স্তব্ধতা ফাটে, পাকিয়ে উঠছে ধুলো
ধূলিস্তম্ভে মেঘযূথ মিশে যায়
ভূগোল ঘুরছে , ধক ধক করে চুলো
সূর্য লুপ্ত প্রায়
সূর্য তো নয় , কাল রাত্রির চাঁদ
চাঁদ মুখে নিয়ে উড়ে যায় কালোপাখি
সেই চাঁদকেই বাণে বেঁধে উন্মাদ
ব্যাধ নামে তাকে ডাকি
পুরাকালে সে-ই মিথুনাবদ্ধ প্রাণ
হনন করেছে তীরে আর বল্লমে
সেই অভিশাপ আজও তাকে দেয় টান
চাঁদ বাড়ে , চাঁদ কমে
আদিম অস্ত্র যুগ থেকে টানাটানি
মুখের খাবার মুখ থেকে কেড়ে খাওয়া
জিরজিরে গায় বল্কল , কাঁথাকানি
মাথার ওপরে সূর্য গরম তাওয়া
বালিতে শুকোয় , সমুদ্রজলে ভাসে
হতাহত দেহ , ভাঙ্গা রথ , মৃত ঘোড়া
অস্ত্র মুঠোয় মুখ গুঁজে আছে ঘাসে
দুজন মানুষ , প্রতিবেশী ছিল ওরা
প্রতিবেশী , তার জমিটি , আমার চাই
প্রতিবেশী গ্রাম আমার অধীনে থাক
প্রতিবেশী রাজা আমাকেই কর দিক
আমার অস্ত্রে প্রতিবেশী ভয় পাক
প্রতিবেশীরা কি এই পৃথিবীতে থাকে ?
তাদের বাতাসে , তাদের রৌদ্রজলে
আজ যদি বিষ মেশাতে বলি তোমাকে
মেশাবেই তুমি , ছলে বলে কৌশলে
সে ষড়যন্ত্র কৌশল লোফালুফি
উন্নতি করে প্রহরী বসানো ঘরে
ধীশক্তি মেধা বিজ্ঞান চুপিচুপি
বুকে হেঁটে গিয়ে মাটিতে গর্ত করে
গর্তে উনুন , ধক ধক করা চুলো
চুল্লি মাটিতে দাঁড়িয়েছে একবার
ছাতার মতন আকাশে ভষ্মধুলো
পথ নেই পালাবার
ঢিলের মতন পাখি পড়ে দলেদলে
তীরে লাফ দিয়ে ওঠে বিষাক্ত জল
হাজার মাইল কণা কণা ছাই জ্বলে
হাজার মাইল পুড়ে যাওয়া জঙ্গল
পোড়া বাড়ি ভাঙ্গা হাড়গোড় ইঁট কাঠ
স্তুপের পেছনে স্তূপ ওঠা জনপদে
চুরমার মাটি , দগ্ধশস্য মাঠ
মানুষ মরেছে , ঘরে দপ্তরে পথে
মানুষ মরেছে , জন্মেছে আরও আরও
বাঁকা হাত , ঘোর জড়ভরতের দেহ
মুখে জিভ নেই , পায়ে হাড় নেই কারও
জন্তুর মতো হামাগুড়ি দেয় কে ও
পুরুষের বীজে বিষ এসে মিশে যায়
নারী ও শস্য ক্ষয়ে যায় পিঠোপিঠি
হেলিকপ্টার পাক মেরে গর্জায়:
একতিলও নেই রেডিও অ্যাক্টিভিটি
তুমি কত সালে জন্মেছ বিজ্ঞানী ?
কত সালে তুমি জন্মেছ হে শাসক ?
তোমাদের ঘরে ছেলেপুলে জন্মেছে ?
ঠিক ঠিক আছে নাক মুখ হাত চোখ ?
আমাদের আরও জন্মানোর কী বাঁকি ?
আছে মাটি থেকে ধান তোলা , তোলা ঘাস
আছে মাটি থেকে ডালে তুলে দেওয়া পাখি
গান বাঁধবার নানক তুলসীদাস
পোড়া গ্রাম দিয়ে তুলসীজী হেঁটে যান
ঘাটে বসে গান ভাষায় কবীর জোলা
শ্রীরাম চরিত পথে পথে খানখান
লালচোখ সাধু , হাতে তলোয়ার খোলা
ও কবির ভাই , কে তোমার গান শোনে
কে পাগল বলে বুঝিয়ে দে বুঝিয়ে দে
ফুটপাথে কারা পড়ে থাকে সারারাত
ও কার বাচ্চা , খাবার চাইছে কেঁদে ?
কোন বাচ্চাটা চা-দোকানে সারাদিন
খেটে যায় , খায় মালিকের থাপ্পড়
কোন্ মা নিজের ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে
খদ্দের নেয় রাত্তির থেকে ভোর
ওদের হালত , থাক ,এরকমই থাক
ওদের জীবন ঢেলে দাও একখাতে
দুবেলা দুমুঠো খেতে পাক নাই পাক
তবু তো অস্ত্র এসেছে আমার হাতে
অস্ত্র মাটিতে , অস্ত্র আকাশগামী
দিগন্ত রাঙা অস্ত্রের মহিমায়
রাঙা অস্ত্রের কিরণ পড়েছে জলে
গ্রন্থসাহেব নদীজলে ভেসে যায়
সেই জলে ভাসে বেহুলার মান্দাস
মশারির নীচে শোয়ানো লখিন্দর
বিকলাঙ্গ সে , তেজস্ক্রিয়ার বিষে
থামে মান্দাস , এক ঘাট অন্তর
একেকটি ঘাটে থমকে একেক যুগ
নদী সমুদ্রে বিরাট সেতুর ছায়া
পঙ্গু কামড়ে ধরেছে তোমার বুক
স্বামী না শ্বাপদ শিশুসন্তান মায়া
সন্তান আর শস্যের ভার বহে
তুমি শুয়ে আছো স্তব্ধ বসুন্ধরা
স্তব্ধতা ফেটে উত্থিত হয় কাল
মাথায় আকাশ —-মুঠোয় দণ্ড ধরা
দণ্ডের মুখে গেঁথে আছে ভাঙা চাঁদ
পায়ের তলায় সমুদ্র আছড়ায়
কাঁধ ছুঁয়ে আছে পাহাড়ের উঁচু কাঁধ
রাত্রি লুপ্ত প্রায়
ভোরবেলা সেই মূর্তিটি নেই আর
সূর্যপূজারী আকাঙ্খা করে তাপ
জেন্দ-আবেস্তা খুলে ধরে রোদ্দুরে
তারও পৃষ্ঠায় তেজস্ক্রিয়ার ছাপ
ভূগোল ঘুরছে , নদীপথ গিরিশিরা
বাঁকে বাঁকে ঘোরে মর্টার মেশিনগান
মাটির তলায় মাটি হয় ইহুদীরা
গনহত্যার কবরে দুলছে ধান
এই দেশ থেকে ও দেশে সূর্য যায়
নামাজে বসেছে গরীব মুসলমান
তার সাদাটুপি শান্তির পারাবত
তার খাওয়া হলে , ঈশ্বর জল খান
কে হিন্দু ? ঐ জিজ্ঞাসে কোনজন ?
এই প্রশ্নের সমুখে তারা খসে
স্নান করে উঠে কুপিটি জ্বালিয়ে নিয়ে
নিরন্ন সাধু অন্নসমীপে বসে
আমরা সবাই অন্নের কাছে আসি
ঘন্টা বাজছে গ্রামের গির্জে ঘরে
নৌকোতে ফেরে কেরেলার মাছচাষী
মা মেরী তোমার জীবন রক্ষা করে
রক্ষা তো নয় প্রতিরক্ষার খাত
সে-খাতে গড়ায় যুদ্ধ-আড়ম্বর
অজন্তা ঘরে কালো হয়ে যাও একা
হে পদ্মপাণি , অবলোকিতেশ্বর
হাতের পদ্ম মাটিতে আছড়ে পড়ে
সে মাটিতে শুধু গহ্বর , গহ্বর
ফোয়ারার মতো মরুবালু ফুঁসে ওঠে
‘ ছোট বুদ্ধ ‘ ফুঁসে উঠবার পর
ঠোঁটে চাঁদ ধরে উড়ে যায় কালো পাখি
ও মারণাস্ত্র , চাঁদ নয় বাস্তবে
পুরাকাল থেকে তীর তুলে আছে ব্যাধ
বোতাম টিপলে পৃথিবী ধ্বংস হবে
এসো কবি , এসো বাধা দাও , মা নিষাদ
বলে ওঠো তুমি , ভেঙে যাক উইঢিবি
দিনের দুপাশে দাঁড়াক সূর্যচাঁদ
গুহায় জ্বলুক প্রাচীন চিত্রলিপি
ওই দেখো রাত বইছে গঙ্গাতীরে
ওই দেখো মাঝি দাঁড় টানে পদ্মায়
ওই শোনো আমি , আমরা যে কথা বলি
কীভাবে সেসবই ভাটিয়ালী হয়ে যায়
ওই দেখো দূরে , থেমে গেছে ধুলোঝড়
জ্যোত্স্না সাঁতরে শান্তির পায়রাটি
চালে ফিরে আসে , উঠোনের গম খায়
গম , ভুট্টার জমিনে আমরা খাঁটি
ওই যে রাত্রি বইছে যমুনাতীরে
ওই যে এসেছে আমাদের শ্যাম-রাই
ওই শুনছো না , ভাঙা মন্দিরে বসে ,
প্রেম গাইছেন আমাদের মীরাবাঈ l
অতই সহজ আমাদের মেরে ফেলা ?
আমাদের পায়ে রাত্রিচক্র ঘোরে
আমরা এসেছি , মহাভারতের পর
আমরা এসেছি দেশকাল পার করে
নিষাদ, তোমার অস্ত্রের মুখে এসে
আমাদের গ্রাম হোক ধুলো হোক ছাই
স্তূপাকার ওই ছাইয়ের ভিতর থেকে
ওঠে নিরস্ত্র , আমরা দেখতে পাই
তার পশ্চাতে সমুদ্র ফুলে ওঠে
তার সন্মুখে মেঘে বাজ চমকায়
সে তোমার হাত মুচড়ে ফেলেছে জলে
হাতের অস্ত্র মুচড়ে ফেলেছে জলে
দেখো ওই জলে সূর্য অস্ত যায়
শতাব্দী ঘোরে —সূর্য অস্ত যায়
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। জয় গোস্বামীর কবিতা।
কবিতার কথা—
জয় গোস্বামীর ‘মা নিষাদ’ আধুনিক বাংলা কবিতার এক সুবিশাল ক্যানভাস, যা মহাকাব্যিক বিস্তার এবং সমকালীন বিপন্নতাকে এক সুতোয় গেঁথেছে। ‘মা নিষাদ’ শব্দবন্ধটি বাল্মীকি রামায়ণের সেই আদি শ্লোক থেকে নেওয়া, যেখানে ক্রৌঞ্চ মিথুনের বিচ্ছেদে শোকাতুর কবি ব্যাধকে অভিশাপ দিয়েছিলেন। জয় গোস্বামী সেই প্রাচীন রূপককে টেনে এনেছেন বর্তমানের পারমাণবিক যুদ্ধের ডামাডোল, তেজস্ক্রিয়তা আর ক্ষমতার মদমত্ত আস্ফালনের প্রেক্ষাপটে। এটি কেবল একটি কবিতা নয়, এটি মানবসভ্যতার ধ্বংস আর পুনর্জন্মের এক দীর্ঘ হাহাকার ও প্রতিরোধের গাথা।
কবিতার শুরুতেই এক প্রলয়ংকরী চিত্রকল্প—‘স্তব্ধতা ফাটে, পাকিয়ে উঠছে ধুলো’। এখানে প্রকৃতি স্বাভাবিক নয়, বরং ‘ধক ধক করে চুলো’ আর ‘তেজস্ক্রিয়ার ছাপ’ এক পারমাণবিক শীত বা যুদ্ধের ইঙ্গিত দেয়। জয় গোস্বামী অত্যন্ত নিপুণভাবে দেখিয়েছেন কীভাবে প্রাচীনকালের সেই তীরের ব্যাধ আজ আধুনিক মারণাস্ত্র আর ‘বোতাম টিপলে পৃথিবী ধ্বংস হবে’ এমন প্রযুক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে। আদিম মানুষের মুখের খাবার কেড়ে নেওয়ার যে প্রবৃত্তি ছিল, তা আজ ‘প্রতিবেশী রাজা’র কর আদায় কিংবা প্রতিবেশীর রৌদ্রজলে বিষ মেশানোর সুক্ষ্ম ষড়যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। বিজ্ঞান ও মেধা আজ মানুষের কল্যাণে নয়, বরং ‘মাটিতে গর্ত করে’ মারণাস্ত্র তৈরির চুল্লি বসাচ্ছে।
কবিতার এক বড় অংশ জুড়ে আছে যুদ্ধের পরবর্তী বিকলাঙ্গতা আর পরিবেশের ধ্বংসযজ্ঞ। ‘পুরুষের বীজে বিষ এসে মিশে যায়’, ‘জন্তুর মতো হামাগুড়ি দেয় কে ও’—এই লাইনগুলো হিরোশিমা, নাগাসাকি বা চেরনোবিলের সেই ভয়াবহ স্মৃতিকে মনে করিয়ে দেয়। ক্ষমতার দম্ভে মত্ত শাসক আর বিজ্ঞানীদের কবি প্রশ্ন করেছেন, তাদের ঘরে যে সন্তান জন্মেছে, তারা কি সুস্থ? নাকি যুদ্ধের তেজস্ক্রিয়তায় মানুষের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পঙ্গু হয়ে জন্মাচ্ছে? হেলিকপ্টারের গর্জন আর রেডিও অ্যাক্টিভিটির মিথ্যা আশ্বাসের আড়ালে যে চরম সত্যটি চাপা পড়ে আছে, কবি তাকেই উন্মোচন করেছেন।
কিন্তু জয় গোস্বামী কেবল ধ্বংসের কথা বলেই থেমে থাকেননি। তিনি এই ধ্বংসস্তূপের বিপরীতে দাঁড় করিয়েছেন ভারতের লোকসংস্কৃতি, ধর্ম এবং মানবিক ঐক্যকে। পোড়া গ্রামের মাঝখানে তিনি ‘তৈলসীজী’, ‘কবীর জোলা’ আর ‘নানক তুলসীদাসের’ গান শুনতে পান। শ্রীরামচরিত থেকে মীরাবাঈয়ের প্রেম—এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যই কবির কাছে প্রতিরোধের হাতিয়ার। কবি প্রশ্ন করেছেন, কার বাচ্চা খাবার চাইছে? কোন মা দারিদ্র্যের কারণে খদ্দের নিতে বাধ্য হচ্ছে? এই রুক্ষ বাস্তবের মাঝখানে দাঁড়িয়েও যখন শাসক ‘অস্ত্র’ নিয়ে দম্ভ করে, তখন কবি সেই অস্ত্রকে ‘দিগন্ত রাঙা অস্ত্রের মহিমা’ বলে বিদ্রূপ করেন।
কবিতাটি এক পর্যায়ে এসে মহামানবিক রূপ নেয়। যেখানে হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান—সবাই ‘অন্নের কাছে’ এসে এক হয়। গির্জার ঘণ্টা, কেরেলার মাছচাষী কিংবা নামাজে বসা গরীব মুসলমানের সাদা টুপি—সবই শান্তির পারাবত। কিন্তু এই শান্তিতেও হানা দেয় ‘প্রতিরক্ষার খাত’। অজন্তার পদ্মপাণি বুদ্ধ কিংবা বামিয়ানের ‘ছোট বুদ্ধ’ যখন ধ্বংস হয়, তখন মানুষের সমস্ত ধীশক্তি আর ঐতিহ্য ধুলোয় মিশে যায়। কবি আর্তনাদ করে উঠেছেন—‘এসো কবি, এসো বাধা দাও, মা নিষাদ / বলে ওঠো তুমি’। অর্থাৎ, শিল্পীকেই আজ সেই আদি কবির মতো ব্যাধকে থামানোর ডাক দিতে হবে।
কবিতার শেষাংশ এক অবিনশ্বর আশাবাদের কথা বলে। ‘অতই সহজ আমাদের মেরে ফেলা?’—এই আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে কবি দাবি করেছেন যে মানুষ মহাভারত আর দেশকাল পার করে ঠিকই ফিরে আসবে। মারণাস্ত্রের মুখে গ্রাম ছাই হয়ে গেলেও সেই ছাইয়ের ভেতর থেকে ‘নিরস্ত্র’ মানুষ জেগে ওঠে। এই নিরস্ত্র মানুষের শক্তিই শেষ পর্যন্ত ব্যাধের হাত মুচড়ে ফেলে অস্ত্রকে জলে ডুবিয়ে দেয়। শতাব্দী ঘোরে, সূর্য অস্ত যায়, কিন্তু মানুষের গান আর প্রেমের জয়গান কখনো থামে না।
মা নিষাদ – জয় গোস্বামী | জয় গোস্বামীর যুদ্ধবিরোধী কবিতা | প্রতিরোধের মহাকাব্যিক চিত্র ও ‘মা নিষাদ’ বলে মাতৃত্বের ডাক | অস্ত্রের ধ্বংস ও ‘আমরা এসেছি, মহাভারতের পর’ বলে চিরন্তন প্রতিরোধ
মা নিষাদ: জয় গোস্বামীর যুদ্ধ ও প্রতিরোধের মহাকাব্যিক অসাধারণ কাব্য, ‘স্তব্ধতা ফাটে, পাকিয়ে উঠছে ধুলো’ বলে সময়ের সূচনা, প্রতিবেশীর জমি দখলের লোভ, অস্ত্রের মহিমা ও ধ্বংসের চিত্র, বিজ্ঞান ও শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, এবং ‘আমরা এসেছি, মহাভারতের পর’ বলে চিরন্তন প্রতিরোধের অমর সৃষ্টি
জয় গোস্বামীর “মা নিষাদ” বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য, মহাকাব্যিক ও যুদ্ধবিরোধী সৃষ্টি। “স্তব্ধতা ফাটে , পাকিয়ে উঠছে ধুলো” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে যুদ্ধ ও প্রতিরোধের চিরন্তন কাহিনি; স্তব্ধতা ভেঙে ধুলো পাকিয়ে ওঠার চিত্র; ধূলিস্তম্ভে মেঘযূথ মিশে যাওয়া; সূর্য লুপ্ত প্রায় ও কালো পাখির উড়ে যাওয়া; প্রতিবেশীর জমি দখলের লোভ ও অস্ত্রের মহিমা; বিজ্ঞান ও শাসকের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ; হেলিকপ্টারের গর্জন ও রেডিও অ্যাক্টিভিটি; ‘মা নিষাদ’ বলে মাতৃত্বের ডাক; মীরাবাঈয়ের প্রেম ও ভাটিয়ালী গানের সুর; এবং শেষ পর্যন্ত ‘আমরা এসেছি, মহাভারতের পর’ বলে চিরন্তন প্রতিরোধের অসাধারণ কাব্যচিত্র। জয় গোস্বামী একজন সমসাময়িক বাঙালি কবি। তিনি যুদ্ধ, প্রতিরোধ, ধ্বংস, প্রকৃতি ও মানুষের অস্তিত্ব নিয়ে লিখেছেন। তাঁর কবিতায় পুরাণ, ইতিহাস ও বর্তমানের সংমিশ্রণ ঘটে। “মা নিষাদ” সেই স্বকীয় কাব্যভাষার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যেখানে ‘মা নিষাদ’ বলতে তিনি নিষাদ (বহিরাগত, শিকারি) জাতির মাতৃত্বকে আহ্বান করেছেন।
জয় গোস্বামী: যুদ্ধ ও প্রতিরোধের কবি
জয় গোস্বামী একজন সমসাময়িক বাঙালি কবি। তিনি যুদ্ধ, প্রতিরোধ, ধ্বংস, প্রকৃতি, মানুষের অস্তিত্ব ও সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে লিখেছেন। তাঁর কবিতায় পুরাণ, ইতিহাস ও বর্তমানের সংমিশ্রণ ঘটে। তিনি চমৎকার চিত্রকল্প, প্রতীকী ভাষা ও তীব্র প্রতিবাদের জন্য পরিচিত।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘মা নিষাদ’, ‘অন্য নামে ডাকো’, ‘নির্বাচিত কবিতা’ ইত্যাদি।
জয় গোস্বামীর যুদ্ধবিরোধী কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ‘স্তব্ধতা ফাটে’ বলে সময়ের সূচনা, ধূলো ও মেঘের মিশ্রণ, সূর্য লুপ্ত ও কালো পাখির প্রতীক, প্রতিবেশীর জমি দখলের লোভ, অস্ত্রের মহিমা ও ধ্বংসের চিত্র, বিজ্ঞান ও শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, হেলিকপ্টারের গর্জন, ‘মা নিষাদ’ বলে মাতৃত্বের ডাক, মীরাবাঈয়ের প্রেম ও ভাটিয়ালী গান, এবং ‘আমরা এসেছি, মহাভারতের পর’ বলে চিরন্তন প্রতিরোধ। ‘মা নিষাদ’ সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ — যেখানে তিনি পুরাণের নিষাদ চরিত্রকে আধুনিক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দাঁড় করিয়েছেন।
মা নিষাদ: শিরোনামের তাৎপর্য ও কবিতার পটভূমি
শিরোনাম ‘মা নিষাদ’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘নিষাদ’ — পুরাণে উল্লিখিত এক জাতি, শিকারি ও বহিরাগত। ‘মা নিষাদ’ বলতে নিষাদ জাতির মাতৃত্বকে বোঝানো হয়েছে। পুরাণে ‘মা নিষাদ’ একটি অভিশাপবাণী। এখানে কবি সেই অভিশাপকে যুদ্ধ ও ধ্বংসের বিরুদ্ধে ডাক হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
কবিতাটি যুদ্ধ ও প্রতিরোধের চিরন্তন কাহিনি নিয়ে রচিত। পুরাকালের অস্ত্র থেকে শুরু করে আধুনিক হেলিকপ্টার ও রেডিও অ্যাক্টিভিটি — সব কিছু এসেছে এতে।
কবি শুরুতে বলছেন — স্তব্ধতা ফাটে, পাকিয়ে উঠছে ধুলো। ধূলিস্তম্ভে মেঘযূথ মিশে যায়। ভূগোল ঘুরছে, ধক ধক করে চুলো। সূর্য লুপ্ত প্রায়।
সূর্য তো নয়, কাল রাত্রির চাঁদ। চাঁদ মুখে নিয়ে উড়ে যায় কালোপাখি। সেই চাঁদকেই বাণে বেঁধে উন্মাদ ব্যাধ নামে তাকে ডাকি।
পুরাকালে সে-ই মিথুনাবদ্ধ প্রাণ, হনন করেছে তীরে আর বল্লমে। সেই অভিশাপ আজও তাকে দেয় টান। চাঁদ বাড়ে, চাঁদ কমে।
আদিম অস্ত্র যুগ থেকে টানাটানি, মুখের খাবার মুখ থেকে কেড়ে খাওয়া। জিরজিরে গায়ে বল্কল, কাঁথাকানি। মাথার ওপরে সূর্য গরম তাওয়া।
বালিতে শুকোয়, সমুদ্রজলে ভাসে হতাহত দেহ, ভাঙ্গা রথ, মৃত ঘোড়া। অস্ত্র মুঠোয় মুখ গুঁজে আছে ঘাসে। দুজন মানুষ, প্রতিবেশী ছিল ওরা।
প্রতিবেশী, তার জমিটি, আমার চাই। প্রতিবেশী গ্রাম আমার অধীনে থাক। প্রতিবেশী রাজা আমাকেই কর দিক। আমার অস্ত্রে প্রতিবেশী ভয় পাক।
প্রতিবেশীরা কি এই পৃথিবীতে থাকে? তাদের বাতাসে, তাদের রৌদ্রজলে। আজ যদি বিষ মেশাতে বলি তোমাকে, মেশাবেই তুমি, ছলে বলে কৌশলে।
সে ষড়যন্ত্র কৌশল লোফালুফি, উন্নতি করে প্রহরী বসানো ঘরে। ধীশক্তি মেধা বিজ্ঞান চুপিচুপি বুকে হেঁটে গিয়ে মাটিতে গর্ত করে।
গর্তে উনুন, ধক ধক করা চুলো। চুল্লি মাটিতে দাঁড়িয়েছে একবার। ছাতার মতন আকাশে ভষ্মধুলো। পথ নেই পালাবার।
ঢিলের মতন পাখি পড়ে দলেদলে। তীরে লাফ দিয়ে ওঠে বিষাক্ত জল। হাজার মাইল কণা কণা ছাই জ্বলে। হাজার মাইল পুড়ে যাওয়া জঙ্গল।
পোড়া বাড়ি ভাঙ্গা হাড়গোড় ইঁট কাঠ, স্তুপের পেছনে স্তূপ ওঠা জনপদে। চুরমার মাটি, দগ্ধশস্য মাঠ। মানুষ মরেছে, ঘরে দপ্তরে পথে।
মানুষ মরেছে, জন্মেছে আরও আরও। বাঁকা হাত, ঘোর জড়ভরতের দেহ। মুখে জিভ নেই, পায়ে হাড় নেই কারও। জন্তুর মতো হামাগুড়ি দেয় কে ও।
পুরুষের বীজে বিষ এসে মিশে যায়। নারী ও শস্য ক্ষয়ে যায় পিঠোপিঠি। হেলিকপ্টার পাক মেরে গর্জায়: একতিলও নেই রেডিও অ্যাক্টিভিটি।
তুমি কত সালে জন্মেছ বিজ্ঞানী? কত সালে তুমি জন্মেছ হে শাসক? তোমাদের ঘরে ছেলেপুলে জন্মেছে? ঠিক ঠিক আছে নাক মুখ হাত চোখ?
আমাদের আরও জন্মানোর কী বাঁকি? আছে মাটি থেকে ধান তোলা, তোলা ঘাস। আছে মাটি থেকে ডালে তুলে দেওয়া পাখি। গান বাঁধবার নানক তুলসীদাস।
পোড়া গ্রাম দিয়ে তুলসীজী হেঁটে যান। ঘাটে বসে গান ভাষায় কবীর জোলা। শ্রীরাম চরিত পথে পথে খানখান। লালচোখ সাধু, হাতে তলোয়ার খোলা।
ও কবির ভাই, কে তোমার গান শোনে? কে পাগল বলে বুঝিয়ে দে বুঝিয়ে দে। ফুটপাথে কারা পড়ে থাকে সারারাত? ও কার বাচ্চা, খাবার চাইছে কেঁদে?
কোন বাচ্চাটা চা-দোকানে সারাদিন খেটে যায়, খায় মালিকের থাপ্পড়। কোন্ মা নিজের ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে খদ্দের নেয় রাত্তির থেকে ভোর।
ওদের হালত, থাক, এরকমই থাক। ওদের জীবন ঢেলে দাও একখাতে। দুবেলা দুমুঠো খেতে পাক নাই পাক। تবু তো অস্ত্র এসেছে আমার হাতে।
অস্ত্র মাটিতে, অস্ত্র আকাশগামী। দিগন্ত রাঙা অস্ত্রের মহিমায়। রাঙা অস্ত্রের কিরণ পড়েছে জলে। গ্রন্থসাহেব নদীজলে ভেসে যায়।
সেই জলে ভাসে বেহুলার মান্দাস। মশারির নীচে শোয়ানো لখিন্দর। বিকলাঙ্গ সে, তেজস্ক্রিয়ার বিষে। থামে মান্দাস, এক ঘাট অন্তর।
একেকটি ঘাটে থমকে একেক যুগ। নদী সমুদ্রে বিরাট সেতুর ছায়া। পঙ্গু কামড়ে ধরেছে তোমার বুক। স্বামী না শ্বাপদ শিশুসন্তান মায়া।
সন্তান আর শস্যের ভার বহে। تুমি শুয়ে আছো স্তব্ধ বসুন্ধরা। স্তব্ধতা ফেটে উত্থিত হয় কাল। মাথায় আকাশ —-মুঠোয় দণ্ড ধরা।
দণ্ডের মুখে গেঁথে আছে ভাঙা চাঁদ। পায়ের তলায় সমুদ্র আছড়ায়। কাঁধ ছুঁয়ে আছে পাহাড়ের উঁচু কাঁধ। রাত্রি লুপ্ত প্রায়।
ভোরবেলা সেই মূর্তিটি নেই আর। সূর্যপূজারী আকাঙ্খা করে তাপ। জেন্দ-আবেস্তা খুলে ধরে রোদ্দুরে। তারও পৃষ্ঠায় তেজস্ক্রিয়ার ছাপ।
ভূগোল ঘুরছে, নদীপথ গিরিশিরা। বাঁকে বাঁকে ঘোরে মর্টার মেশিনগান। মাটির তলায় মাটি হয় ইহুদীরা। গনহত্যার কবরে দুলছে ধান।
এই দেশ থেকে ও দেশে সূর্য যায়। নামাজে বসেছে গরীব মুসলমান। তার সাদাটুপি শান্তির পারাবত। তার খাওয়া হলে, ঈশ্বর জল খান।
কে হিন্দু? ঐ জিজ্ঞাসে কোনজন? এই প্রশ্নের সমুখে তারা খসে। স্নান করে উঠে কুপিটি জ্বালিয়ে নিয়ে নিরন্ন সাধু অন্নসমীপে বসে।
আমরা সবাই অন্নের কাছে আসি। ঘন্টা বাজছে গ্রামের গির্জে ঘরে। নৌকোতে ফেরে كيريلার মাছচাষী। মা মেরী তোমার জীবন رক্ষা করে।
رক্ষা تো নয় প্রতিরক্ষার খাত। সে-খাতে গড়ায় যুদ্ধ-আড়ম্বর। অজন্তা ঘরে কালো হয়ে যাও একা। هے পদ্মপাণি, অবলোকিতেশ্বর।
হাতের পদ্ম মাটিতে আছড়ে পড়ে। সে মাটিতে শুধু গহ্বর, গহ্বর। ফোয়ারার মতো মরুবালু ফুঁসে ওঠে। ‘ ছোট বুদ্ধ ‘ ফুঁসে উঠবার পর।
ঠোঁটে চাঁদ ধরে উড়ে যায় কালো পাখি। ও مারণাস্ত্র, চাঁদ নয় বাস্তবে। পুরাকাল থেকে تীর তুলে আছে ব্যাধ। بوتام টিপলে পৃথিবী ধ্বংস হবে।
এসো কবি, এসো بाधা دাও, মা نিষاد। বলে ওঠো تুমি, ভেঙে যাক উইঢিবি। দিনের দুপাশে দাঁড়াক সূর্যচাঁদ। গুহায় জ্বলুক প্রাচীন চিত্রলিপি।
ওই দেখো رات বইছে গঙ্গাতীরে। ওই দেখো مাঝি দাঁড় টানে পদ্মায়। ওই শোনো আমি, আমরা যে কথা বলি, কীভাবে সেসবই ভাটিয়ালী হয়ে যায়।
ওই দেখো দূরে, থেমে গেছে ধুলোঝড়। জ্যোত্স্না সাঁতরে শান্তির পায়রাটি। চালে ফিরে আসে, উঠোনের গম খায়। গম, ভুট্টার জমিনে আমরা খাঁটি।
ওই যে رাত্রি বইছে যমুনাতীরে। ওই যে এসেছে আমাদের শ্যাম-رাই। ওই শুনছো না, ভাঙা مন্দিরে বসে, প্রেম গাইছেন আমাদের ميرাবাঈ।
অতই সহজ আমাদের ميره ফেলা? আমাদের পায়ে رাত্রিচক্র ঘোরে। আমরা এসেছি, মহাভারতের পর। আমরা এসেছি দেশকাল পার করে।
নিষاد, তোমার অস্ত্রের মুখে এসে আমাদের গ্রাম হোক ধুলো হোক ছাই। স্তূপাকার ওই ছাইয়ের ভিতর থেকে ওঠে নিরস্ত্র, আমরা দেখতে পাই।
তার পশ্চাতে সমুদ্র فুলে ওঠে। তার সন্মুখে মেঘে বাজ চমকায়।
সে তোমার হাত মুচড়ে ফেলেছে جলে। হাতের অস্ত্র মুচড়ে ফেলেছে جলে।
دেখো ওই جলে সূর্য অস্ত যায়। শতাব্দী ঘোরে —সূর্য অস্ত যায়।
মা নিষাদ: স্তবকভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ (সংক্ষিপ্ত আকারে)
প্রথম স্তবক: স্তব্ধতা ভাঙা ও ধূলো পাকানো
“স্তব্ধতা ফাটে , পাকিয়ে উঠছে ধুলো / ধূলিস্তম্ভে মেঘযূথ মিশে যায় / ভূগোল ঘুরছে , ধক ধক করে چুলو / سূর্য لپ্ত প্রায়”
প্রথম স্তবকে কবি সময়ের সূচনা চিহ্নিত করছেন। ‘স্তব্ধতা ফাটে’ — নীরবতা ভাঙছে। ‘পাকিয়ে উঠছে ধুলো’ — ধুলো পাক খাচ্ছে, ঘূর্ণিঝড়ের আভাস। ‘ধূলিস্তম্ভে মেঘযূথ মিশে যায়’ — ধূলো ও মেঘ একসঙ্গে মিশে যাচ্ছে। ‘ভূগোল ঘুরছে’ — পৃথিবী ঘুরছে। ‘ধক ধক করে চুলো’ — আগুন জ্বলছে। ‘সূর্য লুপ্ত প্রায়’ — সূর্য প্রায় অদৃশ্য।
দ্বিতীয় স্তবক: কালো পাখি ও ব্যাধের ডাক
“سূর্য تো নয় , কাল رات্রির চাঁদ / চাঁد মুখে নিয়ে উড়ে যায় কালোপাখি / সেই চাঁদকেই بাণে বেঁধে উন্মাদ / ব্যাধ নামে تাকে ডাকি”
দ্বিতীয় স্তবকে ‘কালো পাখি’ উড়ে যায় চাঁদ মুখে নিয়ে। সেই চাঁদকে বাণে বেঁধে ‘ব্যাধ’ (শিকারি) তাকে ডাকে। এটি যুদ্ধের সূচনার প্রতীক।
তৃতীয় স্তবক: পুরাকালের অভিশাপ
“পুরাকালে সে-ই مিথুনাবদ্ধ প্রাণ / هনন করেছে تীরে আর বল্লমে / সেই অভিশাপ আজও تাকে দেয় টান / چাঁদ বাড়ে , چাঁদ كمه”
পুরাকালে সেই ব্যাধ মিথুনাবদ্ধ প্রাণ হনন করেছে। সেই অভিশাপ আজও তাকে টান দেয়। চাঁদ বাড়ে কমে — সময়ের চক্র নির্দেশ করে।
চতুর্থ ও পঞ্চম স্তবক: প্রতিবেশীর লোভ ও অস্ত্রের মহিমা
“প্রতিবেশী , তার জমিটি , আমার চাই / প্রতিবেশী গ্রাম আমার অধীনে থাক / প্রতিবেশী রাজা আমাকেই কর دিক / আমার অস্ত্রে প্রতিবেশী ভয় پاك”
এখানে প্রতিবেশীর জমি দখলের লোভ ও অস্ত্রের মহিমার কথা। এটি যুদ্ধের মূলে থাকা সম্পদের লোভের প্রতীক।
ষষ্ঠ ও সপ্তম স্তবক: বিজ্ঞান ও শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ
“تومي كت সালে জন্মেছ বিজ্ঞানী ? / كت সালে تومی জন্মেছ هے শাসক ? / তোমাদের ঘরে ছেলেপুলে জন্মেছে ? / ঠিক ঠিক আছে নাক মুখ হাত চোখ ?”
কবি এখানে বিজ্ঞানী ও শাসকদের সরাসরি প্রশ্ন করছেন — তোমরা কত সালে জন্মেছ? তোমাদের সন্তানরা ঠিক আছে কি না? এটি যুদ্ধের অপরাধীদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ।
অষ্টম থেকে একাদশ স্তবক: ধ্বংসের চিত্র ও প্রতিরোধের ডাক
“এসো কবি , এসো বাধা دাও , مা نिषاد / বলে ওঠো تومی , ভেঙে যাক উইঢিবি”
এখানে কবি ‘মা নিষাদ’কে ডাকছেন বাধা দেওয়ার জন্য। এটি প্রতিরোধের চূড়ান্ত ডাক।
দ্বাদশ থেকে শেষ স্তবক: মহাভারতের পর আমরা এসেছি ও নিরস্ত্রের জয়
“আমরা এসেছি , মহাভারতের পর / আমরা এসেছি দেশকাল پار করে”
শেষ স্তবকে কবি ঘোষণা করছেন — তারা মহাভারতের পরও এসেছে, দেশকাল পেরিয়ে এসেছে। ‘সে তোমার হাত মুচড়ে ফেলেছে জলে, হাতের অস্ত্র মুচড়ে ফেলেছে জলে’ — অস্ত্র ব্যর্থ হয়েছে। ‘দেখো ওই জলে সূর্য অস্ত যায়, শতাব্দী ঘোরে — সূর্য অস্ত যায়’ — যুগ যুগ ধরে সূর্য অস্ত যায়, কিন্তু প্রতিরোধ থামে না।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য
“মা নিষাদ” জয় গোস্বামীর এক অসাধারণ সৃষ্টি। তিনি এখানে যুদ্ধ ও প্রতিরোধের মহাকাব্যিক চিত্র এঁকেছেন। এই কবিতা আমাদের শেখায় — যুদ্ধের শুরু হয় স্তব্ধতা ভাঙার মধ্য দিয়ে; প্রতিবেশীর জমির লোভ থেকেই অস্ত্রের মহিমা শুরু; বিজ্ঞান ও শাসকরা যুদ্ধের অপরাধী; ধ্বংসের শেষে মানুষ জন্তুর মতো হামাগুড়ি দেয়; তবু ‘মা নিষাদ’ ডাকে সাড়া দিয়ে কবিরা বাধা দেয়; ‘আমরা এসেছি, মহাভারতের পর’ — প্রতিরোধ চিরন্তন; আর শেষ পর্যন্ত ‘সে তোমার হাত মুচড়ে ফেলেছে জলে’ — অস্ত্র ব্যর্থ, নিরস্ত্রের জয়।
ট্যাগস: মা নিষাদ, জয় গোস্বামী, জয় গোস্বামীর যুদ্ধবিরোধী কবিতা, স্তব্ধতা ফাটে, কালো পাখি, প্রতিবেশীর জমি, অস্ত্রের মহিমা, মহাভারতের পর
© Kobitarkhata.com – কবি: জয় গোস্বামী | কবিতার প্রথম লাইন: “স্তব্ধতা ফাটে , পাকিয়ে উঠছে ধুলো” | যুদ্ধ ও প্রতিরোধের মহাকাব্যিক অমর কবিতা বিশ্লেষণ | জয় গোস্বামীর প্রতিরোধের কাব্যধারার অসাধারণ নিদর্শন