কবির জবাব – আর্যতীর্থ।

কাল থেকে কবিতা না লিখলে কিছু মনে করবে?
কবির সাথীটি তাকালেন।
দুমিনিট চুপ থাকলেন।
তারপরে, ঈষৎ ব‍্যঙ্গ আর ঈষৎ সমবেদনার সাথে
অভিজ্ঞতা মিশিয়ে উত্তর দিলেন,
ওটা তো সিগারেটের মতো,
ক’টা দিন না লিখে ছটফট,
অনতিবিলম্বে নিশ্চিত ফের লেখা ধরবে।

না , যদি সত‍্যি সত‍্যিই কাল থেকে আর একটাও কবিতা না লিখি!

সাথী বললেন ,
একটু সুবিধা হবে ঠিকই,
আধাসংসারী নিয়ে বাঁচা,
রান্না হবে না পোড়া কাঁচা,
বাজারের ফর্দটা মনোযোগ পাবে অবশেষে
এখন যে সংলাপে মৌনতা গ্রাস করে চোখের নিমেষে
মনোলগ না হয়ে ডায়ালগ হবে..
তবে.. বুঝি আমি অনুভবে,
সে তুমিটা ঠিক যেন তুমি হবে না,
সাথী মাইনাস কবি আমার অচেনা,
তার বেশি কিছু নয়…
রিটায়ার করা কবি বরং হয়তো দেবে আমাকে সময়।

কবির মাথাতে ধারণাটা ঘুরপাক খেতে থাকে ,
কলম থামিয়ে দিলে কেউ কিছু বলবে কি তাকে,
নাকি আবহাওয়া সংবাদদাতার নিস্পৃহতায়
হাওয়া মোরগের দিক বদলিয়ে বলে দেবে,
ওখানে এখন আর ঝড় ভূমিকম্প বা বৃষ্টি হয় না,
কাজেই রাখছি না ওনাকে হিসেবে,
অমুক কবিটির তাপমাত্রা উচ্চ নিম্নে এত ছিলো আজ,
তমুক কবিতে বজ্র-বিদ‍্যুৎ সহকারে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা,
পরবর্তী বুলেটিন রাত আটটায়..
কবি ভাবতে থাকেন,
কলম-কারি’র দাঁড়িতে সত‍্যি কি কারো কিছু আসে যায়?

সেদিন থেকে তিনি প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিতে থাকেন নানা জটলায়
চায়ের দোকানে,
অফিসে,
বিয়েবাড়িতে,
পানশালায়,
এমন কি কবি-সম্মেলনগুলিতে,
স্বভাবত ভদ্রজনেরা থতমত খান তার উত্তর দিতে,
তবে শরীরী ভঙ্গিমা বলে
কে এলো কোথা থেকে হরিদাস পাল,
শিক্ষা স্বাস্থ‍্য বা চাকরি তো না,
পোড়া বাংলায় থোড়ি কবির আকাল!

কিছুদিন গেলে পরে কবিটি বোঝেন,
স্মরণের আশ্বাস বৃথাই খোঁজেন,
বর্তমানের থেকে আর বেশি দূরে না দেখাই ভালো,
প্রায়বিলুপ্ত জোনাকির মতো ক্ষণিকের দীপ্তি যে আলো,
সে নিভে গেলে তাকে গিলবে আঁধার,
অন‍্য জোনাক-পানে চলে যাবে চোখ,
কবি কেন লিখছে না,
সেই হেতু খুঁজে শোকে থাকবে না লোক,
লিখলে পড়বে কেউ,
পাঠকের মনে কথা দিতে পারে ঢেউ ,
কিন্তু আলাদা কিছু নয় তা আদৌ,
আরো আরো আরো ঢেউ প্রত‍্যহ পাড়-এএ পড়ে এসে,
মাঝ-জলে যে হারালো,
পরের তরঙ্গ তাকে ঢেকে দেয় চোখের নিমেষে ।

কোনো এক রুটিন সকালে,
কবিটি থমকে যান দর্পণ দেখে
বহুদিন পরে ভালো করে দেখেন নিজেকে,
মুখ নয়, চোখ আটকায় গিয়ে সোজা দুই চোখে,
বলতে কী চায় প্রতিবিম্বটি ওঁকে?

সহসা বোঝেন কবি ।
যে জবাবের খোঁজে বাইরে ঘোরেন হয়ে হন‍্যে,
লেফাফায় নাম লিখে সেই উত্তর আয়নায় পাঠিয়েছে তাঁকে,
অতীতের সে পাগল,
কবিতায় আসা তাঁর যার নিশি-ডাকে,
স্থায়ী পোস্টম‍্যান যে হেমন্তের অরণ‍্যে।

দুই লাইন শুধু তাতে লেখা,
কবিই দেখতে পান একা..
‘ লেখ তুই, না লিখে উপায় নেই বলে,
লিখে চল স্রেফ তোর নিজের জন‍্যে।’

আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। আর্যতীর্থের কবিতা।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x