কবিতার দ্বিতীয় অংশে কবি শৈশব এবং অতীতের সেই হারানো মাধুর্যের জন্য হাহাকার করেছেন। একসময় মানুষের জীবনে গান ছিল, সুর ছিল যা জীবনকে ছন্দময় করে রাখত। আজ সেই গানগুলো যেন কোনো সুদূর দেশে নির্বাসিত হয়েছে। মায়েরা এখন আর ছোটদের পরম মমতায় গান গেয়ে ঘুম পাড়ায় না; যান্ত্রিকতা সেই স্নিগ্ধ আবেশটুকুকেও গিলে খেয়েছে। কবির ব্যক্তিগত জীবনের যন্ত্রণাও এখানে মূর্ত হয়ে উঠেছে। জীবন তাঁকে একসময় নির্মমভাবে আঘাত করেছিল, আর আজ কবিও সেই জীবনের আহ্বানে সাড়া দিতে অস্বীকার করছেন। এটি মূলত এক ধরণের অভিমানী বৈরাগ্য, যেখানে মানুষ জগতের নিষ্ঠুরতা দেখে নিজের ভেতরে গুটিয়ে যায়। অতীত আজ এতটাই দূরে সরে গেছে যে, সে তার নিজের ডাকনামটিও ভুলে গেছে। কবি শ্রীজাত নিজেও সেই পুরনো আবেগপ্রবণ পথে আর হাঁটতে চান না, কারণ তিনি জানেন সেই পথে ফিরলে কেবল শূন্যতা আর হাহাকারই মিলবে। কবির এই আত্মবিলাপ আসলে পুরো প্রজন্মের এক সামগ্রিক নিঃসঙ্গতারই প্রতিধ্বনি।
পরিশেষে, এই কবিতাটি আধুনিক যুগের স্বার্থপরতা এবং যান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ। মানুষের মধ্যকার সেই সহজ সম্প্রীতি আর উষ্ণতা কেন হারিয়ে গেল, সেই প্রশ্নই এখানে বারবার ফিরে এসেছে। ভাঙা মন আজ আর জীবনের জটিলতা বা জট ছাড়াতে চায় না, বরং সে এক ধরণের নির্লিপ্ততায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। শ্রীজাত অত্যন্ত সাবলীল শব্দে এবং ছন্দে বর্তমান সময়ের যে রূঢ় চিত্রটি এঁকেছেন, তা আমাদের সামাজিক অস্তিত্বের এক সংকীর্ণ দিককে উন্মোচিত করে। মানুষের সাথে মানুষের দেখা হওয়াটা আজ কেবল এক যান্ত্রিক প্রক্রিয়া, সেখানে আত্মার কোনো সংযোগ নেই। কবির এই হাহাকার আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা যত বেশি বৈষয়িকভাবে এগোচ্ছি, মানসিকভাবে ততই একে অপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। সৃষ্টির সার্থকতা লৌকিক হাততালিতে নয়, বরং স্রষ্টার নিজের মানসিক মুক্তি এবং অস্তিত্বের তাগিদে। এই কবিতার প্রতিটি চরণে যে হাহাকার রয়েছে, তা আমাদের অবশ হয়ে যাওয়া বিবেককে যেন এক মুহূর্তের জন্য নাড়া দিয়ে যায়। এভাবেই কবিতাটি এক গভীর বিষাদ আর শূন্যতার মধ্য দিয়ে তার চূড়ান্ত বক্তব্যে পৌঁছায়।
দেখা হলে কেউ হাত বাড়ায় না – শ্রীজাত | শ্রীজাতের সেরা কবিতা | আধুনিক বাংলা কবিতা | একাকিত্ব ও নিঃসঙ্গতার অসাধারণ কাব্য | কেউ হাত বাড়ায় না ও সকলে তাড়ায় | ভাঙা মন ও পাগলের সাঁকো না নাড়া | আধুনিক সমাজের নিষ্ঠুর বাস্তবতা
দেখা হলে কেউ হাত বাড়ায় না: শ্রীজাতের একাকিত্ব, সময় ও আধুনিক সমাজের নিষ্ঠুরতার অসাধারণ কাব্যদর্শন — “দেখা হলে কেউ হাত বাড়ায় না আজকাল, / সকলে কেমন খুব তাড়ায়, না, আজকাল?”
শ্রীজাতের “দেখা হলে কেউ হাত বাড়ায় না” আধুনিক বাংলা কবিতার এক অনন্য, নিঃসঙ্গ ও সময়ের নিষ্ঠুরতা চিহ্নিতকারী সৃষ্টি। এই কবিতাটি আজকের সমাজে মানুষের সম্পর্কের শীতলতা, একাকিত্ব, ভাঙা মন, পাগলের সাঁকো না নাড়া, গান চলে যাওয়া, ছোটদের ঘুম পাড়ানো বন্ধ হওয়া, জীবন কর্তৃক ঘুরিয়ে মারা, অতীতের ডাকনাম ভুলে যাওয়া এবং নিজের পথে চলা বন্ধ করার অসাধারণ চিত্রায়ণ। “দেখা হলে কেউ হাত বাড়ায় না আজকাল, / সকলে কেমন খুব তাড়ায়, না, আজকাল?” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু ও শেষ হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে এক গভীর সত্য: আজকাল কেউ কারও জন্য দাঁড়ায় না, কেউ হাত বাড়ায় না, সবাই তাড়াহুড়ো করে। শ্রীজাত একজন জনপ্রিয় আধুনিক বাঙালি কবি ও গীতিকার। তাঁর কবিতায় নগরজীবন, একাকিত্ব, প্রেম, বিচ্ছেদ, সময়ের ক্ষয় ও আধুনিক সমাজের সম্পর্কহীনতা বিশেষভাবে ফুটে ওঠে। “দেখা হলে কেউ হাত বাড়ায় না” সেই ধারার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যেখানে তিনি বারবার ‘আজকাল’ শব্দটি ব্যবহার করে বর্তমান সময়ের শূন্যতা ও সম্পর্কের দূরত্ব চিহ্নিত করেছেন। শেষ পর্যন্ত নিজের নাম উল্লেখ করে বলেছেন — “শ্রীজাতও সেই পথ মাড়ায় না আজকাল” — অর্থ তিনিও এখন সেই উদাসীন, একা পথে চলেন না, অন্যরাও তাকে হাত বাড়ায় না।
শ্রীজাত: নগরজীবন, একাকিত্ব ও আধুনিক সমাজের কবি
শ্রীজাত আধুনিক বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নাম। তিনি কবি ও গীতিকার হিসেবে সমান জনপ্রিয়। তাঁর কবিতায় সহজ-সরল ভাষা, প্রাঞ্জল উপমা ও নগরমুখী চেতনা বিশেষভাবে চিহ্নিত। গীতিকার হিসেবে তিনি বাংলা সিনেমা ও আধুনিক গানে অসংখ্য হিট গান উপহার দিয়েছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে — ‘নির্বাচিত কবিতা’, ‘অবেলায় বৃষ্টি’, ‘শ্রীজাতের শ্রেষ্ঠ কবিতা’ প্রভৃতি।
শ্রীজাতের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো — নগরজীবনের একাকিত্ব ও নিঃসঙ্গতা, আধুনিক সমাজের সম্পর্কহীনতা, ‘আজকাল’ শব্দটি বারবার ব্যবহার করে সময়ের পরিবর্তন চিহ্নিত করা, ভাঙা মন, পাগল, গান ও শৈশবের বিলুপ্তি, কবি নিজের নাম ব্যবহার করে আত্ম-স্বীকারোক্তি। ‘দেখা হলে কেউ হাত বাড়ায় না’ সেই ধারার এক অসাধারণ উদাহরণ — যেখানে তিনি বারবার প্রশ্ন তুলেছেন — কেউ হাত বাড়ায় না? সবাই তাড়ায়? অপেক্ষা ছেড়ে এগোতে হয়? ভাঙা মন জট ছাড়ায় না? পাগলেও সাঁকো নাড়ায় না? শ্রীজাত নিজেও সেই পথ মাড়ায় না আজকাল।
দেখা হলে কেউ হাত বাড়ায় না: শিরোনামের তাৎপর্য ও কবিতার পটভূমি
শিরোনাম ‘দেখা হলে কেউ হাত বাড়ায় না’ অত্যন্ত সরল ও ব্যথিত। দেখা হলে স্বাভাবিক আচরণ হলো হাত বাড়ানো, শুভেচ্ছা বিনিময়। আজকাল কেউ হাত বাড়ায় না — সবাই তাড়াহুড়ো করে, কারও জন্য দাঁড়ায় না। এই এক শূন্য, ঠাণ্ডা ও যান্ত্রিক সম্পর্কের ছবি। কবি প্রশ্ন তুলেছেন — ‘না, আজকাল?’ পুনরাবৃত্তি টেনে এনেছেন। তারপর ধাপে ধাপে দেখিয়েছেন — ভাঙা মন, নিজের সুবিধে বোঝা যুগ, পাগলের সাঁকো না নাড়া, গান চলে যাওয়া, ছোটদের ঘুম পাড়ানো বন্ধ। শেষে শ্রীজাত নিজেও সেই পথে আর পা বাড়ান না। এটি এক নির্জন ও নির্মম আধুনিকতার প্রতিচ্ছবি।
দেখা হলে কেউ হাত বাড়ায় না: স্তবকভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ
প্রথম স্তবক: দেখা হলে কেউ হাত বাড়ায় না, সবাই তাড়ায়
“দেখা হলে কেউ হাত বাড়ায় না আজকাল, / সকলে কেমন খুব তাড়ায়, না, আজকাল?”
প্রথম স্তবকের গভীর বিশ্লেষণ: ‘দেখা হলে কেউ হাত বাড়ায় না আজকাল’ — মৌলিক পর্যবেক্ষণ। হাত বাড়ানো সম্পর্কের উষ্ণতা ও স্বাগতের প্রতীক। আজকাল তা নেই। ‘সকলে কেমন খুব তাড়ায়, না, আজকাল?’ — প্রশ্নটি ব্যঙ্গাত্মক ও যন্ত্রণাময়। ‘না, আজকাল?’ পুনরাবৃত্তি সময়ের পরিবর্তনে বিস্ময় প্রকাশ করে। সবাই তাড়াহুড়ো করে, কারও জন্য সময় নেই।
দ্বিতীয় স্তবক: অপেক্ষা ছেড়ে এগোতে হয়, কেউ দাঁড়ায় না
“অপেক্ষা ছেড়ে একাই এগোও সামনে, / কারওর জন্য কেউ দাঁড়ায় না আজকাল।”
দ্বিতীয় স্তবকের গভীর বিশ্লেষণ: ‘অপেক্ষা ছেড়ে একাই এগোও সামনে’ — পরামর্শ ও নিয়তি মিশে আছে। এখন আর কারও অপেক্ষা না করে একাই এগোতে হবে। ‘কারওর জন্য কেউ দাঁড়ায় না আজকাল’ — ব্যথিত সত্য। আগে মানুষ কারও জন্য দাঁড়াত, অপেক্ষা করত, আজকাল তা বিলুপ্ত।
তৃতীয় স্তবক: সে-ও নকশা বুনেছিল, ভাঙা মন জট ছাড়ায় না
“একদিন সে-ও বুনেছে কত-না নকশা… / ভাঙা মন কোনও জট ছাড়ায় না আজকাল।”
তৃতীয় স্তবকের গভীর বিশ্লেষণ: ‘একদিন সে-ও বুনেছে কত-না নকশা…’ — অতীতে সে-ও স্বপ্ন বুনেছে, পরিকল্পনা করেছে। বুনন/নকশা সৃজনশীলতা ও আশার প্রতীক। ‘ভাঙা মন কোনও জট ছাড়ায় না আজকাল’ — ‘জট ছাড়ানো’ মানে ছন্দ মেলানো, সম্পর্ক মেরামত করা বা মন ভালো করা। ভাঙা মন আজকাল কোনও জট ছাড়ায় না — অর্থ আশাহত, সম্পর্ক পুনরুদ্ধার হয় না।
চতুর্থ স্তবক: নিজের সুবিধে বোঝানো যুগ, পাগলেও সাঁকো না নাড়া
“নিজের সুবিধে বুঝিয়ে ছেড়েছে এই যুগ, / পাগলেও আর সাঁকো নাড়ায় না আজকাল।”
চতুর্থ স্তবকের গভীর বিশ্লেষণ: ‘নিজের সুবিধে বুঝিয়ে ছেড়েছে এই যুগ’ — স্বার্থপরতা ও হিসেবি যুগ। ‘পাগলেও আর সাঁকো নাড়ায় না আজকাল’ — অসাধারণ লাইন। পাগল/উন্মাদ মানুষকে সাঁকো নাড়ানোকে ব্যতিক্রমী ও নির্ভীক আচরণ বোঝাত। আজকাল পাগলেরাও আর সাঁকো নাড়ায় না — অর্থ ব্যতিক্রমী সাহস, পাগলামি, বিদ্রোহ সব বিলুপ্ত। সবাই মেনে নিয়েছে যুগের নিয়ম।
পঞ্চম স্তবক: গান চলে গেছে, ছোটদের ঘুম পাড়ানো বন্ধ
“গানগুলো কারা নিয়ে চলে গেছে দূর দেশ… / ছোটদেরও কেউ ঘুম পাড়ায় না আজকাল।”
পঞ্চম স্তবকের গভীর বিশ্লেষণ: ‘গানগুলো কারা নিয়ে চলে গেছে দূর দেশ’ — অনুভূতি, কবিতা, গান, শিল্প, আনন্দ সব চলে গেছে। ‘ছোটদেরও কেউ ঘুম পাড়ায় না আজকাল’ — শিশুদের আদরের গান, লালন-পালন ও কোলের উষ্ণতা বিলুপ্ত। মা বা বাবা কেউ ঘুম পাড়ায় না — সমাজের নিষ্ঠুরতা ও সময়ের অভাবের চূড়ান্ত চিহ্ন।
ষষ্ঠ স্তবক: জীবন ঘুরিয়ে মারা, আমিও বলি ‘না’
“জীবন আমাকে ঘুরিয়ে মেরেছে একদিন, / আমিও বলছি তার সাড়ায় ‘না’, আজকাল।”
ষষ্ঠ স্তবকের গভীর বিশ্লেষণ: ‘জীবন আমাকে ঘুরিয়ে মেরেছে একদিন’ — জীবন প্রতারণা করেছে, বিপরীত দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে। ‘আমিও বলছি তার সাড়ায় ‘না’, আজকাল’ — এখন তিনি জীবনকে ‘না’ বলছেন, অনুযোগ বা অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন। এটি আত্মরক্ষা ও শেষ মর্যাদার চিহ্ন।
সপ্তম স্তবক: অতীত ভুলে গেছে তার ডাকনাম, শ্রীজাত সেই পথ মাড়ায় না
“অতীত কবেই ভুলে গেছে তার ডাকনাম… / শ্রীজাতও সেই পথ মাড়ায় না আজকাল।”
সপ্তম স্তবকের গভীর বিশ্লেষণ: ‘অতীত কবেই ভুলে গেছে তার ডাকনাম…’ — স্মৃতি লোপ পেয়েছে, পুরনো দিনের ডাকনাম, স্নেহ সব মুছে গেছে। ‘শ্রীজাতও সেই পথ মাড়ায় না আজকাল’ — কবি নিজের নাম উল্লেখ করে জানান — তিনিও সেই পথে (সম্পর্কের উষ্ণ পথ? নাকি হাত বাড়ানোর পথ?) পা বাড়ান না। এক ধরণের আত্ম-বিদ্রূপ ও আত্মস্বীকারোক্তি।
অষ্টম স্তবক: প্রথম স্তবকের পুনরাবৃত্তি — চক্রবদ্ধ একাকিত্ব
“দেখা হলে কেউ হাত বাড়ায় না আজকাল, / সকলে কেমন খুব তাড়ায়, না, আজকাল?”
অষ্টম স্তবকের গভীর বিশ্লেষণ: প্রথম স্তবকের সম্পূর্ণ পুনরাবৃত্তি। বৃত্তাকার কাঠামো তৈরি করে। শুরু ও শেষ একই প্রশ্ন ও বেদনা ফিরে আসে। কোনো সমাধান নেই, কেবল হাহাকার।
কবিতার গঠনশৈলী, ছন্দ ও শিল্পরূপ
কবিতাটি আটটি স্তবকে বিভক্ত (প্রতি স্তবক দুই লাইনের)। ‘আজকাল’ শব্দটি প্রতিটি স্তবকের শেষ লাইনে এসেছে — একে ধ্বনির পুনরাবৃত্তি ও যুগ-সচেতনতা। প্রতীক ও চিহ্নের ব্যবহার অসাধারণ — ‘হাত বাড়ানো’ (সম্পর্ক ও উষ্ণতার প্রতীক), ‘তাড়ানো’ (সময়ের চাপ ও উদাসীনতা), ‘অপেক্ষা ছেড়ে এগোনো’ (অস্বাভাবিক আত্মকেন্দ্রিকতা), ‘নকশা বোনা’ (স্বপ্ন ও পরিকল্পনা), ‘ভাঙা মন ও জট ছাড়ানো’ (অচল সম্পর্ক), ‘নিজের সুবিধে বুঝিয়ে দেওয়া যুগ’ (স্বার্থপর সময়), ‘পাগলেও সাঁকো না নাড়া’ (বিদ্রোহ ও ব্যতিক্রমের মৃত্যু), ‘গান চলে যাওয়া’ (আনন্দের বিলুপ্তি), ‘ছোটদের ঘুম পাড়ানো বন্ধ’ (শিশু ও মাতৃত্বের অনুপস্থিতি), ‘জীবন ঘুরিয়ে মারা’ (ভাগ্যের প্রতারণা), ‘সাড়ায় না বলা’ (অস্বীকৃতি ও আত্মরক্ষা), ‘অতীতের ডাকনাম ভুলে যাওয়া’ (সম্পূর্ণ বিস্মৃতি), ‘শ্রীজাত সেই পথ মাড়ায় না’ (আত্ম-নির্বাসন ও একাকিত্ব)। ‘আজকাল’ শব্দটি প্রতি স্তবকের শেষ লাইনে এসেছে (সাতবার) — লেখকের যুগসচেতনতাকে ধারালো করেছে।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য ও দার্শনিক মাত্রা
“দেখা হলে কেউ হাত বাড়ায় না” শ্রীজাতের এক অসাধারণ সমসাময়িক একাকিত্বের কবিতা। আধুনিক সমাজে মানুষ সম্পর্কের মৌলিক আচারটুকুও ভুলে গেছে। দেখা হলে হাত বাড়ানো, কারও জন্য দাঁড়ানো, পাগলের সাঁকো নাড়ানো— সব প্রথা উঠে গেছে। শিশুরা ঘুম পাড়ানো গান শোনে না, অতীত নিজের ডাকনাম ভুলে গেছে এমনকি নিজেকেও যেন গ্রাস করেছে। শেষ পর্যন্ত কবি নিজের নামে স্বীকার করেন — তিনিও সেই পথ মাড়ান না, হাত বাড়ান না। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়: তাহলে কে হাত বাড়াবে?
শ্রীজাতের কবিতায় একাকিত্ব, সময়ের নিষ্ঠুরতা ও ‘আজকাল’
শ্রীজাতের ‘দেখা হলে কেউ হাত বাড়ায় না’ কবিতায় ‘আজকাল’ শব্দটি গদ্যের মতো বন্ধনীহীন, কিন্তু চরম প্রভাবশালী। ‘পাগলেও আর সাঁকো নাড়ায় না আজকাল’ স্মরণীয় লাইন। সবচেয়ে তীব্র ব্যক্তিগত স্বীকারোক্তি: ‘শ্রীজাতও সেই পথ মাড়ায় না’ — যেখানে কবি নিজের তৈরি কবিতাকে স্বয়ং ভাঙেন অথবা আত্মমর্যাদায় উদাসীন হয়ে পড়েন।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলা সাহিত্যের উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক পর্যায়ে শ্রীজাতের ‘দেখা হলে কেউ হাত বাড়ায় না’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত থাকার যোগ্য। শিক্ষার্থীরা এই কবিতা দ্বারা আধুনিক একাকিত্ব, ব্যষ্টিকরণ, যুগের শীতলতা, পুনরাবৃত্তির কৌশল, ‘আজকাল’ শব্দের ভূমিকা ও নগরজীবনের বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণা পায়।
দেখা হলে কেউ হাত বাড়ায় না সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: ‘দেখা হলে কেউ হাত বাড়ায় না’ কবিতাটির লেখক কে?
শ্রীজাত — জনপ্রিয় আধুনিক বাঙালি কবি ও গীতিকার।
প্রশ্ন ২: ‘পাগলেও আর সাঁকো নাড়ায় না আজকাল’ — লাইনটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
পাগল বা উন্মাদ মানুষের মনে পূর্বে এক ধরনের নির্ভীকতা ও ব্যতিক্রমী সত্তা ছিল, যা সাঁকো নাড়ানোর মাধ্যমে প্রকাশ পেত। আজকাল পাগলেরাও সাধ্যমতো ‘সামাজিক’ ও নিয়মমাফিক চলতে শিখেছে — বিদ্রোহ ও ব্যতিক্রমের বিলুপ্তি বোঝায়।
প্রশ্ন ৩: ‘ছোটদেরও কেউ ঘুম পাড়ায় না আজকাল’ — কেন?
শিশুরা আগে ঘুম পাড়ানোর গান, কোলের স্পর্শ পেত। এখন অভিভাবকরা ব্যস্ত, সময়হীন, যান্ত্রিক। ফলে শিশুরাও সেই উষ্ণতা পায় না, সমাজ আরও ঠাণ্ডা হয়েছে।
প্রশ্ন ৪: ‘জীবন আমাকে ঘুরিয়ে মেরেছে একদিন, / আমিও বলছি তার সাড়ায় ‘না’, আজকাল’ — কী বোঝালেন?
জীবন তাঁর সঙ্গে প্রতারণা করেছে, পরিকল্পনা ও আশা উল্টে দিয়েছে। এখন তিনি জীবনকে ‘না’ বলেন — সম্পৃক্ততার ‘না’, সাড়া না দেওয়ার ‘না’। এক ধরণের চূড়ান্ত হতাশা ও আত্মরক্ষার ঘোষণা।
প্রশ্ন ৫: ‘শ্রীজাতও সেই পথ মাড়ায় না আজকাল’ — ‘সেই পথ’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘সেই পথ’ হলো সম্পর্ক গড়ার পথ, কাউকে হাত বাড়ানোর পথ, নিঃস্বার্থভাবে দাঁড়ানোর পথ। শ্রীজাত (কবি নিজে) এখন সে পথে হাঁটেন না — অর্থ তিনি ইতিমধ্যেই সমাজের সেই নিষ্ঠুর অংশ হয়ে গেছেন।
প্রশ্ন ৬: প্রথম ও শেষ স্তবক একই কেন?
বৃত্তাকার কাঠামো তৈরি করে। শুরুতে প্রশ্ন করে শেষেও সেই একই প্রশ্ন ও বেদনা ফিরে আসে, কোনো সমাধান হয় না। একাকিত্ব ও সম্পর্কহীনতা এক চক্রের মতো ঘুরপাক খায়।
প্রশ্ন ৭: কবিতাটির মূল বার্তা কী?
আধুনিক সমাজে মানুষ যান্ত্রিক ও স্বার্থপর হয়ে গেছে। দেখা হলে হাত বাড়ানো না, কারও জন্য দাঁড়ানো না, পাগলের সাঁকো নাড়ানো বন্ধ, শিশুরা ঘুম পাড়ানো গান পায় না, কবি নিজেও সেই পথ মাড়ান না — সব মিলিয়ে এক নিঃসঙ্গ ও বিচ্ছিন্ন সভ্যতার চিত্র।
ট্যাগস: দেখা হলে কেউ হাত বাড়ায় না, শ্রীজাত, শ্রীজাতের সেরা কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, একাকিত্ব, নিঃসঙ্গতা, আধুনিক সমাজের শীতলতা, পাগলের সাঁকো নাড়া, ছোটদের ঘুম পাড়ানো, আজকাল
© Kobitarkhata.com – কবি: শ্রীজাত | কবিতার প্রথম লাইন: “দেখা হলে কেউ হাত বাড়ায় না আজকাল, / সকলে কেমন খুব তাড়ায়, না, আজকাল?” | একাকিত্ব ও আধুনিক সমাজের অসাধারণ কাব্যদর্শন | আধুনিক বাংলা কবিতার অনন্য নিদর্শন