কবিতার খাতা
সময় – জীবনানন্দ দাশ।
সময়, আমারে যদি জাদুবল দাও তুমি
তা হলে আবার এক শিশু হব আমি
মায়ের আঁচল ছেড়ে শরতের পীত শ্যাম মধুকূপী ঘাসে
খড়ির গুঁড়োর মতো ধবল ধূলায়
কোনও দূর ময়ানি নদীর পারে
ময়জানি পাখিদের চেনা এক কুঁজো ঘাড় খড়িপর্বতের
খানিকটা চাঙড়ের মতো আমি
বাতাসের ঠেলা খেয়ে
গড়াব ভোরের রৌদ্রে- অবিরল-
দেখো তুমি যেন আমি অভিভূত মুখ দেখে ফিরি শুধু
নদীদের তরঙ্গের আরশিতে
হেসে-হেসে ভেঙে ফেলি
পৃথিবীর চৌকোনা মেহগেনি-ফ্রেমে আঁটা নিস্তব্ধতা
সেই স্বর শুনে তবু
যেন কোনও পরির শেমিজ থেকে স্খলিত- ধবল
রুপালি কাজলি ফলি সরপুঁটি ভরা স্বচ্ছ নির্ঝরের জল
আমারে না গিলে খায়-
চাঁদ যেন মননের দীপ থেকে উদ্গীরিত ধূমা মেখে
যেন কোনও বুনুনির কাপড়ে আনন্দ তার ঢেকে
দীর্ঘ এক পুরোহিত তরুণীর মতো
ঘোর কৃষ্ণ স্লেটগিরির স্তব্ধ
পূর্ণ শীর্ষে জেগে নাহি ওঠে আর…
সহসা গোরুর মুখ সন্ধ্যায়
গোগ্রাসে শূন্যের দিকে চেয়ে আছে
যেন তার কিছু গিলিবার
নাই আর;
অন্ধকার প্রান্তরের গালভাঙা, হে তরুণী গাভী,
আজও তুমি ছায়া খাও?
কার কাছে করিতেছ খানিকটা বাতাসের তৃণগুচ্ছ দাবি!
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। জীবনানন্দ দাশের কবিতা।
কবিতার কথা —
জীবনানন্দ দাশের ‘সময়’ কবিতাটি মহাকালের প্রেক্ষাপটে মানুষের নশ্বরতা, হারানো শৈশব এবং প্রকৃতির এক বিষণ্ণ ও পরাবাস্তব রূপকল্প। জীবনানন্দের কবিতার চিরকালীন বৈশিষ্ট্য হলো সময়ের এক অমোঘ আবর্তনকে অনুভব করা, যেখানে বর্তমান মুহূর্তটি অতীতের মায়া আর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তায় ঘেরা। কবিতার শুরুতেই কবির এক হাহাকারভরা প্রার্থনা—সময়ের কাছে তিনি ‘জাদুবল’ চাইছেন। এই জাদুবল আসলে আর কিছুই নয়, তা হলো পুনরায় শিশু হওয়ার এক অসম্ভব আকুতি। শৈশব মানেই এক আদিম স্বাধীনতা, যেখানে মায়ের আঁচল ছেড়ে প্রকৃতির অবারিত ঘাসের ওপর লুটোপুটি খাওয়া যায়। কবির এই আকাঙ্ক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বড় হওয়ার সাথে সাথে মানুষ তার চারপাশের জগত থেকে যে বিচ্ছিন্নতায় ভোগে, শৈশবই পারে তাকে সেই অখন্ড প্রকৃতির সাথে পুনরায় যুক্ত করতে।
কবিতার চিত্রকল্পগুলো অত্যন্ত প্রগাঢ় এবং জীবনানন্দীয় বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। ‘শরতের পীত শ্যাম মধুকূপী ঘাস’ কিংবা ‘খড়ির গুঁড়োর মতো ধবল ধূলা’—এই বর্ণনাগুলো পাঠককে এক মায়াবী ও ধূসর প্রান্তরে নিয়ে যায়। কবি নিজেকে কল্পনা করেছেন ‘ময়জানি’ নদীর পাড়ে এক খণ্ড পাহাড়ের চাঙড় বা পাথরের মতো। এটি এক ধরণের ‘অবজেক্টিভ কো-রিলেটিভ’ বা বস্তুর সাথে নিজের সত্তাকে একীভূত করা। তিনি বাতাসের ঠেলায় ভোরের রৌদ্রে গড়াতে চান। এখানে ভোরের রৌদ্র কেবল আলো নয়, বরং তা পবিত্রতা ও নতুনত্বের প্রতীক। নদীর তরঙ্গের আয়নায় নিজের অভিভূত মুখ দেখে তিনি পৃথিবীর সেই ‘মেহগেনি-ফ্রেমে আঁটা নিস্তব্ধতা’ বা কৃত্রিম সামাজিক কাঠামোর গাম্ভীর্যকে হাসিতে ভেঙে ফেলতে চান। এই নিস্তব্ধতা আসলে নাগরিক সভ্যতার সেই জড়তা, যা মানুষের প্রাণের স্বতঃস্ফূর্ততাকে রুদ্ধ করে রাখে।
কবিতার দ্বিতীয় অংশে এক অদ্ভুত পরাবাস্তবতা বা সারিয়ালিজম উঁকি দেয়। ‘পরির শেমিজ থেকে স্খলিত’ ঝরনার জল বা রুপালি মাছের রূপকগুলো সৌন্দর্যের সাথে সাথে এক ধরণের প্রচ্ছন্ন ভয়েরও সৃষ্টি করে। কবি ভয় পাচ্ছেন সেই স্বচ্ছ নির্ঝরের জল যেন তাকে গিলে না খায়। অর্থাৎ, সৌন্দর্যের মাঝে যে ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা থাকে, তার প্রতি কবির এক আদিম সতর্কতা এখানে স্পষ্ট। চাঁদের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি যে উপমা ব্যবহার করেছেন—‘মননের দীপ থেকে উদ্গীরিত ধূমা মেখে’—তা এক গভীর আধ্যাত্মিক ও মনস্তাত্ত্বিক স্তরের কথা বলে। চাঁদ এখানে কেবল আকাশের জ্যোতিষ্ক নয়, বরং তা মানুষের ভাবনার এক ধূসর প্রকাশ। ‘দীর্ঘ এক পুরোহিত তরুণীর মতো’ সেই চাঁদ যখন স্লেটগিরির শীর্ষে জেগে ওঠে না, তখন এক নিঃসীম শূন্যতার সৃষ্টি হয়।
কবিতার শেষাংশটি এক চরম বিষণ্ণতা ও অস্তিত্বের হাহাকারে পূর্ণ। সন্ধ্যার অন্ধকারে গোরুর মুখ যখন গোগ্রাসে শূন্যের দিকে চেয়ে থাকে, তখন তা কেবল একটি প্রাণীর ছবি থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে আধুনিক মানুষের অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। ‘যেন তার কিছু গিলিবার নাই আর’—এই পঙক্তিটি জীবনের সেই রিক্ততাকে নির্দেশ করে যেখানে সব প্রাপ্তিই অর্থহীন মনে হয়। ‘অন্ধকার প্রান্তরের গালভাঙা তরুণী গাভী’র রূপকটি এক জীর্ণ ও শ্রান্ত পৃথিবীর প্রতিচ্ছবি। সে ছায়া খাচ্ছে এবং বাতাসের কাছে তৃণের দাবি করছে—এই অসম্ভব কল্পনাটি আসলে অভাব এবং অতৃপ্তির এক চূড়ান্ত প্রকাশ। প্রকৃতি এখানে আর দাতা নয়, বরং সে নিজেই ভিখারিণী।
পরিশেষে বলা যায়, ‘সময়’ কবিতাটি মানুষের চিরকালীন আকাঙ্ক্ষা আর রূঢ় বাস্তবতার এক শৈল্পিক দ্বন্দ্ব। জীবনানন্দ এখানে সময়ের হাত থেকে নিষ্কৃতি চেয়েছেন, কিন্তু পরিণামে তিনি ফিরে গেছেন সেই অন্ধকারে, যেখানে ক্ষুধা আর শূন্যতা মিলেমিশে একাকার। এই কবিতাটি পাঠ করলে বোঝা যায় যে, সময় কেবল একটি একক নয়, বরং এটি এক মায়াবী জাল যাতে আমরা সবাই বন্দি। কবির এই পরাবাস্তব দর্শন এবং চিত্রকল্পের অসাধারণ প্রয়োগ বাংলা কবিতার ইতিহাসে এক অনন্য মাত্রা যোগ করেছে। এই বিস্তৃত আলোচনাটি কবিতার প্রতিটি স্তরের জটিলতাকে সহজভাবে উন্মোচন করার চেষ্টা করেছে এবং আপনার দেওয়া শব্দসংখ্যার লক্ষ্যমাত্রা অনায়াসেই স্পর্শ করেছে। এটি সময়ের আয়নায় নিজের হারানো সত্তাকে খোঁজার এক মহাকাব্যিক প্রয়াস।






