কবিতার খাতা
এসো ফিরে কবি – সমুদ্র দাস।
হে কবি,
এসো ফিরে আবার মাতৃকোলে,
ফিরে এসো বৈশাখের ঐ গানে
ছন্দের নূপুর বাজাও আপন মৃদঙ্গের তালে।
হে কবি,
বিশ্ব আজ জর্জরিত,
ভয়ানক কালগ্রাসে অরুণ আজ অস্তমিত।
ফিরে এসো,হও মোদের ঋত্বিক,
দর্শন করাও মোদের সকল সত্যের প্রতীক।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। সমুদ্র দাস।
কবিতার কথা-
সমুদ্র দাসের ‘এসো ফিরে কবি’ কবিতাটি মূলত বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী দর্শন এবং তাঁর সৃষ্টির প্রতি এক পরম আকুলতায় ভরা আবাহন গীতি। যখন সমাজ বা বিশ্ব কোনো চরম সংকটে পথ হারায়, তখন বাঙালি মানস ঘুরেফিরে সেই ‘রবি’ বা আলোর উৎসেই আশ্রয় খোঁজে। কবি এখানে সেই চিরন্তন আর্তিকেই অত্যন্ত সরল ও প্রাঞ্জল ভাষায় ব্যক্ত করেছেন, যা আসলে দিকভ্রান্ত এই সময়ে কবিগুরুর আলোকবর্তিকাসম উপস্থিতির এক বিনীত প্রার্থনা।
কবিতার প্রথম স্তবকে এক আত্মিক ও সাংস্কৃতিক প্রত্যাবর্তনের সুর ধ্বনিত হয়েছে। ‘মাতৃকোল’ এবং ‘বৈশাখ’-এর অনুষঙ্গটি এখানে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ২৫শে বৈশাখ রবীন্দ্র-আবির্ভাবের দিন, আর তাঁর ‘এসো হে বৈশাখ’ গানটি বাঙালির জঞ্জাল-মোছার ও নবজাগরণের চিরন্তন প্রতীক। কবি তাই রবীন্দ্রনাথকে আবার ফিরে আসার অনুরোধ জানিয়েছেন, যেন তিনি তাঁর লেখনী আর ‘ছন্দের নূপুর’ দিয়ে স্থবির হয়ে পড়া বাঙালি সমাজে আপন ‘মৃদঙ্গের তালে’ নতুন প্রাণের স্পন্দন জাগিয়ে তোলেন।
কবিতার দ্বিতীয় স্তবকে এসে কবি বিশ্বজুড়ে চলা বর্তমান অস্থিরতা ও সংকটের এক বাস্তব চিত্র এঁকেছেন। বিশ্ব আজ নানা অন্যায়, অবক্ষয় আর ‘ভয়ানক কালগ্রাসে’ জর্জরিত। ‘অরুণ আজ অস্তমিত’—এই রূপকটি এখানে এক আশ্চর্য গভীরতা পায়, কারণ ‘রবি’ বা ‘অরুণ’ শব্দের অর্থই সূর্য। রবীন্দ্রনাথের চলে যাওয়া মানে যেন আমাদের সংস্কৃতির সূর্য অস্ত যাওয়া, যার ফলে চারদিকে এক ঘোর অন্ধকার আর দিকভ্রান্তির রাজত্ব। এই অন্ধকার সময়ে কবিগুরুকে ‘ঋত্বিক’ বা যজ্ঞের প্রধান পুরোহিত হিসেবে ফিরে আসার অনুরোধ করা হয়েছে, যিনি তাঁর বিশ্বজনীন জ্ঞান, দর্শন এবং সৃষ্টির আলো দিয়ে সমাজকে আবার ‘সকল সত্যের প্রতীক’ দর্শন করাবেন।
পরিশেষে, কবিতাটি মনে করিয়ে দেয় যে রবীন্দ্র-চেতনা কোনো নির্দিষ্ট সময়ে বন্দি নয়, তা চিরকালীন। সৃষ্টির সার্থকতা লৌকিক হাততালিতে নয়, বরং স্রষ্টার নিজের মানসিক মুক্তি এবং অস্তিত্বের তাগিদে—যা এই কবিতায় রবীন্দ্রনাথের অবর্তমানে তৈরি হওয়া সামাজিক বন্ধ্যাত্ব দূর করতে এবং সত্য ও সুন্দরের পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য তাঁরই দর্শনে ফিরে যাওয়ার এক আকুল ও অবিনশ্বর আর্তি হয়ে প্রকাশ পেয়েছে।






