মা নিষাদ – জয় গোস্বামী।

স্তব্ধতা ফাটে, পাকিয়ে উঠছে ধুলো
ধূলিস্তম্ভে মেঘযূথ মিশে যায়
ভূগোল ঘুরছে , ধক ধক করে চুলো
সূর্য লুপ্ত প্রায়

সূর্য তো নয় , কাল রাত্রির চাঁদ
চাঁদ মুখে নিয়ে উড়ে যায় কালোপাখি
সেই চাঁদকেই বাণে বেঁধে উন্মাদ
ব্যাধ নামে তাকে ডাকি

পুরাকালে সে-ই মিথুনাবদ্ধ প্রাণ
হনন করেছে তীরে আর বল্লমে
সেই অভিশাপ আজও তাকে দেয় টান
চাঁদ বাড়ে , চাঁদ কমে

আদিম অস্ত্র যুগ থেকে টানাটানি
মুখের খাবার মুখ থেকে কেড়ে খাওয়া
জিরজিরে গায় বল্কল , কাঁথাকানি
মাথার ওপরে সূর্য গরম তাওয়া

বালিতে শুকোয় , সমুদ্রজলে ভাসে
হতাহত দেহ , ভাঙ্গা রথ , মৃত ঘোড়া
অস্ত্র মুঠোয় মুখ গুঁজে আছে ঘাসে
দুজন মানুষ , প্রতিবেশী ছিল ওরা

প্রতিবেশী , তার জমিটি , আমার চাই
প্রতিবেশী গ্রাম আমার অধীনে থাক
প্রতিবেশী রাজা আমাকেই কর দিক
আমার অস্ত্রে প্রতিবেশী ভয় পাক

প্রতিবেশীরা কি এই পৃথিবীতে থাকে ?
তাদের বাতাসে , তাদের রৌদ্রজলে
আজ যদি বিষ মেশাতে বলি তোমাকে
মেশাবেই তুমি , ছলে বলে কৌশলে

সে ষড়যন্ত্র কৌশল লোফালুফি
উন্নতি করে প্রহরী বসানো ঘরে
ধীশক্তি মেধা বিজ্ঞান চুপিচুপি
বুকে হেঁটে গিয়ে মাটিতে গর্ত করে

গর্তে উনুন , ধক ধক করা চুলো
চুল্লি মাটিতে দাঁড়িয়েছে একবার
ছাতার মতন আকাশে ভষ্মধুলো
পথ নেই পালাবার

ঢিলের মতন পাখি পড়ে দলেদলে
তীরে লাফ দিয়ে ওঠে বিষাক্ত জল
হাজার মাইল কণা কণা ছাই জ্বলে
হাজার মাইল পুড়ে যাওয়া জঙ্গল

পোড়া বাড়ি ভাঙ্গা হাড়গোড় ইঁট কাঠ
স্তুপের পেছনে স্তূপ ওঠা জনপদে
চুরমার মাটি , দগ্ধশস্য মাঠ
মানুষ মরেছে , ঘরে দপ্তরে পথে

মানুষ মরেছে , জন্মেছে আরও আরও
বাঁকা হাত , ঘোর জড়ভরতের দেহ
মুখে জিভ নেই , পায়ে হাড় নেই কারও
জন্তুর মতো হামাগুড়ি দেয় কে ও

পুরুষের বীজে বিষ এসে মিশে যায়
নারী ও শস্য ক্ষয়ে যায় পিঠোপিঠি
হেলিকপ্টার পাক মেরে গর্জায়:
একতিলও নেই রেডিও অ্যাক্টিভিটি

তুমি কত সালে জন্মেছ বিজ্ঞানী ?
কত সালে তুমি জন্মেছ হে শাসক ?
তোমাদের ঘরে ছেলেপুলে জন্মেছে ?
ঠিক ঠিক আছে নাক মুখ হাত চোখ ?

আমাদের আরও জন্মানোর কী বাঁকি ?
আছে মাটি থেকে ধান তোলা , তোলা ঘাস
আছে মাটি থেকে ডালে তুলে দেওয়া পাখি
গান বাঁধবার নানক তুলসীদাস

পোড়া গ্রাম দিয়ে তুলসীজী হেঁটে যান
ঘাটে বসে গান ভাষায় কবীর জোলা
শ্রীরাম চরিত পথে পথে খানখান
লালচোখ সাধু , হাতে তলোয়ার খোলা

ও কবির ভাই , কে তোমার গান শোনে
কে পাগল বলে বুঝিয়ে দে বুঝিয়ে দে
ফুটপাথে কারা পড়ে থাকে সারারাত
ও কার বাচ্চা , খাবার চাইছে কেঁদে ?

কোন বাচ্চাটা চা-দোকানে সারাদিন
খেটে যায় , খায় মালিকের থাপ্পড়
কোন্ মা নিজের ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে
খদ্দের নেয় রাত্তির থেকে ভোর

ওদের হালত , থাক ,এরকমই থাক
ওদের জীবন ঢেলে দাও একখাতে
দুবেলা দুমুঠো খেতে পাক নাই পাক
তবু তো অস্ত্র এসেছে আমার হাতে

অস্ত্র মাটিতে , অস্ত্র আকাশগামী
দিগন্ত রাঙা অস্ত্রের মহিমায়
রাঙা অস্ত্রের কিরণ পড়েছে জলে
গ্রন্থসাহেব নদীজলে ভেসে যায়

সেই জলে ভাসে বেহুলার মান্দাস
মশারির নীচে শোয়ানো লখিন্দর
বিকলাঙ্গ সে , তেজস্ক্রিয়ার বিষে
থামে মান্দাস , এক ঘাট অন্তর

একেকটি ঘাটে থমকে একেক যুগ
নদী সমুদ্রে বিরাট সেতুর ছায়া
পঙ্গু কামড়ে ধরেছে তোমার বুক
স্বামী না শ্বাপদ শিশুসন্তান মায়া

সন্তান আর শস্যের ভার বহে
তুমি শুয়ে আছো স্তব্ধ বসুন্ধরা
স্তব্ধতা ফেটে উত্থিত হয় কাল
মাথায় আকাশ —-মুঠোয় দণ্ড ধরা

দণ্ডের মুখে গেঁথে আছে ভাঙা চাঁদ
পায়ের তলায় সমুদ্র আছড়ায়
কাঁধ ছুঁয়ে আছে পাহাড়ের উঁচু কাঁধ
রাত্রি লুপ্ত প্রায়

ভোরবেলা সেই মূর্তিটি নেই আর
সূর্যপূজারী আকাঙ্খা করে তাপ
জেন্দ-আবেস্তা খুলে ধরে রোদ্দুরে
তারও পৃষ্ঠায় তেজস্ক্রিয়ার ছাপ

ভূগোল ঘুরছে , নদীপথ গিরিশিরা
বাঁকে বাঁকে ঘোরে মর্টার মেশিনগান
মাটির তলায় মাটি হয় ইহুদীরা
গনহত্যার কবরে দুলছে ধান

এই দেশ থেকে ও দেশে সূর্য যায়
নামাজে বসেছে গরীব মুসলমান
তার সাদাটুপি শান্তির পারাবত
তার খাওয়া হলে , ঈশ্বর জল খান

কে হিন্দু ? ঐ জিজ্ঞাসে কোনজন ?
এই প্রশ্নের সমুখে তারা খসে
স্নান করে উঠে কুপিটি জ্বালিয়ে নিয়ে
নিরন্ন সাধু অন্নসমীপে বসে

আমরা সবাই অন্নের কাছে আসি
ঘন্টা বাজছে গ্রামের গির্জে ঘরে
নৌকোতে ফেরে কেরেলার মাছচাষী
মা মেরী তোমার জীবন রক্ষা করে

রক্ষা তো নয় প্রতিরক্ষার খাত
সে-খাতে গড়ায় যুদ্ধ-আড়ম্বর
অজন্তা ঘরে কালো হয়ে যাও একা
হে পদ্মপাণি , অবলোকিতেশ্বর

হাতের পদ্ম মাটিতে আছড়ে পড়ে
সে মাটিতে শুধু গহ্বর , গহ্বর
ফোয়ারার মতো মরুবালু ফুঁসে ওঠে
‘ ছোট বুদ্ধ ‘ ফুঁসে উঠবার পর

ঠোঁটে চাঁদ ধরে উড়ে যায় কালো পাখি
ও মারণাস্ত্র , চাঁদ নয় বাস্তবে
পুরাকাল থেকে তীর তুলে আছে ব্যাধ
বোতাম টিপলে পৃথিবী ধ্বংস হবে

এসো কবি , এসো বাধা দাও , মা নিষাদ
বলে ওঠো তুমি , ভেঙে যাক উইঢিবি
দিনের দুপাশে দাঁড়াক সূর্যচাঁদ
গুহায় জ্বলুক প্রাচীন চিত্রলিপি

ওই দেখো রাত বইছে গঙ্গাতীরে
ওই দেখো মাঝি দাঁড় টানে পদ্মায়
ওই শোনো আমি , আমরা যে কথা বলি
কীভাবে সেসবই ভাটিয়ালী হয়ে যায়

ওই দেখো দূরে , থেমে গেছে ধুলোঝড়
জ্যোত্স্না সাঁতরে শান্তির পায়রাটি
চালে ফিরে আসে , উঠোনের গম খায়
গম , ভুট্টার জমিনে আমরা খাঁটি

ওই যে রাত্রি বইছে যমুনাতীরে
ওই যে এসেছে আমাদের শ্যাম-রাই
ওই শুনছো না , ভাঙা মন্দিরে বসে ,
প্রেম গাইছেন আমাদের মীরাবাঈ l

অতই সহজ আমাদের মেরে ফেলা ?
আমাদের পায়ে রাত্রিচক্র ঘোরে
আমরা এসেছি , মহাভারতের পর
আমরা এসেছি দেশকাল পার করে

নিষাদ, তোমার অস্ত্রের মুখে এসে
আমাদের গ্রাম হোক ধুলো হোক ছাই
স্তূপাকার ওই ছাইয়ের ভিতর থেকে
ওঠে নিরস্ত্র , আমরা দেখতে পাই

তার পশ্চাতে সমুদ্র ফুলে ওঠে
তার সন্মুখে মেঘে বাজ চমকায়

সে তোমার হাত মুচড়ে ফেলেছে জলে
হাতের অস্ত্র মুচড়ে ফেলেছে জলে

দেখো ওই জলে সূর্য অস্ত যায়
শতাব্দী ঘোরে —সূর্য অস্ত যায়

আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। জয় গোস্বামীর কবিতা।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x