কবিতার খাতা
এর বেশি কখনো চাইনি – সুবোধ সরকার।
দুবেলা দুমুঠো ভাত আর কোন মাসে একবার নৌকোযাত্রা
আমি কিন্তু এর বেশি কখনো চাইনি।
কিন্তু নিয়তি এসে চারটি পেরেক পুঁতে মশারি টাঙায়।
সেই থেকে আমাদের চারহাতে গর্ত পেরেকের।
একবার নৌকোযাত্রা, তাকে তুমি উচ্চাকাঙ্ক্ষা বলো?
আমার ওষুধ কিনে যে ছেলেটি ফিরছে এখন
তাকে ধরো, সে আমার সব কথা জানে
সে আর নিয়তি ফেরে এক অশ্বে, মাঝখানে ডক্টর লাহিড়ী।
শরশয্যার দিনে আমার ছেলেটি যাবে ওষুধ আনতে
আমি কিন্তু এর বেশি কখনো চাইনি।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। সুবোধ সরকারের কবিতা।
কবিতার কথা—
সুবোধ সরকারের ‘এর বেশি কখনো চাইনি’ কবিতাটি মধ্যবিত্ত জীবনের এক চরম হাহাকার, সীমাবদ্ধতা এবং নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসের এক সকরুণ আখ্যান। কবিতার শুরুতেই কবি মানুষের অতি সাধারণ ও মৌলিক কিছু ইচ্ছার কথা বলেছেন—‘দুবেলা দুমুঠো ভাত’ আর মাসে অন্তত একবার ‘নৌকোযাত্রা’। এই আকাঙ্ক্ষার মাঝে কোনো রাজকীয় বিলাসিতা নেই, নেই কোনো আকাশচুম্বী উচ্চাকাঙ্ক্ষা। দুমুঠো ভাতের নিশ্চয়তা জীবনধারণের নূন্যতম দাবি, আর নৌকোযাত্রা হলো নাগরিক জীবনের যান্ত্রিকতা থেকে ক্ষণিকের মুক্তি বা একটুখানি প্রশান্তি। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, এই নূন্যতম চাওয়াটুকুও যখন এক সাধারণ মানুষের জীবনে দুষ্প্রাপ্য হয়ে ওঠে, তখনই কবিতার মূল সুরটি ধরা পড়ে। মানুষের ক্ষুদ্র ইচ্ছাগুলোও যখন অপূর্ণ থাকে, তখন তার দারিদ্র্য কেবল পেটের নয়, আত্মার দারিদ্র্যে পরিণত হয়।
কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী এবং বিঁধে যাওয়ার মতো রূপক হলো ‘নিয়তি এসে চারটি পেরেক পুঁতে মশারি টাঙায়’। মশারি সাধারণত সুরক্ষা বা আশ্রয়ের প্রতীক হলেও এখানে তা হয়ে উঠেছে এক বন্দিদশা বা সীমাবদ্ধতার খাঁচা। সেই মশারির খুঁটি নয়, বরং নিয়তি সেখানে পেরেক পুঁতছে। এই পেরেকবিদ্ধ অবস্থাটি যিশু খ্রিস্টের ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার যন্ত্রণাকে মনে করিয়ে দেয়। ‘সেই থেকে আমাদের চারহাতে গর্ত পেরেকের’—এই পঙক্তিটি দিয়ে কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, সাধারণ মানুষের জীবন আসলে এক অবিরত আত্মত্যাগ ও দহনের নাম। বেঁচে থাকার তাগিদে তাদের প্রতিনিয়ত ক্রুশবিদ্ধ হতে হয়। অভাবের তাড়নায় মানুষের হাতগুলো এখন আর সৃজনশীল নয়, বরং সেগুলো নিয়তির পেরেকের গর্তে ক্ষতবিক্ষত।
কবি এখানে একটি অত্যন্ত মানবিক ও করুণ সম্পর্কের অবতারণা করেছেন। যে ছেলেটি কবির জন্য ওষুধ কিনে ফিরছে, সে কবির অভাব এবং অস্তিত্বের প্রতিটি স্তর চেনে। কিন্তু সেই ছেলেটি আর ‘নিয়তি’ যেন একই ঘোড়ায় চড়ে ফিরছে, যার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন ডক্টর লাহিড়ী। অর্থাৎ, মানুষের অসুস্থতা, জরা এবং মৃত্যু যখন অনিবার্য হয়ে ওঠে, তখন সেখানে নিয়তি আর বাস্তবতার মাঝে কেবল ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনটুকু ঝুলে থাকে। চিকিৎসা বা ওষুধের এই যে চক্র, তা মধ্যবিত্তের জীবনের শেষ সঞ্চয়টুকুও শুষে নেয়। কবি যখন প্রশ্ন করেন—একবার নৌকোযাত্রাকে কি উচ্চাকাঙ্ক্ষা বলা যায়? তখন তা পাঠকের বিবেকের কাছে এক বিশাল প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়ায়। যে সমাজে সামান্য বিনোদনও বিলাসিতা বলে গণ্য হয়, সেই সমাজব্যবস্থার রুগ্নতা এখানে ফুটে উঠেছে।
কবিতার শেষাংশটি এক ধরণের অদ্ভুত নির্লিপ্ততা ও করুণ ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়। ‘শরশয্যার দিনে আমার ছেলেটি যাবে ওষুধ আনতে’—এই পঙক্তিটি যেমন দায়িত্ববোধের কথা বলে, তেমনি তা এক ধরণের চক্রাকার কষ্টের গল্পও শোনায়। কবি জানেন, তাঁর শেষ জীবনেও শান্তি নেই; আছে কেবল ওষুধের শিশি আর ছেলের দৌড়ঝাঁপ। কিন্তু অদ্ভুতভাবে কবি বারবার বলছেন, তিনি এর বেশি কিছু চাননি। এই ‘না চাওয়া’র আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর প্রতিবাদ। সমাজ যখন মানুষকে তার নূন্যতম অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, তখন মানুষ তার আকাঙ্ক্ষাকে ছোট করতে করতে একসময় শূন্যে নামিয়ে আনে। এই রিক্ততা আসলে কবির দয়া প্রার্থনা নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের এবং কাঠামোর প্রতি এক তীব্র শ্লেষ।
পরিশেষে বলা যায়, সুবোধ সরকার এখানে অতি সাধারণ শব্দের বুননে এক অসাধারণ দীর্ঘশ্বাস তৈরি করেছেন। ‘এর বেশি কখনো চাইনি’ কেবল একটি ব্যক্তিগত আর্তি নয়, এটি কোটি কোটি মানুষের সেই না-পাওয়া জীবনের প্রতিচ্ছবি যারা স্বপ্ন দেখতেও ভয় পায়। এই কবিতায় প্রেম নেই, সৌন্দর্য নেই; আছে কেবল বেঁচে থাকার এক বিবর্ণ ও ক্ষতবিক্ষত লড়াই।






