কোথায় খুঁজি তারে – রবিশঙ্কর মৈত্রী।

অঙ্গের মধ্যে থাকে না আত্মা যেমন,
স্বার্থ আর শর্তের মধ্যেও থাকে না আত্মীয় তেমন।
চেতনা জন্ম নেয় না আকস্মিক
অন্ধকারে না হেঁটে আলোকে চেনে না পথিক।

ভেবেছি—যে আমাকে ডাকে কাছে
রাখে কাছে যত্ন করে
সেই তো আমার আপন।
ভেবেছি—যে আমার পাশে বসে
সেই আমার আত্মীয়।
সময় বলল—সবই তোমার উপস্থিতি মাত্র।
সর্বাঙ্গ যেমন আত্মার সঙ্গ নয়
নিকটজনও তেমন সত্য সঙ্গী নয়।

একদিন বাতাসে পাই সন্ধ্যার গন্ধ
গাছের পাতায় পাতায় বাজছিল অচেনা মন্ত্র।
রাত ঘন হল অজানা নক্ষত্র এক
অন্ধকার আকাশ থেকে বলল–কে তুমি?
বললাম—আমি দেহ।
সে হাসল। সে বলল—যদি দেহই তুমি হও
তবে ঘুমের ভেতর তুমি কোথায় যাও?
আমি নিরুত্তর নিদ্রাহীন
নতুন প্রভাত এল।
আমি তখন নিজের দেহকে দেখলাম
এই চোখ—দেখে পৃথিবী।
এই কান—শোনে শব্দছন্দ।
এই আঙুল—স্পর্শ করে রূপ।
কিন্তু চোখ? চোখ তো দৃষ্টির নিয়ন্ত্রক নয়।
কান তো শব্দের স্রষ্টা নয়।
আঙুল তো স্পর্শের উৎস নয়।
যেমন নদী। নদী কি জলের জন্ম দেয়?
অঙ্গ কি চেতনার জন্ম দেয়?

অয়মাত্মা ব্রহ্ম। আত্মাই ব্রহ্ম
সে দেহের ভেতরে থাকে, তবু দেহ নয়।
সে চোখে আলো দেয়, তবু সে চোখ নয়।
সে হৃদয়ে অনুভব জাগায়, তবু সে হৃদয় নয়।
সে অদৃশ্য–তবু সব দৃশ্যের উৎস।

প্রভাতের নরম আলোয় স্নাত হচ্ছে পৃথিবী
পাখিরা গাইছে প্রভাত সংগীত।
মানুষ শুধু নিদ্রাগত, নীরব।

হে নীরবতা, বলো আত্মীয় কে?
নীরবতা দীর্ঘক্ষণ কিছু অব্যক্ত রইল।
তারপর বাতাসের মতো ধীরে বলল—
আত্মীয়তা, রক্তের সূত্র নয়
স্বার্থের বন্ধন নয়
শর্তের প্রাচীর নয়।
আত্মীয়তা জন্মায় সেখানে
যেখানে দুটি হৃদয়
একই চেতনায় মিলিত হয়।

নীরবতার স্বর এবার আরও দৃঢ় হল–
তুই সেই
তুই সেই চেতনা
যা সব প্রাণে প্রবাহিত।
তুই সেই আলো
যা সব চোখে জ্বলে।
তাই যে অন্যকে চিনতে পারে
সে নিজেকেই চেনে. মানে।

দিনের আলো উজ্জ্বল হল
আলো নাচল পাতায় পাতায়
পাতারা বলল–
যে আত্মা তোমার ভেতরে
সেই আত্মা বৃক্ষের ভেতরেও
সেই আত্মা নদীর ভেতরেও।
সেই আত্মা
অচেনা মানুষের ভেতরেও।
আত্মীয়তা তাই সীমিত নয়
সে অসীম।

সূর্য যখন মাথার উপরে
আমি তখন বুঝলাম—
আমি আমার আমিকে না চিনে
পরের চোখে প্রেম খুঁজেছি।
আমি ভেবেছি— অন্যের স্বীকৃতি আমাকে পূর্ণ করবে।
কিন্তু পূর্ণতা ভিক্ষা করে পাওয়া যায় না।
পূর্ণময় থেকে পূর্ণ জগত জন্মেছে
পূর্ণময় থেকে পূর্ণ নিলেও
পূর্ণই অবশিষ্ট থাকে।
এখানে স্বার্থের কোনো প্রাচীর নেই
শর্তের শিকল নেই।
এখানে আত্মীয়তা মানে—
সমস্ত প্রাণের সঙ্গে এক নীরব ঐক্য।
এখানে আমি ও তুমি দুই নই, এক।
এখানে দেহ কেবল সমুদ্রের ঢেউ
এখানে আত্মা মানে মহাসমুদ্র।
মানুষ আত্মা থেকে আলাদা নয়।
দেহ আর আত্মাকে যে জানে
সে আর বিভেদ দেখে না।
সে জানে, সকল মানুষ একই আলোর সন্তান
একটাই পৃথিবী
মানুষের একটাই পরিবার
প্রেম।

আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। রবিশঙ্কর মৈত্রীর কবিতা।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x