মায়ের চিঠি – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।

কাল সারা রাত ধরে তুষারপাত, তিন ফুট
গ্যারাজ থেকে গাড়ি বার করতে…
কফি ফুরিয়ে গেছে, শিট! আগে খেয়াল হয়নি
কাচের জানলার বাইরে পাতাহীন গাছের ডালে
থোকা থোকা বরফ, জাপানি ছবি
দেখলেই ভুরু কুঁচকে যায়, আজ আবার?
গরম লাগছে, মিলির বড্ড বাতিক, এতখানি হিটিং
টি ব্যাগ, জল ফুটছে, হোয়ার দ্যা হেল ইজ সুগার?
অজস্র জাঙ্ক মেইল, একটা শুধু বাড়ি মর্টগেজের
ওঃ হো, আর একখানা, মায়ের বাংলা চিঠি
মাকে একটা কমপিউটার…বারাসতে প্রায়ই লোড শেডিং
দেশটা দিন দিন উচ্ছন্নে যাচ্ছে,
রাস্তায় কেউ চাপা পড়লেই বনধ ডাকে
ই-মেইলে বাংলা চালু হয়নি
প্রত্যেক সপ্তাহেই তো তোমাকে টেলিফোন করি, মা, তবু
কেন চিঠি লেখো?
বাংলা হাতের লেখা আমি ভুলেই গেছি

খালি পেটে দিনের প্রথম সিগারেট
থ্যাঙ্ক ইউ ফর নট স্মোকিং, মিলি বাড়িতে নেই
গাড়িটা বদলাতে হবে, আবার ব্যাঙ্ক লোন
ফ্রিজ প্রায় খালি, বাজার করা হয়নি উইক এন্ডে
টুথ পেস্টও শেষ, যা খুঁজবে কিছুই পাওয়া যাবে না,
ওয়ান অফ দোজ ডেইজ
ঘড়ির কাঁটা দৌড়াচ্ছে, শিট, এখনো স্নান হয়নি
আর একটু দেরি হলেই জ্যামে পড়তে হবে,
বাম্পার টু বাম্পার, টেলিফোন বাজছে, বাজুক,
আনসারিং মেশিনে…মিলি শিকাগোয়, প্রিয়তোষের সঙ্গে
একটু প্রেম করতে চায় তো করুক
দুখানা টোস্ট, মার্মালেডও তেতো লাগছে, আর একটা মোজা
কোথায়?
ড্যাম ইট! আজই বসের বাড়িতে ডিনার, মনে আছে? ড্যাম ইট!
আমি কাঁদছি? ক্যান ইউ বিট ইট, আমি কাঁদছি? ড্যাম ইট!
যদি আজ অফিস না যাই, সারা দিন, সন্ধে, রাত্তির একলা একলা কাটাই?
মা, আজ আমি ঠিক তোমায় বাংলায় চিঠি লিখব!

আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতা।

কবিতার কথা –

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘মায়ের চিঠি’ কবিতাটি প্রবাসী আধুনিক মানুষের যান্ত্রিক জীবন, পাশ্চাত্যের চরম ব্যস্ততা এবং তার সমান্তরালে মাতৃভূমি ও শিকড়ের প্রতি গোপন আত্মিক আকুতির এক অতুলনীয় ও প্রগাঢ় চিত্রায়ণ। আধুনিক কাব্যভাষার সাথে ইংরেজি বাক্যাংশ ও দৈনন্দিন প্রবাসজীবনের চিত্রকল্প বুনে কবি এখানে অস্তিত্বের চরম বিভ্রান্তি ও আত্মিক জাগরণকে ফুটিয়ে তুলেছেন।

কবিতার প্রথমাংশে প্রবাসজীবনের এক অতি চেনা ও রুটিনবান্ধা সকালের বাস্তব চিত্র ফুটে ওঠে। কাচের জানালার বাইরে তিন ফুট জমা বরফ, পাতাহীন গাছের ডাল, কফি ফুরিয়ে যাওয়ার বিরক্তি, অতিরিক্ত হিটিং কিংবা ব্যাগ থেকে চা তৈরির যান্ত্রিক আয়োজনের মাঝে উঁকি দেয় প্রবাসে থাকা এক বাঙালি তরুণের বিচ্ছিন্ন জীবন। জাঙ্ক মেইলের পাহাড় ও মর্টগেজের ভিড়ে হঠাৎ সে খুঁজে পায় দেশ থেকে পাঠানো মায়ের একখানা বাংলা চিঠি। চিঠিটি হাতে পেয়েই তার আধুনিক মগজে ভেসে ওঠে প্রথাগত অনুযোগ—”ই-মেইলে বাংলা চালু হয়নি”, কিংবা মাকে একটা কম্পিউটার কিনে দিলে কেমন হয়! দেশ নিয়ে প্রবাসীর সেই চেনা আক্ষেপ—বারাসতে লোডশেডিং, উচ্ছন্নে যাওয়া দেশ আর ধর্মঘটের জটলা। প্রতি সপ্তাহে ফোনে কথা হওয়া সত্ত্বেও মায়ের এই চিঠি লেখা আর তা পড়ার মতো সময় বা অভ্যাসের অভাব তাকে বিরক্ত করে; সে যেন বাংলা হাতের লেখাও ভুলতে বসেছে।

কবিতার মধ্যভাগে আধুনিক নগরজীবনের তীব্র ব্যস্ততা, সম্পর্কের শিথিলতা ও একাকিত্বকে কবি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। খালি পেটে প্রথম সিগারেট, ফ্রিজ খালি থাকা, ব্যাংকের লোন, যানজটের ভয় আর আনসারিং মেশিনে অবহেলিত টেলিফোনের শব্দ—সব মিলিয়ে এক চরম বিশৃঙ্খল দিন (“ওয়ান অফ দোজ ডেইজ”)। এমনকি ব্যক্তিগত সম্পর্কের জায়গাতেও এক গভীর উদাসীনতা ও শূন্যতা; স্ত্রী মিলি শিকাগোয় প্রিয়তোষের সাথে প্রেম করতে গেছে জেনেও তরুণের মনে কোনো উত্তাপ নেই। বসের বাড়ির ডিনার আর মোজা খুঁজে না পাওয়ার মতো তুচ্ছ যান্ত্রিক জটিলতার মাঝে হঠাৎই নেমে আসে সেই অলৌকিক মুহূর্ত।

একদম শেষ চরণে এসে প্রবাস জীবনের সেই জমাট বাঁধা কৃত্রিমতা আর যান্ত্রিকতার বরফ গলে জল হয়ে যায়। সবকিছুর মাঝে হঠাৎ নিজেকে কাঁদতে দেখে তরুণ নিজেই যেন হতবাক হয়—“আমি কাঁদছি? ক্যান ইউ বিট ইট, আমি কাঁদছি?”। মায়ের সেই একখানা চিঠি তার প্রথাগত জীবনের সমস্ত হিসাব-নিকাশ উল্টে দেয়। ব্যস্ততা, বসের ডিনার আর প্রবাসের সমস্ত বাধ্যবাধকতা একপাশে সরিয়ে রেখে সে সিদ্ধান্ত নেয় আজ সে অফিসে যাবে না, সারা দিন একলা কাটাবে। মায়ের ভালোবাসার এই অদৃশ্য টানে তার ভেতরের হারিয়ে যাওয়া শিকড় আবার জেগে ওঠে এবং সে ব্যাকুলভাবে ঘোষণা করে—“মা, আজ আমি ঠিক তোমায় বাংলায় চিঠি লিখব!”। এইভাবে কবিতাটি আধুনিক মানুষের যান্ত্রিকতার খোলস ভেঙে ভালোবাসার মূল শিকড়ে ফিরে আসার এক চিরন্তন কাব্যিক বিজয়গাথায় পরিণত হয়।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x