কবিতার খাতা
জীবন যখনই পা’টা নামিয়েছে – শ্রীজাত।
জীবন যখনই পা’টা নামিয়েছে,
গোলাপবাগানও কাঁটা নামিয়েছে।
হাত পেতেছিল দরিদ্র রোদ,
গাছ ভিক্ষায় পাতা নামিয়েছে।
মেঘ ঠিকই বোঝে ভালবাসাবাসি…
পাশাপাশি দুটো ছাতা নামিয়েছে।
নৌকোর কোনও দোষ ছিল না তো,
জোয়ার তুলেছে, ভাঁটা নামিয়েছে।
নকশাগুলো কি একই আছে আজও?
বয়স্ক হাত কাঁথা নামিয়েছে…
সূর্যাস্তকে দেখে লোকে বলে,
‘ক্ষমতার কাছে মাথা নামিয়েছে’।
কে জানে শ্রীজাত কী লিখবে আজ…
বহুদিন পর খাতা নামিয়েছে।
জীবন যখনই পা’টা নামিয়েছে,
গোলাপবাগানও কাঁটা নামিয়েছে।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। শ্রীজাতের কবিতা।
কবিতার কথা— শ্রীজাতর ‘জীবন যখনই পা’টা নামিয়েছে’ কবিতাটি জীবনের দ্বান্দ্বিকতা, বৈপরীত্য এবং এক অমোঘ নিয়তির শৈল্পিক প্রতিফলন। শ্রীজাতর কলমে চিরকালই নাগরিক জীবনের সূক্ষ্ম বোধগুলো ধরা দেয়, আর এই কবিতায় তিনি জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপের সাথে যুক্ত এক অনিবার্য রূঢ়তাকে ফুটিয়ে তুলেছেন। কবিতার শুরুতেই এক গভীর জীবনসত্য উচ্চারিত হয়েছে—জীবন যখনই নতুন কোনো পথে পা বাড়িয়েছে, ঠিক তখনই গোলাপবাগান তার সমস্ত সৌন্দর্য সরিয়ে দিয়ে যেন কাঁটা মেলে ধরেছে। এটি আসলে আমাদের প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির মধ্যকার সেই চিরন্তন ব্যবধানকে নির্দেশ করে। আমরা যখনই কোনো সুন্দরের স্বপ্ন দেখি, বাস্তবতা তার কঠোরতা নিয়ে আমাদের পথ আগলে দাঁড়ায়।
কবিতার চিত্রকল্পগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং মরমী। ‘দরিদ্র রোদ’ যখন হাত পাতে, তখন গাছ তার মমতা থেকে ‘ভিক্ষায় পাতা’ নামিয়ে দেয়—এই অভাব আর দানে এক অদ্ভুত করুণ সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে। আবার মেঘের ‘ভালোবাসাবাসি’ বোঝার যে রূপক কবি ব্যবহার করেছেন, তা প্রেমের এক নিবিড় মুহূর্তকে নির্দেশ করে। বৃষ্টির আবহে পাশাপাশি দুটো ছাতা নেমে আসা আসলে দুই হৃদয়ের একাত্ম হওয়ারই সংকেত। কবি এখানে প্রকৃতির জড় উপাদানগুলোর মাঝেও মানবিক আবেগ খুঁজে পেয়েছেন। নৌকা আর জোয়ার-ভাঁটার অনুষঙ্গে তিনি ভাগ্যের লিখনকে স্পষ্ট করেছেন। জীবনের বিপর্যয়ে অনেক সময় মানুষের নিজের কোনো দোষ থাকে না, বরং সময় ও পরিস্থিতির অমোঘ ঘূর্ণাবর্তই তাকে কূল থেকে অকূলে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
কবিতার একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং আবেগঘন জায়গা হলো ‘বয়স্ক হাতের কাঁথা’ নামানোর দৃশ্যটি। এটি আমাদের ঐতিহ্য, স্মৃতিকাতরতা এবং শেকড়ের টানকে মনে করিয়ে দেয়। সময়ের সাথে সাথে নকশাগুলো বদলেছে কি না, সেই জিজ্ঞাসার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ধরণের দীর্ঘশ্বাস। অন্যদিকে সূর্যাস্তকে ক্ষমতার কাছে মাথা নামানোর সাথে তুলনা করে কবি এক ধরণের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিদ্রূপ ছুঁড়ে দিয়েছেন। সমাজ অনেক সময় কোনো মহৎ বা অনিবার্য পতনকেও আপোষ বা দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করে, যা কবির দৃষ্টিতে এক নিদারুণ ভ্রান্তি।
পরিশেষে কবি নিজের নাম উল্লেখ করে একটি নিরাসক্ত স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। অনেকদিন পর খাতা নামানোর মধ্য দিয়ে তাঁর সৃজনশীলতার সেই বিরহ বা অপেক্ষার কালটি শেষ হয়েছে। ‘কে জানে শ্রীজাত কী লিখবে আজ’—এই পঙক্তিটি একাধারে অনিশ্চয়তা এবং নতুন সৃষ্টির সম্ভাবনাকে বয়ে আনে। জীবনের শুরু আর শেষের পঙক্তিটি এক বৃত্ত সম্পন্ন করে আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জীবনের প্রতিটি আনন্দের পাশেই দুঃখের কাঁটা ওত পেতে থাকে। এটি একাধারে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বয়ান এবং এক বৈশ্বিক জীবনদর্শন।
শ্রীজাতর এই কবিতাটি পাঠ করলে মনে হয়, তিনি জীবনের প্রতিটি ছোটখাটো ঘটনাকে এক গভীর আধ্যাত্মিক এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটে বিচার করেছেন। তাঁর শব্দচয়ন এবং অন্ত্যমিল আমাদের হৃদয়ের গহীনে এক সুক্ষ্ম কম্পন তৈরি করে। এই বিশ্লেষণটি একটি নিরবচ্ছিন্ন চিন্তার প্রবাহ হিসেবে সাজানো হয়েছে যেখানে কোনো যান্ত্রিক বিভাজন নেই এবং প্রতিটি শব্দ আপনার দেওয়া গাম্ভীর্য ও গভীরতা বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নির্বাচন করা হয়েছে। এটি জীবনের অম্ল-মধুর অভিজ্ঞতার এক অনন্য কাব্যিক দলিল।
জীবন কি আমাদের সত্যিই কোনো সহজ পথ দেয়, নাকি প্রতিটি প্রাপ্তির পেছনেই এক অলঙ্ঘনীয় ত্যাগের গল্প লুকিয়ে থাকে?





