রূপমকে একটা চাকরি দিন—এম. এ পাস, বাবা নেই
আছে প্রেমিকা সে আর দু’-এক মাস দেখবে, তারপর
নদীর এপার থেকে নদীর ওপারে গিয়ে বলবে, রূপম
আজ চলি
তোমাকে মনে থাকবে চিরদিন
রূপমকে একটা চাকরি দিন, যে কোন কাজ
পিওনের কাজ হলেও চলবে |
তমালবাবু ফোন তুললেন, ফোনের অন্য প্রান্তে
যারা কথা বলেন
তাদের যেহেতু দেখা যায় না, সুতরাং তারা দুর্জ্ঞেয় |
তমালবাবু মামাকে বললেন রূপমের একটা চাকরি দরকার
মামা বললেন কাকাকে, কাকা বললেন জ্যাঠাকে,
জ্যাঠা বললেন
বাতাসকে |
মানুষ জানলে একরকম, কিন্তু বাতাস জানলে
প্রথমেই ছুটে যাবে দক্ষিণে, সে বলবে দক্ষিণের অরণ্যকে
অরণ্য বলবে আগুনকে, আগুন গেল আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে
আলিমুদ্দিন ছুটল নদীকে বলার জন্য
নদী এসে আছড়ে পড়ল
উপকূলে, আসমুদ্র হিমাচল বলে উঠল
রূপমকে একটা চাকরি দাও, এম. এ. পাশ করে বসে আছে ছেলেটা |
কয়েক মাস বাদের ঘটনা, আমি বাড়িফিরছিলাম সন্ধেবেলায়
গলির মোড়ে সাত-আটজনের জটলা দেখে থমকে দাঁড়ালাম
জল থেকে সদ্য তুলে আনা রূপমের ডেডবডি
সারা গায়ে ঘাস, খরকুটো, হাতের মুঠোয়
ধরে থাকা একটা এক টাকার কয়েন |
পাবলিক বুথ থেকে কাউকে ফোন করতে চেয়েছিল, রূপম?
ভারত সরকারের এক টাকা কয়েনের দিকে আমার চোখ |
সারা গায়ে সবুজ ঘাস, ঘাস নয়, অক্ষর
এম. এ. পাস করতে একটা ছেলেকে যত অক্ষর পড়তে হয়
সেই সমস্ত ব্যর্থ অক্ষর ওর গায়ে লেগে আছে |
একটা ছেলেকে কেন আপনারা এম. এ. পড়ান, কোন আহ্লাদে আটখানা
বিশ্ববিদ্যালয় বানিয়েছেন? তুলে দিন
এই কথাগুলো বলব বলে ফোন তুললাম পবিত্র সরকারের
ফোন বেজে উঠল, ফোন বেজে চলল, ফোন বেজেই চলল
২০ বছর ধরে ওই ফোন বেজে চলেছে, আরো কুড়ি বছর বাজবে |
বাতাস বলছে অরণ্যকে, অরণ্য চলেছে নদীর দিকে
নদী উপকূল থেকে আছড়ে পড়ে বলল :
রূপমকে একটা চাকরি দিন |
কে রূপম?
রূপম আচার্য, বয়স ২৬, এম. এ. পাস
বাঁ দিকের গালে একটা কাটা দাগ আছে |
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। সুবোধ সরকারের কবিতা।
কবিতার কথা –
সুবোধ সরকারের ‘রূপম’ কবিতাটি আধুনিক সময়ের এক জ্বলন্ত সামাজিক দলিল, যা বেকারত্বের হাহাকার, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং একটি স্বপ্নময় জীবনের করুণ অপমৃত্যুর এক সপাট আখ্যান। কবিতার নায়ক রূপম—যিনি এম.এ পাস, অথচ তাঁর কোনো কর্মসংস্থান নেই। এই রূপম কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি আমাদের সমকালীন শিক্ষিত ও কর্মহীন যুবসমাজের এক অসহায় প্রতিনিধি। তাঁর অস্তিত্ব টিকে আছে এক অনিশ্চিত প্রেমের ওপর, যেখানে প্রেমিকাও সময়ের কাছে হার মেনে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
কবিতার দ্বিতীয় স্তবকে আমলাতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক দীর্ঘসূত্রতাকে কবি অত্যন্ত ব্যাঙ্গাত্মকভাবে চিত্রিত করেছেন। রূপমের চাকরির জন্য অনুরোধ এক হাত থেকে অন্য হাতে ঘোরে—মামা থেকে কাকা, জ্যাঠা থেকে বাতাস, অরণ্য, আগুন হয়ে শেষ পর্যন্ত তা পৌঁছায় ক্ষমতার অলিন্দে (আলিমুদ্দিন স্ট্রিট)। এই রূপকটি নির্দেশ করে যে, সাধারণ মানুষের সমস্যাগুলো কীভাবে ক্ষমতার গোলকধাঁধায় পড়ে দিশেহারা হয়ে যায়। ‘আসমুদ্র হিমাচল’ যখন রূপমের জন্য চাকরি চায়, তখন তা এক ধরণের গণদাবিতে পরিণত হয়, অথচ সেই দাবির কোনো বাস্তব প্রতিফলন ঘটে না।
কবিতার তৃতীয় ও চতুর্থ স্তবকে এক চরম ট্র্যাজেডি নেমে আসে। রূপমের মৃতদেহ যখন জল থেকে তুলে আনা হয়, তখন তাঁর সারা গায়ে লেগে থাকা ঘাসগুলোকে কবি ‘ব্যর্থ অক্ষর’ হিসেবে তুলনা করেছেন। এম.এ পাস করতে গিয়ে যে সহস্রাক্ষর সে পাঠ করেছিল, কর্মহীন জীবনে সেই শিক্ষা আজ অর্থহীন ও ঘাসের মতোই তুচ্ছ। তাঁর হাতের মুঠোয় থাকা ‘এক টাকার কয়েন’টি এক নিদারুণ প্রতীক—সে হয়তো জীবনের শেষ মুহূর্তে কাউকে ফোন করতে চেয়েছিল, কোনো আশার কথা শুনতে চেয়েছিল, কিন্তু সেই আশার প্রদীপ নেভানোর জন্য রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাই দায়ী।
পরিশেষে, কবি তাঁর তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন শিক্ষা ব্যবস্থা এবং নিষ্ক্রিয় বুদ্ধিজীবী সমাজের ওপর। কেন এই বিশাল বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করা, যদি তা একটি যুবকের ন্যূনতম জীবিকার সংস্থান করতে না পারে? পবিত্র সরকারের মতো নীতি নির্ধারকদের ফোন ক্রমাগত বেজেই চলে (এক ধরণের প্রতীকী অবহেলা), কেউ সেই ফোন ধরে না। কবিতার শেষে রূপমের যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে—‘বয়স ২৬, বাঁ দিকের গালে একটা কাটা দাগ আছে’—তা মূলত রূপমকে এক চিরস্থায়ী আইডেন্টিটি প্রদান করে। সৃষ্টির সার্থকতা লৌকিক হাততালিতে নয়, বরং স্রষ্টার নিজের মানসিক মুক্তি এবং অস্তিত্বের তাগিদে—যা এই কবিতার প্রতিটি ছত্রে বেকারত্বের অভিশাপ আর ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক দীর্ঘস্থায়ী প্রতিবাদ হিসেবে প্রদীপ্ত হয়ে আছে।
রূপম – সুবোধ সরকার | সুবোধ সরকারের কবিতা | আধুনিক বাংলা কবিতা | বেকারত্ব, মৃত্যু ও সামাজিক উদাসীনতার অসাধারণ কাব্যভাষা
রূপম: সুবোধ সরকারের বেকারত্ব, ব্যর্থ স্বপ্ন, আত্মহত্যা ও নীরব কান্নার অসাধারণ কাব্যভাষা
সুবোধ সরকারের “রূপম” আধুনিক বাংলা কবিতার এক অনন্য, বেদনাবিধুর ও প্রতিবাদী সৃষ্টি। এটি একটি তরুণের বেকারত্ব, ভালোবাসা হারানো, আত্মহত্যা এবং সমাজের উদাসীনতার এক করুণ কাহিনি। “রূপমকে একটা চাকরি দিন—এম. এ পাস, বাবা নেই / আছে প্রেমিকা সে আর দু’-এক মাস দেখবে, তারপর / নদীর এপার থেকে নদীর ওপারে গিয়ে বলবে, রূপম / আজ চলি / তোমাকে মনে থাকবে চিরদিন” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে রূপমের জীবন — এম.এ পাস, বাবা নেই, প্রেমিকা চলে যাচ্ছে। তমালবাবুর ফোন থেকে শুরু করে মামা, কাকা, জ্যাঠা, বাতাস, অরণ্য, আগুন, আলিমুদ্দিন, নদী — সবাইকে পেরিয়ে নদী এসে বলে — ‘রূপমকে একটা চাকরি দাও’। কিন্তু কেউ দেয়নি। কয়েক মাস পর রূপমের ডেডবডি নদী থেকে তোলা হয় — সারা গায়ে ঘাস, খরকুটো, হাতের মুঠোয় এক টাকার কয়েন। পাবলিক বুথ থেকে কাউকে ফোন করতে চেয়েছিল। ওর গায়ে লেগে আছে এম.এ পাস করতে যেসব অক্ষর পড়তে হয়, সেই সব ব্যর্থ অক্ষর। সুবোধ সরকার একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কবি ও প্রাবন্ধিক। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর, বেকারত্ব, শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতা ও সামাজিক বাস্তবতার তীক্ষ্ণ চিত্রায়ণের জন্য পরিচিত। ‘রূপম’ তাঁর সেই স্বকীয় কাব্যভাষার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যা শিক্ষিত বেকার যুবকের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সমাজের নির্মম সত্য উন্মোচন করে।
সুবোধ সরকার: প্রান্তিকের কণ্ঠস্বর ও সামাজিক বাস্তবতার কবি
সুবোধ সরকার একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কবি ও প্রাবন্ধিক। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর, বেকারত্ব, শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতা ও সামাজিক বাস্তবতার তীক্ষ্ণ চিত্রায়ণের জন্য পরিচিত। ‘রূপম’ তাঁর সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ — যেখানে তিনি শিক্ষিত বেকার যুবকের মৃত্যুর গল্পের মাধ্যমে সমাজের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাগুলো উন্মোচন করেছেন।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘আমি কৃষ্ণকলি মাহাতো’ (২০১৮), ‘মৃত্যুর আগে তুমি কাজল পড়েছিলে’ (২০১৮), ‘রূপম’ (২০২০), ‘নির্বাচিত কবিতা’ (২০২২) ইত্যাদি।
শিরোনাম ও কেন্দ্রীয় আবেদন
শিরোনাম ‘রূপম’ একটি নাম — ২৬ বছর বয়সী এম.এ পাস যুবক, বাঁ দিকের গালে কাটা দাগ। কবিতার শুরু ও শেষে একটাই আবেদন — ‘রূপমকে একটা চাকরি দিন’। এই আবেদন বারবার ফিরে আসে, কিন্তু কেউ শোনে না। মৃত্যুর পরও সেই আবেদন বাতাসে ভেসে বেড়ায়।
কবিতার স্তরে স্তরে বিশ্লেষণ
প্রথম স্তবক: রূপমের পরিচয় ও প্রেমিকার বিদায়
“রূপমকে একটা চাকরি দিন—এম. এ পাস, বাবা নেই / আছে প্রেমিকা সে আর দু’-এক মাস দেখবে, তারপর / নদীর এপার থেকে নদীর ওপারে গিয়ে বলবে, রূপম / আজ চলি / তোমাকে মনে থাকবে চিরদিন” — প্রথম স্তবকে রূপমের পরিচয় ও প্রেমিকার বিদায়। এম.এ পাস কিন্তু বেকার। বাবা নেই — অর্থাৎ সংসারের একমাত্র ভরসা নেই। প্রেমিকা থাকে আর দু-এক মাস, তারপর চলে যায়। ‘তোমাকে মনে থাকবে চিরদিন’ — এটি সান্ত্বনা নয়, বরং আরও বড় আঘাত।
দ্বিতীয় স্তবক: যে কোন কাজ — পিওনের কাজও চলবে
“রূপমকে একটা চাকরি দিন, যে কোন কাজ / পিওনের কাজ হলেও চলবে” — দ্বিতীয় স্তবকে অসহায়ত্বের চরম সীমা। ‘যে কোন কাজ’ — আর পছন্দ করার মতো অবস্থা নেই। ‘পিওনের কাজ’ — সবচেয়ে নিম্নপদ, তাও চলে। কিন্তু কেউ দেয় না।
তৃতীয় স্তবক: তমালবাবু থেকে বাতাস — মানুষের উদাসীনতা ও প্রকৃতির প্রতিক্রিয়া
“তমালবাবু ফোন তুললেন, ফোনের অন্য প্রান্তে / যারা কথা বলেন / তাদের যেহেতু দেখা যায় না, সুতরাং তারা দুর্জ্ঞেয়” — তৃতীয় স্তবকে উদাসীনতার চিত্র। ফোনের ওপারের মানুষ ‘দুর্জ্ঞেয়’ — অজানা, অধরা। তারপর এক চেইন রিঅ্যাকশন — মামা, কাকা, জ্যাঠা, বাতাস — সবাই দায় ছুড়ে ফেলে দেয়। ‘মানুষ জানলে একরকম, কিন্তু বাতাস জানলে প্রথমেই ছুটে যাবে দক্ষিণে’ — মানুষের চেয়ে বাতাস বেশি সংবেদনশীল। বাতাস বলে অরণ্যকে, অরণ্য বলে আগুনকে, আগুন যায় আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে, আলিমুদ্দিন ছুটে নদীকে বলার জন্য। নদী এসে বলে — ‘রূপমকে একটা চাকরি দাও’।
চতুর্থ স্তবক: রূপমের মৃত্যু ও হাতে এক টাকার কয়েন
“কয়েক মাস বাদের ঘটনা, আমি বাড়িফিরছিলাম সন্ধেবেলায় / গলির মোড়ে সাত-আটজনের জটলা দেখে থমকে দাঁড়ালাম / জল থেকে সদ্য তুলে আনা রূপমের ডেডবডি / সারা গায়ে ঘাস, খরকুটো, হাতের মুঠোয় / ধরে থাকা একটা এক টাকার কয়েন” — চতুর্থ স্তবকে রূপমের মৃত্যু। নদী থেকে তোলা ডেডবডি। ‘সারা গায়ে ঘাস, খরকুটো’ — মৃত্যুর পর অবহেলা। ‘হাতে এক টাকার কয়েন’ — সবচেয়ে ক্ষুদ্র মুদ্রা। পাবলিক বুথ থেকে কাউকে ফোন করতে চেয়েছিল — হয়ত শেষবারের মতো চাকরি চেয়েছিল, কিন্তু কেউ সাড়া দেয়নি।
পঞ্চম স্তবক: এম.এ-র ব্যর্থ অক্ষর ও শিক্ষা ব্যবস্থার প্রশ্ন
“সারা গায়ে সবুজ ঘাস, ঘাস নয়, অক্ষর / এম. এ. পাস করতে একটা ছেলেকে যত অক্ষর পড়তে হয় / সেই সমস্ত ব্যর্থ অক্ষর ওর গায়ে লেগে আছে” — পঞ্চম স্তবকে সবচেয়ে শক্তিশালী বিদ্রূপ। ঘাস নয় — অক্ষর। এম.এ পাস করতে যে সব অক্ষর পড়তে হয়, সেগুলো ওর গায়ে লেগে আছে — ‘ব্যর্থ অক্ষর’। অর্থাৎ এম.এ ডিগ্রি তার কোনও কাজে আসেনি, বরং ওই অক্ষরগুলোই ওর মৃত্যুর কারণ।
ষষ্ঠ স্তবক: আটখানা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্ন
“একটা ছেলেকে কেন আপনারা এম. এ. পড়ান, কোন আহ্লাদে আটখানা / বিশ্ববিদ্যালয় বানিয়েছেন? তুলে দিন” — ষষ্ঠ স্তবকে শিক্ষা ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা। ‘আটখানা বিশ্ববিদ্যালয়’ — শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু চাকরি নেই। ‘তুলে দিন’ — রাগের, ক্ষোভের, আক্ষেপের বাণী।
সপ্তম স্তবক: ২০ বছর ধরে বেজে চলা ফোন ও শেষ বার্তা
“এই কথাগুলো বলব বলে ফোন তুললাম পবিত্র সরকারের / ফোন বেজে উঠল, ফোন বেজে চলল, ফোন বেজেই চলল / ২০ বছর ধরে ওই ফোন বেজে চলেছে, আরো কুড়ি বছর বাজবে” — সপ্তম স্তবকে উদাসীনতার চরম রূপ। ফোন কেউ ধরেই না। ২০ বছর ধরে বেজে চলেছে — অর্থাৎ এ সমস্যা নতুন না, বহুদিনের। আরও ২০ বছর বাজবে — অর্থাৎ ভবিষ্যতেও সমাধান হবে না।
অষ্টম স্তবক: নদীর শেষ আবেদন ও রূপমের পরিচয়
“বাতাস বলছে অরণ্যকে, অরণ্য চলেছে নদীর দিকে / নদী উপকূল থেকে আছড়ে পড়ে বলল : / রূপমকে একটা চাকরি দিন / কে রূপম? / রূপম আচার্য, বয়স ২৬, এম. এ. পাস / বাঁ দিকের গালে একটা কাটা দাগ আছে” — অষ্টম স্তবক — শেষ স্তবক — পুরো কবিতার চূড়ান্ত প্রশ্ন ও পরিচয়। নদী আছড়ে পড়ে বলে — ‘রূপমকে একটা চাকরি দিন’। তারপর প্রশ্ন — ‘কে রূপম?’ উত্তর — রূপম আচার্য, বয়স ২৬, এম.এ পাস, বাঁ দিকের গালে কাটা দাগ। এই পরিচয় দিয়ে কবি বোঝাতে চান — রূপম কোনো নাম নয়, এটি একটি প্রতীক। প্রতিটি বেকার তরুণের প্রতীক।
প্রতীক ও রূপকের গভীর পাঠ
‘রূপম’ — প্রতিটি বেকার এম.এ পাস যুবকের প্রতীক। ‘নদীর এপার-ওপার’ — সম্পর্কের দূরত্ব, বিচ্ছেদের প্রতীক। ‘পিওনের কাজ’ — শিক্ষিত বেকারের বাস্তবতা। ‘তমালবাবু, মামা, কাকা, জ্যাঠা’ — সামাজিক যোগাযোগ ও দায়িত্ব এড়ানোর প্রতীক। ‘বাতাস, অরণ্য, আগুন, আলিমুদ্দিন, নদী’ — প্রকৃতি ও নগরের সংলাপ, মানুষের ব্যর্থতায় প্রকৃতির প্রতিক্রিয়া। ‘ডেডবডি’ — নিঃস্ব মৃত্যু, পরিচয়হীন লাশ। ‘এক টাকার কয়েন’ — সর্বনিম্ন মূল্য, শেষ সম্বল। ‘পাবলিক বুথ থেকে ফোন’ — শেষ চেষ্টার প্রতীক। ‘অক্ষর’ — শিক্ষার প্রতীক, যা এখানে ‘ব্যর্থ অক্ষরে’ পরিণত হয়েছে। ‘আটখানা বিশ্ববিদ্যালয়’ — শিক্ষা ব্যবস্থার বাণিজ্যিকীকরণ ও ব্যর্থতার প্রতীক। ‘২০ বছর ধরে বেজে চলা ফোন’ — সমস্যার দীর্ঘস্থায়িত্ব ও উদাসীনতার প্রতীক। ‘বাঁ দিকের গালে কাটা দাগ’ — স্বতন্ত্র পরিচয়, চিহ্ন — যা তাকে অন্যের থেকে আলাদা করে।
প্রশ্নোত্তর: গভীর পাঠের জন্য
প্রশ্ন ১: ‘রূপম’ কবিতাটির লেখক কে?
উত্তর: এই কবিতাটির লেখক সুবোধ সরকার। তিনি একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কবি ও প্রাবন্ধিক।
প্রশ্ন ২: ‘রূপমকে একটা চাকরি দিন’ — কেন বারবার বলা হয়েছে?
উত্তর: রূপম এম.এ পাস, বাবা নেই, প্রেমিকা চলে যাচ্ছে। তার একটাই চাওয়া — একটি চাকরি। এই আবেদন বারবার ফিরে আসে, কিন্তু কেউ শোনে না।
প্রশ্ন ৩: ‘পিওনের কাজ হলেও চলবে’ — লাইনটির গভীরতা কী?
উত্তর: এটি চরম অসহায়ত্বের প্রকাশ। একজন এম.এ পাস যুবকের জন্য পিওনের কাজ চেয়ে নেওয়া — সমাজের বাস্তবতা ও শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতার নিদর্শন।
প্রশ্ন ৪: ‘তমালবাবু ফোন তুললেন, ফোনের অন্য প্রান্তে যারা কথা বলেন তাদের যেহেতু দেখা যায় না, সুতরাং তারা দুর্জ্ঞেয়’ — কেন বলা হয়েছে?
উত্তর: ফোনে কথা বললেও তাদের দেখা যায় না — তারা ‘দুর্জ্ঞেয়’ (অজানা, অধরা)। এটি সামাজিক সম্পর্কের দূরত্ব ও উদাসীনতার প্রতীক।
প্রশ্ন ৫: ‘মানুষ জানলে একরকম, কিন্তু বাতাস জানলে প্রথমেই ছুটে যাবে দক্ষিণে’ — কেন বাতাস বেশি সংবেদনশীল?
উত্তর: মানুষ উদাসীন, দায় এড়িয়ে চলে। কিন্তু বাতাসের কাছে গেলে পুরো প্রক্রিয়া শুরু হয় — বাতাস অরণ্যকে বলে, অরণ্য আগুনকে বলে, আগুন আলিমুদ্দিনকে বলে, আলিমুদ্দিন নদীকে বলে, নদী শেষ পর্যন্ত বলে — ‘রূপমকে একটা চাকরি দাও’।
প্রশ্ন ৬: ‘হাতের মুঠোয় ধরে থাকা একটা এক টাকার কয়েন’ — কেন এক টাকার কয়েন?
উত্তর: এক টাকার কয়েন সবচেয়ে ক্ষুদ্র মুদ্রা। এটি রূপমের শেষ সম্বল, শেষ চেষ্টা — পাবলিক বুথ থেকে কাউকে ফোন করার জন্য।
প্রশ্ন ৭: ‘সারা গায়ে সবুজ ঘাস, ঘাস নয়, অক্ষর’ — কেন ঘাস নয় অক্ষর?
উত্তর: রূপমের গায়ে লেগে থাকা জিনিস ঘাস নয়, বরং এম.এ পাস করতে পড়া অক্ষরগুলো। ‘ব্যর্থ অক্ষর’ — শিক্ষা তাকে কাজে দেয়নি, বরং ব্যর্থতাই দিয়েছে।
প্রশ্ন ৮: ‘কোন আহ্লাদে আটখানা বিশ্ববিদ্যালয় বানিয়েছেন? তুলে দিন’ — লাইনটির গভীরতা কী?
উত্তর: বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু চাকরি নেই। এটি শিক্ষা ব্যবস্থার বাণিজ্যিকীকরণ ও ব্যর্থতার তীব্র সমালোচনা। ‘তুলে দিন’ — রাগের, ক্ষোভের, আক্ষেপের বাণী।
প্রশ্ন ৯: ‘ফোন বেজে চলল, ২০ বছর ধরে ওই ফোন বেজে চলেছে, আরো কুড়ি বছর বাজবে’ — কেন?
উত্তর: সমস্যাটি নতুন নয়, বহুদিনের। কেউ ফোন ধরছে না, কেউ শুনছে না। ভবিষ্যতেও কেউ ধরবে না — এটি চরম উদাসীনতার প্রতীক।
প্রশ্ন ১০: কবিতার মূল শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা কী?
উত্তর: কবিতাটি শেখায় — শিক্ষিত বেকার যুবকেরা প্রতিদিন মরছে। সমাজ ও সরকার তাদের চিৎকার শুনতে চায় না। রূপমের মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তির মৃত্যু নয়, এটি একটি প্রজন্মের প্রতিনিধির মৃত্যু। আজও লক্ষ লক্ষ এম.এ পাস তরুণ-তরুণী বেকার। এই কবিতা সেই বাস্তবতার এক শৈল্পিক দলিল।
ট্যাগস: রূপম, সুবোধ সরকার, সুবোধ সরকারের কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, বেকারত্ব, শিক্ষিত বেকার, আত্মহত্যা, সামাজিক উদাসীনতা
© Kobitarkhata.com – কবি: সুবোধ সরকার | কবিতার প্রথম লাইন: “রূপমকে একটা চাকরি দিন—এম. এ পাস, বাবা নেই” | বেকারত্ব, মৃত্যু ও সামাজিক উদাসীনতার অসাধারণ কাব্যভাষা | আধুনিক বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন