী করার প্রতিদানে পথে পথে ফেরা, ঘুম হারানোর প্রতিদানে রাত জাগা
“আমার এ ঘর ভাঙিয়াছে যেবা আমি বাঁধি তার ঘর, / আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর। / যে মোরে করিল পথের বিবাগী- / পথে পথে আমি ফিরি তার লাগি, / দিঘল রজনী তার তরে জাগি ঘুম যে হরেছে মোর; / আমার এ ঘর ভাঙিয়াছে যেবা আমি বাঁধি তার ঘর।”
প্রথম স্তবকে কবি বলছেন — যে আমার ঘর ভেঙেছে, আমি তার ঘর বাঁধি। যে আমাকে পর (পরিচিত নয়, বাইরের লোক) করেছে, তাকে আপন করতে কাঁদিয়া বেড়াই। যে আমাকে পথের বিবাগী (পথে পথে ঘুরতে বাধ্য) করেছে, তার লাগি পথে পথে ফিরি। দীর্ঘ রজনী তার জন্যই জাগি — যে আমার ঘুম হরণ করেছে। আবার পুনরাবৃত্তি — আমার এ ঘর ভাঙিয়াছে যেবা আমি বাঁধি তার ঘর।
দ্বিতীয় স্তবক: কূল ভাঙার প্রতিদানে কূল বাঁধা, বুকে আঘাত হানার প্রতিদানে কাঁদা, বিষে-ভরা বাণের প্রতিদানে বুকভরা গান, কাঁটার প্রতিদানে ফুল দান
“আমার এ কূল ভাঙিয়াছে যেবা আমি তার কূল বাঁধি, / যে গেছে বুকে আঘাত হানিয়া তার লাগি আমি কাঁদি। / যে মোরে দিয়েছে বিষে-ভরা বাণ, / আমি দেই তারে বুকভরা গান, / কাঁটা পেয়ে তারে ফুল করি দান সারাটি জনম-ভর,— / আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর।”
দ্বিতীয় স্তবকে কবি আরও বলছেন — যে আমার কূল (আশ্রয়, নৌকার বাঁধা জায়গা) ভেঙেছে, আমি তার কূল বাঁধি। যে আমার বুকে আঘাত হেনেছে, তার লাগি আমি কাঁদি (দুঃখ করি না, বরং সহানুভূতি করি)। যে আমাকে বিষে-ভরা বাণ (তিরস্কার, কটু কথা) দিয়েছে, আমি তাকে বুকভরা গান দেই। কাঁটা পেয়েও তাকে ফুল দান করি সারাটা জীবন ধরে। আবার পুনরাবৃত্তি — আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর।
তৃতীয় স্তবক: বুকে কবর বাঁধার প্রতিদানে বুক ভরিয়া ফুল মালঞ্চ ধরা, নিঠুর বাণীর প্রতিদানে মুখখানি সাজানো
“মোর বুকে যেবা কবর বেঁধেছে আমি তার বুক ভরি / রঙিন ফুলের সোহাগ-জড়ানো ফুল মালঞ্চ ধরি। / যে মুখে সে কহে নিঠুরিয়া বাণী, / আমি লয়ে সখি তারই মুখখানি, / কত ঠাঁই হতে কত কীযে আনি সাজাই নিরন্তর— / আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর।”
তৃতীয় স্তবকে কবি বলছেন — যে আমার বুকে কবর বেঁধেছে (মৃত্যু ঘটাতে চেয়েছে), আমি তার বুক ভরিয়া রঙিন ফুলের মালঞ্চ ধরি (ফুলের বাগান করে দেই, বা ফুলে ভরিয়ে দেই)। যে মুখে সে নিঠুর বাণী কহে, আমি সেই মুখখানি তুলে নিই, কত জায়গা থেকে কত কী যে এনে নিরন্তর সাজাই। আবার শেষ পঙ্ক্তি — আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর।
কবিতার গঠনশৈলী, ছন্দ ও শিল্পরূপ
কবিতাটি তিনটি স্তবকে বিভক্ত। প্রথম স্তবকে ৬ লাইন, দ্বিতীয় স্তবকে ৬ লাইন, তৃতীয় স্তবকেও ৬ লাইন। সরল ছন্দ, গীতিময় ও আবেগঘন। ভাষা অত্যন্ত সরল, প্রাঞ্জল, আন্তরিক ও মহৎভাবাপন্ন।
প্রতীক ব্যবহারে তিনি দক্ষ। ‘ঘর ভাঙা’ — আশ্রয় ধ্বংস করা, নিরাপত্তা নষ্ট করা। ‘ঘর বাঁধা’ — ক্ষমা করে আবার আশ্রয় দেওয়া। ‘পর করা’ — দূরে ঠেলে দেওয়া, বাইরের বানানো। ‘আপন করিতে কাঁদা’ — আপন করে নেওয়ার জন্য কান্না, আব্দার, মিনতি। ‘পথের বিবাগী’ — পথে পথে ঘুরতে বাধ্য, গৃহহীন। ‘দিঘল রজনী জাগা’ — রাত জেগে থাকা, স্মরণ করা। ‘কূল ভাঙা’ — ভরসা নষ্ট করা, নোঙর কাটা। ‘বুকে আঘাত হানা’ — আঘাত দেওয়া, কষ্ট দেওয়া। ‘বিষে-ভরা বাণ’ — কটু কথা, তিরস্কার, গালি। ‘বুকভরা গান’ — ভালোবাসার গান, প্রশংসা। ‘কাঁটা পাওয়া’ — উপেক্ষা, আঘাত। ‘ফুল দান’ — ভালোবাসা, সম্মান, ক্ষমা। ‘কবর বাঁধা’ — মৃত্যু কামনা করা, পুঁতে ফেলার চেষ্টা। ‘রঙিন ফুলের মালঞ্চ’ — বাগান, ভালোবাসা, জীবনদান। ‘নিঠুর বাণী’ — কঠোর কথা, শাসন। ‘মুখখানি সাজানো’ — সম্মান দেওয়া, সুন্দর করে দেখা।
পুনরাবৃত্তি শৈলী কবিতার সুর তৈরি করেছে। ‘আমার এ ঘর ভাঙিয়াছে যেবা আমি বাঁধি তার ঘর’ — প্রথম স্তবকের শুরু ও শেষে পুনরাবৃত্তি। ‘আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর’ — প্রতিটি স্তবকের শেষে পুনরাবৃত্তি।
শেষের ‘আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর’ — এটি অত্যন্ত শক্তিশালী সমাপ্তি। যিনি সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছেন, তাকেই আপন করতে কাঁদা — এটি ক্ষমার চরম আদর্শ।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য ও দার্শনিক মাত্রা
“প্রতিদান” পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের এক অসাধারণ সৃষ্টি। তিনি এখানে ঘর ভাঙার প্রতিদানে ঘর বাঁধা, পর করার প্রতিদানে আপন করতে কাঁদা, পথের বিবাগী করার প্রতিদানে পথে পথে ফেরা, ঘুম হারানোর প্রতিদানে রাত জাগা, কূল ভাঙার প্রতিদানে কূল বাঁধা, বুকে আঘাত হানার প্রতিদানে কাঁদা, বিষে-ভরা বাণের প্রতিদানে বুকভরা গান, কাঁটার প্রতিদানে ফুল দান, কবর বাঁধার প্রতিদানে বুক ভরিয়া ফুল মালঞ্চ, নিঠুর বাণীর প্রতিদানে মুখখানি সাজানো — এই সব মিলিয়ে এক অপমানের প্রতিদানে ভালোবাসা, ক্ষমা ও মানবিক মহত্ত্বের চিত্র এঁকেছেন।
প্রথম স্তবকে — ঘর ভাঙা ও বাঁধা, পর করা ও আপন করতে কাঁদা, পথের বিবাগী করা ও পথে ফেরা, ঘুম হরণ ও রাত জাগা। দ্বিতীয় স্তবকে — কূল ভাঙা ও কূল বাঁধা, বুকে আঘাত ও কাঁদা, বিষে-ভরা বাণ ও বুকভরা গান, কাঁটা ও ফুল দান। তৃতীয় স্তবকে — কবর বাঁধা ও বুক ফুলে ভরা, নিঠুর বাণী ও মুখ সাজানো।
এই কবিতা আমাদের শেখায় — প্রতিশোধ নয়, ক্ষমা মহৎ। অপমানের প্রতিদান ভালোবাসা দিয়ে দিতে হয়। ঘর ভাঙা হাতকেই আবার ঘর বাঁধতে হয়। যে পর করেছে, তাকেই আপন করতে হয়। যে কাঁটা দিয়েছে, তাকেই ফুল দিতে হয়। যে বিষ দিয়েছে, তাকেই গান দিতে হয়। যিনি কবর বেঁধেছেন, তার বুক ফুলের মালঞ্চে ভরিয়ে দিতে হয়। এটি খ্রিস্টীয় ‘গালে চড় দিলে অপর গাল বাড়িয়ে দাও’ নীতির বাংলা কাব্যরূপ।
পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের কবিতায় ক্ষমা, মহত্ত্ব ও মানবিকতা
পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের কবিতায় ক্ষমা, মহত্ত্ব ও মানবিকতা একটি পুনরাবৃত্ত বিষয়। তিনি ‘প্রতিদান’ কবিতায় ঘর ভাঙার প্রতিদানে ঘর বাঁধা, পর করার প্রতিদানে আপন করতে কাঁদা, বিষে-ভরা বাণের প্রতিদানে বুকভরা গান, কাঁটার প্রতিদানে ফুল দান — এই সব মিলিয়ে ক্ষমার চরম আদর্শ স্থাপন করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন — কীভাবে শত্রুকেও আপন করা যায়, কীভাবে অপমানকে ভালোবাসায় পরিণত করা যায়।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলা সাহিত্যের পাঠ্যক্রমে পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের ‘প্রতিদান’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত থাকার যোগ্য। এই কবিতাটি শিক্ষার্থীদের ক্ষমার মহত্ত্ব, অপমানের প্রতিদানে ভালোবাসা, মানবিকতা ও মহৎ চরিত্র সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করে।
প্রতিদান সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: ‘প্রতিদান’ কবিতাটির লেখক কে?
এই কবিতাটির লেখক পল্লীকবি জসীমউদ্দীন (১৯০৩-১৯৭৬)। তিনি বাংলাদেশের জাতীয় কবি। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘নকশী কাঁথার মাঠ’, ‘বেদের মেয়ে’, ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’, ‘পল্লীকবি’, ‘রাখালী’ ইত্যাদি।
প্রশ্ন ২: ‘আমার এ ঘর ভাঙিয়াছে যেবা আমি বাঁধি তার ঘর’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
যে আমার ঘর ভেঙে দিয়েছে, আমি তার ঘর বেঁধে দিই। প্রতিশোধ নয়, বরং উপকার করে শত্রুকেও জয় করার নীতি। এটি ক্ষমার চরম উদাহরণ।
প্রশ্ন ৩: ‘আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
যে আমাকে পর (অচেনা, বাইরের) বানিয়েছে, আমি কাঁদতে কাঁদতে তাকে আপন করার চেষ্টা করি। অর্থাৎ যে আমাকে দূরে ঠেলে দিয়েছে, তাকে আমি কাছে টানার জন্য মিনতি করি।
প্রশ্ন ৪: ‘যে মোরে দিয়েছে বিষে-ভরা বাণ, আমি দেই তারে বুকভরা গান’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
বিষে-ভরা বাণ — কটু কথা, তিরস্কার, গালি। তার প্রতিদানে আমি বুকভরা গান দেই — প্রশংসা, ভালোবাসা, সুমধুর কথা। মন্দের প্রতিদানে ভালো।
প্রশ্ন ৫: ‘কাঁটা পেয়ে তারে ফুল করি দান’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
কাঁটা পেয়ে (অপমান, উপেক্ষা, আঘাত পেয়ে) তাকে ফুল দান করি (সম্মান, ভালোবাসা, স্নেহ দেই)। অমৃতের বদলে অমৃত নয় — বিষের বদলেও অমৃত।
প্রশ্ন ৬: ‘মোর বুকে যেবা কবর বেঁধেছে আমি তার বুক ভরি রঙিন ফুলের সোহাগ-জড়ানো ফুল মালঞ্চ ধরি’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
কবর বেঁধেছে — মৃত্যু কামনা করেছে, পুঁতে ফেলার চেষ্টা করেছে। তার প্রতিদানে আমি তার বুক ফুলের বাগান করে দেই — জীবন দান করি, ভালোবাসায় ভরিয়ে দেই।
প্রশ্ন ৭: ‘যে মুখে সে কহে নিঠুরিয়া বাণী, আমি লয়ে সখি তারই মুখখানি, কত ঠাঁই হতে কত কীযে আনি সাজাই নিরন্তর’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
যে মুখে সে কঠোর, নিষ্ঠুর কথা বলে — সেই মুখকেই আমি তুলে নিয়ে নানান জায়গা থেকে নানান উপকরণ এনে সাজাই, সুন্দর করি। উপেক্ষার বদলে সাজানো — ক্ষমার চরম উদাহরণ।
প্রশ্ন ৮: ‘আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর’ — কেন বারবার পুনরাবৃত্তি হয়েছে?
এই পঙ্ক্তিটি কবিতার মূল সুর ও মূল বার্তা। বারবার পুনরাবৃত্তি করে কবি জোর দিয়েছেন — যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে, তাকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতে হবে। এটি খ্রিস্টীয় ‘গালে চড় দিলে অপর গাল বাড়িয়ে দাও’ নীতির বাংলা কাব্যরূপ।
প্রশ্ন ৯: ‘প্রতিদান’ শিরোনামটির তাৎপর্য কী?
প্রতিদান অর্থ প্রতিশোধ নয়, বরং অপমানের প্রতিদানে ভালোবাসা, আঘাতের প্রতিদানে ফুল, বিষের প্রতিদানে গান। এটি একটি বিপরীত প্রতিদান — খারাপের বদলে ভালো দেওয়া।
প্রশ্ন ১০: কবিতার মূল শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা কী?
কবিতাটি আমাদের শেখায় — প্রতিশোধ নয়, ক্ষমা মহৎ। অপমানের প্রতিদান ভালোবাসা দিয়ে দিতে হয়। ঘর ভাঙা হাতকেই আবার ঘর বাঁধতে হয়। যে পর করেছে, তাকেই আপন করতে হয়। যে কাঁটা দিয়েছে, তাকেই ফুল দিতে হয়। যে বিষ দিয়েছে, তাকেই গান দিতে হয়। যিনি কবর বেঁধেছেন, তার বুক ফুলের মালঞ্চে ভরিয়ে দিতে হয়। এই শিক্ষা চিরকালীন ও সর্বজনীন।
ট্যাগস: প্রতিদান, পল্লীকবি জসীমউদ্দীন, জসীমউদ্দীনের কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, ক্ষমার কবিতা, মহত্ত্বের কবিতা, মানবিকতার কবিতা, ঘর ভাঙা ও ঘর বাঁধা, কাঁটা ও ফুল, বিষ ও গান, কবর ও মালঞ্চ, বাংলা কবিতা বিশ্লেষণ
© Kobitarkhata.com – কবি: পল্লীকবি জসীমউদ্দীন | কবিতার প্রথম লাইন: “আমার এ ঘর ভাঙিয়াছে যেবা আমি বাঁধি তার ঘর, / আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর।” | অপমানের প্রতিদানে ভালোবাসা, ক্ষমা ও মানবিক মহত্ত্বের অসাধারণ কাব্যভাষা | আধুনিক বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন






