একটা লোক
বেতস পাতার মতো রোগা
ধুলোর ভেতর দিয়ে হেঁটে চলেছেন।
আগুনের ভেতর দিয়ে হেঁটে চলেছেন।
ধ্বংসের ভেতর দিয়ে হেঁটে চলেছেন।
দা ও শাবল পেরিয়ে হেঁটে চলেছেন।
পোড়া হাঁড়ি ও ছাড়ানো ভাত পার হয়ে হেঁটে চলেছেন।
একটা পিঁপড়ে এসে তা৺কে বলল :
আমাকে মারতে মারতে মারতে মারতে
ওরা ছোট করে ফেলেছে,
আমি এত ছোট ছিলাম না।
রোগা লোকটা পিঁপড়েকে হাতে তুলে নিলেন
পিঁপড়ে এত ছোট যে আদর করা যায় না
কিন্তু হাতে নিতেই সে হয়ে গেল কাঠবিড়ালি
তারপর লাফাতে লাফাতে সে মিলিয়ে গেল ভারতবর্ষে।
ও কি পিঁপড়ে না নোয়াখালি?
ও কি পিঁপড়ে না বেলেঘাটা?
লোকটা ধুলোর ভেতর দিয়ে চলেছেন।
আফ্রিকা পার হয়ে হেঁটে চলেছেন।
আমেরিকা পার হয়ে হেঁটে চলেছেন।
বিহার পার হয়ে হেঁটে চলেছেন।
হাঁটতে হাঁটতে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে গেলেন।
এক মিনিট বাদে আবার উঠে দাঁড়ালেন
তারপর আবার শুরু করলেন হাঁটতে।
সারা পৃথিবীর ওপর দিয়ে তিনি আজ হেঁটে চলেছেন।
এ ভাবে হাঁটতে আর কাউকে দেখিনি।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। সুবোধ সরকারের কবিতা।
কবিতার কথা –
সুবোধ সরকারের ‘একটা লোক’ কবিতাটি বিশ্বশান্তির প্রতীক, অহিংসার প্রতিমূর্তি মহাত্মা গান্ধীর জীবনদর্শন, আত্মিক শক্তি এবং অমরতার ওপর রচিত এক অসাধারণ ও রূপকভিত্তিক আধুনিক আখ্যান। কবি অত্যন্ত নিপুণভাবে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও আন্তর্জাতিক ক্যানভাসকে এক সুদৃঢ় কাব্যিক বুননে ফুটিয়ে তুলেছেন।
কবিতার প্রথমাংশে এক কৃশ ও শীর্ণকায় অথচ আত্মশক্তিতে বলীয়ান পথিকের ছবি ফুটে ওঠে। “বেতস পাতার মতো রোগা” সেই লোকটি কোনো সাধারণ পথিক নন; তিনি মহাত্মা গান্ধী, যিনি দেশভাগের সময় দাঙ্গা, হিংসা, ধ্বংস আর অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির মধ্য দিয়েও অবিচলভাবে হেঁটে চলেছিলেন। দা, শাবল, পোড়া হাঁড়ি ও ছড়ানো ভাতের রূপকে কবি দেশভাগের করুণ ও রক্তাক্ত সামাজিক বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন। সেই ধ্বংসস্তূপ ও ধূলির মধ্য দিয়েই তাঁর শান্তির পদযাত্রা অব্যাহত ছিল।
কবিতাটিতে নিপীড়িত মানুষের রূপক হিসেবে এসে হাজির হয় একটি ‘পিঁপড়ে’। দাঙ্গা ও রাষ্ট্রীয় হিংসার চাপে সাধারণ নির্যাতিত মানুষ কীভাবে নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ক্রমশ তুচ্ছ ও ছোট হয়ে পড়েছে, পিঁপড়ের সংলাপে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে—”আমাকে মারতে মারতে মারতে মারতে / ওরা ছোট করে ফেলেছে”। কিন্তু গান্ধীজির অহিংসার সেই মহতী ছোঁয়ায় এবং ভালোবাসার আশ্রয়ে ক্ষুদ্র পিঁপড়েটি নিমেষেই কাঠবিড়ালিতে পরিণত হয় এবং আশার বার্তা নিয়ে ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ে। কবি নোয়াখালী কিংবা বেলেঘাটার মতো রক্তাক্ত দাঙ্গাকবলিত অঞ্চলের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বোঝান যে, হিংসা মানুষকে তুচ্ছ করে আর ভালোবাসা তাকে পুনরায় সঞ্জীবিত করে।
কবিতার শেষাংশে গান্ধীর পদযাত্রা কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় আটকে থাকে না। ভারতবর্ষ পেরিয়ে তা ছড়িয়ে পড়ে আফ্রিকা, আমেরিকা, বিহার কিংবা বিশ্বমানবের প্রতিটি কোণায়। ঘাতকের গুলিতে তিনি ঢলে পড়লেও, তাঁর চিন্তা, নীতি ও আদর্শকে কখনো হত্যা করা সম্ভব হয়নি। তাই গুলিবিদ্ধ হওয়ার “এক মিনিট বাদে আবার উঠে দাঁড়িয়ে” তিনি পথ চলতে শুরু করেন। কবি সুবোধ সরকার এখানে অত্যন্ত গভীর এক দর্শনে উপনীত হয়েছেন—মহাত্মা গান্ধী কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি সত্য ও অহিংসার এক অবিনশ্বর প্রতীক; যার মানবতাবাদী পদযাত্রা বিশ্বজুড়ে অনাদিকাল ধরে অব্যাহত থাকবে।
একটা লোক – সুবোধ সরকার | হাঁটতে থাকা প্রতিরোধের কবিতা
একটা লোক: ধুলো, আগুন ও ধ্বংসের ভেতর দিয়ে হাঁটা
সুবোধ সরকারের একটা লোক কবিতাটি শুরু হয় এক অনন্য চিত্র দিয়ে — “একটা লোক, বেতস পাতার মতো রোগা, ধুলোর ভেতর দিয়ে হেঁটে চলেছেন।” এই লোক শুধু হাঁটছেন না — তিনি আগুনের ভেতর দিয়ে, ধ্বংসের ভেতর দিয়ে, দা ও শাবল পেরিয়ে, পোড়া হাঁড়ি ও ছাড়ানো ভাত পার হয়ে হেঁটে চলেছেন। এই হাঁটা কোনো সাধারণ যাত্রা নয় — এটি প্রতিরোধের, অস্তিত্বের, অমরতার যাত্রা।
পোড়া হাঁড়ি ও ছাড়ানো ভাত: দারিদ্র্যের ভূগোল
কবিতার সবচেয়ে ব্যথিত চিত্র — “পোড়া হাঁড়ি ও ছাড়ানো ভাত পার হয়ে হেঁটে চলেছেন।” এখানে হাঁড়ি রান্নার পাত্র, ভাত খাদ্য — কিন্তু পোড়া, ছাড়ানো, পরিত্যক্ত। এই একটি লাইনেই দারিদ্র্যের সম্পূর্ণ ভূগোল ধরা পড়ে — যেখানে খাদ্যও ফেলে দেওয়া, যেখানে পাত্রও পোড়া। লোকটি এই দারিদ্র্যের ভেতর দিয়েই হাঁটছেন, থামছেন না।
পিঁপড়ের আত্মকথা: ‘আমি এত ছোট ছিলাম না’
কবিতার কেন্দ্রীয় রূপক হলো পিঁপড়ে। “আমাকে মারতে মারতে মারতে মারতে ওরা ছোট করে ফেলেছে, আমি এত ছোট ছিলাম না।” পিঁপড়ে এখানে নিপীড়িত মানুষের প্রতীক — যাকে বারবার আঘাত করে ছোট করে ফেলা হয়েছে। কিন্তু তার মূল সত্তা ছোট ছিল না — সমাজ, রাষ্ট্র, ইতিহাস তাকে ছোট বানিয়েছে। এই স্বীকারোক্তি আজকের বিশ্বের সব নিপীড়িত জাতির কথা বলে।
পিঁপড়ে থেকে কাঠবিড়ালি: রূপান্তরের জাদু
রোগা লোকটি পিঁপড়েকে হাতে তুলে নিলেন — “পিঁপড়ে এত ছোট যে আদর করা যায় না, কিন্তু হাতে নিতেই সে হয়ে গেল কাঠবিড়ালি।” এই রূপান্তরটি অসাধারণ। পিঁপড়ে — সবচেয়ে ছোট, সবচেয়ে উপেক্ষিত। কাঠবিড়ালি — চঞ্চল, প্রাণবন্ত, মুক্ত। স্পর্শ করলেই সেই ছোট্ট পিঁপড়ে কাঠবিড়ালি হয়ে যায়, তারপর লাফাতে লাফাতে মিলিয়ে যায় ভারতবর্ষে। অর্থাৎ নিপীড়িত মানুষের ভেতরে লুকিয়ে আছে বিপুল শক্তি — শুধু স্পর্শ দরকার, শুধু স্বীকৃতি দরকার।
নোয়াখালি ও বেলেঘাটা: পিঁপড়ের ভূগোল
“ও কি পিঁপড়ে না নোয়াখালি? ও কি পিঁপড়ে না বেলেঘাটা?” — এই দুই প্রশ্নে কবি দেখান, পিঁপড়েটি কোনো একটি জায়গার নয়, সে是所有 নিপীড়িত মানুষের প্রতীক। নোয়াখালি — বাংলাদেশের এক জেলা, যেখানে ইতিহাসে গণহত্যা হয়েছে। বেলেঘাটা — কলকাতার এক অঞ্চল, যেখানে শ্রমজীবী মানুষ থাকে। পিঁপড়ে সবার — সে সীমান্ত মানে না, সে ভূগোল মানে না।
গুলি খেয়ে আবার উঠে দাঁড়ানো: অমর প্রতিরোধ
“হাঁটতে হাঁটতে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে গেলেন। এক মিনিট বাদে আবার উঠে দাঁড়ালেন। তারপর আবার শুরু করলেন হাঁটতে।” — এই চিত্রটি চে গুয়েভারার, ভগত সিংয়ের, সব বিপ্লবীর চিত্র। গুলি তাকে থামাতে পারে না — এক মিনিট পরেই সে আবার উঠে দাঁড়ায়। সারা পৃথিবীর ওপর দিয়ে তিনি হেঁটে চলেছেন — থামেন না, কেউ তাকে থামাতে পারে না।
হাঁটার দর্শন: সুবোধ সরকারের রাজনৈতিক ভূগোল
এই কবিতায় হাঁটা একটি দার্শনিক কাজ। আফ্রিকা, আমেরিকা, বিহার — সব পার হয়ে তিনি হাঁটছেন। হাঁটা মানে এগিয়ে যাওয়া, হাঁটা মানে প্রতিবাদ, হাঁটা মানে অস্তিত্ব। যারা হাঁটে, তারা পরাজিত হয় না। যারা হাঁটে, তারা হারায় না। সেই কারণেই শেষ লাইন — “এ ভাবে হাঁটতে আর কাউকে দেখিনি।”
ট্যাগস: একটা লোক, সুবোধ সরকার, হাঁটার কবিতা, পিঁপড়ের রূপান্তর, নোয়াখালি, বেলেঘাটা, রাজনৈতিক কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা
© Kobitarkhata.com – কবি: সুবোধ সরকার | “একটা লোক, বেতস পাতার মতো রোগা, ধুলোর ভেতর দিয়ে হেঁটে চলেছেন” | ধ্বংস, রূপান্তর ও অমর প্রতিরোধের কাব্য