কবিতার খাতা
বেহুলা – মোহাম্মদ রফিক।
আমি তবে লখিন্দর
তোমারে অমর করে যাব,
ভাসতে দাও ঢেউয়ে-ঢেউয়ে নিম্নগামী স্রোতে
গলিত মাংসের পিন্ড ঝরে পড়বে জলে,
আনন্দে মাতাল হবে মৎস্য-পরিবার,
কামনা দংশিছে যারে কাকে বা সে দোষারোপ করে,
বজ্রবিদ্যুতের শিখা বিদ্ধ করে শস্যের ভান্ডার
নয় সর্প দুর্ভাগ্যের কালচক্র নয়,
ফিরে চলো, কাজ নেই দেবতাকে তুষ্ট করে,
স্বর্গ বড়ো পরিহাসপরায়ন,
তোমার নৃত্যের মুদ্রা আলোকিত করুক ব্রহ্মাণ্ড
বেদানার্ত পিচ্ছিল দেহের ভাজে-ভাজে
কলকণ্ঠ প্রকৃতির পাখ-পাখালির কলতান
দু’ঠোটের ফাঁকে বসে থাক নক্ষত্রের মেলা
মুক্তি পাক মানুষের দমিত বাসনা
ঘাটে মাঠে উচ্চারিত আকাক্সক্ষার নাদ
জীয়নের মন্ত্রধ্বনি কবিতায় পংক্তি বিন্যাসে
সব সাধনায় জন্মসাক্ষী সঙ্গীতের তান লয়
লোহার গরাদ খুলে যায় স্বর্গে মর্ত্যে
বন্ধিশালা থেকে অবশেষে মুক্ত সব অবরুদ্ধ চেতনা-চৈতন্য
কিংবদন্তি যুগ-যুগান্তরে
প্রাণ পাবে মাটিতে ও জলে,
এক একটি মৃত্যুমুখী
শতাব্দীর কালঘুম টুটে গেল!
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। মোহাম্মদ রফিকের কবিতা।
কবিতার কথা –
মোহাম্মদ রফিকের ‘বেহুলা’ কবিতাটি আবহমান বাংলার জনপ্রিয় পৌরাণিক মিথ ‘মনসামঙ্গল’-এর এক আমূল রাজনৈতিক ও আধুনিক পুনর্নির্মাণ। প্রথাগত লোকগাথায় স্বর্গের দেবতাদের তুষ্ট করে মৃত স্বামীকে ফিরিয়ে আনার যে করুণ মিনতি থাকে, কবি এখানে সেই প্রথা ভেঙে স্বৈরাচার ও অলৌকিক শক্তির বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ মানবীয় প্রতিরোধের গল্প বুনেছেন।
কবিতার শুরুতেই মৃত লখিন্দর যেন এক সচেতন সত্তা হিসেবে জেগে উঠে বেহুলাকে অমরত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে এই অমরত্ব দেবালয়ের অনুগ্রহে নয়, বরং স্রোতের জলে গলিত মাংসপিণ্ড বিলিয়ে দিয়ে প্রকৃতির অনন্ত নিয়মে মিশে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। সর্পদংশন বা ভাগ্যের লিখনকে এখানে কোনো কালচক্র বা দুর্ভাগ্যের প্রতীক না করে সামাজিক ও রাজনৈতিক বাধার রূপক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। লখিন্দরের স্পষ্ট আহ্বান—কাজ নেই দেবতাকে তুষ্ট করার, কারণ ক্ষমতা বা স্বর্গের সেই শাসকগোষ্ঠী বড্ড পরিহাসপ্রিয়। দেবতাদের কাছে মাথা নোয়ানোর চেয়ে নিজের অস্তিত্ব ও আত্মমর্যাদাকে টিকিয়ে রাখাই এখানে মুখ্য।
বেহুলার শরীরের ভাজ ও নাচের মুদ্রা কেবল স্বর্গসভার বিনোদন নয়, তা পরিণত হয় সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডকে আলোকিত করার মতো এক গতিশীল বিপ্লবে। কবি চান সেই নাচে, প্রকৃতির পাখপাখালির গানে ও আকাশের নক্ষত্রের আলোয় যেন মানুষের যুগ যুগ ধরে দমিত থাকা বাসনা ও আকাঙ্ক্ষা মুক্তি পায়। জীয়নের মন্ত্র হয়ে ওঠে কবিতার পংক্তি আর সঙ্গীতের সুর। শেষ বিচারে, লখিন্দর-বেহুলার এই যাত্রা কেবল দুটি ব্যক্তিসত্তার করুণ বিচ্ছেদ থাকে না; তা হয়ে ওঠে স্বর্গে ও মর্ত্যে জমে থাকা শৃঙ্খল ভেঙে ফেলার এক হুংকার। ক্ষমতার লোহার গরাদ খুলে যায়, অবরুদ্ধ চেতনা মুক্ত হয় এবং মৃতপ্রায় শতাব্দীর স্তব্ধতা ভেঙে জেগে ওঠে জীবনের আসল স্পন্দন।






