কবিতার খাতা
আবার যখনই দেখা হবে – নির্মলেন্দু গুণ।
আবার যখনই দেখা হবে, আমি প্রথম সুযোগেই
বলে দেব স্ট্রেটকাটঃ ‘ভালোবাসি’।
এরকম সত্য-ভাষণে যদি কেঁপে ওঠে,
অথবা ঠোঁটের কাছে উচ্চারিত শব্দ থেমে যায়,
আমি নখাগ্রে দেখাবো প্রেম, ভালোবাসা, বক্ষ চিরে
তোমার প্রতিমা। দেয়ালে টাঙ্গানো কোন প্রথাসিদ্ধ
দেবীচিত্র নয়, রক্তের ফ্রেমে বাঁধা হৃদয়ের কাচে
দেখবে নিজের মুখে ভালোবাসা ছায়া ফেলিয়াছে।
এরকম উন্মোচনে যদি তুমি আনুরাগে মুর্ছা যেতে চাও
মূর্ছা যাবে,জাগাবো না,নিজের শরীর দিয়ে কফিন বানাবো।
‘ভালোবাসি’ বলে দেব স্ট্রেটকাট, আবার যখনই দেখা হবে।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। নির্মলেন্দু গুণ।
আবার যখনই দেখা হবে – নির্মলেন্দু গুণ | আবার যখনই দেখা হবে কবিতা নির্মলেন্দু গুণ | নির্মলেন্দু গুণের কবিতা | আধুনিক বাংলা প্রেমের কবিতা
আবার যখনই দেখা হবে: নির্মলেন্দু গুণের প্রেমের চূড়ান্ত, সরাসরি ও বলিষ্ঠ প্রকাশের অসাধারণ কাব্যভাষা
নির্মলেন্দু গুণের “আবার যখনই দেখা হবে” একটি অনন্য সৃষ্টি, যা প্রেমের চূড়ান্ত, সরাসরি ও বলিষ্ঠ প্রকাশের এক গভীর কাব্যিক অন্বেষণ । “আবার যখনই দেখা হবে, আমি প্রথম সুযোগেই / বলে দেব স্ট্রেটকাটঃ ‘ভালোবাসি’।” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে এক গভীর চেতনা — প্রেমে আর দ্বিধা, সংকোচ, লুকোচুরির খেলা নয়। সরাসরি, স্ট্রেটকাট বলে দেব — ভালোবাসি। নির্মলেন্দু গুণ (জন্ম: ১৯৪৫) বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত কবি, চিত্রশিল্পী ও গদ্যকার । তাঁর কবিতায় প্রেম ও নারীর পাশাপাশি স্বৈরাচার বিরোধিতা ও শ্রেণীসংগ্রামের বার্তা ওঠে এসেছে বার বার। “আবার যখনই দেখা হবে” তাঁর একটি বহুপঠিত কবিতা যা প্রেমের সরাসরি স্বীকারোক্তির এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত ।
নির্মলেন্দু গুণ: আধুনিক বাংলা কবিতার প্রাণপুরুষ
নির্মলেন্দু গুণের পুরো নাম নির্মলেন্দু প্রকাশ গুণ চৌধুরী। তিনি ১৯৪৫ সালের ২১শে জুন (৭ই আষাঢ় ১৩৫২ বঙ্গাব্দ) নেত্রকোনার বারহাট্টায় জন্মগ্রহণ করেন । আধুনিক কবি হিসাবে খ্যাতিমান হলেও কবিতার পাশাপাশি চিত্রশিল্প, গদ্য এবং ভ্রমণকাহিনীতেও তিনি স্বকীয় অবদান রেখেছেন ।
১৯৭০ সালে প্রথম কাব্যগ্রন্থ “প্রেমাংশুর রক্ত চাই” প্রকাশিত হবার পর থেকেই তিনি তীব্র জনপ্রিয়তা অর্জন করেন । তাঁর কবিতায় প্রেম ও নারীর পাশাপাশি স্বৈরাচার বিরোধিতা ও শ্রেণীসংগ্রামের বার্তা ওঠে এসেছে বার বার ।
কবি নির্মলেন্দু গুণকে বলা হয় আধুনিক কবিতার প্রাণ পুরুষ, যিনি কলমের আঁচড়ে অক্ষরের প্রজাপতি উড়িয়েছেন কবিতার খাতার পাতায় পাতায় । গত কয়েক দশক ধরেই একের পর এক কবিতার সোনালী ফসল আমাদের উপহার দিচ্ছেন। কখনোবা আমাদের আচ্ছন্ন করছেন নিদারুণ মানবিকতায়, কখনো কাতর করেছেন দেশাত্ববোধে আবার কখনো প্রেমের মায়ায় ।
তাঁর বহুল আবৃত্ত কবিতার মধ্যে রয়েছে ‘হুলিয়া’, ‘মানুষ’, ‘আফ্রিকার প্রেমের কবিতা’, ‘একটি অসমাপ্ত কবিতা’, ‘স্বাধীনতা এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’, ‘তুলনামূলক হাত’, ‘তোমার চোখ এতো লাল কেন’, ‘শুধু তোমার জন্য’, ‘আবার যখনই দেখা হবে’, ‘টেলিফোনে প্রস্তাব’ প্রভৃতি । তিনি ১৯৮২ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং ২০০১ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন ।
আবার যখনই দেখা হবে কবিতার বিস্তারিত বিশ্লেষণ
কবিতার শিরোনামের তাৎপর্য
“আবার যখনই দেখা হবে” শিরোনামটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘আবার’ শব্দটি নির্দেশ করে যে আগেও দেখা হয়েছে, সম্পর্ক আছে। ‘যখনই’ শব্দটি অনিশ্চয়তা নির্দেশ করে — কবে দেখা হবে জানি না, কিন্তু যখনই হবে। শিরোনামেই কবি ইঙ্গিত দিয়েছেন — এই কবিতা একটি প্রতীক্ষার, একটি প্রতিজ্ঞার গল্প বলবে — যখনই দেখা হবে, তখনই কিছু বলার আছে ।
প্রথম স্তবকের বিশ্লেষণ: স্ট্রেটকাট ভালোবাসি
“আবার যখনই দেখা হবে, আমি প্রথম সুযোগেই / বলে দেব স্ট্রেটকাটঃ ‘ভালোবাসি’। / এরকম সত্য-ভাষণে যদি কেঁপে ওঠে, / অথবা ঠোঁটের কাছে উচ্চারিত শব্দ থেমে যায়, / আমি নখাগ্রে দেখাবো প্রেম, ভালোবাসা, বক্ষ চিরে / তোমার প্রতিমা। দেয়ালে টাঙ্গানো কোন প্রথাসিদ্ধ / দেবীচিত্র নয়, রক্তের ফ্রেমে বাঁধা হৃদয়ের কাচে / দেখবে নিজের মুখে ভালোবাসা ছায়া ফেলিয়াছে।” প্রথম স্তবকে কবি তাঁর প্রতিজ্ঞা ও ভালোবাসা প্রকাশের পদ্ধতি বর্ণনা করেছেন । তিনি বলেছেন — আবার যখনই দেখা হবে, আমি প্রথম সুযোগেই বলে দেব স্ট্রেটকাট: ‘ভালোবাসি’। এরকম সত্য-ভাষণে যদি কেঁপে ওঠে, অথবা ঠোঁটের কাছে উচ্চারিত শব্দ থেমে যায়, আমি নখাগ্রে দেখাবো প্রেম, ভালোবাসা, বক্ষ চিরে তোমার প্রতিমা। দেয়ালে টাঙ্গানো কোন প্রথাসিদ্ধ দেবীচিত্র নয়, রক্তের ফ্রেমে বাঁধা হৃদয়ের কাচে দেখবে নিজের মুখে ভালোবাসা ছায়া ফেলিয়াছে।
‘আবার যখনই দেখা হবে, আমি প্রথম সুযোগেই / বলে দেব স্ট্রেটকাটঃ ‘ভালোবাসি’’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘স্ট্রেটকাট’ মানে সরাসরি, কোনো ঘুরিয়ে না বলে। কবি প্রতিজ্ঞা করেছেন — আবার দেখা হলে আর কোনো লুকোচুরি নয়, সরাসরি বলে দেবেন ‘ভালোবাসি’। এটি প্রেমের চূড়ান্ত সত্য ও সরল স্বীকারোক্তি ।
‘এরকম সত্য-ভাষণে যদি কেঁপে ওঠে, / অথবা ঠোঁটের কাছে উচ্চারিত শব্দ থেমে যায়’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
সত্য-ভাষণ শুনে প্রেয়সী যদি কেঁপে ওঠেন বা কিছু বলতে পারেন না, তাহলে কবি অন্য উপায়ে প্রেম দেখাবেন। এটি প্রেমের গভীরতা ও বহুমাত্রিক প্রকাশের ইঙ্গিত ।
‘আমি নখাগ্রে দেখাবো প্রেম, ভালোবাসা, বক্ষ চিরে / তোমার প্রতিমা’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘নখাগ্রে দেখানো’ অর্থ অতি সূক্ষ্মভাবে, স্পর্শের মাধ্যমে দেখানো। ‘বক্ষ চিরে তোমার প্রতিমা’ — অর্থাৎ নিজের বুক চিরে প্রেয়সীর মূর্তি বের করে দেখানো। এটি ভালোবাসার চরম আত্মত্যাগ ও নিবেদনের প্রতীক ।
‘দেয়ালে টাঙ্গানো কোন প্রথাসিদ্ধ / দেবীচিত্র নয়, রক্তের ফ্রেমে বাঁধা হৃদয়ের কাচে / দেখবে নিজের মুখে ভালোবাসা ছায়া ফেলিয়াছে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
প্রেয়সী কোন দেয়ালে টাঙানো দেবীচিত্র নন — তিনি জীবন্ত, বাস্তব। ‘রক্তের ফ্রেমে বাঁধা হৃদয়ের কাচে’ — কবির হৃদয় যেন একটি কাচের ফ্রেম, যা রক্ত দিয়ে বাঁধানো। সেই কাচে প্রেয়সী নিজের মুখ দেখবেন এবং দেখবেন যে ভালোবাসা সেখানে ছায়া ফেলেছে — অর্থাৎ তাঁর মুখে ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে ।
দ্বিতীয় স্তবকের বিশ্লেষণ: মূর্ছা যাওয়া ও কফিন
“এরকম উন্মোচনে যদি তুমি আনুরাগে মূর্ছা যেতে চাও / মূর্ছা যাবে, জাগাবো না, নিজের শরীর দিয়ে কফিন বানাবো।” দ্বিতীয় স্তবকে কবি ভালোবাসার চরম প্রকাশের পরিণতি ও নিজের আত্মত্যাগের কথা বলেছেন । তিনি বলেছেন — এরকম উন্মোচনে যদি তুমি অনুরাগে মূর্ছা যেতে চাও, মূর্ছা যাবে, জাগাবো না, নিজের শরীর দিয়ে কফিন বানাবো।
‘এরকম উন্মোচনে যদি তুমি আনুরাগে মূর্ছা যেতে চাও’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
প্রেমের এই চরম উন্মোচন, এই আত্মপ্রকাশ দেখে প্রেয়সী যদি অনুরাগে মূর্ছা যেতে চান, তবে তিনি যেতে পারেন। ‘অনুরাগে’ শব্দটি ইঙ্গিত দেয় — এই মূর্ছা ভালোবাসার অতিরিক্ত তীব্রতা থেকে আসবে ।
‘মূর্ছা যাবে, জাগাবো না, নিজের শরীর দিয়ে কফিন বানাবো’ — শেষ পঙ্ক্তির তাৎপর্য
এটি কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী লাইন। যদি প্রেয়সী মূর্ছা যান, কবি তাকে জাগাবেন না। বরং নিজের শরীর দিয়ে তার জন্য কফিন বানাবেন। অর্থাৎ প্রেয়সী যদি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন, কবি নিজের শরীর দিয়ে তার শেষযাত্রার ব্যবস্থা করবেন। এটি প্রেমের চরম আত্মত্যাগ ও নিবেদনের প্রতীক ।
তৃতীয় স্তবকের পুনরাবৃত্তি
“‘ভালোবাসি’ বলে দেব স্ট্রেটকাট, আবার যখনই দেখা হবে।” তৃতীয় স্তবকে প্রথম পঙ্ক্তির পুনরাবৃত্তি হয়েছে। এটি কবিতাটিকে একটি বৃত্তাকার কাঠামো দিয়েছে এবং মূল প্রতিজ্ঞাকে আরও শক্তিশালী করেছে ।
কবিতার গঠনশৈলী ও শিল্পরূপ
কবিতাটি তিনটি স্তবকে বিভক্ত। প্রথম স্তবক দীর্ঘ, দ্বিতীয় স্তবক ছোট, তৃতীয় স্তবক প্রথম পঙ্ক্তির পুনরাবৃত্তি। এই গঠন কবিতাটিকে একটি প্রতিজ্ঞা ও তার শপথের রূপ দিয়েছে। প্রথম স্তবকে প্রতিজ্ঞা ও তার ব্যাখ্যা, দ্বিতীয় স্তবকে সেই প্রতিজ্ঞার চূড়ান্ত পরিণতি ও আত্মত্যাগ, তৃতীয় স্তবকে প্রতিজ্ঞার পুনরাবৃত্তি — এই ক্রমিক কাঠামো কবিতাটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ দিয়েছে ।
শব্দচয়ন ও শৈলীগত বিশেষত্ব
কবি এখানে অত্যন্ত শক্তিশালী ও বলিষ্ঠ শব্দ ব্যবহার করেছেন — ‘স্ট্রেটকাট’, ‘ভালোবাসি’, ‘সত্য-ভাষণ’, ‘নখাগ্রে দেখানো’, ‘বক্ষ চিরে’, ‘রক্তের ফ্রেম’, ‘হৃদয়ের কাচ’, ‘উন্মোচন’, ‘অনুরাগে মূর্ছা’, ‘কফিন’। এই শব্দগুলো প্রেমের তীব্রতা, গভীরতা ও আত্মত্যাগের চরম প্রকাশ ফুটিয়ে তুলেছে ।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য
“আবার যখনই দেখা হবে” কবিতাটি প্রেমের চূড়ান্ত ও বলিষ্ঠ প্রকাশের এক অসাধারণ চিত্র । কবি প্রতিজ্ঞা করেছেন — আবার যখনই দেখা হবে, প্রথম সুযোগেই সরাসরি বলে দেবেন ‘ভালোবাসি’। যদি সেই সত্য-ভাষণে প্রেয়সী কেঁপে ওঠেন বা শব্দ থেমে যায়, তিনি নখাগ্রে দেখাবেন প্রেম, ভালোবাসা। তিনি বক্ষ চিরে দেখাবেন প্রেয়সীর প্রতিমা। তিনি দেয়ালে টাঙানো কোন প্রথাসিদ্ধ দেবীচিত্র নন, তিনি রক্তের ফ্রেমে বাঁধা হৃদয়ের কাচে নিজের মুখ দেখবেন — যেখানে ভালোবাসা ছায়া ফেলেছে। এই উন্মোচনে প্রেয়সী যদি অনুরাগে মূর্ছা যেতে চান, তিনি যেতে পারেন, কবি তাকে জাগাবেন না, বরং নিজের শরীর দিয়ে তার কফিন বানাবেন। শেষে আবার প্রতিজ্ঞা — ‘ভালোবাসি’ বলে দেব স্ট্রেটকাট, আবার যখনই দেখা হবে । এই কবিতা আমাদের শেখায় — প্রকৃত প্রেমে আর লুকোচুরি নয়, দ্বিধা নয়, সংকোচ নয়। সরাসরি বলে দিতে হয়, এবং প্রয়োজনে প্রেয়সীর জন্য নিজের জীবন দিতেও প্রস্তুত থাকতে হয় ।
আবার যখনই দেখা হবে কবিতায় ব্যবহৃত প্রতীক ও চিহ্নের গভীর বিশ্লেষণ
স্ট্রেটকাটের প্রতীকী তাৎপর্য
‘স্ট্রেটকাট’ শব্দটি ইংরেজি, যার অর্থ সরাসরি পথ, কোনো ঘুরিয়ে না বলে। এখানে এটি প্রেমের সরাসরি স্বীকারোক্তির প্রতীক। কবি আর কোনো কৌশল, কোনো ঘুরিয়ে, কোনো লুকোচুরি চান না — সরাসরি বলে দিতে চান ‘ভালোবাসি’ ।
ভালোবাসি শব্দের প্রতীকী তাৎপর্য
এই একটি শব্দে কবিতার সব অর্থ নিহিত। এটি প্রেমের চূড়ান্ত সত্য, যা কবি বারবার উচ্চারণ করতে চান। প্রথম স্তবকে বলা, শেষ স্তবকে পুনরাবৃত্তি — এটি ভালোবাসার স্থায়িত্ব ও গুরুত্ব নির্দেশ করে ।
সত্য-ভাষণের প্রতীকী তাৎপর্য
সত্য-ভাষণ — যে ভাষণ সত্য, কোনো মিথ্যা নেই। এটি প্রেমের স্বীকারোক্তির সত্যতা ও নিখাদতা নির্দেশ করে। এই সত্য শুনে প্রেয়সী কেঁপে উঠতে পারেন — এত বড় সত্য!
নখাগ্রে দেখানোর প্রতীকী তাৎপর্য
নখাগ্রে দেখানো — অতি সূক্ষ্মভাবে, স্পর্শের মাধ্যমে দেখানো। এটি প্রেমের সূক্ষ্মতা, কোমলতা ও গভীরতা নির্দেশ করে। শব্দ ব্যর্থ হলে স্পর্শ দিয়ে বোঝাতে হবে ।
বক্ষ চিরে প্রতিমা দেখানোর প্রতীকী তাৎপর্য
বক্ষ চিরে প্রতিমা দেখা — নিজের বুক চিরে প্রেয়সীর মূর্তি বের করে দেখানো। এটি ভালোবাসার চরম আত্মত্যাগ ও নিবেদনের প্রতীক। প্রেয়সী কবির হৃদয়ে বাস করেন, তাকে বের করে দেখাতে বুক চিরতে হবে ।
দেয়ালে টাঙানো প্রথাসিদ্ধ দেবীচিত্রের প্রতীকী তাৎপর্য
দেয়ালে টাঙানো দেবীচিত্র — যা সাধারণ, যা প্রথা মেনে করা হয়। কবি বলছেন, প্রেয়সী তা নন। তিনি জীবন্ত, বাস্তব, অনন্য। এটি প্রেয়সীর প্রতি কবির অনন্য ভালোবাসার প্রকাশ ।
রক্তের ফ্রেমে বাঁধা হৃদয়ের কাচের প্রতীকী তাৎপর্য
রক্তের ফ্রেম — জীবন দিয়ে বাঁধানো ফ্রেম। হৃদয়ের কাচ — হৃদয় যেন একটি কাচ, যা স্বচ্ছ। সেই কাচে প্রেয়সী নিজের মুখ দেখবেন এবং দেখবেন ভালোবাসা সেখানে ছায়া ফেলেছে। এটি একটি অসাধারণ চিত্রকল্প — হৃদয় যেন একটি আয়না, যাতে প্রেয়সীর প্রতিচ্ছবি ও ভালোবাসার ছায়া ফুটে আছে ।
উন্মোচনের প্রতীকী তাৎপর্য
উন্মোচন — আবরণ খুলে ফেলা, গোপন কথা প্রকাশ করা। এখানে প্রেমের গোপন কথা, অনুভূতি প্রকাশ করা। এই উন্মোচন এতই শক্তিশালী যে প্রেয়সী মূর্ছা যেতে পারেন ।
অনুরাগে মূর্ছা যাওয়ার প্রতীকী তাৎপর্য
অনুরাগ — ভালোবাসা, প্রেম। প্রেমের তীব্রতায় মূর্ছা যাওয়া — ভালোবাসার চরম প্রকাশের প্রতীক। প্রেয়সী যদি সেই তীব্রতা সহ্য করতে না পারেন, তিনি মূর্ছা যেতে পারেন ।
নিজের শরীর দিয়ে কফিন বানানোর প্রতীকী তাৎপর্য
এটি কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক। প্রেয়সী মূর্ছা গেলে বা মারা গেলে, কবি নিজের শরীর দিয়ে তার জন্য কফিন বানাবেন। অর্থাৎ প্রেয়সীর জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত। এটি প্রেমের চরম আত্মত্যাগের প্রতীক ।
কবির সাহিত্যিক শৈলী ও দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি
নির্মলেন্দু গুণের কবিতার বৈশিষ্ট্য হলো সহজ-সরল ভাষায় গভীর মানবিক অনুভূতি প্রকাশের ক্ষমতা । তিনি প্রেমের চূড়ান্ত সত্য, আত্মত্যাগ ও নিবেদনকে অসাধারণ কাব্যিক সৌন্দর্যে রূপ দিয়েছেন । ‘আবার যখনই দেখা হবে’ কবিতায় তিনি প্রেমের সেই চূড়ান্ত প্রকাশকে ফুটিয়ে তুলেছেন, যেখানে কোনো দ্বিধা নেই, কোনো সংকোচ নেই — শুধু সরাসরি স্বীকারোক্তি ও আত্মত্যাগের প্রস্তুতি ।
সাহিত্যিক মূল্যায়ন ও সমালোচনা
সাহিত্য সমালোচকদের মতে, নির্মলেন্দু গুণকে বলা হয় আধুনিক কবিতার প্রাণ পুরুষ, যিনি কলমের আঁচড়ে অক্ষরের প্রজাপতি উড়িয়েছেন কবিতার খাতার পাতায় পাতায় । ‘আবার যখনই দেখা হবে’ কবিতাটি তাঁর প্রেমের কবিতার অন্যতম সেরা উদাহরণ। এই কবিতায় তিনি প্রেমের চূড়ান্ত সরল স্বীকারোক্তি ও আত্মত্যাগের অসাধারণ শিল্পরূপ দিয়েছেন ।
শিল্পগত উৎকর্ষ
কবিতাটির সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো প্রেমের চূড়ান্ত স্বীকারোক্তিকে এত সরল, এত বলিষ্ঠ ও এত গভীরভাবে ফুটিয়ে তোলা। ‘স্ট্রেটকাট’ শব্দটির ব্যবহার আধুনিক ও বলিষ্ঠ। ‘রক্তের ফ্রেমে বাঁধা হৃদয়ের কাচে দেখবে নিজের মুখে ভালোবাসা ছায়া ফেলিয়াছে’ — এই লাইনটি বাংলা কবিতার অমূল্য সম্পদ। শেষের ‘নিজের শরীর দিয়ে কফিন বানাবো’ — এই আত্মত্যাগের চিত্রকল্প প্রেমের চরম উৎসর্গকে নির্দেশ করে ।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলা সাহিত্যের পাঠ্যক্রমে এই কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এটি শিক্ষার্থীদের আধুনিক বাংলা কবিতার বলিষ্ঠ ভাষা, প্রেমের চূড়ান্ত প্রকাশ এবং আত্মত্যাগের ধারণা সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করে ।
সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা
আজকের ক্ষণস্থায়ী, ভাসাভাসা সম্পর্কের যুগে এই কবিতাটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। এটি শেখায় — প্রেম মানে সরাসরি স্বীকারোক্তি, প্রেম মানে আত্মত্যাগ, প্রেম মানে নিজের জীবন দিতেও প্রস্তুত থাকা। ‘স্ট্রেটকাট’ বলে দিতে হবে — ভালোবাসি ।
সম্পর্কিত কবিতা ও সাহিত্যকর্ম
নির্মলেন্দু গুণের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রেমের কবিতার মধ্যে রয়েছে ‘টেলিফোনে প্রস্তাব’, ‘তুলনামূলক হাত’, ‘তোমার চোখ এতো লাল কেন’, ‘শুধু তোমার জন্য’, ‘মোনালিসা’, ‘ভালোবাসা, ভারসাম্যহীন’, ‘আক্রোশ’, ‘মুখোমুখি’ প্রভৃতি । ‘আবার যখনই দেখা হবে’ তাঁর প্রেমের কবিতার ধারার একটি বিশেষ সংযোজন ।
আবার যখনই দেখা হবে কবিতা সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: আবার যখনই দেখা হবে কবিতাটির লেখক কে?
আবার যখনই দেখা হবে কবিতাটির লেখক নির্মলেন্দু গুণ। তিনি বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত কবি, চিত্রশিল্পী ও গদ্যকার ।
প্রশ্ন ২: আবার যখনই দেখা হবে কবিতাটির মূল বিষয়বস্তু কী?
এই কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো প্রেমের চূড়ান্ত, সরাসরি ও বলিষ্ঠ প্রকাশ। কবি প্রতিজ্ঞা করেছেন — আবার যখনই দেখা হবে, তিনি প্রথম সুযোগেই সরাসরি বলে দেবেন ‘ভালোবাসি’। প্রয়োজনে তিনি নিজের বুক চিরে প্রেয়সীর প্রতিমা দেখাবেন, এমনকি নিজের শরীর দিয়ে তার কফিন বানাবেন ।
প্রশ্ন ৩: ‘আবার যখনই দেখা হবে, আমি প্রথম সুযোগেই / বলে দেব স্ট্রেটকাটঃ ‘ভালোবাসি’’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘স্ট্রেটকাট’ মানে সরাসরি, কোনো ঘুরিয়ে না বলে। কবি প্রতিজ্ঞা করেছেন — আবার দেখা হলে আর কোনো লুকোচুরি নয়, সরাসরি বলে দেবেন ‘ভালোবাসি’। এটি প্রেমের চূড়ান্ত সত্য ও সরল স্বীকারোক্তি ।
প্রশ্ন ৪: ‘আমি নখাগ্রে দেখাবো প্রেম, ভালোবাসা, বক্ষ চিরে / তোমার প্রতিমা’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘নখাগ্রে দেখানো’ অর্থ অতি সূক্ষ্মভাবে, স্পর্শের মাধ্যমে দেখানো। ‘বক্ষ চিরে তোমার প্রতিমা’ — অর্থাৎ নিজের বুক চিরে প্রেয়সীর মূর্তি বের করে দেখানো। এটি ভালোবাসার চরম আত্মত্যাগ ও নিবেদনের প্রতীক ।
প্রশ্ন ৫: ‘দেয়ালে টাঙ্গানো কোন প্রথাসিদ্ধ / দেবীচিত্র নয়, রক্তের ফ্রেমে বাঁধা হৃদয়ের কাচে / দেখবে নিজের মুখে ভালোবাসা ছায়া ফেলিয়াছে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
প্রেয়সী কোন দেয়ালে টাঙানো দেবীচিত্র নন — তিনি জীবন্ত, বাস্তব। ‘রক্তের ফ্রেমে বাঁধা হৃদয়ের কাচে’ — কবির হৃদয় যেন একটি কাচের ফ্রেম, যা রক্ত দিয়ে বাঁধানো। সেই কাচে প্রেয়সী নিজের মুখ দেখবেন এবং দেখবেন যে ভালোবাসা সেখানে ছায়া ফেলেছে — অর্থাৎ তাঁর মুখে ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে ।
প্রশ্ন ৬: ‘এরকম উন্মোচনে যদি তুমি আনুরাগে মূর্ছা যেতে চাও / মূর্ছা যাবে, জাগাবো না, নিজের শরীর দিয়ে কফিন বানাবো’ — শেষ পঙ্ক্তির তাৎপর্য কী?
এটি কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী লাইন। যদি প্রেয়সী মূর্ছা যান, কবি তাকে জাগাবেন না। বরং নিজের শরীর দিয়ে তার জন্য কফিন বানাবেন। অর্থাৎ প্রেয়সী যদি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন, কবি নিজের শরীর দিয়ে তার শেষযাত্রার ব্যবস্থা করবেন। এটি প্রেমের চরম আত্মত্যাগ ও নিবেদনের প্রতীক ।
প্রশ্ন ৭: নির্মলেন্দু গুণ সম্পর্কে সংক্ষেপে বলুন।
নির্মলেন্দু গুণ (জন্ম: ১৯৪৫) বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত কবি, চিত্রশিল্পী ও গদ্যকার । তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ “প্রেমাংশুর রক্ত চাই” ১৯৭০ সালে প্রকাশিত হয় । তিনি ১৯৮২ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং ২০০১ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন । তাঁর বহুল আবৃত্ত কবিতার মধ্যে রয়েছে ‘হুলিয়া’, ‘মানুষ’, ‘আফ্রিকার প্রেমের কবিতা’, ‘স্বাধীনতা এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’, ‘আবার যখনই দেখা হবে’ প্রভৃতি ।
ট্যাগস: আবার যখনই দেখা হবে, নির্মলেন্দু গুণ, নির্মলেন্দু গুণের কবিতা, আবার যখনই দেখা হবে কবিতা নির্মলেন্দু গুণ, আধুনিক বাংলা প্রেমের কবিতা, স্ট্রেটকাট ভালোবাসি
© Kobitarkhata.com – কবি: নির্মলেন্দু গুণ | কবিতার প্রথম লাইন: “আবার যখনই দেখা হবে, আমি প্রথম সুযোগেই / বলে দেব স্ট্রেটকাটঃ ‘ভালোবাসি’।” | বাংলা প্রেমের কবিতা বিশ্লেষণ






