শুনুন রবীন্দ্রনাথ এ যুগে ভীষণ দায় বাঁচা, বড়ো অসহায়
আমরা কজন যুবা আপনার শান্তিনিকেতনে প্রত্যহ প্রার্থনা
করি হে ঈশ্বর, আমাদের
শান্তি দাও, প্রত্যহ প্রার্থনা করি মঠে ও গির্জায়
আমাদের শান্তি দাও, দাও মহান ঈশ্বর, তবু
সর্বত্র আজ অনাবৃষ্টি, রৌদ্রে
পোড়ে মাঠ, বোমায় শহর পোড়ে, লোকালয় উচ্ছন্নে যায়
মারী ও মড়কে কাঁপে দেশ, শুনুন রবীন্দ্রনাথ এ যুগে আমরা বড়ো
অসহায় কজন যুবক, বিশেষত আমরা কজন যুবা
ব্যক্তিগত নিখোঁজ সংবাদ যারা ঢেকে রাখি সর্বক্ষণ আস্তিনের
পুরু ভাঁজে, বড়োই রুগ্ণ আমরা
এ যুগে নিঃশ্বাস নেবো প্রকৃতিতে বৃষ্টিতে বা উদার অরণ্যে দাঁড়াবো
এমন জো নেই কোনো,
আমাদের সন্নিকটে বনভূমি নেই।
এখন ভীষণ রুগ্ন আমরা, সারা গায়ে কালোশিরা, চোখ ভর্তি
নিঃশব্দ আঁধার, যেখানে যাই আমরা কজন যুবা
যেন বড়ো বেশি ম্লান ফ্যাকাশে বৃদ্ধ, চোখমুখে
স্পষ্ট হয়ে লেগে থাকে যাবতীয় অনাচার, নিজের কাছেও
আজ নিজেদের লুকাবার রাস্তা খোলা নেই, এ যুগে আমরা
বড়ো অসহায় কজন যুবক; শুনুন রবীন্দ্রনাথ তবু আমরা
কজন যুবা আজো ভালোবাসি গান, তবু
আমরা কজন যুবক
বড়ো ভালোবাসি মাধবীকে, ভালোবাসি মাধবীর বাংলাদেশ
তার নিজস্ব বর্ণমালা রবীন্দ্রসঙ্গীত।
শুনুন রবীন্দ্রনাথ আমরা কজন যুবা, বড়ো বেশি অসহায় কজন
যুবা, তখন তাকিয়ে দেখি সূর্যাস্ত কী
মনোরম, কিংবা ভোর হয় আমাদের সমস্ত অস্তিত্বে রৌদ্র
ওঠে, পাখি নাচে, আমরা কজন এই ভয়ানক রুগ্ণ যুবা পুনরায়
মাঠে যাই আমরা নিঃশ্বাস নিই সঙ্গীতের উদার নিসর্গে, আমরা
যেন ধীরে ধীরে বেঁচে উঠি
তখন মনে হয় এমনি করেই বুঝি এদেশে
বিপ্লব আসে, একুশে ফেব্রুয়ারি আসে, নববর্ষ আসে;
আমরা কতিপয় যুবা
তাই আর সব পরিচয় যখন ভুলে যাই এমনকী ভুলে
যাই নিজেদের নাম, তখনো মনে রাখি
রবীন্দ্রনাথ আমাদের আবহমান বাংলাদেশ
আমাদের প্রদীপ্ত বিপ্লব,
রবীন্দ্রনাথ আমাদের চিরদিন একুশে ফেব্রুয়ারি।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। মহাদেব সাহার কবিতা।
কবিতার কথা –
মহাদেব সাহার ‘রবীন্দ্রোত্তর আমরা কজন যুবা’ কবিতাটি রবীন্দ্র-পরবর্তী প্রজন্মের এক আত্মিক সংকট, অস্তিত্বের হাহাকার এবং শেষ পর্যন্ত শিকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার এক মহাকাব্যিক স্বীকারোক্তি। কবি এখানে রবীন্দ্রনাথকে সম্বোধন করে তাঁর যুগের এক রূঢ় ও নগ্ন বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন। যে শান্তিনিকেতন বা যে আদর্শের কথা রবীন্দ্রনাথ বলে গিয়েছিলেন, বর্তমানের অস্থির সময়ে তা যেন এক সুদূর পরাহত স্বপ্ন। কবি অত্যন্ত বেদনার সাথে জানাচ্ছেন যে, এ যুগের যুবসমাজ আজ ভীষণ অসহায়। বোমায় শহর পুড়ছে, লোকালয় উচ্ছন্নে যাচ্ছে, আর মারী-মড়কের কবলে দেশ কাঁপছে। এই ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়ে কতিপয় যুবক আজ এতটাই রুগ্ণ যে, তাদের সারা গায়ে কালো শিরা আর চোখে নিঃশব্দ আঁধার।
কবিতার প্রথমার্ধে আধুনিক জীবনের যান্ত্রিকতা ও নৈতিক অবক্ষয়ের এক করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে। কবি বলছেন যে, প্রকৃতির উদার অরণ্যে গিয়ে একটু নিঃশ্বাস নেওয়ার জো নেই, কারণ মানুষের সন্নিকটে আজ আর কোনো বনভূমি অবশিষ্ট নেই। যুবকরা আজ নিজেদের ‘ব্যক্তিগত নিখোঁজ সংবাদ’ আস্তিনের ভাঁজে লুকিয়ে রাখে—অর্থাৎ তারা বেঁচে থেকেও মৃত, তাদের নিজস্ব পরিচয় আজ সংকটের মুখে। এমনকি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের মুখ লুকানোর রাস্তাও আজ বন্ধ। রবীন্দ্রনাথের সেই ঋজু ও বলিষ্ঠ মানুষের ধারণার বিপরীতে মহাদেব সাহার এই ‘যুবা’রা অত্যন্ত ম্লান, ফ্যাকাশে এবং অকালবৃদ্ধ।
তবে কবিতার দ্বিতীয়ার্ধে এক বিস্ময়কর উত্তরণ লক্ষ্য করা যায়। এত যন্ত্রণা আর অন্ধকারের মাঝেও কবি বলছেন—‘তবু আমরা কজন যুবা আজো ভালোবাসি গান’। এই ভালোবাসাটিই হলো বেঁচে থাকার রসদ। প্রিয়তমা ‘মাধবী’ এবং তার ‘বাংলাদেশ’—যাকে ঘিরে রয়েছে নিজস্ব বর্ণমালা আর রবীন্দ্রসঙ্গীত—সেটাই এই রুগ্ণ যুবকদের পরম আশ্রয়। যান্ত্রিক নগরজীবনের কদর্যতা কাটিয়ে তারা যখন সূর্যাস্ত দেখে বা ভোরের পাখির গান শোনে, তখন তাদের অস্তিত্বে যেন নতুন করে রৌদ্র ওঠে। সঙ্গীতের এই ‘উদার নিসর্গই’ তাদের ধীরে ধীরে বাঁচিয়ে তোলে।
পরিশেষে, মহাদেব সাহা রবীন্দ্রনাথকে কেবল একজন কবি হিসেবে নয়, বরং বাঙালির জাতীয় সত্তা ও বিপ্লবের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। যখন সব পরিচয় মানুষ ভুলে যায়, এমনকি নিজের নামটাও হারিয়ে ফেলে, তখনও বাঙালির হৃদয়ে জেগে থাকেন রবীন্দ্রনাথ। কবি ঘোষণা করেছেন যে, রবীন্দ্রনাথই আমাদের আবহমান বাংলাদেশ, আমাদের প্রদীপ্ত বিপ্লব এবং আমাদের চিরন্তন একুশে ফেব্রুয়ারি। অর্থাৎ, বাঙালির অস্তিত্বের প্রতিটি লড়াকু মোড়ে রবীন্দ্রনাথ এক অপরিহার্য শক্তি। সৃষ্টির সার্থকতা লৌকিক হাততালিতে নয়, বরং স্রষ্টার নিজের মানসিক মুক্তি এবং অস্তিত্বের তাগিদে—যা এই কবিতার প্রতিটি চরণে এক কালজয়ী সত্য হিসেবে প্রদীপ্ত হয়ে আছে।
মহাদেব সাহার এই কবিতায় নস্টালজিয়া আর সমকালীন রাজনীতির যে মেলবন্ধন ঘটেছে, তা আপনাকে নিশ্চয়ই গভীরভাবে স্পর্শ করে। বিশেষ করে যখন তিনি বলেন—‘রবীন্দ্রনাথ আমাদের চিরদিন একুশে ফেব্রুয়ারি’, তখন তা আমাদের জাতীয় চেতনার এক গভীর শিকড়কে মনে করিয়ে দেয়।
রবীন্দ্রোত্তর আমরা কজন যুবা – মহাদেব সাহা | মহাদেব সাহার কবিতা | আধুনিক বাংলা কবিতা | যুব, সংকট, রবীন্দ্রনাথ ও প্রতিরোধের অসাধারণ কাব্যভাষা
রবীন্দ্রোত্তর আমরা কজন যুবা: মহাদেব সাহার যুব সংকট, অসহায়ত্ব, আবহমান বাংলাদেশ ও রবীন্দ্রনাথের অসাধারণ কাব্যভাষা
মহাদেব সাহার “রবীন্দ্রোত্তর আমরা কজন যুবা” আধুনিক বাংলা কবিতার এক অনন্য, বেদনাবিধুর ও প্রতিবাদী সৃষ্টি। এটি একটি কবিতা নয়, বরং রবীন্দ্রনাথের উদ্দেশ্যে লেখা এক দীর্ঘ স্বীকারোক্তি। “শুনুন রবীন্দ্রনাথ এ যুগে ভীষণ দায় বাঁচা, বড়ো অসহায় / আমরা কজন যুবা আপনার শান্তিনিকেতনে প্রত্যহ প্রার্থনা / করি হে ঈশ্বর, আমাদের / শান্তি দাও” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে রবীন্দ্রোত্তর যুগের যুবাদের সংকট —সর্বত্র অনাবৃষ্টি, রৌদ্রে পোড়ে মাঠ, বোমায় শহর পোড়ে, মারী ও মড়কে কাঁপে দেশ। ব্যক্তিগত নিখোঁজ সংবাদ যারা ঢেকে রাখে আস্তিনের ভাঁজে, তারা বড়োই রুগ্ণ। তবু তারা ভালোবাসে গান, ভালোবাসে মাধবীকে, ভালোবাসে মাধবীর বাংলাদেশ, তার নিজস্ব বর্ণমালা রবীন্দ্রসঙ্গীত। সূর্যাস্ত মনোরম, ভোর হয়, পাখি নাচে — তারা ধীরে ধীরে বেঁচে ওঠে। এমনি করেই বুঝি এদেশে বিপ্লব আসে, একুশে ফেব্রুয়ারি আসে, নববর্ষ আসে। শেষে তারা জানান — সব পরিচয় ভুলে গেলেও মনে রাখেন রবীন্দ্রনাথ, তাদের আবহমান বাংলাদেশ, তাদের প্রদীপ্ত বিপ্লব, তাদের চিরদিন একুশে ফেব্রুয়ারি। মহাদেব সাহা একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কবি। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতায় যুব সংকট, অসহায়ত্ব, রবীন্দ্রচেতনা ও বাংলাদেশের প্রতি টানের জন্য পরিচিত। ‘রবীন্দ্রোত্তর আমরা কজন যুবা’ তাঁর সেই স্বকীয় কাব্যভাষার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যা রবীন্দ্রচেতনার গভীরতায় নিমজ্জিত।
মহাদেব সাহা: যুব, সংকট ও রবীন্দ্রচেতনার কবি
মহাদেব সাহা একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কবি। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতায় যুব সংকট, অসহায়ত্ব, রবীন্দ্রচেতনা ও বাংলাদেশের প্রতি টানের জন্য পরিচিত। ‘রবীন্দ্রোত্তর আমরা কজন যুবা’ তাঁর সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ — যেখানে তিনি রবীন্দ্রনাথকে সম্বোধন করে যুবাদের বর্তমান সংকট ও সম্ভাবনা চিত্রিত করেছেন।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘রবীন্দ্রোত্তর আমরা কজন যুবা’ (২০১৫), ‘নির্বাচিত কবিতা’ (২০২০) ইত্যাদি।
শিরোনাম ও কেন্দ্রীয় আবেদন
শিরোনাম ‘রবীন্দ্রোত্তর আমরা কজন যুবা’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘রবীন্দ্রোত্তর’ — রবীন্দ্রনাথের পরবর্তী যুগ। ‘আমরা কজন যুবা’ — অল্প কজন যুবক, সংখ্যালঘু, যারা রবীন্দ্রচেতনা ধরে রেখেছেন। কবি পুরো কবিতায় রবীন্দ্রনাথকে সম্বোধন করেছেন — ‘শুনুন রবীন্দ্রনাথ’। এটি একটি চিঠি, একটি স্বীকারোক্তি, একটি প্রার্থনা।
কবিতার স্তরে স্তরে বিশ্লেষণ
প্রথম স্তবক: দায় বাঁচা ও অসহায় যুবা
“শুনুন রবীন্দ্রনাথ এ যুগে ভীষণ দায় বাঁচা, বড়ো অসহায় / আমরা কজন যুবা আপনার শান্তিনিকেতনে প্রত্যহ প্রার্থনা / করি হে ঈশ্বর, আমাদের / শান্তি দাও” — প্রথম স্তবকে যুবাদের অসহায়ত্বের চিত্র। ‘ভীষণ দায় বাঁচা’ — বেঁচে থাকাটাই এখন দায়, কষ্ট। ‘প্রত্যহ প্রার্থনা করি হে ঈশ্বর শান্তি দাও’ — ঈশ্বরের কাছে শান্তি প্রার্থনা, কিন্তু তবু শান্তি নেই।
দ্বিতীয় স্তবক: সর্বত্র অনাবৃষ্টি ও ধ্বংস
“প্রত্যহ প্রার্থনা করি মঠে ও গির্জায় / আমাদের শান্তি দাও, দাও মহান ঈশ্বর, তবু / সর্বত্র আজ অনাবৃষ্টি, রৌদ্রে / পোড়ে মাঠ, বোমায় শহর পোড়ে, লোকালয় উচ্ছন্নে যায় / মারী ও মড়কে কাঁপে দেশ” — দ্বিতীয় স্তবকে ধ্বংসের চিত্র। মঠে-গির্জায় প্রার্থনা, তবু কোনও শান্তি নেই। ‘অনাবৃষ্টি’ — খরা। ‘রৌদ্রে পোড়ে মাঠ’ — কৃষির ধ্বংস। ‘বোমায় শহর পোড়ে’ — যুদ্ধ ও সহিংসতা। ‘মারী ও মড়কে কাঁপে দেশ’ — রোগ ও মৃত্যু।
তৃতীয় স্তবক: ব্যক্তিগত নিখোঁজ সংবাদ ও রোগ
“শুনুন রবীন্দ্রনাথ এ যুগে আমরা বড়ো / অসহায় কজন যুবক, বিশেষত আমরা কজন যুবা / ব্যক্তিগত নিখোঁজ সংবাদ যারা ঢেকে রাখি সর্বক্ষণ আস্তিনের / পুরু ভাঁজে, বড়োই রুগ্ণ আমরা” — তৃতীয় স্তবকে ব্যক্তিগত সংকট। ‘নিখোঁজ সংবাদ ঢেকে রাখি’ — নিজেদের হারানো, নিজেদের বিচ্ছিন্নতার কথা লুকিয়ে রাখি। ‘আস্তিনের পুরু ভাঁজে’ — নিজেদের বুকের ভেতর। ‘বড়োই রুগ্ণ’ — অসুস্থ, ভাঙা।
চতুর্থ স্তবক: প্রকৃতি ও অরণ্যহীনতা
“এ যুগে নিঃশ্বাস নেবো প্রকৃতিতে বৃষ্টিতে বা উদার অরণ্যে দাঁড়াবো / এমন জো নেই কোনো, / আমাদের সন্নিকটে বনভূমি নেই।” — চতুর্থ স্তবকে প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্নতা। ‘নিঃশ্বাস নেওয়ার জো নেই’ — শ্বাস ফেলার শক্তি নেই। ‘সন্নিকটে বনভূমি নেই’ — কাছাকাছি কোনো বন নেই, কোনো নিরিবিলি জায়গা নেই।
পঞ্চম স্তবক: রোগ, আঁধার ও অনাচার
“এখন ভীষণ রুগ্ন আমরা, সারা গায়ে কালোশিরা, চোখ ভর্তি / নিঃশব্দ আঁধার, যেখানে যাই আমরা কজন যুবা / যেন বড়ো বেশি ম্লান ফ্যাকাশে বৃদ্ধ, চোখমুখে / স্পষ্ট হয়ে লেগে থাকে যাবতীয় অনাচার, নিজের কাছেও / আজ নিজেদের লুকাবার রাস্তা খোলা নেই” — পঞ্চম স্তবকে রোগ ও অনাচারের চিত্র। ‘কালোশিরা’ — শিরায় শিরায় কালো বেদনা। ‘চোখ ভর্তি নিঃশব্দ আঁধার’ — চোখে কোনো আলো নেই, শুধু অন্ধকার। ‘ম্লান ফ্যাকাশে বৃদ্ধ’ — যুবক হওয়া সত্ত্বেও দেখতে বৃদ্ধের মতো। ‘যাবতীয় অনাচার মুখে লেগে থাকে’ — সব অন্যায়, সব কুৎসা তাদের মুখে দাগ কেটেছে।
ষষ্ঠ স্তবক: তবু ভালোবাসা গান, মাধবী ও বাংলাদেশ
“শুনুন রবীন্দ্রনাথ তবু আমরা / কজন যুবা আজো ভালোবাসি গান, তবু / আমরা কজন যুবক / বড়ো ভালোবাসি মাধবীকে, ভালোবাসি মাধবীর বাংলাদেশ / তার নিজস্ব বর্ণমালা রবীন্দ্রসঙ্গীত।” — ষষ্ঠ স্তবকে আশার আলো। ‘তবু’ — এতকিছুর পরও। ‘ভালোবাসি গান’ — সঙ্গীত ভালোবাসা এখনও আছে। ‘ভালোবাসি মাধবীকে’ — হয়ত নারী, আর ‘মাধবীর বাংলাদেশ’ — মাধবী মানে বসন্তকাল, অথবা প্রেয়সী। রবীন্দ্রসঙ্গীত তাদের নিজস্ব বর্ণমালা।
সপ্তম স্তবক: সূর্যাস্ত, ভোর ও বেঁচে ওঠা
“শুনুন রবীন্দ্রনাথ আমরা কজন যুবা, বড়ো বেশি অসহায় কজন / যুবা, তখন তাকিয়ে দেখি সূর্যাস্ত কী / মনোরম, কিংবা ভোর হয় আমাদের সমস্ত অস্তিত্বে রৌদ্র / ওঠে, পাখি নাচে, আমরা কজন এই ভয়ানক রুগ্ণ যুবা পুনরায় / মাঠে যাই আমরা নিঃশ্বাস নিই সঙ্গীতের উদার নিসর্গে, আমরা / যেন ধীরে ধীরে বেঁচে উঠি” — সপ্তম স্তবকে পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া। ‘সূর্যাস্ত কী মনোরম’ — প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হওয়া। ‘ভোর হয়, রৌদ্র ওঠে, পাখি নাচে’ — নতুন দিনের শুরু। ‘নিঃশ্বাস নিই সঙ্গীতের উদার নিসর্গে’ — সঙ্গীতের উদার পরিবেশে শ্বাস নেওয়া। ‘ধীরে ধীরে বেঁচে উঠি’ — আস্তে আস্তে ফিরে আসা।
অষ্টম স্তবক: বিপ্লব, একুশে ফেব্রুয়ারি ও নববর্ষ
“তখন মনে হয় এমনি করেই বুঝি এদেশে / বিপ্লব আসে, একুশে ফেব্রুয়ারি আসে, নববর্ষ আসে” — অষ্টম স্তবকে ঐতিহাসিক ঘটনার উল্লেখ। ‘বিপ্লব আসে’ — প্রতিরোধ আসে। ‘একুশে ফেব্রুয়ারি আসে’ — ভাষা আন্দোলনের দিন, আত্মত্যাগের দিন। ‘নববর্ষ আসে’ — নতুন শুরু, নতুন সম্ভাবনা।
নবম স্তবক: শেষ কথায় রবীন্দ্রনাথ, বাংলাদেশ ও একুশে ফেব্রুয়ারি
“আমরা কতিপয় যুবা / তাই আর সব পরিচয় যখন ভুলে যাই এমনকী ভুলে / যাই নিজেদের নাম, তখনো মনে রাখি / রবীন্দ্রনাথ আমাদের আবহমান বাংলাদেশ / আমাদের প্রদীপ্ত বিপ্লব, / রবীন্দ্রনাথ আমাদের চিরদিন একুশে ফেব্রুয়ারি।” — নবম স্তবক — শেষ স্তবক — পুরো কবিতার চূড়ান্ত বাণী। ‘সব পরিচয় ভুলে যাই, এমনকী নিজের নাম ভুলে যাই’ — চরম সীমায় পৌঁছে গেছে, আত্মপরিচয়ও হারিয়ে ফেলেছে। ‘তখনো মনে রাখি রবীন্দ্রনাথ’ — সেই আত্মহারা অবস্থায়ও রবীন্দ্রনাথকে মনে রাখে। ‘আবহমান বাংলাদেশ’ — চিরন্তন বাংলাদেশ। ‘প্রদীপ্ত বিপ্লব’ — জ্বলজ্বলে প্রতিরোধ। ‘চিরদিন একুশে ফেব্রুয়ারি’ — রবীন্দ্রনাথই তাদের কাছে চিরকালের একুশে ফেব্রুয়ারি — অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ ভাষা আন্দোলনের চেয়েও বড়, অথবা রবীন্দ্রনাথই তাদের ভাষা আন্দোলনের প্রেরণা।
প্রশ্নোত্তর: গভীর পাঠের জন্য
প্রশ্ন ১: ‘রবীন্দ্রোত্তর আমরা কজন যুবা’ কবিতাটির লেখক কে?
উত্তর: এই কবিতাটির লেখক মহাদেব সাহা। তিনি একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কবি।
প্রশ্ন ২: ‘শুনুন রবীন্দ্রনাথ’ — কেন এই সম্বোধন?
উত্তর: কবি রবীন্দ্রনাথকে সম্বোধন করে বর্তমান যুগের যুবাদের সংকট ও আশা জানাচ্ছেন। এটি একটি চিঠি, স্বীকারোক্তি ও প্রার্থনা।
প্রশ্ন ৩: ‘ভীষণ দায় বাঁচা’ — কেন বলা হয়েছে?
উত্তর: বর্তমান যুগে বেঁচে থাকাটাই কঠিন হয়ে গেছে। যুদ্ধ, দারিদ্র্য, রোগ, অনাচার — সব মিলিয়ে বাঁচাটাই এক ‘দায়’।
প্রশ্ন ৪: ‘প্রত্যহ প্রার্থনা করি মঠে ও গির্জায়’ — কেন?
উত্তর: যুবারা ঈশ্বরের কাছে শান্তি চায়, কিন্তু কোনো লাভ হয় না। মঠ ও গির্জা — দুই ধর্মের উপাসনালয় — ধর্মের সংকীর্ণতা ছাড়িয়ে সর্বধর্মের মানুষের প্রার্থনার কথা।
প্রশ্ন ৫: ‘ব্যক্তিগত নিখোঁজ সংবাদ ঢেকে রাখি আস্তিনের পুরু ভাঁজে’ — কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: প্রতিটি যুবক নিজের ভেতরে হারানো, বিচ্ছিন্ন হওয়া, মানসিক ভাঙনের গল্প লুকিয়ে রাখে। ‘নিখোঁজ সংবাদ’ — নিজের সত্তা হারিয়ে ফেলার খবর।
প্রশ্ন ৬: ‘সারা গায়ে কালোশিরা’ — কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: রোগ, যন্ত্রণা, বেদনা শিরায় শিরায় ছড়িয়ে আছে। ‘কালো’ নীলাভ, মৃতপ্রায় রং।
প্রশ্ন ৭: ‘যেন বড়ো বেশি ম্লান ফ্যাকাশে বৃদ্ধ’ — কেন যুবকদের বৃদ্ধ বলা হয়েছে?
উত্তর: অল্প বয়সেই ক্লান্ত, ভাঙা, রোগাক্রান্ত যুবকেরা — বয়সে যুবক, মানসিক ও শারীরিক অবস্থায় বৃদ্ধের মতো।
প্রশ্ন ৮: ‘তবু আমরা কজন যুবা আজো ভালোবাসি গান’ — ‘তবু’ শব্দটির গুরুত্ব কী?
উত্তর: ‘তবু’ — এত দুর্দশা, রোগ, অসহায়ত্ব সত্ত্বেও। গান এখনও বেঁচে আছে, ভালোবাসা এখনও বেঁচে আছে।
প্রশ্ন ৯: ‘রবীন্দ্রনাথ আমাদের আবহমান বাংলাদেশ, আমাদের প্রদীপ্ত বিপ্লব, রবীন্দ্রনাথ আমাদের চিরদিন একুশে ফেব্রুয়ারি’ — কেন বলা হয়েছে?
উত্তর: রবীন্দ্রনাথ তাদের কাছে শুধু কবি নন — তিনি বাংলাদেশ, তিনি বিপ্লব, তিনি ভাষা আন্দোলন। তিনি তাদের পরিচয়ের ভিত্তি।
প্রশ্ন ১০: কবিতার মূল শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা কী?
উত্তর: কবিতাটি শেখায় — রবীন্দ্রোত্তর যুগের যুবাদের অবস্থা ভয়াবহ। তারা রোগাক্রান্ত, ভাঙা, অসহায়, নিজেদের হারিয়ে ফেলেছে। তবু রবীন্দ্রনাথকে মনে রেখে, গান ভালোবেসে, মাধবীর বাংলাদেশকে ভালোবেসে, সূর্যাস্ত ও ভোরের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তারা ধীরে ধীরে বেঁচে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ তাদের কাছে বাংলাদেশ, বিপ্লব ও একুশে ফেব্রুয়ারি।
ট্যাগস: রবীন্দ্রোত্তর আমরা কজন যুবা, মহাদেব সাহা, মহাদেব সাহার কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, যুব সংকট, রবীন্দ্রচেতনা, বাংলাদেশ ও ভাষা আন্দোলন
© Kobitarkhata.com – কবি: মহাদেব সাহা | কবিতার প্রথম লাইন: “শুনুন রবীন্দ্রনাথ এ যুগে ভীষণ দায় বাঁচা, বড়ো অসহায়” | যুব, সংকট, রবীন্দ্রনাথ ও প্রতিরোধের অসাধারণ কাব্যভাষা | আধুনিক বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন