কবিতার খাতা
স্বপ্নজাল – দিলারা হাফিজ।
কী আসে যায় তোমায় যদি হারিয়ে ফেলি স্বপ্ন জালে,
হারাতে হারাতে নিঃস্ব যদি হতেই পারি
অনাগত দিন বদলের অপেক্ষাতে
কী আসে যায় তাতেই কোনো।
জীবন নামের ব্ল্যাকহোলে আর কটা দিন
বেশি বেঁচে কীইবা এমন ক্ষতি বৃদ্ধি সাধনাতে?
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। দিলারা হাফিজের কবিতা।
কবিতার কথা —
দিলারা হাফিজের ‘স্বপ্নজাল’ কবিতাটি মূলত অস্তিত্ববাদ এবং বৈরাগ্যের এক চমৎকার মেলবন্ধন। এখানে কবি জীবনের এক চরম ও নির্মম সত্যকে অত্যন্ত সহজভাবে উপস্থাপন করেছেন। মানুষের জীবন প্রতিনিয়ত পাওয়ার নেশায় মত্ত, কিন্তু এই কবিতায় কবি ‘হারিয়ে ফেলা’ বা ‘নিঃস্ব হওয়া’র মাঝেই এক ধরণের মুক্তি এবং সাহসিকতা খুঁজে পেয়েছেন। ‘কী আসে যায় তোমায় যদি হারিয়ে ফেলি স্বপ্ন জালে’—এই প্রারম্ভিক জিজ্ঞাসাটি আসলে কোনো অভিযোগ নয়, বরং এটি এক ধরণের আধ্যাত্মিক নির্লিপ্ততা। স্বপ্ন যখন জালের মতো আমাদের ঘিরে ধরে, তখন সেই জালে প্রিয়জনকে হারানো বা নিজেকে হারিয়ে ফেলাটা কবির কাছে কোনো বড় বিপর্যয় মনে হয়নি। কারণ, এই হারানোর মধ্য দিয়ে তিনি আসলে এক ধরণের রিক্ততার আভিজাত্য অর্জন করতে চেয়েছেন।
কবিতার একপর্যায়ে ‘নিঃস্ব’ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। সাধারণত মানুষ রিক্ত হতে ভয় পায়, কিন্তু কবি এখানে ‘হারাতে হারাতে নিঃস্ব’ হওয়াকে বরণ করে নিতে চেয়েছেন। এর পেছনে রয়েছে ‘অনাগত দিন বদলের অপেক্ষা’। এটি নির্দেশ করে যে, পুরাতনকে পূর্ণাঙ্গভাবে বিসর্জন না দিলে নতুনের আগমন সম্ভব নয়। নিজেকে সম্পূর্ণ খালি করে দেওয়ার মাধ্যমেই আসলে নতুন কোনো সৃষ্টির বা নতুন কোনো সময়ের সূচনা হতে পারে। এই শূন্যতাই হলো পূর্ণতার পূর্বশর্ত। কবির এই দর্শন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জাগতিক মায়া বা প্রাপ্তির চেয়ে হারানো বা ত্যাগের শক্তি অনেক বেশি শক্তিশালী হতে পারে।
কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী ও আধুনিক রূপকটি হলো ‘জীবন নামের ব্ল্যাকহোল’। ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বর যেমন মহাবিশ্বের সবকিছুকে নিজের ভেতরে টেনে নেয় এবং সেখান থেকে কোনো আলোও ফিরে আসতে পারে না, মানুষের জীবনও তেমনি এক অনিবার্য গহ্বর। সময় এখানে সবকিছুকে গ্রাস করে নেয়। কবি প্রশ্ন তুলেছেন, এই কৃষ্ণগহ্বরের কিনারে দাঁড়িয়ে আর কটা দিন ‘বেশি বেঁচে’ কী লাভ? এই জিজ্ঞাসাটি জীবনের গুণগত মান বনাম দীর্ঘায়ুর এক দ্বন্দ্বে আমাদের দাঁড় করিয়ে দেয়। আধ্যাত্মিক সাধনা বা জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য যেখানে অস্পষ্ট, সেখানে কেবল সংখ্যাতাত্ত্বিক হিসেবে কয়েকটা দিন বেশি বেঁচে থাকা বা বৈষয়িক ‘ক্ষতি বৃদ্ধি’র হিসাব করা কবির কাছে নিতান্তই অর্থহীন মনে হয়েছে।
এখানে ‘সাধনা’ শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষের সারাজীবনের চেষ্টা বা সাধনা যদি কেবল বেঁচে থাকার তুচ্ছ গ্লানিতেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে সেই সাধনা ব্যর্থ। কবি জীবনের এই মায়াজাল বা স্বপ্নজাল ছিঁড়ে এক বৃহত্তর সত্যের দিকে তাকাতে চেয়েছেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, জীবন যখন এক অনন্ত শূন্যতার দিকে ধাবমান, তখন ব্যক্তিগত ক্ষতি বা প্রাপ্তি নিয়ে বিচলিত হওয়াটা এক ধরণের বোকামি। এই জীবনদর্শনের ভেতর দিয়ে তিনি আসলে এক ধরণের প্রশান্তি খুঁজে পেয়েছেন। হারানোর ভয় যার নেই, সেই আসলে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষ।
পরিশেষে বলা যায়, ‘স্বপ্নজাল’ কবিতাটি আমাদের শেখায় যে জীবন কেবল টিকে থাকার লড়াই নয়, বরং এটি নিজেকে জানার ও বোঝার এক অন্তহীন প্রক্রিয়া। দিলারা হাফিজ এখানে জীবনের রূঢ় বাস্তবতাকে বৈজ্ঞানিক রূপক (ব্ল্যাকহোল) এবং কাব্যিক আবেগের মিশেলে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। বিচ্ছেদ বা ক্ষতি এখানে কোনো যন্ত্রণার কারণ নয়, বরং তা এক মহাজাগতিক সত্যের অংশ।






