পাগলামী করিসনে বন্ধু সুধাংশু
সময় যে পার হয়ে যাচ্ছে
এবার যে তোর পালানোর বেলা
জিদ করিসনে বন্ধু, এখনই তুই পালা।
জানি তুই কী ভাবছিস বন্ধু সুধাংশু
দাঁড়িয়ে হাহাকারের ছোঁয়ায় জড়ানো শ্মশানসম বাস্তুভিটায়
সেই হারিয়ে যাওয়া প্রাণচঞ্চল দিনগুলো, আমাদের ছেলেবেলা
কিন্তু এবার যে তোর পালানোর বেলা, এবার তুই পালা।
আমি জানি নির্বাক দাঁড়িয়ে তুই কী ভাবছিস বন্ধু সুধাংশু,
সেই একপাল বন্ধুগুলো-রামী, শেপু, কাকলী আরও অনেকে
প্রাণময় কোলাহলে কাটিয়েছি সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা বেলা,
কিন্তু এবার যে তোকে পালাতে হবে, এবার তুই পালা।
আমি বুঝি তোর শঙ্কা আগামী বিরহ বেদনার বন্ধু সুধাংশু,
আড়াই যুগ ধরে তিলে তিলে গড়ে উঠা আত্মার সম্পর্ক,
এই বাস্তুভিটার সাথে আর একঝাঁক বন্ধুর ভালবাসা প্রাণঢালা,
কিন্তু এবার যে তোকে পালাতে হবে, এবার তুই পালা।
কোথায় সেই কল-কাকলীতে মুখরিত সবুজ সুন্দর কাপালী-ভিটাটি বন্ধু সুধাংশু?
দু’টি জীর্ণ-শীর্ণ ঘর চির-দুঃখীর মতো দাঁড়িয়ে আছে আজ সেই কাপালী ভিটায়,
কোথায় সেই রামী, শেপু, কাকলী আরও সেই প্রিয় বন্ধুগুলা?
ওরা যে সবাই পালিয়েছে, এবার তোর পালা।
তুই কি জানিস বন্ধু সুধাংশু
তোর বিদায়ে ভীষণ ব্যথা পাবে আমার ঐ ছ’বছরের অবুঝ বোনটি ‘নেহা’?
কাটাবে কত সন্ধ্যা অধীর প্রত্যাশায়?
সুধাংশু ভাইকে জড়িয়ে ধরবে, কোথায় চকলেটগুলা?
তবুও তোকে পালাতে হবে যে, এবার তুই পালা।
আরও জানি বন্ধু সুধাংশু
তোর ষোড়শী বোনটি ‘মিলা’ দুষ্টামির ছলে আর বলতে পারবেনা,
আলমদা তুমি এত কৃপণ কেন?
চলো মেলায় নিয়ে, কিনে দিতে হবে সুন্দর একটি মালা।
তথাপি তোকে পালাতে যে হবে, এবার তুই পালা।
তোকে যে বলা হয় নি বন্ধু সুধাংশু
মিলা’র সহপাঠী আমার ভাইটি ‘রিপন’ বলছিল সেদিন,
ভাইয়া মিলা’টা যা সুন্দর হয়েছে না!
বলে দিয়েছি ওকে, সুন্দরী মেধাবী মিলা বিশ্ব জয় করবে,
তোর মতো গর্দভটি ওর দিকে তাকাবে না।
তোর হাতে যে সময় নেই বন্ধু, এবার তুই পালা।
মিলাকে যে বিশ্ব জয় করতেই হবে বন্ধু সুধাংশু,
অসাধারণ সুন্দরী মেধাবী মিলার জন্য এক ধর্ষিত, অচ্ছুৎ, অভাগী নারীর জীবন,
হবে মানবতার জন্য এক অমার্জনীয় ব্যর্থতা,
তাই আমার কাতর মিনতি বন্ধু, এখনই তুই পালা।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। শামসুর রাহমানের কবিতা।
কবিতার কথা –
শামসুর রাহমানের ‘সুধাংশু যাবে না’ কবিতাটি দেশভাগ-পরবর্তী বাস্তবতা, সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা এবং শেকড় উপড়ে ফেলার মর্মান্তিক যন্ত্রণাকে কেন্দ্র করে রচিত এক অতি সংবেদনশীল ও দরদি আখ্যান। দীর্ঘদিনের প্রতিবেশী, বন্ধু ও আতঙ্কের মুখে দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়া সংখ্যালঘু পরিবারের করুণ বাস্তবতা কবি এখানে ‘সুধাংশু’ নামক এক বন্ধুর প্রতি এক মুসলমান বন্ধুর কাতর আকুতির মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন।
কবিতাটির মূল কথক বন্ধু ‘আলম’ তার শৈশবের খেলার সাথী সুধাংশুকে বারবার তাগিদ দিচ্ছে ভিটেমাটি ছেড়ে নিরাপদে পালিয়ে যাওয়ার জন্য। আড়াই যুগ ধরে গড়ে ওঠা আত্মিক টান, রামী, শেপু, কাকলীদের সাথে কাটানো রঙিন শৈশব আর কাপালী-ভিটার ভালোবাসার স্মৃতি আঁকড়ে সুধাংশু নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে তার পিতৃপুরুষের ভিটে ছেড়ে যেতে চায় না। কিন্তু চারপাশের বাস্তবতায় সেই ভিটে আজ শ্মশানে পরিণত হয়েছে, বন্ধুরা একে একে চলে গেছে। কবি খুব পরিষ্কারভাবেই বোঝেন শেকড় ছাড়ার এই হাহাকার, তবুও বাস্তবতার স্বার্থেই তাকে পালিয়ে যেতে বলেন।
কবিতার এক অত্যন্ত আবেগঘন ও মর্মান্তিক দিক ফুটে উঠেছে দুই পরিবারের ব্যক্তিগত সম্পর্কের বয়ানে। আলমের ছয় বছরের ছোট বোন ‘নেহা’র চকলেট পাওয়ার অমলিন বায়না কিংবা সুধাংশুর ষোড়শী বোন ‘মিলা’র চঞ্চল দুষ্টুমি—সবই এই সাম্প্রদায়িক ভিটেছাড়ার ঝড়ে চিরতরে থমকে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। আলম স্বগতোক্তির মতো স্মরণ করে কীভাবে তার ভাই রিপন মিলার মেধার প্রশংসা করত। কিন্তু এই শান্ত-সুন্দর জীবনের ওপর অশুভ ছায়া নেমে এসেছে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বা নিপীড়নের শিকার হয়ে মেধাবী ও সুন্দরী মিলা যেন কোনো ধর্ষিত বা অচ্ছুৎ নারীর ভাগ্য বরণ না করে, সেই আশঙ্কায় কবি হাহাকার করে উঠেছেন। মানবতার এই চরম ব্যর্থতাকে এড়াতে হৃদয়বিদারক বিরহবেদনা সত্ত্বেও তিনি সুধাংশুকে চলে যেতে বলছেন।
সুধাংশু যাবেনা – শামসুর রাহমান | শামসুর রাহমানের কবিতা | আধুনিক বাংলা কবিতা | বিদায়, বন্ধুত্ব, মৃত্যু ও পালানোর অসাধারণ কাব্যভাষা
সুধাংশু যাবেনা: শামসুর রাহমানের বিদায়, বন্ধুত্ব, মৃত্যু ও অমোঘ বিদায়ের অসাধারণ কাব্যভাষা
শামসুর রাহমানের “সুধাংশু যাবেনা” আধুনিক বাংলা কবিতার এক অনন্য, স্পর্শকাতর ও বেদনাবিধুর সৃষ্টি। এটি একটি বন্ধুর উদ্দেশ্যে লেখা বিদায়ের কবিতা — যে বিদায় হয়ত চিরবিদায়। “পাগলামী করিসনে বন্ধু সুধাংশু / সময় যে পার হয়ে যাচ্ছে / এবার যে তোর পালানোর বেলা / জিদ করিসনে বন্ধু, এখনই তুই পালা” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে এক বন্ধুর প্রতি কবির শেষ অনুরোধ — পালিয়ে যাও, সময় শেষ হয়ে আসছে। কবি জানেন, সুধাংশু কী ভাবছেন — হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো, ছেলেবেলা, বন্ধুদের কথা — রামী, শেপু, কাকলী। কাপালী ভিটার কথা, যেখানে দুটি জীর্ণ-শীর্ণ ঘর দাঁড়িয়ে আছে। সবাই পালিয়েছে — এবার সুধাংশুর পালা। কবি জানেন, সুধাংশুর বিদায়ে কষ্ট পাবে তার ছ’বছরের বোন নেহা, ষোড়শী বোন মিলা। তবু তাকে পালাতে হবে। শামসুর রাহমান বাংলাদেশের জাতীয় কবি (মরণোত্তর)। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতায় নগরজীবন, প্রেম, বন্ধুত্ব, মৃত্যু ও মানবিক সম্পর্কের জন্য পরিচিত। ‘সুধাংশু যাবেনা’ তাঁর সেই স্বকীয় কাব্যভাষার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যা বিদায়ের এক অনবদ্য দলিল।
শামসুর রাহমান: বন্ধুত্ব, বিদায় ও মৃত্যুর কবি
শামসুর রাহমান বাংলাদেশের জাতীয় কবি (মরণোত্তর)। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতায় নগরজীবন, প্রেম, বন্ধুত্ব, মৃত্যু ও মানবিক সম্পর্কের জন্য পরিচিত। ‘সুধাংশু যাবেনা’ তাঁর সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ — যেখানে তিনি বন্ধু সুধাংশুকে বিদায় জানানোর মাধ্যমে মৃত্যু ও সম্পর্কের চিরন্তন সত্যকে ফুটিয়ে তুলেছেন।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’, ‘বন্দী শিবির থেকে’, ‘স্বাধীনতা তুমি’, ‘রৌদ্র করোটিতে’, ‘শামসুর রাহমানের শ্রেষ্ঠ কবিতা’ ইত্যাদি।
শিরোনাম ও কেন্দ্রীয় আবেদন
শিরোনাম ‘সুধাংশু যাবেনা’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘সুধাংশু’ — বন্ধুর নাম। ‘যাবেনা’ — যাবে না, থাকবে। কিন্তু পুরো কবিতায় কবি বারবার বলছেন — ‘এবার তুই পালা’, ‘এবার তোকে পালাতে হবে’। শিরোনাম ও কবিতার মধ্যে একটি বিরোধ তৈরি হয়েছে — হয়ত সুধাংশু যেতে চান না, কিন্তু তাকে যেতে হবে।
কবিতার স্তরে স্তরে বিশ্লেষণ
প্রথম স্তবক: পালানোর আহ্বান
“পাগলামী করিসনে বন্ধু সুধাংশু / সময় যে পার হয়ে যাচ্ছে / এবার যে তোর পালানোর বেলা / জিদ করিসনে বন্ধু, এখনই তুই পালা।” — প্রথম স্তবকে সরাসরি আহ্বান। ‘পাগলামী করিসনে’ — দেরি করো না। ‘সময় পার হয়ে যাচ্ছে’ — শেষ সময়। ‘এবার পালানোর বেলা’ — এখনই সময়। ‘জিদ করিসনে’ — আর জেদ করো না।
দ্বিতীয় স্তবক: শ্মশানসম বাস্তুভিটা ও ছেলেবেলার স্মৃতি
“জানি তুই কী ভাবছিস বন্ধু সুধাংশু / দাঁড়িয়ে হাহাকারের ছোঁয়ায় জড়ানো শ্মশানসম বাস্তুভিটায় / সেই হারিয়ে যাওয়া প্রাণচঞ্চল দিনগুলো, আমাদের ছেলেবেলা / কিন্তু এবার যে তোর পালানোর বেলা, এবার তুই পালা।” — দ্বিতীয় স্তবকে পুরনো বাড়ির স্মৃতি। ‘শ্মশানসম বাস্তুভিটা’ — বাড়িটি এখন শ্মশানের মতো, শূন্য, মৃত। ‘হারিয়ে যাওয়া প্রাণচঞ্চল দিনগুলো’ — শৈশব, খেলাধুলা, হাসি। ‘ছেলেবেলা’ — যা আর ফিরবে না।
তৃতীয় স্তবক: বন্ধুদের স্মৃতি
“আমি জানি নির্বাক দাঁড়িয়ে তুই কী ভাবছিস বন্ধু সুধাংশু, / সেই একপাল বন্ধুগুলো-রামী, শেপু, কাকলী আরও অনেকে / প্রাণময় কোলাহলে কাটিয়েছি সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা বেলা, / কিন্তু এবার যে তোকে পালাতে হবে, এবার তুই পালা।” — তৃতীয় স্তবকে বন্ধুদের নাম। ‘রামী, শেপু, কাকলী’ — শৈশবের বন্ধুরা। ‘প্রাণময় কোলাহল’ — জীবন্ত সময়। কিন্তু সব বন্ধু চলে গেছে, এখন সুধাংশুর পালা।
চতুর্থ স্তবক: আত্মার সম্পর্ক ও প্রাণঢালা ভালোবাসা
“আমি বুঝি তোর শঙ্কা আগামী বিরহ বেদনার বন্ধু সুধাংশু, / আড়াই যুগ ধরে তিলে তিলে গড়ে উঠা আত্মার সম্পর্ক, / এই বাস্তুভিটার সাথে আর একঝাঁক বন্ধুর ভালবাসা প্রাণঢালা, / কিন্তু এবার যে তোকে পালাতে হবে, এবার তুই পালা।” — চতুর্থ স্তবকে সম্পর্কের গভীরতা। ‘আড়াই যুগ’ — প্রায় পঁচিশ বছর। ‘তিলে তিলে গড়ে ওঠা আত্মার সম্পর্ক’ — ধীরে ধীরে গড়া বন্ধন। ‘বাস্তুভিটার সঙ্গে, বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক’ — সব ছেড়ে যেতে হবে।
পঞ্চম স্তবক: কাপালী ভিটার বর্তমান ও বন্ধুদের বিদায়
“কোথায় সেই কল-কাকলীতে মুখরিত সবুজ সুন্দর কাপালী-ভিটাটি বন্ধু সুধাংশু? / দু’টি জীর্ণ-শীর্ণ ঘর চির-দুঃখীর মতো দাঁড়িয়ে আছে আজ সেই কাপালী ভিটায়, / কোথায় সেই রামী, শেপু, কাকলী আরও সেই প্রিয় বন্ধুগুলা? / ওরা যে সবাই পালিয়েছে, এবার তোর পালা।” — পঞ্চম স্তবকে বর্তমান চিত্র। ‘কোলাহলে মুখরিত কাপালী ভিটা’ — আগে ছিল প্রাণবন্ত। ‘দুটি জীর্ণ-শীর্ণ ঘর’ — এখন শুধু দুইটি ভাঙা ঘর। ‘রামী, শেপু, কাকলী সবাই পালিয়েছে’ — সব বন্ধু চলে গেছে।
ষষ্ঠ-সপ্তম স্তবক: নেহা ও মিলা — বোনদের কথা
“তুই কি জানিস বন্ধু সুধাংশু / তোর বিদায়ে ভীষণ ব্যথা পাবে আমার ঐ ছ’বছরের অবুঝ বোনটি ‘নেহা’? / কাটাবে কত সন্ধ্যা অধীর প্রত্যাশায়? / সুধাংশু ভাইকে জড়িয়ে ধরবে, কোথায় চকলেটগুলা? / তবুও তোকে পালাতে হবে যে, এবার তুই পালা।” — ষষ্ঠ স্তবকে ছোট বোন নেহার কথা। ‘ছ’বছরের অবুঝ বোন’ — নির্দোষ, ছোট মেয়ে। ‘সন্ধ্যা অধীর প্রত্যাশায়’ — অপেক্ষা করবে। ‘চকলেটগুলা’ — সুধাংশু হয়ত চকলেট নিয়ে আসত। “আরও জানি বন্ধু সুধাংশু / তোর ষোড়শী বোনটি ‘মিলা’ দুষ্টামির ছলে আর বলতে পারবেনা, / আলমদা তুমি এত কৃপণ কেন? / চলো মেলায় নিয়ে, কিনে দিতে হবে সুন্দর একটি মালা। / তথাপি তোকে পালাতে যে হবে, এবার তুই পালা।” — সপ্তম স্তবকে বড় বোন মিলার কথা। ‘ষোড়শী বোন’ — ষোলো বছর বয়সী। ‘আলমদা তুমি এত কৃপণ কেন?’ — সুধাংশুকে জিজ্ঞেস করত। ‘মেলায় নিয়ে মালা কিনে দিতে হবে’ — কিন্তু সুধাংশু আর পারবে না।
অষ্টম-নবম স্তবক: রিপনের কথা ও মিলার ভবিষ্যৎ
“তোকে যে বলা হয় নি বন্ধু সুধাংশু / মিলা’র সহপাঠী আমার ভাইটি ‘রিপন’ বলছিল সেদিন, / ভাইয়া মিলা’টা যা সুন্দর হয়েছে না! / বলে দিয়েছি ওকে, সুন্দরী মেধাবী মিলা বিশ্ব জয় করবে, / তোর মতো গর্দভটি ওর দিকে তাকাবে না। / তোর হাতে যে সময় নেই বন্ধু, এবার তুই পালা।” — অষ্টম স্তবকে মিলার প্রশংসা। ‘সুন্দরী মেধাবী মিলা বিশ্ব জয় করবে’ — ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা। ‘তোর মতো গর্দভটি ওর দিকে তাকাবে না’ — ব্যঙ্গাত্মক স্নেহ। ‘সময় নেই’ — শেষ সময়। “মিলাকে যে বিশ্ব জয় করতেই হবে বন্ধু সুধাংশু, / অসাধারণ সুন্দরী মেধাবী মিলার জন্য এক ধর্ষিত, অচ্ছুৎ, অভাগী নারীর জীবন, / হবে মানবতার জন্য এক অমার্জনীয় ব্যর্থতা, / তাই আমার কাতর মিনতি বন্ধু, এখনই তুই পালা।” — নবম স্তবকে গভীর রহস্য। ‘ধর্ষিত, অচ্ছুৎ, অভাগী নারী’ — কে এই নারী? হয়ত সুধাংশুর প্রিয় কেউ, অথবা কবির আত্মীয়? এই লাইনগুলো রহস্যময় — হয়ত সুধাংশুর প্রেমিকা বা স্ত্রী? ‘মানবতার জন্য অমার্জনীয় ব্যর্থতা’ — মিলাকে বাঁচাতে হলে সুধাংশুকে পালাতে হবে।
প্রশ্নোত্তর: গভীর পাঠের জন্য
প্রশ্ন ১: ‘সুধাংশু যাবেনা’ কবিতাটির লেখক কে?
উত্তর: এই কবিতাটির লেখক শামসুর রাহমান। তিনি বাংলাদেশের জাতীয় কবি (মরণোত্তর)।
প্রশ্ন ২: ‘পাগলামী করিসনে বন্ধু সুধাংশু’ — কেন বলা হয়েছে?
উত্তর: সুধাংশু হয়ত যেতে চান না, জেদ করছেন, দেরি করছেন। কবি বলছেন — সময় শেষ, আর দেরি করো না।
প্রশ্ন ৩: ‘শ্মশানসম বাস্তুভিটা’ — কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: পুরনো বাড়িটি এখন শ্মশানের মতো — শূন্য, মৃত, প্রাণহীন। সবাই চলে গেছে, বাড়িটি কেবল স্মৃতি বহন করছে।
প্রশ্ন ৪: ‘রামী, শেপু, কাকলী’ — এরা কারা?
উত্তর: এরা সুধাংশু ও কবির শৈশবের বন্ধু। তারা সবাই আগেই চলে গেছে, এখন সুধাংশুর পালা।
প্রশ্ন ৫: ‘আড়াই যুগ ধরে তিলে তিলে গড়ে উঠা আত্মার সম্পর্ক’ — কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: প্রায় পঁচিশ বছর ধরে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা গভীর বন্ধুত্ব। এই সম্পর্ক ছেড়ে যেতে কষ্ট হচ্ছে সুধাংশুর।
প্রশ্ন ৬: ‘নেহা’ ও ‘মিলা’ কারা?
উত্তর: নেহা সুধাংশুর ছ’বছরের ছোট বোন, মিলা ষোলো বছর বয়সী বোন। সুধাংশু তাদের খুব ভালোবাসেন, তাই তাদের ছেড়ে যেতে কষ্ট হচ্ছে।
প্রশ্ন ৭: ‘চকলেটগুলা’ — কেন এই উল্লেখ?
উত্তর: সুধাংশু হয়ত বাসায় ফিরলে নেহার জন্য চকলেট নিয়ে আসতেন। নেহা এখনও সেই অভ্যাসে অপেক্ষা করবে।
প্রশ্ন ৮: ‘সুন্দরী মেধাবী মিলা বিশ্ব জয় করবে’ — কেন বলা হয়েছে?
উত্তর: মিলার সম্ভাবনার কথা। কবি বিশ্বাস করেন মিলা বড় হবে, সফল হবে। কিন্তু তার জন্য সুধাংশুকে কিছু করতে হবে — হয়ত তাকে পালাতে হবে।
প্রশ্ন ৯: ‘এক ধর্ষিত, অচ্ছুৎ, অভাগী নারীর জীবন’ — এই রহস্যময় লাইনটি কী বোঝায়?
উত্তর: এটি কবিতার সবচেয়ে রহস্যময় অংশ। হয়ত সুধাংশুর কোনো প্রিয় নারী ধর্ষিত হয়েছিল, অথবা সুধাংশুর মা বা বোন? ‘অচ্ছুৎ’ শব্দটি হিন্দু সমাজের অস্পৃশ্যতার কথা মনে করিয়ে দেয়। ‘অভাগী’ — দুর্ভাগা। মিলাকে বাঁচাতে হলে সুধাংশুকে পালাতে হবে — যেন এই নারীর মতো অভাগী না হয় মিলা।
প্রশ্ন ১০: কবিতার মূল শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা কী?
উত্তর: কবিতাটি শেখায় — কখনও কখনও ভালোবাসার মানুষদের ছেড়ে যেতে হয়। বন্ধুত্ব, সম্পর্ক, স্মৃতি — সব পিছনে ফেলে পালাতে হয়। সময় শেষ হয়ে আসছে, আর দেরি নেই। নেহা, মিলা, পুরনো বাড়ি, বন্ধুরা — সব ছেড়ে সুধাংশুকে পালাতে হবে। মিলার ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য, মানবতার জন্য।
ট্যাগস: সুধাংশু যাবেনা, শামসুর রাহমান, শামসুর রাহমানের কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, বন্ধুত্ব ও বিদায়, মৃত্যুর কবিতা, চিরবিদায়
© Kobitarkhata.com – কবি: শামসুর রাহমান | কবিতার প্রথম লাইন: “পাগলামী করিসনে বন্ধু সুধাংশু সময় যে পার হয়ে যাচ্ছে” | বিদায়, বন্ধুত্ব, মৃত্যু ও পালানোর অসাধারণ কাব্যভাষা | আধুনিক বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন