এসো সাকি, এসো, রেখো না বসিয়ে
হাতে হাতে দাও ভর্তি পেয়ালা ;
আগে ভাবতাম প্রেম কী সহজ,
আজ দেখি তাতে কী বিষম জ্বালা ।
খোঁপা থেকে মৃগনাভির সুরভি
ভেসে এসেছিল ভোরের হাওয়ায়
চমকানো তার চূর্ণ অলক
হৃদয়ে রক্তগঙ্গা বহায় ।
প্রানবঁধুয়ার পান্থশালায়
এ সুখশান্তি কদিনের বলো !
দিনরাত খালি বাজছে ঘন্টা :
‘গোটাও তোমার পাততাড়ি, চলো !’
কী ঘোর রাত্রি, কী ভীষন ঢেউ,
রসাতলে টানা ঘূর্ণী এমন –
কী করে জানবে শুকনো ডাঙ্গায়
ঝাড়া হাত-পায় যে করে ভ্রমন !
বুড়ো মাজি বলে, নমাজ পড়ার
আসনে ছুটুক মদের ফোয়ারা ;
সদগুরু নয় অজ্ঞ, সে জানে
সঠিক লক্ষ্যে চলবার ধারা ।
পরিনামে রটে নিন্দে, কারণ
যা করেছি শুধু নিজেরই জন্য;
সে রহস্য থাকে গোপন কিভাবে
জানাজানি হলে এ জনারণ্যে !
হাফিজ, চাও কি তার দর্শন ?
করো না নিজেকে আড়াল তাহলে ;
দেখা দিলে প্রিয়া, এই জগৎটা
ভুলে যেয়ো তুমি, ছেড়ে যেয়ো চলে ।।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা।
কবিতার কথা –
সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘প্রেম সহজ না’ কবিতাটি পারস্যের প্রখ্যাত সুফি কবি হাফিজের মূল গজল থেকে অনুদিত ও রূপান্তরিত এক অনবদ্য সৃষ্টি। প্রেম যে কেবল একটি সহজ অনুভূতির নাম নয়, বরং তা যে এক তীব্র আত্মিক দহন, বিরহ, ঝুঁকি এবং লৌকিক সমাজের বিরুদ্ধে গিয়ে আত্মত্যাগের পরম সাধনা—কবি এখানে হাফিজের ভাবের সাথে বাঙালি কাব্যাঙ্গিকের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন।
কবিতার শুরুতে মদের পেয়ালা বা সাখির আহ্বান দিয়ে সুফিবাদের এক চেনা রূপক হাজির করা হয়েছে। প্রথমে প্রেমের সরল অনুভূতির কথা ভাবলেও কবি দ্রুতই টের পান তার ভেতরের বিষম জ্বালা ও অস্থিরতা। প্রিয়তমার খোঁপার সুবাস কিংবা অলকের চমক কেবল মনকে ব্যাকুলই করে না, বরং তা হৃদয়ে এক প্রকার রক্তগঙ্গা বা তোলপাড় সৃষ্টি করে। পার্থিব এই সুখ-শান্তি অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী, কারণ প্রতিনিয়ত সময়ের ঘণ্টা বেজে চলেছে এবং এই নশ্বর জগত ছেড়ে চলে যাওয়ার ডাক আসছে।
কবিতাটিতে প্রেমের গভীরতা ও দুর্গম পথকে এক উত্তাল সমুদ্র ও ঘূর্ণির সাথে তুলনা করা হয়েছে। শুকনো ডাঙায় শান্তিতে বসবাসকারী সাধারণ মানুষ যেমন ঝোড়ো সমুদ্রের বিপজ্জনক ঢেউ ও ঘূর্ণির ভয়াবহতা বুঝতে পারে না, তেমনি ভালোবাসার আত্মিক গভীরতায় না ডোবা পর্যন্ত কেউ প্রেমের আসল যন্ত্রণা বুঝতে সক্ষম হয় না। এ প্রসঙ্গে পীরের আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনার রূপকে মদের ফোয়ারার কথা বলা হয়েছে—যা প্রথাগত সমাজ সংস্কারকে ভেঙে প্রেমের পরম লক্ষ্য অর্জনের এক গভীর ইশারা প্রদান করে।
কবিতার শেষাংশে প্রেম ও সুফি দর্শনের মূল সুরটি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভালোবাসায় আত্মকেন্দ্রিকতা বা ব্যক্তিগত অনুভূতির গোপনীয়তা যখন জনারণ্যে জানাজানি হয়ে যায়, তখন সমাজের কটূক্তি ও নিন্দা কুড়াতে হয়। কবি হাফিজের উদ্দেশ্যে পরম সত্যকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন—যদি প্রিয়তম বা পরম সত্তার দর্শন লাভ করতে হয়, তবে অহং ও আত্মপরিচয়ের সব আড়াল সরিয়ে দিতে হবে। প্রিয়তমের উপস্থিতি পাওয়ার সাথে সাথে এই নশ্বর জগতকে ভুলে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে সঁপে দেওয়াই হলো প্রেমের পরম সিদ্ধি।
প্রেম সহজ না – সুভাষ মুখোপাধ্যায় | সাকি, দহন ও ঘূর্ণীর কবিতা
সাকি কেন? সুফি রূপকের ভেতর দিয়ে প্রেমের দহন
সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের প্রেম সহজ না কবিতাটি শুরু হয় সুফি ঐতিহ্যের এক চিরন্তন আহ্বান দিয়ে — “এসো সাকি, এসো, রেখো না বসিয়ে, হাতে হাতে দাও ভর্তি পেয়ালা।” সাকি মানে পানপাত্র-বিতরণকারী, যিনি সুফি কবিতায় প্রায়ই ঈশ্বর বা গুরুর প্রতীক। কবি সাকির কাছে মদ চাইছেন, কারণ তিনি বুঝতে পেরেছেন — প্রেম সহজ নয়, প্রেমে “কী বিষম জ্বালা।” এই কবিতাটি ভালোবাসার জ্বালা, দহন ও আত্মবিলোপের এক অনন্য কাব্য।
মৃগনাভির সুরভি ও রক্তগঙ্গা: প্রেমের প্রথম আঘাত
“খোঁপা থেকে মৃগনাভির সুরভি ভেসে এসেছিল ভোরের হাওয়ায়, চমকানো তার চূর্ণ অলক, হৃদয়ে রক্তগঙ্গা বহায়।” মৃগনাভি হলো কস্তুরীর সুগন্ধি — যা প্রিয়জনের চুল থেকে ভেসে আসে। কিন্তু সেই সুগন্ধি হৃদয়ে বহায় রক্তগঙ্গা — প্রেমের প্রথম আঘাতেই রক্ত প্রবাহ। অর্থাৎ প্রেমের সৌন্দর্য ও যন্ত্রণা একসঙ্গে আসে। ভোরের হাওয়া মিষ্টি, কিন্তু হৃদয়ের ভেতরে ঝড়।
পান্থশালা ও ঘন্টার ডাক: প্রেমে স্থিতি নেই
“প্রানবঁধুয়ার পান্থশালায় এ সুখশান্তি কদিনের বলো! দিনরাত খালি বাজছে ঘন্টা: ‘গোটাও তোমার পাততাড়ি, চলো!’” পান্থশালা মানে পথিকের বিশ্রামগৃহ — যেখানে যাত্রীরা ক্ষণিকের জন্য থামে। প্রেমকে কবি এখানে পান্থশালার সঙ্গে তুলনা করছেন — যেখানে সুখশান্তি স্থায়ী নয়, দিনরাত বাজে ঘন্টা, যাত্রা চালিয়ে যেতে হয়। প্রেম মানে থেমে থাকা নয়, প্রেম মানে চলতে থাকা।
ঘূর্ণী ও রসাতল: শুকনো ডাঙার মানুষ কী করে বুঝবে
“কী ঘোর রাত্রি, কী ভীষণ ঢেউ, রসাতলে টানা ঘূর্ণী এমন — কী করে জানবে শুকনো ডাঙায় ঝাড়া হাত-পায় যে করে ভ্রমন!” প্রেমের অভিজ্ঞতা ঘোর রাত্রির, ভীষণ ঢেউয়ের, রসাতলে টানা ঘূর্ণীর মতো। যিনি কখনও সমুদ্রে ঝাঁপ দেননি, যিনি শুকনো ডাঙায় দাঁড়িয়ে আছেন — তিনি কী করে বুঝবেন সাঁতার কাটার কষ্ট? প্রেমের যন্ত্রণা শুধু প্রেমিকই বোঝে, বাইরের মানুষ বোঝে না।
বুড়ো মাজি ও নমাজের আসন: আধ্যাত্মিক প্রেমের ইঙ্গিত
“বুড়ো মাজি বলে, নমাজ পড়ার আসনে ছুটুক মদের ফোয়ারা; সদগুরু নয় অজ্ঞ, সে জানে সঠিক লক্ষ্যে চলবার ধারা।” মাজি মানে নৌকার মাঝি — অভিজ্ঞ পথপ্রদর্শক। তিনি বলছেন, নমাজের আসনেও মদের ফোয়ারা ছুটুক — অর্থাৎ আধ্যাত্মিক সাধনাও প্রেমের দহন ছাড়া সম্পূর্ণ নয়। সুফি ঐতিহ্যে মদ ও প্রেম একসঙ্গে মেশে — যেখানে পেয়ালা মানে ঐশ্বরিক প্রেমের পাত্র।
হাফিজের প্রতি সম্বোধন: শেষ উপদেশ
“হাফিজ, চাও কি তার দর্শন? করো না নিজেকে আড়াল তাহলে; দেখা দিলে প্রিয়া, এই জগৎটা ভুলে যেয়ো তুমি, ছেড়ে যেয়ো চলে।” হাফিজ ছিলেন পারস্যের বিখ্যাত সুফি কবি, প্রেম ও মদের কবি। কবি হাফিজকে সম্বোধন করে বলছেন — প্রিয়ার দর্শন পেতে হলে আত্মগোপন করো না। প্রিয়া যখন দেখা দেয়, তখন এই জগৎ ভুলে যেতে হয়, ছেড়ে চলে যেতে হয়। প্রেম মানে জগৎ ত্যাগ, প্রেম মানে আত্মবিলোপ।
প্রেম সহজ না: কবিতার দার্শনিক সারাংশ
এই কবিতার মূল বার্তা — প্রেম কখনও সহজ নয়। প্রেম মানে দহন, প্রেম মানে ঘূর্ণী, প্রেম মানে পান্থশালার ঘণ্টা, প্রেম মানে আত্মহারা হওয়া। সুভাষ মুখোপাধ্যায় সুফি রূপকের ভেতর দিয়ে প্রেমকে আধ্যাত্মিক স্তরে নিয়ে গেছেন — যেখানে প্রেম শুধু দুটি মানুষের মিলন নয়, প্রেম হলো আত্মার যাত্রা।
ট্যাগস: প্রেম সহজ না, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সাকি ও প্রেমের কবিতা, সুফি রূপক, হাফিজ, পান্থশালা, আধুনিক বাংলা কবিতা
© Kobitarkhata.com – কবি: সুভাষ মুখোপাধ্যায় | “এসো সাকি, এসো, রেখো না বসিয়ে” | প্রেম, দহন ও ঘূর্ণীর অসাধারণ কাব্য